১৩.৫ আইনের উৎস হিসাবে কোরান



“কোরানে বর্ণিত আল্লাহর আইনসমূহের প্রতি বাধ্যবাধকতা ইসলামের একটি মূল এবং অপরিহার্য অঙ্গ।

(৬:১১৪) তবে কি আমি (রাসূলুল্লাহ্) আল্লাহ্ ব্যতীত আর কাহারও বিচার-প্রার্থী হইব, যখন তিনি তোমাদের নিকট সম্পূর্ণরূপে ব্যাখ্যায়িত এই গ্রন্থ প্রকাশ করিয়াছেন? [....]“

(৫:৪৫) [...] আল্লাহ্ যাহা নাজিল করিয়াছেন তদনুসারে যাহারা বিচার করে না, তাহারাই অন্যায়কারী।

“আল্লাহর আইনের প্রতি আনুগত্য কোন ব্যক্তি বিশেষের অধিকার নহে এই অর্থে যে, সে নিজস্ব বিবেচনায় কোরানের ব্যাখ্যা করিয়া নিজস্ব মতে কার্য করিবে। কোন সাংগঠনিক পদ্ধতির আওতায় (বর্তমান পরিভাষায় ‘সরকার’ নামে বিদিত) এই বাধ্যতাকে নিয়ন্ত্রিত এবং সুশৃঙ্খলিত করিতে হইবে। এই সংগঠন একটি কেন্দ্রিয় কর্তৃত্ব দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হইবে, যেমন প্রথম কেন্দ্রিয় কর্তৃত্বে ছিলেন আল্লাহর রাসূল। (৪:৮০) যে রাসূলকে মান্য করিল, সে আল্লাহকে মান্য করিল এবং যে মুখ ফিরাইয়া লইল আমরা তাহাদের জন্য আপনাকে প্রহরী করিয়া প্রেরণ করি নাই। (৫:৪৯) [...] সুতরাং যাহা আল্লাহ্ নাজিল করিয়াছেন তাহার সাহায্যে, তাহাদের মধ্যে বিচার কর। এবং খেয়ালখুশীর বশবর্তী হইয়া, তোমার নিকট যে সত্য প্রকাশিত হইয়াছে, তাহা হইতে বিচ্যুত হইওনা [....]।

অল্প কয়েকটি ব্যতিক্রম ব্যতীত, কোরান সাধারণতঃ মূল নীতিসমূহ বিবৃত করে, তাহাদের সহকারী আইন নহে। এই অপরিবর্তনীয় মূল-নীতি বা স্থায়ী আদর্শ সম্বন্ধে কোরান বলে: (৬:১১৫) তোমার প্রতিপালক কর্তৃক প্রকাশিত মূল নীতিসমূহ সত্য এবং ন্যায় দ্বারা পরিপূর্ণ। আল্লাহর মূল নীতি পরিবর্তন করিতে পারে এমন কেহই নাই”।

“সহকারী আইনসমূহ কোরান সুবিবেচনার সহিত অনির্ধারিত রাখিয়াছে। কিন্তু সেগুলি মূলনীতি ও স্থায়ী আদর্শে আলোকে কিরূপে বিধিবদ্ধ হইবে তাহার নির্দেশ রাসূলকে দেওয়া হইয়াছে: (৩:১৫৯) [...] (সমাজের) ব্যাপার সমূহে তাহাদের (বিশ্বাসীদের) সহিত পরামর্শ করুন” [...]।১০

“রাসূল তাঁহার জীবনকালে ‘উম্মার’ সহিত পরামর্শ করিয়া সহকারী আইন সমূহ স্থির করিতেন। প্রশ্ন এই যে, তাঁহার মৃত্যুর পর কি করা হইবে? ইহার উত্তরে (কোরান) এইরূপে বলিতেছে: (৩:১৪৪) মোহাম্মদ এক বার্তাবাহক মাত্র; (যাঁহার অনুরূপ) বার্তাবাহক পূর্বেও গত হইয়াছে। সুতরাং তাঁহার যদি মৃত্যু হয়, অথবা তিনি নিহত হন, তবে কি তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিয়া পলায়ন করিবে? [...] ইহা হইতে বুঝা যায় যে, রাসূলের মৃত্যুর পর, কোরানে বর্ণিত মূল-নীতির কাঠামো অনুসারে আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া থামিয়া যাইবে না”১১

