১১.২ সালাত (নামাজ)



‘সালাত’ শব্দের অনুবাদ, অধিকাংশ ক্ষেত্রে, ইউসুফ আলী করিয়াছেন ‘প্রার্থনা’, এবং পিক্টহল করিয়াছেন ‘আরাধনা’। শুধু তাহাই নহে, ‘ইবাদত’ (বহুবচন) শব্দও, যাহার অর্থ আনুগত্য অথবা বশ্যতা, ‘সালাতে’র প্রতিশব্দ (synonym) রূপে প্রায়ই ব্যবহৃত হইয়াছে। ‘ইবাদত’ শব্দের উৎপত্তি মূল ‘আবাদা’ হইতে, যাহার অর্থ কর্তব্য সম্পাদন করা, আরাধনা করা, আল্লাহর কাজে উৎসর্গ করা ইত্যাদি। অতএব কোরানের ক্ষেত্রে ‘ইবাদত’ শব্দের অর্থ হইবে কোরানে প্রদত্ত আল্লাহর নির্দেশাবলীর প্রতি আনুগত্য। সুতরাং এই শব্দের তাৎপর্য ‘সালাত’ অপেক্ষা আরও ব্যাপক। প্রকৃতপক্ষে ‘সালাত’ ‘ইবাদত’ এর অন্তর্ভুক্ত কর্তব্যসমূহের একটি বলিয়া গণ্য হইতে পারে। কোরানে মূল ‘আবাদা’ হইতে উদ্ভূত ‘নাবুদু’ শব্দ পাওয়া যায় সুরা ‘আল-ফাতিহা’র পঞ্চম আয়াতে। কোরানে ৯৪ সংখ্যক আয়াত আছে যাহাতে মূল ‘আবাদা’ শব্দ হইতে উদ্ভূত কোন একটা রূপ ব্যবহৃত হইয়াছে। কোরানে ‘সালাত’ শব্দ ৬৭ বার এবং যে সমস্ত আয়াতে ‘সালাত’ শব্দ ব্যবহৃত হইয়াছে তাহাদের প্রসঙ্গে ‘সালাত’-এর নিকটবর্তী ইংরেজী শব্দ হিসাবে প্রার্থনা (prayer) অথবা আরাধনা (worship) ব্যবহৃত হইতে পারে। কোরান কিন্তু ‘সালাত’ শব্দ বহুবচন রূপে ব্যবহার করিয়াছে ইহার ইঙ্গিত এই যে, এই ক্রিয়া, সম্পূর্ণঅর্থে, যৌথরূপে পালন করিতে হইবে। প্রার্থনা ও আরাধনা অর্থে ‘সালাত’ পালন করিবার ব্যাপারে কোরানে আরও কি বক্তব্য আছে তাহা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। আমরা তারপর কোরানের বক্তব্যের আলোকে এ বিষয়ে হাদিসের অবস্থান পর্যালোচনা করিতে পারি। কোরানের সংশ্লিষ্ট কতিপয় আয়াত নিম্নে উদ্ধৃত করা হইল।

(২:৪৩) [...] আর যাহারা মস্তক অবনত করে তাহাদের সহিত মস্তক অবনত কর।

(২:১৪৯) [...] এবং সেই পবিত্র মসজিদের (কাবার) দিকে তোমাদের মুখ ফিরাও [...]।

(৫:৬) হে বিশ্বাসীগণ, যখন তোমরা সালাতের (নামাজের) জন্য উত্থিত হও, তামাদের মুখমন্ডল ও কনুই পর্য্যন্ত তোমাদের হস্তদ্বয় ধৌত কর, এবং হালকাভাবে মস্তক ঘর্ষণ কর, এবং গোড়ালি পর্যন্ত পাদদেশ ধৌত কর, এবং অপরিচ্ছন্ন থাকিলে নিজেদের পরিচ্ছন্ন কর [...]।

(১১:১১৪) দিবসের দুই প্রান্তে এবং রাত্রির কিছু অংশে সালাত প্রতিষ্ঠিত কর [...]।

(১৭:৭৮) সর্যাস্তের সময় রাত্রির অন্ধকার না হওয়া পর্যন্ত সালাত প্রতিষ্ঠিত কর এবং প্রত্যূষে কোরান-পাঠ কর। স্মরণ রাখিও! প্রত্যূষে কোরান-পাঠ সর্বদাই লক্ষ করা হয়।

