১১.৪ রোজা



রমজান মাসে মুসলিমদের প্রত্যূষ হইতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজা রাখিতে হয় (এই অধ্যায়ের শেষে প্রদত্ত টীকা দ্রষ্টব্য)। নিম্নের আয়াতগুলি এই নীতি পরিষ্কার বর্ণনা করে:

(২:১৮৩) হে বিশ্বাসীগণ! রোজা তোমাদের জন্য নির্দিষ্ট করা হইয়াছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের জন্যও করা হইয়াছিল, যাহাতে তোমরা (অমঙ্গল) দূরীভূত করিতে পার।

(২:১৮৪) (রোজার জন্য নির্দ্ধারিত) নির্দিষ্ট কতকগুলি দিন (রোজা রাখ)। যদি কেহ পীড়িত হয় অথবা ভ্রমণে থাকে, তাহার পরিবর্তে সমান সংখ্যক অন্য দিন হইতে পারে, আর যাহারা ব্যয় করিতে সক্ষম তাহাদের জন্য দায়মুক্তি হইল: একজন দুঃস্থ লোককে আহার করানো। কিন্তু যদি কেহ (অধিকতর সৎকর্মে) স্বতঃপ্রবৃত্ত হয় ইহা তাহার পক্ষে উৎকৃষ্টতর। কিন্তু রোজা তোমাদের জন্য অধিকতর উত্তম, কেবল যদি তোমরা জানিতে।

(২:১৮৫) মানবজাতির জন্য পথ-প্রদর্শক কোরান নাজিল হইয়াছিল রজমান মাসে, এবং পথ প্রদর্শনের স্পষ্ট প্রমাণ ও (ভাল, মন্দ) বিচারের নীতি সহ। এবং তোমাদের যে কেহ (গৃহে) উপস্থিত থাকে, তাহার উচিত এই মাস রোজা রাখা; এবং তোমাদের যে কেহ পীড়িত হয় অথবা ভ্রমণে থাকে (তাহার সমান) সংখ্যক অন্য দিন রোজা রাখা উচিত। আল্লাহ্ চাহেন তোমাদের জন্য যাহা সহজসাধ্য, তোমাদের জন্য কষ্টসাধ্য হউক তাহা তিনি চাহেননা, এবং (তিনি চাহেন) যে তোমরা এই নির্দিষ্ট সময় পূর্ণ কর; এবং তোমাদিগকে সঠিক পথে চালনা করিবার জন্য আল্লাহর প্রশংসা কর এবং সম্ভবতঃ তাহার জন্য তোমরা কৃতজ্ঞ হইবে।

(২:১৮৭) রোজার রাত্রে তোমাদের স্ত্রীদিগের নিকট যাওয়া জন্য বিধিসংগত করা হইয়াছে। তাহারা তোমাদের আচ্ছাদন এবং তোমরা তাহাদের আচ্ছাদন। আল্লাহ্ জানেন যে এ বিষয়ে তোমরা নিজেদের প্রতারিত করিতেছ এবং তিনি তোমাদের প্রতি করুণা পরবশ হইয়া নিষ্কৃতি দিয়াছেন। সুতরাং তাহাদের সহিত সহবাস কর যাহা আল্লাহ্ তোমাদের জন্য নির্দ্ধারিত করিয়াছেন, এবং পান ভোজন কর যে পর্যন্ত প্রত্যূষের শুভ্র-সূত্র ইহার কৃষ্ণ-সূত্র হইতে পৃথক অনুভূত হয়। অতঃপর রাত্রি-সমাগম পর্যন্ত তোমরা রোজা পালন কর এবং তাহাদিগকে স্পর্শ করিও না, কিন্তু মসজিদে গমন কর (১১.৪১ বিভাগ দ্রষ্টব্য)। আল্লাহ এইরূপ সীমা নির্দেশ করিয়াছেন, সুতরাং তাহাদের নিকটস্থ হইও না। এইরূপে আল্লাহ্ তাঁহার বাণীসমূহ মানুষের নিকট ব্যাখ্যা করেন যাহাতে তাহারা দুষ্কর্ম দূরীভূত করিতে পারে।

টীকা: ভূমধ্যস্থিত জাতিসমূহের তুলনায় (যেমন মধ্য প্রাচ্যের দেশ সমূহ) যে সকল স্থানে দিবসের দৈর্ঘ অত্যন্ত বেশী, রোজার সময়সীমা যুক্তি ও বুদ্ধির ভিত্তিতে হওয়া উচিত। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ চাহেন না এই সকল স্থানের কেহ মধ্য প্রাচ্য দেশবাসীদের তুলনায়, যেখানে দিবসের গড় দৈর্ঘ্য প্রায় ১২ ঘন্টা, অধিকতর কষ্ট সহ্য করুক। উপরের (২:১৮৫) আয়াতে ইহার সমর্থন পাওয়া যায়।

