১১.৫ হজ্জ্ব



হজ্জ্ব একটি মূল আরবী শব্দ এবং ইহার অর্থ মক্কায় তীর্থ সম্পন্ন করা। হজ্জ্ব হইতে উৎপন্ন শব্দ ‘হাজ্জ্বা’র অর্থ পরস্পরের সহিত তর্ক বিতর্ক অথবা যুক্তি আদান প্রদান করা। হজ্জ্ব শব্দ কোরানে দশবার পাওয়া যায়, এবং প্রতি ক্ষেত্রেই ‘মানবজাতির’ প্রতিই ইহার নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে, কেবলমাত্র মুসলিমদিগের প্রতি নয়। হজ্জ্ব যে মানবজাতির প্রতি সম্বোধিত হইয়াছে ইহাতে ধারণা হয় যে সর্বশক্তিমানের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হইল মানবজাতিকে একত্রিত করা, এবং তাহা একমাত্র তখনই সম্ভব হইবে যখন ‘দ্বীন’, বা মানবজাতির পক্ষে মঙ্গলকর জীবনধারা, প্রতিষ্ঠিত হইবে। ‘হাজ্জ্বা’ শব্দ হজ্জ্বের প্রক্রিয়াগত অংশ অপেক্ষা অধিকতর ও ব্যাপকতর উদ্দেশ্য নির্দেশ করে। এই অধিকতর উদ্দেশ্য শেষ অংশে ১১.৫২ বিভাগে বর্ণিত হইয়াছে।

বর্তমানে হজ্জ্ব যে ভাবে সম্পাদিত হয় তাহা মূলতঃ প্রার্থনা ও তৎসহ কিছু অতি পরিচিত আচারানুষ্ঠান। কোরানে অনুষ্ঠানগুলির প্রতি নির্দেশ দিলেও কোন বিশদ বিবরণ দেওয়া হয় নাই। হাদিস সাহিত্য কোরানের এই আচারানুষ্ঠানের সহিত আরও বহু কিছু যোগ দিয়াছে, ফলে, হজ্জ্বের প্রকৃত তাৎপর্য বহুপরিমাণে বিনাশ পাইয়াছে। এক্ষণে মুসলিমরা হজ্জ্বকে নির্ভুলভাবে অনুসরণ যোগ্য একটি রীতি বলিয়া বিবেচনা করে, এবং আমাদের অতীত পাপ মোচনের একটি পথ বলিয়া মনে করে। সেইজন্য বোধহয় যাহারা সঙ্গতিশীল তাহারা প্রায়ই হজ্জ্ব সমাধা করে। আচারানুষ্ঠানের অংশ সম্পর্কে বলা যায় ইহার সূক্ষ্ম ভাগ প্রত্যাদেশ উদ্ভুত নহে, সহায়ক বা অতিরিক্ত বিধানের আওতায় পড়ে (১৩.৫ বিভাগ দ্রষ্টব্য)। সুতরাং কোরানের সহজ পদ্ধতি অথবা হাদিস গ্রন্থে প্রদত্ত জটিলতর রূপে হজ্জ্ব সম্পাদন করিবার মধ্যে কোন পার্থক্য নাই। ইহা অবশ্যই স্মরণ রাখিতে হইবে যে আচারনুষ্ঠানিক অংশ গত ১৪০০ বৎসর ব্যাপী চলিয়া আসিতেছে, এবং প্রথম কয়েক শত বৎসর মানুষকে নির্দেশ দিবার জন্য কোন হাদিসগ্রন্থ ছিল না, সুতরাং সেই সময়ে যে পদ্ধতিই প্রচলিত ছিল তাহা অবশ্যই চলিয়া আসিবে। ইহা বলিবার উদ্দেশ্য হইল যে, কোরানে হজ্জ্ব সম্বন্ধে যথেষ্ট বর্ণনা আছে যাহা অবলম্বনে হজ্জ্বের একটি প্রক্রিয়া স্থির করা যায়, তবে কি উদ্দেশ্যে হজ্জ্ব পালন করা হয় মূলতঃ তাহাই অর্থপূর্ণ। নিম্নের আয়াতসমূহ হজ্জ্বের মূল সূত্রগুলির নির্দেশ দেয়। ইহার পরে এই আয়াতগুলির ভিত্তিতে হজ্জ্বের একটি সংক্ষিপ্ত প্রক্রিয়া দেওয়া হইয়াছে। সর্বশেষে হজ্জ্বের প্রকৃত তাৎপর্য আলোচনা করা হইয়াছে।