(২৪:৪৮) হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের ক্রীতদাসের এবং যাহারা বয়ঃপ্রাপ্ত হয় নাই, তাহাদের তিনবার ছাড়িয়া দাও। প্রত্যূষের সালাতের পূর্বে (সালাত-উল-ফজর) এবং মধ্যাহ্নের উত্তাপে যখন তোমরা আচ্ছাদন একপাশে রাখিয়া দাও, এবং রাত্রির সালাতের (সালাত-উল-এশা) পর।

(৬২:৯) হে বিশ্বাসীগণ, যখন শুক্রবার (জামায়াতের দিন) সালাতের জন্য আহবান ধ্বনিত হয়, সমস্ত কর্ম ত্যাগ করিয়া আল্লাহর স্মরণের জন্য একান্তভাবে ধাবিত হও।

(৪:৪৩) হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা যাহা বল, যে পর্যন্ত না তাহা বুঝিতে পার এইরূপ জড়গ্রস্ত মনে সালাতে যাইও না, অথবা পথযাত্রা বাদে তোমরা যখন কলুষিত হও, গোসল না করা পর্যন্ত (সালাতে যাইও না)।

(১৭:১০৭,১০৮) [...] তাহারা মুখমণ্ডলের উপর ভূলুষ্ঠিত হইয়া প্রশংসার সহিত বলে: আমাদের প্রতিপালকের গৌরব হউক! আমাদের প্রতিপালকের অঙ্গীকার অবশ্যই পূর্ণ হইবে।

(২৫:৬৪,৬৫) আর যাহারা তাহাদের প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে ভূলুণ্ঠিত বা দণ্ডিত অবস্থায় রাত্রি অতিবাহিত করে, এবং যাহারা বলে: হে আমাদের প্রতিপালক! নরকের পরিণতি হইতে আমাদেরকে রক্ষা করুন; সেই পরিণতি যন্ত্রণাকর।

(১৭:১১০,১১১) তোমরা সালাত উচ্চস্বরে অথবা নিম্নস্বরে করিও না, বরং মধ্যপথ অবলম্বন কর। এবং বল: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যিনি কাহাকেও পুত্র হিসাবে লন নাই এবং যাহার সার্বভৌমত্বে কোন অংশীদার নাই, এবং নির্ভর হিসাবে তাহার কোন রক্ষণকারী সুহৃদও নাই। এবং তাঁহাকে সমস্ত মহিমার উচ্চে মহিমান্বিত কর।

লক্ষণীয় যে (২৪:৫৮) আয়াত সালাত-উল-ফজর এবং সালাত-উল-ঈশা নাম করিয়া উল্লেখ করে। অপর পক্ষে (১১:১১৪) আয়াত, দিবসের দুই প্রান্তে সালাতের কথা বলে, যাহা যুক্তিসঙ্গতভাবে ফজর ও মাগরিবের সালাত। ইহাও লক্ষ্য করিবার বিষয় যে (২৪:৫৮) আয়াতে, মধ্যাহ্নের উত্তাপে, যখন বিশ্রামের জন্য লোকে পরিচ্ছদ একপাশে রাখিয়া দেয়, সেই সময়ে জোহর-এর সালাতের উল্লেখ নাই। অধিকন্তু (১৭:১১০) আয়াতে সালাত নিঃশব্দে পড়িতে নিষেধ করা হইয়াছে (ইহা স্পষ্টতঃ কোরানে যেরূপে ‘সালাত’ শব্দ ব্যবহৃত হইয়াছে তাহার ইঙ্গিত করে, অর্থাৎ জামায়াতে সালাত, অথবা ‘সালাত’ বহুবচন অর্থে)। ইহা অমান্য করিয়া মুসলিমরা জোহর ও আছরের সালাত নিঃশব্দে সম্পন্ন করে।