১১.৪১ ঐতিহ্যগত ভাবে রোজা নিম্নোক্ত উদ্দেশ্য সমূহ সমাধা করে বলিয়া অনুভূত হয়।

(ক) কোরানের নির্দেশমত আল্লাহর ইচ্ছার প্রতি আত্মসমর্পণ।

(খ) যাহারা আর্থিক কষ্টে আছে তাহাদের বিষয়ে মমতাবোধ উদ্দীপিত করা।

(গ) এই মাসটি মসজিদে নামাজ ও ধ্যানে নিমগ্ন হওয়া।

উপরে বর্ণিত (ক)(খ) এর ঐতিহ্যগত চিন্তাধারা যুক্তিসিদ্ধ, কিন্তু (গ) এর বিষয়ে এই ধারণা ঠিক নহে, কারণ ইহা কোরান আমাদের যে শিক্ষা দিবার চেষ্টা করিতেছে সেই ধারণা সম্পূর্ণ বিপরীত। রমজান মাসে, মুসলিমরা যে অতিরিক্ত (তারাবী) নামাজ পালন করেন তাহা বিশ্লেষণ করিলে বিষয়টি অধিকতর বোধগম্য হইবে।

১১.৪২ রমজান মাসে তারাবি নামাজ

(২:১৮৭) [....] অতঃপর রাত্রি-সমাগম পর্যন্ত তোমরা রোজা পালন কর এবং তাহাদের স্পর্শ করিও না কিন্তু মসজিদে গমন (আকফা) কর।

আরবী ‘আকফা’ শব্দের মূল অর্থ হইল অবসর লওয়া, বিরত হওয়া, আত্মনিয়োগ করা অথবা ব্যস্ত হওয়া। রমজান মাসে আল্লাহ্ আশা করেন যে আমরা যেন কিছু সময় মসজিদে যাপন করি। প্রশ্ন এই যে, আল্লাহ্ ইহার দ্বারা কি বুঝাইতে চাহেন। আমরা জানি যে কোরান রমজান মাসে নাজিল হইয়াছিল, তাই ইহা পবিত্র মাস। মসজিদে সময় যাপন সম্বন্ধে মুসলিমরা অর্থ করে যে, সারা রমজান মাসের প্রতি রাত্রে আট রাকাত হইতে বিশ রাকাত পর্যন্ত অতিরিক্ত নামাজ পড়িতে হইবে। যিনি বা যাঁহারা এই নামাজ পরিচালনা করেন তাহাদের এই মাসে অন্ততঃ একবার সমগ্র কোরান আবৃত্তি করিতে হইবে বলিয়া ধারণা করা হয়। কোরানের নির্দেশ সত্ত্বেও এই আবৃত্তি অতি দ্রুত সমাধা করা হয়: “[...] এবং কোরান আবৃত্তি কর ধীর, সমতাল ও সংযত স্বরে” (৭৩.৪)। যাঁহারা নামাজে যোগদান করেন, তাহারা একটি শব্দ না বুঝিয়াও এই অতি দ্রুত আবৃত্তি শ্রবণের জন্য ভক্তিপূর্ণ ভাবে দাড়াইয়া থাকেন। যোগদানকারী ব্যক্তিরা এই ধারণা পোষণ করেন যে, এই ভক্তির জন্য আল্লাহ্ তাঁহাদের উপর তাঁহার আশীর্বাদ বর্ষণ করিবেন। সাধারণতঃ একজন হাফিজ (যিনি সমগ্র কোরান মুখস্থ করিয়াছেন) এই নামাজ পরিচালনা করেন। রমজানের ২৭তম রাত্রে, বিপুল সংখ্যক লোক মসজিদে আসেন অতিরিক্ত সাওয়াব প্রাপ্তির আশায়। কারণ এই বিশেষ রজনীকে “শক্তির রজনী” বলিয়া মনে করা হয়, এবং ইহা সহস্র মাসের অপেক্ষা অধিকতর উত্তম, কারণ এই রাত্রে কোরান নাজিল হইয়াছিল। এই রাত্রে ফেরেশতাগণ প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে হুকুম-নামা সহ পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন (৯৭:১-৫)। যাহা হউক, ২৭তম তারিখ ঐতিহ্যের উপর প্রতিষ্ঠিত, কারণ সঠিক তারিখ বা রাত্রি কোরানে নির্দিষ্ট করিয়া বলা হয় নাই।