(৩:৯৬,৯৭) লক্ষ্য করিও যে মানবজাতির জন্য নির্দিষ্ট স্থান প্রথম পবিত্র স্থান ছিল বেক্কা (মক্কা); একটি শান্তিময় স্থান, মানুষের জন্য পথ-নির্দেশক, যেখানে (আল্লাহর নির্দেশের) সুস্পষ্ট স্মারক-চিহ্ন বর্তমান, যে স্থানে নবী ইবরাহীম দাঁড়াইয়াছিলেন প্রার্থনায়; এবং যে কেহ এখানে প্রবেশ করিবে সে নিরাপদ হইবে। এবং এই গৃহে হজ্জ্ব সম্পন্ন করিতে যে কেহ সক্ষম তাহার এবং মানবজাতির জন্য ইহা আল্লাহর প্রতি কর্তব্য। যে ইহা অবিশ্বাস করিবে (তাহাকে জানাও) যে আল্লাহ্ (সকল) জীব হইতে স্বাবলম্বী।

(২২:২৭-২৯) মানবজাতির নিকট হজ্জ্ব সম্বন্ধে ঘোষণা করুন। তাহারা আপনার নিকট পদব্রজে এবং কৃশকায় উটে প্রতিটি গভীর গিরি-সংকট পার হইয়া আসিবে; যাহাতে তাহারা তাহাদের জন্য মঙ্গলজনক বিষয়সমূহ প্রত্যক্ষ করিতে পারে; এবং নির্দিষ্ট দিনগুলিতে তাঁহারা যেন আল্লাহর দেওয়া গবাদি পশুদের উপর তাঁহার নাম উচ্চারণ করে; পরে উহাদের মাংস ভক্ষণ করিবে এবং দরিদ্র ভাগ্যহীনদের খাওয়াইবে। তারপর তাহারা যেন তাহাদের কৃচ্ছসাধন অবস্থা সাঙ্গ করে এবং কোন শপথ করিয়া থাকিলে তাহা পূর্ণ করে ও (আর একবার) ঐ প্রাচীন গৃহের চতুর্দিকে প্রদক্ষিণ করে।

(২:১২৫) এবং যখন আমি মানবজাতির জন্য (মক্কার) ঐ গৃহ একটি আশ্রয়-স্থল ও পবিত্র স্থান করিয়াছিলাম (ও বলিয়াছিলাম): ইবরাহীম যে স্থানে দাঁড়াইয়া (প্রার্থনা করিতেন) তোমরা তোমাদের প্রার্থনার জন্য সেই স্থান গ্রহণ কর। এবং ইবরাহীম ও ইসমাইলের উপর কর্তব্য হিসাবে ন্যস্ত করিয়াছিলাম যে, তোমরা আমরা গৃহকে তাহাদের জন্য পবিত্র রাখিবে, যাহারা ইহার চতুর্দিকে আবর্তন করিবে বা তথায় ধ্যানমগ্ন হইবে বা (প্রার্থনায়) নতমস্তক ও প্রণিপাত (সেজদা) হইবে।

(২:১৫৮) আস-সাফা ও আল-মারওয়া (পাহাড়দ্বয়) আল্লাহর নিদর্শন স্বরূপ। অতএব যে (আল্লাহর) ঐ গৃহে হজ্জ্ব করিতে বা ইহা দর্শনে (ওমরাহ) যায়, তাহার জন্য ইহাদের চতুর্দ্দিকে ঘুরিলে কোন পাপ নাই এবং যে স্বেচ্ছায় সৎকর্ম করে, আল্লাহ্ তাহার প্রতি প্রতিবেদনশীল, সচেতন।