উপরে উদ্ধৃত আয়াতসমূহ হইতে স্পষ্টতঃ কোরান সকাল, সন্ধ্যায় এবং রাত্রে অর্থাৎ তিনবার, সালাত প্রতিষ্ঠা করিতে বলিতেছে। দিবসের ক্ষেত্রে ইহা বলিতেছে: “নিশ্চয় দিবসে তোমার জন্য দীর্ঘ কর্মব্যস্ততা রহিয়াছে” (৭৩:৭)। শুক্রবার ব্যতিক্রম বলা যায়, যখন অবশ্যই সমস্ত কর্ম পরিত্যাগ করিয়া দ্রুত মসজিদে যাইতে হইবে। ‘জামায়াতের দিন হিসাবে’ উল্লিখিত এই সমাবেশে, ঐতিহ্যগত বক্তৃতার পরিবর্তে, বর্তমান সমাজের সহিত সঙ্গতিহীন, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ বক্তৃতার (খুতবার) অংশ হওয়া উচিত এবং তাহার পরে সালাত। সালাতের আনুষ্ঠানিক অংশ সম্পর্কে কোরান দাঁড়ান, নত হওয়া, প্রণত হওয়া, দিক অভিমুখী হওয়া, এবং প্রণত অবস্থায় আল্লাহর গুণকীর্তন এ সবকিছু উল্লেখ করে। যাহা হউক, আল্লাহ্ বহু আয়াতে বলেন (দৃষ্টান্ত ৫:৭, ১১:৫) যে আমাদের অন্তরে কি আছে তাহা তিনি জানেন, এবং ইহার অর্থ এই যে সালাতের আনুষ্ঠানিক অংশ প্রধানতঃ তাহার নিকট গুরুত্বপূর্ণ নহে। (৪:৪৩) আয়াতে এই ধারণা আরও দৃঢ় হয় যাহাতে বলা হইয়াছে, সালাতে আমরা কি বলিতেছি তাহা আমাদের অবশ্যই বুঝিতে হইবে।

কোরানের কোন কোন অনুবাদে, বিশেষ করিয়া ইউসূফ আলী ও মোঃ আসাদের অনুবাদে ১৭:৭৮ আয়াত, দৈনিক পাঁচবার নামাজ অনুমোদন করে বলিয়া ব্যাখ্যা করা হইয়াছে। ইউসূফ আলী তাহার ২২৭৫ টিকায় বলেন: “ব্যাখ্যাকারীরা এই আয়াতে দৈনিক পাঁচবার নামাজের নির্দেশ আছে বলিয়া মনে করেন, অর্থাৎ চারবার সূর্যের সর্বোচ্চ স্থান হইতে অবনত হইবার পর হইতে রাত্রির পূর্ণ অন্ধকার পর্যন্ত, এবং অবশিষ্ট প্রত্যুষের ফজর নামাজ, যাহার সহিত পবিত্র কোরান পাঠ করা হয়। চারিটি অপরাহ্নের নামাজ হইতেছে: জোহর, যখন সূর্য সর্বোচ্চ স্থান হইতে অবনত হয়; অপরাহ্নে আছর; সূর্যাস্তের পর মাগরিব এবং যখন সূর্যাস্তের আলোক কমিয়া আসে এবং রাত্রির পূর্ণ অন্ধকার নামিয়া আসে তখন ঈশা। এই আয়াতের অনুবাদে কোন কোন শব্দ এবং শব্দগুচ্ছের অর্থ সম্বন্ধে মতভেদ আছে, কিন্তু যে সাধারণ ভাবান্তর উপস্থিত হয় সে সম্বন্ধে দ্বিমত নাই”।

তথাপি ইউসূফ আলী অতি সাবধারনতার সহিত যে শব্দ বা শব্দগুচ্ছ সম্বন্ধে মতভেদ আছে তাহার উল্লেখ করেন নাই, কারণ তাহা হইলে পাচবার নামাজের ঐতিহ্যের সহিত সংঘর্ষ এড়াইয়া আয়াতটির অনুবাদ করা কঠিন হইত।

