১৩.২ আইন-বিজ্ঞানের বিকাশ (আহলি ফিকাহ্)



“হাদিস সাহিত্য ‘আহাদিস’ (হাদিসের বহুবচন) লিপিবদ্ধ হইবার পূর্বে আইন প্রণয়ন (ফিকাহ্) বিষয়ক গ্রন্থসমূহ লিখিত হইয়াছিল। ইহার কারণ সুস্পষ্ট। আইন এবং আইন বিষয়ক গবেষণামূলক গ্রন্থাদি জনসাধারণের জন্য অত্যাবশ্যক, এবং সেইহেতু সরকারও এই বিষয়ে উৎসাহী ছিল। অপরপক্ষে হাদিস অধ্যয়নের আবশ্যকতা ছিল স্বল্প, এবং ইহা প্রধানতঃ নিজস্ব ও ব্যক্তিগত গণ্ডীর মধ্যেই বদ্ধ ছিল।

আইন প্রণয়নের চারিটি মতবাদের মধ্যে মালিক ইবনে আনাস (মৃত্য ১৭৯ হিজরী) অগ্রগামী। তিনি ছিলেন একজন আইনজ্ঞ এবং আইনে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে তিনি ঐতিহ্যগত বিষয় (tradition) সংগ্রহ করিতেন। অপরপক্ষে আবু হানিফা (মৃত্যু ১৫০ হিজরী) আইন প্রণালীর বিকাশের ভিত্তি হিসাবে তত্ত্ববিষয়ক মূলনীতির উন্নয়নে অধিকতর উদ্যোগী ছিলেন। তিনি ঐতিহ্যের (tradition) উপর বিশেষ গুরুত্ব না দিয়া কোরানে বর্ণীত তথ্যাদি বিশদরূপে বিকশিত করিতে ইচ্ছুক ছিলেন। তাঁহার দুই সহকারী ছাত্র, কাজি আবু ইউসূফ (মৃত্যু ১৮২ হিজরী) এবং মোহাম্মদ ইবনে হাসান (মৃত্যু ১৮৯ হিজরী), তাহার তত্ত্ববিষয়ক মূল নীতিসমূহ আইনের ধারায় সংকলিত করেন। আইন প্রণয়নে তৃতীয় মতবাদের উৎপত্তি আল-শাফি হইতে (মৃত্যু ২০৪ হিজরী)। তাহার আইন-পদ্ধতির চারিটি ভিত্তি: কোরান, ঐতিহ্য (tradition) সাদৃশ্য এবং মতৈক্য। কার্যতঃ সকল মতবাদই আল-শাফির উৎসসমূহের এই শ্রেণীবিন্যাস মানিয়া লইয়াছে। যাহা হউক, এই চারিটি মতবাদের শেষটিকে আসা যাউক। আহমাদ ইবনে হানবাল (মৃত্যু ২৪১ হিজরী) ছিলেন একজন ধর্মতত্ত্ববিদ (theologian) যিনি আইনজ্ঞ বলিয়া কোন দাবী করেন নাই। তাহার ‘মসনদ’ ৩০,০০০ হাদিসের এক বিশাল সংগ্রহ, কিন্তু সেগুলি আইনে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে সজ্জিত হয় নাই। তাঁহার গোড়া বিশ্বাসের দরুণ খলিফা মামুনের সময় তাহাকে প্রচণ্ড কষ্ট ভোগ করিতে হইয়াছে। তাঁহার মৃত্যুর পর তাহার শিষ্যগণ একত্রিত হইয়া তাহার শিক্ষা অনুসারে চতুর্থ মতবাদ প্রতিষ্ঠিত করেন। মতৈক্য এবং সাদৃশ্যের প্রভাব ক্ষুন্ন করিয়া তাঁহার মতবাদ সরাসরি আক্ষরিক ব্যাখ্যার প্রতি ধাবিত হইয়াছে।

এই চারিটি মতবাদই সমভাবে আইনতঃ সিদ্ধ এবং ইহাদের সিদ্ধান্ত মুসলিমদের চক্ষে সমরূপে শ্রদ্ধার অধিকারী। বিশ্বাসীগণ যে কোন একটি অনুসারী হইতে পারে কিন্তু তাহাদিগকে একটি মতবাদ অবশ্যই গ্রহণ করিতে হইবে। একতার মধ্যে এই বৈচিত্রের স্বাধীনতা চুক্তির ফলে সম্ভব হইয়াছে, কিন্তু বিভিন্ন মতবাদের মধ্যে আইন প্রয়োগের বিবাদের জন্য ইহা সুন্নীদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিভাগ সৃষ্টি করিয়াছে। হানাফি মতবাদের অনুসারীরাই সংখ্যায় গরিষ্ঠ। ইহার পরে ক্রমান্বয়ে আসে শাফি ও মালিকি অনুসারীরা, এবং সর্বনিম্ন হইতেছে হানবালী, যাহা সৌদী আরবের ওহাবী রাজত্বের মতবাদ।





Home Next >>