(২:১৯৬) এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ্জ্ব ও ওমরাহ (১১.৫১) পালন কর। এবং যদি তুমি বাধাগ্রস্থ হও, তবে এমন কিছু দানসামগ্রী প্রেরণ কর যাহা সহজ প্রাপ্য, এবং ঐ সমস্থ দানসামগ্রী গন্তব্য স্থানে না পৌছান পর্যন্ত মস্তক মুণ্ডিত করিও না। এবং তোমাদের মধ্যে যদি কেহ অসুস্থ থাকে কিংবা কাহারও মস্তকের কোন ব্যাধি থাকে তবে অবশ্যই উহার বিনিময়ে রোজা রাখিবে অথবা দান কিম্বা অন্য কোন প্রকার ধর্মকর্ম করিবে। যদি নিরাপদ হও এবং ওমরাহর পর হজ্জ্ব পালন করিতে চাও তবে যাহা সহজপ্রাপ্য দান সামগ্রী তাহাই দিবে। এবং যদি কেহ ইহাতে সক্ষম না হয় তবে হজ্জ্বের মধ্যে তিন দিন এবং প্রত্যাবর্তনের পর সাত দিন, মোট দশ দিন রোজা রাখিবে। এই ব্যবস্থা তাহার জন্য যাহার পরিজন ঐ পবিত্র মসজিদের নিকট বাস করে না। এবং আল্লাহর প্রতি তোমরা কর্তব্য পালন কর এবং জানিও আল্লাহ্ শাস্তিদানে কঠোর।

(২:১৯৭) হজ্জ্বের মাস সমূহ সুবিদিত, এবং সেই সময়ে যে ইহা পালন করিতে মনস্থির করে (তাহাকে খেয়াল রাখিতে হইবে যে), কোন প্রকার ব্যভিচার, গালিগালাজ কিংবা ক্রুদ্ধ বাদানুবাদ হজ্জ্বের সময় চলিবে না। এবং যাহা কিছু সৎকর্ম তোমরা কর আল্লাহ্ তাহা জানেন। সুতরাং (পরলোকের) জন্য ব্যবস্থা করিও, এবং মন্দকে বিতাড়িত করাই সর্বোৎকৃষ্ট ব্যবস্থা। অতএব, জ্ঞানীগণ আমার প্রতি তোমাদের কর্তব্য ঠিক রাখিও।

(২:১৯৮,১৯৯) তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হইতে অনুগ্রহ অনুসন্ধান করিলে কোন পাপ নাই। কিন্তু যখন জনতার সহিত আরাফত হইতে ফিরিবে তখন সেই পবিত্র স্মারকচিহ্নের নিকট আল্লাহকে স্মরণ করিও যদিও পূর্বে তোমরা বিভ্রান্ত ছিলে। তৎপর ঐ স্থান হইতে দ্রুত ধাবমান হও যেমন জনতা সেখান হইতে দ্রুত ধাবমান হয়, এবং আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। অবশ্যই আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, দয়াময়।

(২:২০০-২০২) এবং যখন তোমাদের প্রার্থনা সমাধা হয়, তখন যেরূপ তোমাদের পিতাদের স্মরণ করিতে সেইরূপ অথবা ততোধিক জীবন্তভাবে আল্লাহকে স্মরণ কর। মানুষের মধ্যে যাহারা বলে: “প্রভু আমাদিগকে দুনিয়াতে দান করুন” তাহাদের জন্য পরকালে কোন অংশ নাই। কিন্তু তাহাদের মধ্যে যাহারা বলে: “হে প্রভু! পৃথিবীতে যাহা মঙ্গলজনক এবং পরজগতে যাহা কিছু মঙ্গলজনক আমাদিগকে দান করুন, এবং দোজখের নিয়তি হইতে আমাদিগকে রক্ষা করুন”। তাহাদের জন্য, তাহারা যাহা অর্জন করিয়াছে তাহারই একটি উত্তম অংশ সঞ্চিত রহিয়াছে। বস্তুতঃ হিসাব সম্পন্ন করিতে আল্লাহর বিন্দুমাত্র বিলম্ব হয় না।

(২:২০৩) নির্দিষ্ট দিনগুলিতে আল্লাহকে স্মরণ কর। অতঃপর যে ব্যক্তি দুই দিনের মধেই প্রস্থান করে, তাহার জন্য পাপ নাই; এবং যে ব্যক্তি বিলম্ব করিবে তাহার জন্যও পাপ নাই; অর্থাৎ যাহারা (মন্দ) হইতে দূর থাকে। এবং আল্লাহর প্রতি তোমাদের কর্তব্য সম্বন্ধে সতর্ক থাকিও, এবং জানিয়া রাখ যে তাহারই নিকটে তোমাদের সমবেত করা হইবে।