এই আয়াতের “দুলুক-আস-শামস্” শব্দগুচ্ছ অনুবাদের বিষয়ে এই বিশৃঙ্খলা অবস্থার সৃষ্টি। ইউসূফ আলী এই শব্দগুচ্ছ “সূর্যের অবনত হওয়া” এবং মোঃ আসাদ “সূর্যের সর্বোচ্চ স্থান হইতে অবনত হওয়া” বলিয়া অনুবাদ করিয়াছেন। মারমাডিউক পিকথল ইহাকে “সূর্যের অস্তগমন” এবং এন.জে. দাউদ “সূর্যাস্তকাল”, বলিয়া অনুবাদ করিয়াছেন। হ্যান্স ওয়ার (Hans Wehr) এর আরবী-ইংরেজি অভিধান “দুলুক” এর অনুবাদ “নিম্নে যাওয়া” বা “(সূর্যের) অস্তগমন” এবং “দুলুক-আস-শামস্” শব্দগুচ্ছকে “সূর্যাস্ত” বলিয়াছেন। ইউসূফ আলী ও মোঃ আসাদ স্পষ্টতঃ হাদিসে যাহা উল্লিখিত অর্থাৎ পাচবার নামাজের সহিত সামঞ্জস্য রাখিবার জন্য এইভাবে শব্দগুচ্ছটিকে ব্যাখ্যা করিয়াছেন। যদি আরবী হইতে ঠিক অর্থ ধরা হয় তাহা হইলে ১৭:৭৮ আয়াতের অনুবাদ হয়: সূর্য অস্তপথে অবনমিত অবস্থা (অথবা সূর্যাস্ত) হইতে রাত্রির অন্ধকার পর্যন্ত। [...], এবং ইহা মাগরীব ও ঈশা নামাজের ইঙ্গিত করে, কিন্তু জোহর, আছর, মাগরীব ও ঈশা নামাজের, যাহা প্রস্তাব করা হইয়াছে, তাহা নহে। ইহা ব্যতীত ইউসূফ আলী ২০:১৩০ আয়াতের ২৬৫৫ টিকায় এবং ৫০:৩৯ আয়াতে ৪৯৭৮ টিকায়, আরবী ‘হামদ’ শব্দের যথার্থ ব্যাখ্যা ‘প্রশংসা’র পরিবর্তে ‘সালাত’ করিয়াছেন। নিজেদের সুবিধার জন্য শব্দ বা শব্দগুচ্ছের ব্যাখ্যা না করিয়া, আমাদের উচিৎ কোরানের শব্দ বা শব্দগুচ্ছের অর্থের প্রতি লক্ষ রাখিয়া ব্যাখ্যা করা।

১১.২১ সালাত (নামাজ) সম্পর্কে হাদিসের বক্তব্য, এবং সালাতের উদ্ভব।

হাদিস সালাতের আনুষ্ঠানিক অংশসমূহ অর্থাৎ ইহার প্রক্রিয়া, সময় এবং সংখ্যা ইত্যাদির প্রতি দৃষ্টিবদ্ধ। যাহা হউক, আমাদের অবশ্যই স্মরণ রাখিতে হইবে যে এ বিষয়ে হাদিসের কোন বক্তব্য যেন কোরান বিরোধী না হয়।

হাদিসের মতে সালাতের প্রক্রিয়া ও সংখ্যা, কোরানের মতই, রাসূলের নিকট প্রত্যাদেশ রূপে আসিয়াছিল। কেবল তাহাই নহে, জিবরাইল১ক নির্দ্ধারিত সময়ে, প্রতিটি সালাতে অগ্রণী হইয়া, সালাত প্রক্রিয়া রাসূলকে দেখাইয়া দিয়াছিলেন (বুখারি ১ম খণ্ড, ৫০০ নং এবং ৪র্থ খণ্ড ৪৪৪ নং)। ইহাতে তৎক্ষণাৎ এই প্রশ্নের উদ্ভব হয়, যদি সালাতের প্রক্রিয়া ও আনুষ্ঠানিক অংশ প্রত্যাদেশরূপে আসিয়া থাকে, তবে কেন ইহা কোরানে অন্তর্ভূক্ত হয় নাই ? তবে কি আমাদের বুঝিতে হইবে যে কোরান অসম্পূর্ণ? অপরপক্ষে, আমরা যদি এই মত পোষণ করি যে, কোরান সর্বশেষ প্রত্যাদেশ হিসাবে সম্পূর্ণ, এবং ইহার প্রতিটি শব্দই অক্ষত আছে, এবং আল্লাহ্ স্বয়ং ইহার রক্ষণের দায়িত্ব নিয়াছেন, সেক্ষেত্রে উপরের হাদিস অবশ্যই মিথ্যা হইবে। অন্য কথায়, জিবরাইল১ক রাসূলকে হাদিসে বর্ণিত সালাতের প্রক্রিয়া দেখাইয়া দেন নাই।

ইহার ফলে প্রশ্ন দাড়ায় সালাতের প্রক্রিয়া ও আনুষ্ঠানিকতা সমূহের কিরূপে উৎপত্তি হইয়াছিল। এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পূর্বে (১১.২২ দ্রঃ) পাঁচবার সালাতের প্রশ্ন আলোচনা করা যাউক। হাদিস (যথা বুঝারী) এই বিষয় বর্ণনা করে ১ম খণ্ড ৩৪৫নং, ৪র্থ খণ্ড ৪২৯নং এবং ৯ম খণ্ড ৬০৮ নং হাদিসে। এই বিষয় এতই গুরূত্বপূর্ণ ছিল যে, ইহা নিশ্চিত করিবার জন্য জিবরাইল রাসূলকে আল্লাহর দর্শনে লইয়া গিয়াছিলেন। হাদিস মতে আল্লাহ্ প্রথমতঃ পাঁচের স্থলে পঞ্চাশ বার সালাত করিবার নির্দেশ দেন। যাহা হউক বেশ কিছু দর কষাকষির পর, যাহাতে মূসা নবী রাসূলের উপদেষ্টা রূপে কাজ করিয়াছিলেন, আল্লাহ্ দয়ার্দ্র হইলেন এবং এই সংখ্যা কমাইয়া পাঁচ বার করিয়া দিলেন। সর্বাপেক্ষা বিস্ময়ের বিষয় এই যে কোরান এরূপ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভ্রমণ উল্লেখ করেনা, যদিও ইহা অপেক্ষা কম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর উল্লেখ করে। এই ভ্রমণ সম্পর্কে কোরানের একমাত্র উল্লেখ, (১৭:১) আয়াতে পাওয়া যায়, যাহা নিম্নে দেওয়া হইল:

(১৭:১) তিনি গৌরবান্বিত হউন যিনি নিশিকালে তাঁহার ভৃত্যকে নিকটতম মসজিদ (কাবা) হইতে দূরতম মসজিদে লইয়াছিলেন, এবং যাহার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল আমরা আশীর্বাদধন্য করিয়াছি, যাহাতে আমরা ঐ ভৃত্যকে আমাদের কিছু নিদর্শনাবলী দেখাইতে পারি [...]।

এই আয়াতের চারটি পৃথক ব্যাখ্যা আছে বলিয়া মনে হয়: (ক) অধিকাংশ ব্যাখ্যাকারী এই নিশিযাত্রাকে আক্ষরিকরূপে গ্রহণ করেন, অর্থাৎ জিবরাইল রাসূলকে মক্কায় অবস্থিত নিকটতম মসজিদ (মসজিদ-আল-হারাম) হইতে জেরুজালেম দূরতম মসজিদ (মসজিদ-আল-আক্সা)য়, যাহার সে সময় অস্তিত্ব ছিল না, লইয়া গিয়াছিলেন। অতএব ইহা দ্বারা সম্ভবতঃ জেরুজালেমের অবস্থিত নবী সুলায়মানের মন্দির অথবা যাহা কিছু তখন অবস্থিত ছিল তাহার কথা বলা হইয়াছে। (খ) হাদিস সাহিত্য আরও একধাপ অগ্রসর হইয়া বলে যে জিবরাইল রাসূলকে জেরুজালেম হইতে আল্লাহর দর্শন লইয়া গিয়াছিলেন এবং এই সাক্ষাতকারে পাঁচবার সালাত নিশ্চিত হয়। (গ) এই সমগ্র ভ্রমণ ছিল আধ্যাত্মিক, সম্ভবতঃ স্বপ্নে। (ঘ) ইহা রাসূলের আবু বকরের সহিত মক্কা (যেখানে নিকটতম মসজিদ কাবা অবস্থিত ছিল) হইতে মদিনায় পলায়ন (হিজরত), এবং যেখানে (দূরতম মসজিদ অর্থাৎ মসজিদ-আল-আক্সা), নবীর আগমনের পূর্বে স্থাপিত হইয়াছিল। ইহার ঐতিহাসিক নিদর্শন আছে যেহেতু মদিনা হইতে আগত ৭৩ জনের একটি প্রতিনিধি দল রাসূলের মক্কায় অবস্থানকালে তাঁহার সাক্ষাতে আসিয়াছিলেন, এবং রাসূল মুসাব-বিন-উমায়েরকে সালাত পরিচালনা করিতে ও মদিনাবাসীদের ইসলামের ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আনিবার জন্য সাহায্য করিতে ঐ প্রতিনিধিদলের সহিত পাঠাইয়াছিলেন। সুতরাং মদিনাবাসীরা রাসূলের আগমনের পূর্বে অবশ্যই মসজিদ নির্মাণ করিয়াছিল। এই শেষোক্ত ব্যাখ্যাই অধিকতর যুক্তিসঙ্গত মনে হয়, কারণ মদিনা রাসূলের ধর্ম প্রচার কার্যের জন্য অধিকতর সহায়ক ছিল এবং সেই কারণে ইহা ছিল আল্লাহর আশীর্বাদ প্রাপ্ত পার্শ্ববর্তী অঞ্চল যাহা রাসূল কর্তৃক তাঁহার ধর্মপ্রচারের শেষোক্ত অধ্যায়ে ব্যবহৃত হইয়াছিল।

(৯৩:৪,৫) নিশ্চয় তোমরা জন্য পূর্ববর্তী অপেক্ষা পরবর্তী সময় কল্যাণকর। অচিরেই তোমার প্রতিপালক তোমাকে অনুগ্রহ দান করিবেন যাহাতে তুমি সন্তুষ্ট হইবে।

১১.২২ হাদিসে বর্ণিত সালাতের প্রক্রিয়া বা রূপ।

বুখারীতে সালাতের প্রক্রিয়া সুসংগতরূপে দেওয়া হয় নাই। ইহার একটি বোধগম্য ধারণা পাইতে হইলে এই গ্রন্থে উদ্ধৃত বহু হাদিসের পর্যালোচনা করিতে হয়। বুখারীর মতে (১ম খণ্ড ৩৪৬নং) যখন আল্লাহ্ সালাতের নির্দেশ দিলেন, ইহা প্রতি সালাতে কেবল ২ রাকাতক৪ ছিল, বাড়ি বা ভ্রমণ উভয় ক্ষেত্রে। পরে ভ্রমনের সময় সালাত একই থাকিল, কিন্তু অন্যান্য ক্ষেত্রে রাকাতের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হইল। উদাহরণ স্বরূপ হাদিসে (বুখারী ১ম খণ্ড ৪৭৪নং) বলা হইয়াছে যে রাসূল জোহরে ২ রাকাত ও আছরে ২ রাকাত পড়িতেন। আবার (১ম খণ্ড, ৫১৮নং) হাদিসে বলা হইয়াছে যে, রাসূল মদিনায় ৮ রাকাত করিয়া জোহর ও আছর এবং ৭ রাকাত মাগরিব ও ঈশায় পড়িতেন। বুখারী (১ম খণ্ড, ৫৬৬নং) হাদিসে আবার বলা হইয়াছে যে, আল্লাহর বার্তাবাহক, ফজরের সালাতের (নামাজের) পূর্বে ২ রাকাত এবং আছরের সালাতের (নামাজের) পরে ২ রাকাত, কখনও বাদ দেন নাই। প্রকৃতপক্ষে, ২ রাকাত ফজর, ৪ রাকাত জোহর, ৪ রাকাত আছর, ৩ রাকাত মাগরিব এবং ৪ রকাত ঈশা, যাহা বাধ্যতামূলক নামাজ হিসাবে ধরা হয়, বুখারীতে তাহার কোনই উল্লেখ নাই। অধিকন্তু বর্তমানে আমরা যে সুন্নত নামাজ পাঠ করি বুখারীতে তাহারও উল্লেখ নাই। বহু সংখ্যক হাদিস অনুসন্ধান করিয়া দাঁড়ান অবস্থায় রুকুতে এবং সেজদায় কি বলিতে হইবে তাহার নির্দেশ পাওয়া যায়। কাজেই সুনিশ্চিত ভাবে বলা যায় যে হাদিসে সংগঠিত বা সমন্বয়ের সহিত নামাজ পড়িবার কোন নিয়ম নাই যাহা সার্বজনীনভাবে অনুসরণ করা যায়। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই যে, যদিও বসিয়া থাকিবার সময় ‘আত্তাহিয়াতু’র উল্লেখ আছে, যে ‘দরূদ’ আমরা আত্তাহিয়াতু’র পরে পড়ি, বুখারীতে তাহার উল্লেখ নাই।

মুসলিমের হাদিসেও সালাতের প্রক্রিয়া সম্বন্ধে কোন স্পষ্ট নির্দেশ নাই। বাধ্যতামূলক নামাজের রাকাত এবং বর্তমান কালের রাকাতের মধ্যে কোন মিল নাই। প্রতি রাকাতে সুরা আল-ফাতিহা আবৃতির নির্দেশ মুসলিমে স্পষ্ট, কিন্তু প্রধান অংসগতি দেখা যায় রাকাতের সংখ্যায় এবং প্রধানতঃ বাধ্যতামূলক নামাজের ক্ষেত্রে। উদাহরণ স্বরূপ হাদিস নং ১০১৭ এ উক্ত যে নবী জোহরে দুই রাকাত এবং আছরে দুই রাকাত নামাজ পালন করিতেন, অথচ এই হাদিসের সহিত নিম্নে বর্ণিত ৯১১ নং হাদিসের অসংগতি দেখা যায়।

(৯১১) আবু সাইদ আল-খুদরীর বর্ণনা: আল্লাহর রাসূল জোহর নামাজের প্রথম দুই রাকাতে ৩০টি আয়াত এবং শেষের দুই রাকাতে ১৫টি আয়াত আবৃত্তি করিতেন এবং আছরের নামাজে প্রথম দুই রাকাতে ১৫ আয়াত ও শেষের দুই রাকাতে প্রথম দুই রাকাতের অর্ধেক আয়াত আবৃত্তি করিতেন।

ইহার সহিত আবার ৯০৯ নং হাদিসের অসংগতি দেখা যায়, যেখানে শেষের দুই রাকাতে কেবল সুরা আল-ফাতিহা আবৃত্তির উল্লেখ আছে। অধিকন্তু বলা হয় যে কোন কোন সময়ে রাসূল উচ্চস্বরে আবৃতি করিতেন এবং ইহার বর্তমান কালের জোহর ও আছরের নীরব নামাজের সহিত সামঞ্জস্য রাখে না।

বেতের নামাজের বর্ণনায় হাদিস নং ১৬০২, ১৬০৪ এবং ১৬০৭ যথাক্রমে এক রাকাত, পাঁচ রাকাত ও তিন রাকাত পাঠের নির্দেশে পুনরায় অসংগতির সৃষ্টি করিয়াছে।

সুন্নত নামাজ সম্বন্ধে কোন স্পষ্ট নির্দেশ নাই। বাধ্যতামূলক নামাজ ব্যতীত অন্য যে নামাজের উল্লেখ আছে তাহা ঐচ্ছিক বা স্বতঃপ্রবৃত্ত নামাজ। যেমন ১৫৭৯ নং হাদিসে বলা হইয়াছে যে কোন ব্যক্তি যদি এক দিবা রাত্রিতে ১২ রাকাত নামাজ পড়ে তবে তাহার জন্য বেহেস্তে একটি বাসস্থান নির্মিত করা হইবে।

অধিকন্তু আশ্চর্যের বিষয় যে দিবা রাত্রির সর্বসময় নবী নামাজের মধ্যেই নিমগ্ন আছেন, যাহা দ্বারা অনুমিত হয় যে আল্লাহর নির্দেশ কেবলমাত্র নামাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। উদাহরণ স্বরূপ উল্লেখ করা যায়: জোহরের পূর্বে ৪ হইতে ৮ রাকাত (১৫৪৯নং হাদিস); মসজিদে নামাজের নেতৃত্বের পর স্বীয় বাসস্থানে অতিরিক্ত নামাজ পাঠ; ঈশার পরে তাহাজ্যুদ নামাজ, প্রায় ফজর পর্যন্ত (১৫৮৪ নং হাদিস), ইত্যাদি। ৯২৭নং এবং ৯২৮নং হাদিসে উক্ত যে নবী ফজরের নামাজে ৬০ হইতে ১০০ আয়াত আবৃত্তি করিতেন। বিস্ময়ের বিষয় যে নবী উপরন্তু কি প্রকারে অন্যান্য কর্তব্য পালনের সময় পাইতেন, বহুমুখী কর্তব্য, যেমন কোরানের সংকলন, আল্লাহর নির্দেশ প্রচার, সরকারি কর্তব্য, জনগণের দাবী-দাওয়া, এবং তাঁহার পরিবারের প্রতিপালন।

বুখারী ও মুসলিমে উল্লেখিত নামাজের প্রক্রিয়ায় সামঞ্জস্য আছে রুকু ও সেজদায় যাহা বলিতে হইবে তাহার নির্দেশে। বসা অবস্থায় আত্তাহিয়াতু ও দরূদ পাঠ মুসলিমে আছে, কিন্তু বুখারীতে দরুদ পাঠ নাই।

এই সব কিছু হইতে যাহা ধারণা করা যায় তাহা এই যে বর্তমান আকারে প্রতিষ্ঠিত হইবার পূর্বে, আমাদের সমস্থ নামাজের প্রক্রিয়ার ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হইয়াছে এবং এই সকল পরিবর্তনের অধিকাংশই রাসূলের মৃত্যুর বেশ কিছুকাল পরেই হইয়াছে। ইহাতে কোন দোষ নাই যদি আমরা স্বীকার করি যে নামাজের আনুষ্ঠানিক অংশ প্রত্যাদেশের মাধ্যমে আসে নাই। ইহা ছিল কোরানে নির্দেশিত সীমা-রেখার মধ্যে (সালাতের উপর আয়াতগুলি দ্র:) একটি সাধারণ জ্ঞানের ভিত্তিতে নামাজের নিয়ম উদ্ভাবনের পথ। রাসূল ইহা না করিয়া থাকিলে একটি উপযুক্ত ইসলামী রাষ্ট্র ইহা করিত। যে বিষয় আমাদের অবশ্যই স্মরণ রাখিতে হইবে, তাহা এই যে, আল্লাহ্ আমাদের যে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য পালনের নির্দেশ দিয়াছেন তাহাদের পরিপ্রেক্ষিতে আচারানুষ্ঠানের স্থান দিলেই তাহা মুল্যবান হইবে। অন্যথায় ইহা কেবল প্রণালী হইবে যাহার কোন মূল্য নাই।

১১.২৩ সমালোচনা

পূর্বে বলা হইয়াছে যে নামাজের প্রক্রিয়া বা আনুষ্ঠানিক অংশ প্রত্যাদেশের মাধ্যমে আসে নাই, কারণ ইহা কোরানে নাই। সেহেতু একটি প্রচলিত প্রশ্ন সর্বদাই উত্থাপিত হয়। ইহা এই যে, যেহেতু হাদিস নামাজের প্রক্রিয়া বর্ণনা করে, সুতরাং হাদিস উপক্ষো করিলে কিরূপ আমরা নামাজ শিক্ষা করিতাম? পূর্বেই দেখান হইয়াছে যে বর্তমানে আমরা যেভাবে নামাজ পাঠ করি তাহা বুখারী এবং মুসলিমের হাদিসে নাই এবং আমাদের সমস্ত নামাজের পদ্ধতি বহু পরিবর্তনের পর অবশেষে বর্তমান পর্যায়ে আসিয়াছে এবং এই সমস্ত পরিবর্তনের অধিকাংশই নবীর মৃতুর বহু পরে হইয়াছে। ইহা ব্যতীত হাদিস সাহিত্য আবির্ভাবের পূর্বে প্রায় ২৫০ বৎসরের ব্যবধান রহিয়াছে (হাদিস বিষয়ে আলোচনার জন্য ১০.১ দ্র:)। সুতরাং এই সময়ের ব্যাপ্তিতে মানুষ কিরূপে নামাজ পালন করিত। স্পষ্টতঃ রাসূল অবশ্যই কোরানে বর্ণিত সূত্রের প্রতি খেয়াল রাখিয়া তাহার সাহাবিদের সহিত আলোচনার মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া স্থির করিয়া ছিলেন। ইহা মূলনীতির সীমার মধ্যে সহায়ক আইন প্রতিষ্ঠা হইতে পