৩.২ কোরানের রূপক আয়াত সমূহ



অতঃপর রূপক-মূলক আয়াতগুলির প্রতি দৃষ্টিপাত করা যাউক। ‘রূপক’ শব্দের অর্থ হইল একটি বিষয়ের ছদ্মাবরণে অন্য একটি বিষয় বর্ণনা করা। ইহা ঐ সকল বিষয়ে প্রয়োগ করা হয় যাহা সম্বন্ধে বর্তমানে আমাদের কোন জ্ঞান নাই, এবং সেইহেতু আমরা ইহাদের যথার্থ ব্যাখ্যা করিতে পারিনা। যাঁহারা প্রকৃত জ্ঞানী তাঁহারা নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করেন এবং বলেন যে, বর্তমান জ্ঞানের পরিসীমাতে আয়াতগুলির ব্যাখ্যা করা সম্ভব নহে। যাহা হউক, ইহার অর্থ নয় যে, এই আয়াতগুলি চিরকালই রূপক আকারে থাকিবে; কারণ তাহা হইলে ইহাদের অবতীর্ণ (নাজিল) হওয়ার কোন অর্থ হইত না। পরন্তু ইহাই বুঝায় যে, বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে মহাবিশ্বের প্রকৃতি সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞান যতই বৃদ্ধি পাইবে ততই এই আয়াতগুলির প্রকৃত অর্থ আমাদের নিকট পরিস্কার হইবে। ইহার প্রমাণের জন্য অনেক উদাহরণও আছে।

কোরানের এই সকল আয়াত বুঝিতে কেবল ভাষাগত জ্ঞানের দক্ষতাই যথেষ্ট নহে। ইহার সহিত বিজ্ঞান বিষয়ে বহুমুখী জ্ঞানের প্রয়োজন। ইহার অর্থ এই নয় যে কোরান বুঝিবার জন্য সকলকেই বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় অধ্যয়ন করিতে হইবে। আমার ইহাই বক্তব্য যে বিজ্ঞানের বিষয় সমূহে জ্ঞানবৃদ্ধির ফলে কোরানের অনেক কিছুই আর রূপক বা গুপ্ত বলিয়া বিবেচিত হইবে না। কেবল যে সকল ব্যক্তি নিজ নিজ মতানুযায়ী ব্যাখ্যা দিয়া বিভ্রান্ত করিবার চেষ্টা করে তাহাদের সম্বন্ধে সতর্ক থাকিতে হইবে। ডঃ মরিস বুকায়িল তাঁহার “দি বাইবেল, দি কোরান এন্ড সায়েন্স” শীর্ষক গ্রন্থে অনেক আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়াছেন, বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় আমাদের জ্ঞানের অভাব যেগুলির পূর্বে অপব্যাখ্যা করা হইয়াছিল। তাঁহার পুস্তক হইতে কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া হইল:

(৫৫:৩৩) “হে জ্বীন ও মানবসম্প্রদায়, যদি তোমরা আসমান ও জমিনের স্তর সমূহে অনুপ্রবেশ করিতে পার, তবে তাহা কর। তোমরা শক্তি ব্যতীত সেখানে অনুপ্রবেশ করিতে পারিবে না”।

এই আয়াত মহাশূন্য বিজয় সম্বন্ধে বর্ণনা করিতেছে। যদিও ইহা শৈশব অবস্থায় তবুও মানুষকে যে বুদ্ধি ও কলা কৌশলের শক্তি দেওয়া হইয়াছে তাহার ফলে ইহা বাস্তবে পরিণত হইয়াছে। এই আয়াত ভূস্তরের গভীরেও আবিষ্কার অভিযানের ইঙ্গিত দিতেছে।

এই আয়াতের প্রচলিত অনুবাদে কেহ কেহ সম্পূর্ণ ভ্রান্তভাবে একটি অতীন্দ্রিয় ব্যাপার ঘটিত ব্যাখ্যা আরোপ করিয়াছেন।

আরও দুইটি আয়াত মহাশূন্যচারীরা যে সমস্ত অপ্রত্যাশিত দৃশ্য দেখিবেন তাহার মানবিক প্রক্রিয়া বর্ণনা করিয়াছে: যেমন তাহাদের বিহবল দৃষ্টি, সুরামত্ত অবস্থার ন্যায়, মন্ত্রমুগ্ধ বোধ হওয়া, আর ইহাই মহাশূন্যচারীদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। এই আয়াতগুলির অনুবাদ:

(১৫:১৪,১৫) এমনকি যদি আমরা তাহাদের জন্য আসমানে যাইবার একটি দ্বার খুলিয়াও দিই এবং তাহারা সেইপথে আরোহণ করিতে থাকে, তাহারা বলিবে: আমাদের দৃষ্টি বিহবল হইয়া পড়িয়াছে, সুরামত্ত অবস্থায় যেমন হয়। নতুবা আমরা মন্ত্রমুগ্ধ।

রূপক-মূলক আয়াত সমূহের আরো সুন্দর দৃষ্টান্ত হইল যে সকল আয়াতে বেহেশত্ ও দোজখের বর্ণনা দেওয়া হইয়াছে। এ বিষয়ে কোরান জাজ্বল্যমান বস্তুতান্ত্রিক চিত্র অঙ্কন সত্ত্বেও, এইগুলি উপমা ও রূপক-মূলক উদাহরণ হিসাবে গণ্য করিতে আমাদিগকে সতর্ক করে।

স্মরণে রাখিতে হইবে যে, সহজবোধ্য আয়াতগুলি যেখানে বাস্তব জীবনে অভ্যাসের বিধি নির্দেশ করে সেখানে রূপক-মূলক আয়াতগুলি কেবলমাত্র আল্লাহর সৃষ্টিরহস্য উদঘাটনকারী বৈজ্ঞানিক গবেষণার অগ্রগতির মাধ্যমেই তাহাদের প্রকৃত অর্থ ব্যক্ত করিবে।

কোরান অনেক আয়াতেই প্রকৃতি সম্বন্ধে গবেষণামূলক অনুশীলনে উৎসাহিত করে যাহাতে মানবজাতির জন্য বহু উপকার নিহিত আছে। কিন্তু ঐসব উপকার কেবলমাত্র কঠোর শ্রমের মাধ্যমেই পাওয়া যাইবে।

অবশেষে, ইহা লক্ষ্য করা অত্যাবশক, অনেক আয়াতে আল্লাহ্ বলিয়াছেন যে, তিনি কোরান স্মরণে রাখা সহজ করিয়াছেন, অতীতে এবং বর্তমানে সে অসংখ্য ব্যক্তি কোরান মুখস্ত করিয়াছেন ইহাই তাহার প্রমাণ। মূল আয়াতগুলি বুঝিতে পারা সহজ, এবং এইগুলিই আমাদের বাস্তব জীবনে পথনির্দেশ দিতে পারে যাহাতে মানুষে মানুষে দ্বন্দ্ব ও বিভেদ অপসারিত হইতে পারে। দুঃখের বিষয় যে আমাদের জীবন পদ্ধতিতে ইহা প্রতিফলিত হয়না, ফলে আমরা নিদারুণ দুর্ভোগের শিকার হই।

References: (প্রসঙ্গ সূত্র)

১. Exposition of the Qur’an, by Gulam Ahmed Parwez.
Tolu-E-Islam Trust (Regd) 25B Gulberg, Lahore11, Pakistan. Verse(p.6).
২. The Bible The Qur’an and Science, by Dr. Maurice Bucaili.
Publisher Seghers, 6 Place Saint-Sulpice 75006 Paris. p. 134-234.
৩. Ibid., p.174.
৪. Ibid., p.175.





Home Next >>