“রাসূল কর্তৃক নির্ধারিত ‘খিলাফত’ এর প্রতিষ্ঠান চালিত থাকিলে, ইহার দ্বারা উদ্ভাবিত আইন প্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবেই প্রসারিত হইত, এবং ফলে ‘শরিয়তের’ আইনে স্থায়ীত্ব ও পরিবর্তনের একটি সুন্দর সংমিশ্রণ হইতে পারিত। পরিতাপের বিষয়, যে এই প্রক্রিয়া স্থগিত হইয়া পড়িল, এবং যে সমালোচনা করার মনোভাব দ্বারা সহকারী আইনসমূহ প্রণীত হইত তাহারও অবসান হইল। ইহা সত্য যে, ‘ফিকাহ’র বিধি মতবাদীরা এই প্রক্রিয়া কিছুকাল চালু রাখিয়াছিল; কিন্তু তাহাদের চেষ্টা ছিল ব্যক্তিগত পর্যায়ে, যাহা অতি সত্বর কঠিন ও প্রস্তরীভূত হইয়া গিয়াছিল”।১২

“এক্ষণে আমরা এই অতিগুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সম্মুখীন যে, যেহেতু রাসূলের সময়কার খিলাফতের আদর্শ আর চালু নাই, সেক্ষেত্রে আইন প্রণয়নের জন্য একটি ইসলামী রাষ্ট্র কি ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে? উত্তরে যদি বলা হয় যে, রাসূলের সময়কার খিলাফতের আদর্শ এখন চালু করা অসম্ভব কারণ এই কার্যে হযরত আবুবকর ও হযরত ওমরের ন্যায় ব্যক্তিত্ব এখন দুর্লভ, তাহা হইলে ইহাই স্বীকার করিবার সামিল হইবে যে, কোরানে প্রদর্শিত জীবন ধারা কেবলমাত্র ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট কালের জন্য ছিল। এই চিন্তাধারা অসংগত। কোরানকে আল্লাহ্ স্বয়ং সংরক্ষণ করেন, যাহাতে মানব সমাজ বাস্তব জীবন যাপনের জন্য এমন একটি জীবনবিধান পায়, যাহা কাল হইতে কালান্তরে এবং স্থান হইতে স্থানান্তরে প্রযোজ্য। কোরানের মত এবং আদর্শের ভিত্তিতে একটি প্রকৃত ইসলামীক রাষ্ট্র একদা প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। অনুরূপ প্রতিষ্ঠান এখনও সম্ভব, কিন্তু রাতারাতি বর্তমান ব্যবস্থার পরিবর্তন করিয়া একটি আদর্শ ইসলামী রাষ্ট্রের প্রবর্তন সম্ভব নয়। প্রতিষ্ঠানটিকে বিবর্তনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ধাপে ধাপে চরম গন্তব্যের উদ্দেশ্যে অগ্রসর হইতে হইবে, এবং প্রতিপদে পূর্বের ভুল-ত্রুটী হইতে ইহাকে মুক্ত করিতে হইবে”।১৩

অবশ্যই স্মরণে রাখিতে হইবে যে, পরিবর্তন আনয়নের অধিকার ইসলামী রাষ্ট্রের, কোন ব্যক্তি বিশেষের নহে, যতই না তাহার মানসিক উৎকর্ষতা থাকুক। ব্যক্তিসত্ত্বা কেবল চিন্তাধারা পরিবর্তনের সূচনা করিতে পারে, কিন্তু কার্যকরী প্রক্রিয়া নির্ভর করে সমগ্র সমাজের সহযোগিতার উপর।