পরীক্ষা করিয়া দেখা যাউক, কোরানে কি বলা হইতেছে তাহা না বুঝিয়া সমগ্র কোরান আবৃত্তি করার কোন যৌক্তিকতা আছে কি না (উপরে উদ্ধৃত ৭৩:৪ আয়াত এবং ১১.২ বিভাগ দ্রষ্টব্য)। কার্যতঃ কোরানে যাহা আছে, মুসলিমরা আল্লাহকে তাহা শুনাইতেছে। কিন্তু আল্লাহ্ কোরানে কি আছে তাহা পূর্ব হইতেই জানেন। তাঁহাকে স্মরণ করিয়া দিবার প্রয়োজন নাই। তিনি যাহা চাহেন তাহা হইল বিশ্বাসীদিগের কোরান বোধগম্য হউক, যাহাতে তাহারা ইহার শিক্ষা দ্বারা পরিচালিত হয়। এবং নূতন করিয়া কোরান উপলব্ধি করিতে রমজান মাসে অপেক্ষা অধিকতর উৎকৃষ্ট সময় আর কি আছে? যাহা প্রয়োজন তাহা হইল যাঁহারা মসজিদসমূহের তত্ত্বাবধান করেন তাঁহাদের পক্ষ হইতে কোরানে সুপণ্ডিত ব্যক্তিদের আমন্ত্রণের মাধ্যমে বক্তৃতা ও আলোচনা সভার আয়োজন করা। প্রকৃতপক্ষে, সকল মসজিদ পরিচালকেরই উচিত তাহাদের কার্য-তালিকা পূর্ব হইতেই প্রচার করা, যাহাতে লোকে তাহাদের প্রয়োজন অনুযায়ী বক্তৃতা ও আলোচনা সভায় যোগ দিতে পারে। প্রত্যহ বা প্রতি রাত্রে যোগদানের আবশ্যকতা নাই। যাহাতে তাহাদের কোরানে জ্ঞান বৃদ্ধি পায় ও মানুষের কাছে দ্বীন প্রচারে সহায়ক হয় ঐরূপ সময় যোগ দিলেই চলিবে। স্পষ্টতঃ এতদসত্ত্বেও নামাজের জন্য সময় নির্দ্ধারিত থাকিবে, যাহাতে প্রার্থনার মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও তাঁহার প্রশংসা করা যায় ও তাঁহার ক্ষমা ও করুণা ভিক্ষা করা যায়। কিন্তু কেবলমাত্র একটি অর্থহীন আচারানুষ্ঠান পালন করিবার কোনই যুক্তি নাই। হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, তারাবি নামাজ রাসূলের সময় প্রবর্তিত হয় নাই, আরও পরে খলিফা ওমরের সময় হইয়াছিল। কিন্তু অধিকাংশ মুসলিম তাহাদের যথাযথ অভ্যাস অনুযায়ী, কোরান হইতে নির্দেশ লাভের পরিবর্তে অন্ধভাবে হাদিস অনুসরণ করে। অবশ্যই কোরান হইতে আবৃত্তি করিতে হইবে, কিন্তু আমাদের আসল উদ্দেশ্য হইবে ইহার বাণীমর্ম উপলব্ধি করা। বস্তুতঃপক্ষে এই বাণী অনুসরণ করিয়া এবং দৈনন্দিন জীবনে দ্বীনের সংগঠন প্রতিষ্ঠা ও আলোচনার মাধ্যমে আমরা পৃথিবীতে একটি দৃষ্টান্তমূলক ও কল্যাণকর সামাজিক ব্যবস্থার প্রসার ঘটাইতে পারি। নিম্নের আয়াতের অনুদেশ ও সাবধান বাণী লক্ষণীয়।

(৩:১৮৭) এবং (স্মরণ কর) যখন আল্লাহ্, গ্রন্থপ্রাপ্ত (সম্প্রদায়ের) উপর ভার অর্পণ করিয়াছিলেন এই বলিয়া যে, তোমরা ইহা গোপন করিবে না, মানবজাতির নিকট ব্যাখ্যা করিবে, কিন্তু তাহারা উহা অবজ্ঞাভরে পশ্চাতে নিক্ষেপ করিল, এবং ফলে তাহাদের কোনই লাভ হইল না। প্রকৃতই, ইহাতে তাহারা পাপভাগীই হইয়াছে।

১১.৪৩ রোজার শারীরিক উপকারীতাসমূহ

বিগত ১০০-১৫০ বৎসরে মানবজাতির খাদ্যাভাস বহুল পরিমাণে পরিবর্তিত হইয়াছে। আমাদের খাদ্যদ্রব্য, যাহা একসময় টাটকা, পুষ্টিকর ও অশোধিত ছিল, তাহা এক্ষণে হিম-কঠিন, টিন-জাত অথবা শোধিত, এবং নানা প্রকার কীট-নাশক, সংরক্ষক, রঞ্জক দ্রব্য ও অন্যান্য রাসায়নিক পদার্থ-মিশ্রিত।

রোগ-ব্যাধির একটি প্রধান কারণ দেহে দূষিত বা বিষাক্ত পদার্থ (অধিবিষ) সঞ্চিত হওয়া এবং অতি-ভোজন এই সঞ্চয় প্রক্রিয়ার একটি কারণ। রোজা তাই আমাদের দেহশুদ্ধির একটি কল-কাঠি হইতে পারে।

রোজার সময় শরীরের দূষিত পদার্থ বর্জন করিবার কর্মশক্তি বৃদ্ধি পায়, কারণ বৃহৎ পরিমাণ খাদ্য সামগ্রী হজম ও শরীরে গ্রহণ বা পরিমিশ্রণ (assimilation) করিবার জন্য যে কর্মশক্তি ব্যবহৃত হয় তাহার প্রয়োজন থাকেনা। শরীর এই বর্দ্ধিত শক্তিকে, প্রাণশক্তির বাধারূপী দূষিত-বিষাক্ত পদার্থ সমূহের দূরীকরণে পুনর্বিন্যাস করিতে সক্ষম হয়। রোজার প্রথম তিন দিনে বিষাক্ত পদার্থ দূরীকরণ প্রক্রিয়ার প্রকাশ, জিহবায় প্রলেপ, দুর্গন্ধ নিঃশ্বাস, মাথা ও মাংসপেশীর পীড়া, উদরাময়/কোষ্ঠকাঠিন্য এবং শারীরিক দুর্বলতার মাধ্যমে লক্ষিত হয়। রক্ত-প্রবাহে অধিবিষের (toxins) বৃদ্ধি ও নিষ্কাশন-প্রণালীর মাধ্যমে ইহার নির্গমনের জন্য এই লক্ষণগুলি দেখা দেয়। এই সমস্ত অস্বস্থিকর লক্ষণ যতই দ্রুত ফুটিয়া উঠে, শরীরে বিষ ততই অধিক বুঝিতে হইবে। চতুর্থ দিনে এই প্রক্রিয়া স্বল্প বলিয়া বোধ হইতে পারে। এই সঙ্গে সাধারণতঃ সুস্থ বোধ, অধিকতর মানসিক স্বচ্ছতা এবং প্রচুর কর্মশক্তির উপস্থিতি অনুভূত হয়। এই অবস্থার তীব্রতা বিভিন্ন মাত্রায় স্থায়ী হয় এবং বিষাক্তপদার্থ সমূহ অধিকতর ভাবে দূরীভূত হওয়ার সঙ্গে মধ্যে মধ্যে কর্মশক্তির অভাব, ক্লান্তি ও মনঃসংযোগে অসুবিধা বোধ হয়। এই অবস্থা প্রায় দশ দিন স্থায়ী হয় যখন একটি আরোগ্যমূলক সংকটের আরম্ভ হইতে পারে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শরীর বহু পরিমাণে সুপ্রোথিত বিষাক্ত পদার্থ বা অধিবিষ নিষ্কাশন করিতে সমর্থ হয়। ইহা বিবিধ প্রকারে বোধগম্য হয়, যেমন ইনফ্লুয়েঞ্জারূপ লক্ষণ, চর্মে ফুস্কুড়ি ইত্যাদি অন্যান্য বর্জন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। ইহার পরে আবার স্বাস্থ্য ও প্রাণশক্তির উৎকর্ষতা বোধ করা যায়। রোজা ভঙ্গ করিবার সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। সাধারনতঃ অল্প পরিমাণ ফলই শ্রেয়। পরবর্তী আহার পরিমাণে সংযত ও উৎকৃষ্ট মানের স্বাভাবিক খাদ্য হওয়া উচিৎ (অপুষ্টিকর কিছু নহে), কারণ শরীর ইহাতে পেশী গঠন করিবে।

এইরূপে রমজান আত্ম-সংযম ও শোধনের মাধ্যমে এই প্রয়োজনীয় পরিবর্তন সাধনের একটি আদর্শ সুযোগ সৃষ্টি করে।





Home Next >>