(৫:১) হে বিশ্বাসীগণ তোমাদের অঙ্গীকার সমূহ কার্যে পরিণত কর। (এই গ্রন্থে) উল্লিখিত কিছু পশু ব্যতীত; (খাদ্য হিসাবে) গবাদি পশু তোমাদের জন্য হালাল করা হইয়াছে; তবে হজ্জ্বের সময় শিকার অবৈধ। আল্লাহ্ তাহার ইচ্ছানুযায়ী নির্দেশ দেন।

(৫:৯৬) সমুদ্রের মাছ ধরা ও খাওয়া তোমাদের জন্য হালাল করা হইয়াছে। ইহা তোমাদের জন্য এবং সমুদ্র যাত্রীদের জন্য খাদ্য। কিন্তু হজ্জ্বের সময় স্থলভাগে শিকার নিষিদ্ধ করা হইয়াছে। আল্লাহর প্রতি তোমাদের কর্তব্য সম্বন্ধে মনযোগী হইও, যাঁহার সমীপে তোমাদের সমবেত করা হইবে।

(২২:৩৪) এবং প্রত্যেক জাতির জন্য আল্লাহ্ একটি ধর্মাচরণের পদ্ধতি নির্দিষ্ট করিয়াছেন, যাহাতে তাহারা খাদ্য হিসাবে আল্লাহর প্রদত্ত গবাদি পশুরু উপর তাহার নাম উচ্চারণ করিতে পারে এবং তোমাদের মা’বুদ এক আল্লাহ্; সুতরাং তাঁহার নিকট আত্মসমর্পণ কর। এবং (হে মোহাম্মাদ) সৎব্যক্তিদের জন্য সুসংবাদ দিন।

(২২:৩৬,৩৭) এবং উটকে আল্লাহ্ তাঁহার উৎসবের জন্য মনোনীত করিয়াছেন। ইহাতে তোমাদের জন্য অনেক মঙ্গল নিহিত আছে। অতএব যখন তাহাদের শ্রেণীবদ্ধ করা হয়, তাহাদের উপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ কর। তারপর যখন তাহারা পার্শ্বে পতিত হয় (মৃত), তাহাদের মাংস ভক্ষণ কর এবং ভিক্ষুকদের ও প্রার্থীদের দাও। এইরূপে আল্লাহ্ ইহাদেরকে তোমাদের অধীন করিয়াছেন, যাহাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হও। তাহাদের মাংস ও রক্ত আল্লাহর নিকট পৌছায় না; কিন্তু তোমাদের ভক্তি তাহার নিকট পৌছায়। এইরূপে আল্লাহ্ ইহাদেরকে তোমাদের অধীন করিয়াছেন, যাহাতে তোমাদিগকে পথপ্রদর্শন করিবার জন্য তোমরা আল্লাহর মহত্ব প্রচার করিবে। এবং (হে মোহাম্মাদ) পুণ্যবাণদিগকে সুসংবাদ দিন।