আর একটি অতি প্রয়োজনীয় বাস্তব বিষয় “যাহা ইসলামের পরবর্তীকালের ব্যাখ্যাকারকগণ বলিষ্ঠভাবে উল্লেখ করিতে সম্পূর্ণরূপে অপারগ হইয়াছিলেন তাহা এই যে, আইন বিশেষজ্ঞরা কোরান হইতে কেবল সেই অংশগুলিই গ্রহণ করিয়াছিলেন যাহাতে নির্দিষ্ট শান্তির কথা অথবা যাহার ব্যাখ্যা আছে। তাঁহারা অন্যান্য বিবিধ প্রকার অপরাধ এবং পাপের উপর কোনই গুরুত্ব দেন নাই। কিন্তু কোরানের দৃঢ় উল্লেখ অনুযায়ী সেগুলিই জাতিসমূহকে চূড়ান্ত ধ্বংসের পথে পরিচালিত করিয়াছিল এবং এ সম্বন্ধে কোরান দৃঢ় ইঙ্গিত দেয় যে এইগুলির শাস্তি চিরস্থায়ী দোজখ”।১৪

কোরান হইতে গৃহীত ‘সঠিক ফিকাহ্’ ইসলামী সমাজের রাজনৈতিক পরিচালকগণ বিশ্বাসের শক্তির সহিত বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত করিতে পারিলে তাহাই হইবে ইসলামকে পুনর্জীবিত করিবার প্রকৃত মহৌষধ। যাঁহারা কোরানের মৌলিক ভাবধারার প্রতি লক্ষ্য রাখিয়া কোরান পাঠ করেন এবং মানব সমাজে ব্যবহারিক আইন প্রশাসনের জ্ঞান রাখেন, তাঁহাদের পৃষ্ঠপোষকতা ব্যতীত ইসলামী ‘ফিকাহ্’ (আইন) অলৌকিক ফল আনিতে পারিবে না। আরম্ভ হিসাবে ইসলামী আইন প্রশাসকদিগকে কোরানের ঐ সকল অনুশাসন গ্রহণ করিতে হইবে যাহা সমগ্র সমাজকে দৃঢ় ভিত্তির উপর গঠিত করিবে। এই প্রসঙ্গে কোরানের অনুশাসন বাক্য (৩:১০৪) যে, ‘তোমাদের মধ্যে এমন একদল থাকিতে হইবে যাহারা (লোকদের) কল্যাণের দিকে আমন্ত্রণ করিবে এবং লক্ষণীয় সৎকার্যের জন্য নির্দেশ করিবে (একতাবদ্ধ থাকিয়া), এবং অসৎ কার্য করিতে নিষেধ করিবে [...]’, ইহা অবশ্যই আমাদের প্রগতিশীল আইনের অংশ হইতে হইবে”।১৫ “কোরানের সুবিদিত আয়াতসমূহ: (৩:১০৩) ‘এবং তোমরা সকলে একত্রে আল্লাহর রজ্জু দৃঢ়রূপে ধরিয়া থাক, এবং পৃথক হইও না [...]’, এবং (৬:১৬০) ‘যাহারা তাহাদের কর্মসূচী (দ্বীন) বিচ্ছিন্ন করে এবং বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত হয়, আপনি (হে রাসূল) কোনরূপে নিজেকে তাহাদের অন্তর্ভুক্ত করিবেন না [...]’, এগুলি স্পষ্ট উদাহরণ, যদ্বারা কোরান অনুসারীদিগকে সর্বক্ষেত্রে আল্লাহর আদেশসমূহ মান্য করিতে নির্দেশ দেয়। সুতরাং, যে পর্যন্ত আইন ও সুবিজ্ঞ আইন প্রণয়নের নৈতিক শক্তির দ্বারা এগুলির ন্যায় সাধারণ আদেশসমূহ কার্যে পরিণত করা না হয়, সে পর্যন্ত মানুষের কোন আইন একটি সুস্থ সমাজ গঠন করিতে পারিবে না। সেইহেতু প্রগতিশীল ইসলামী ফিকাহর কর্তব্য যে, কোরানে বর্ণিত বিধানসমূহের প্রকৃতি সংরক্ষিত করিয়া মুসলিমদের নৈতিকতা ও কার্যধারা গঠন করা”।১৬





Home Next >>