১১.৫১ হজ্বের প্রক্রিয়া

হজ্জ্ব ও ওমরাহ, যাহারা ইহা করিতে সক্ষম, তাহাদের জন্য নির্দ্ধারিত হইয়াছে (৩:৯৭)। হজ্জ্ব জিলহজ্জ মাসের কয়েক দিনের জন্য পালন করা হয়। ইহা ইসলামিক পঞ্জিকার দ্বাদশ মাস। ওমরাহ, হজ্জ্বের একটি সংক্ষিপ্ত সংস্করণ বলা যাইতে পারে, এবং ইহা যে কোন সময় পালন করা যায়। বর্তমান প্রচলিত হজ্জ্ব অনুষ্ঠান আরম্ভ হয় প্রথমে গোসল ও পরে ‘ইহরাম’ বাঁধিয়া, যাহার উদ্দেশ্য পবিত্রাবস্থা হওয়া। ইহার জন্য পুরুষ সেলাই বিহীন দুই খণ্ড সাদা শ্বেতবস্ত্র এবং নারী একটি সাধারণ সঙ্গত পোষাক পরিধান করে। হজ্জ্বের সমস্ত সময়ব্যাপী, তীর্থযাত্রীকে যৌন সঙ্গম হইতে বিরত থাকিতে হইবে; কেশ, শ্মশ্রু ক্ষৌর করা বা অশালীন ভাষা ব্যবহার করা চলিবে না (২:১৯৭)। কাবায় পৌছিয়া তীর্থযাত্রী (পুরুষ অথবা স্ত্রীলোক) কাবার চতূষ্পার্শে সাতবার ঘুরিয়া, আল্লাহর গৌরব ও প্রশংসা করিতে থাকে (২:১২৫; ২২,২৯)। সাধারণতঃ বলা হইয়া থাকে: “লাব্বায়িকা আল্লাহুমা লাব্বায়িকা” (হে আল্লাহ্, আমি আপনার ডাকে আসিয়াছি), লাব্বায়িকা লা-শারীকা লাকা লাব্বায়িক” (আমি আপনার ডাকে সাড়া দিয়া আসিয়াছি, এবং আমি ঘোষণা করি যে আপনি ব্যতীত আর কোন মা’বুদ নাই; আমি আপনার ডাকে আসিয়াছি)”। পরবর্তী করণীয় হইল আল-সাফা ও আল-মারওয়া নামে দুইটি ক্ষুদ্র পাহাড়কে সাতবার বেষ্টন করা (২:১৫৮)। কিন্তু বর্তমানে সৌদি সরকারের নির্মাণ কার্যের ফলে ইহা সম্ভব নয়, কেবল দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী অংশে যাতায়াত করা হয়। এই পর্যন্ত করিলে হজ্জ্বের ওমরাহ অংশ সমাধা হয়। তারপর তীর্থযাত্রী ‘আরাফাতে’র বিশাল প্রান্তরে গমন করে এবং এখানে সূর্যোদয় হইতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নামাজ, ধ্যান ও আল্লাহর গুণগান করিয়া সমস্তদিন অতিবাহিত করে (২:১৯৮)। সূর্যাস্তের পর তীর্থযাত্রী ‘মুযদালিফায়’য় গমন করে ও যেখানে রাত্রির নামাজ পড়ে। মুযদালিফা হইতে তীর্থযাত্রী দুই অথবা তিন দিনের জন্য ‘মিনা’তে যায় (২:২০৩)। প্রতীকস্বরূপ, মিনাতে শয়তানের প্রতি প্রস্তর নিক্ষেপের জন্য একুশটি নুড়ি কুড়াইয়া লওয়া হয়। আবার মিনাতেই প্রচলিত রীতি অনুযায়ী পশু কোরবানি যে ঘটনার স্মৃতি রক্ষার্থে করা হয় তাহা হইল যখন ইবরাহীম ইশমাইলকে কুরবানি করিতে উদ্যত হন; কিন্তু আল্লাহর নির্দেশে বাস্তবে ইহা করিতে হয় নাই। তীর্থযাত্রী তারপর মক্কায় ফিরিয়া আসে এবং কাবার চতুর্দিকে সাতবার বিদায়পূর্ব প্রদক্ষিণ করে। ইহাতে প্রচলিত হজ্জ্বের সমাপ্তি হয়।

টীকা: পশু কোরবানির উৎস হাদিস সাহিত্য অনুযায়ী, কারণ ইহা বাইবেলে বর্ণিত গল্পের ন্যায় মনে করে যে ইবরাহীম মেষ-শাবক কোরাবানির দ্বারা আল্লাহর (আজ্ঞা পালনের) দায়মুক্ত হইয়াছিলেন। এই সম্পর্কে কোরানের বক্তব্যের জন্য ৭.৫ বিভাগ দ্রষ্টব্য। ইবরাহীম মেষ-শাবক কোরবানি দিয়াছিলেন কোরানে কোথাও ইহার উল্লেখ নাই।

কোরান অনুযায়ী পশু কোরবানি কেবল খাদ্য হিসাবে করা হইবে (২২:২২,৩৪ এবং ৩৬), কারণ এই সময় বহু সংখ্যক লোকের জন্য খাদ্য সরবরাহ করিতে হয়। এই মর্মে ২:১৯৬ আয়াতে আল্লাহ বলেন যদি কোন সময় তোমরা সেখানে যাইতে বাধাগ্রস্থ হও, তাহা হইলে তোমাদের সামর্থ অনুযায়ী দানসামগ্রী (হাদিয়া), সেখানে যাহারা সমবেত হইয়াছে, তাহাদের জন্য পাঠাও। প্রকৃতপক্ষে, বাস্তবে সংঘটিত হয় নাই, এইরূপ একটি ঘটনার স্মারক হিসাবে, এই সময় বিশ্বব্যাপী লক্ষ লক্ষ পশু হত্যা করা ভিত্তিহীন। রক্ত উৎসর্গের পরিবর্তে তাহার উপর আরও গুরুভার ন্যস্ত করিয়া আল্লাহ্ ইবরাহীমকে দায়মুক্ত করিয়াছিলেন, তাহা মানবজাতির জন্য আল্লাহর গৃহ (কাবা) নির্মাণ ও পবিত্রকরণ, এবং আল্লাহর জন্য কাজ করিয়া যাওয়া (৭.৫ বিভাগ দ্রষ্টব্য)।

অধিকন্তু ২২:৩৭ আয়াতে আল্লাহ্ সন্দেহাতীত রূপে বলেন যে কোরবানি দেওয়া পশুর রক্ত ও মাংস তাঁহার নিকট পৌঁছায় না। প্রকৃতপক্ষে, ঐ বিশেষ সময়ে বিশ্বব্যাপী পশু কোরবানির কথা কোরান বলে না। কেবলমাত্র হজ্জ্বের স্থানে খাদ্য হিসাবে, এবং দরিদ্র ভোজনের জন্য পশু হত্যা অনুমোদন করে। আবারও দেখা যায় যে, মুসলিমরা কোরানের নির্দেশ অপেক্ষা হাদিস কি বলিয়াছে তাহাতেই অধিকতর উৎসাহী।

১১.৫২ হজ্জ্বের প্রকৃত তাৎপর্য
হজ্জ্বের প্রকৃত তাৎপর্য অধিকতর স্পষ্ট হইয়া উঠে যখন আমরা ‘হাজ্জ্বা’ শব্দের অর্থ বিবেচনা করি। ইহা মূল ‘হজ্জ্ব’ শব্দ হইতে উদ্ভুত। পূর্বেই বলা হইয়াছে, এই শব্দের অর্থ তর্ক, বিতর্ক বা আলোচনা করা। প্রশ্ন হইল: কিরূপে ইহা সম্ভব? আমরা জানি বাৎসরিক হজ্জ্ব, সারা মুসলিম বিশ্ব হইতে মুসলিমদের একত্রিত করে। সুতরাং মানবজাতির মধ্যে দৃঢ়তর ঐক্য স্থাপন, ভাবের সমন্বয় ও বিশ্ব ভ্রতৃত্বের সূচনার জন্য, ইহা একটি আদর্শ সুযোগ। হজ্জ্বের পূর্বে অথবা পরে, সপ্তাহকাল বা প্রয়োজন অনুযায়ী দীর্ঘতর সময়ব্যাপী, আলোচনা ও পরামর্শের মাধ্যমে কল্যাণজনক পরিকল্পনা ও প্রকল্পসমূহের পরীক্ষার মাধ্যমে ইহা সফল হইতে পারে। দৈনন্দিন জীবনে ‘দ্বীনে’র কাঠামোকে প্রতিষ্ঠার (দ্রষ্টব্য ১৬ পরিচ্ছদ, ইসলামী রাষ্ট্র) চুড়ান্ত উদ্দেশ্যের উপলক্ষে প্রকৃতপক্ষে কয়েক বৎসরের মধ্যে, হজ্জ্বের সময় জ্ঞান ও সহযোগীতা বৃদ্ধির সর্বাপেক্ষা উপযোগী মাধ্যম হইয়া উঠিতে পারে। কোরানের শিক্ষা চর্চার মাধ্যমে ‘দ্বীন’ সমগ্র বিশ্ব সমাজে পরিব্যাপ্ত হইবে এবং এইরূপে হজ্জ্বের মূল আবশ্যকীয়তাকে কার্যকরী করিবে, যেহেতু হজ্জ্ব সমগ্র মানবজাতির উপলক্ষেই সূচিত হইয়াছে।

References: (প্রসঙ্গ সূত্র)

১. Ramadan –A time for change: Lecture by David Stokes.
Sec. 11.43 summarised from lecture note.

Shahih al-Bukhari, Volumes 1 to 9, Translated by Dr. Muhammad Muhsin Khan. Published by Kitab Bhaban, New Delhi, India.

Sahih Muslim, Vol. 1. Translated by: Abdul Hamid Siddiqi. Publisher: Sh. Muhammad Ashraf. Publishers & Booksellers. 7 Aibak Road (New Anarkali). Lahore-7 (Pakistan)





Home Next >>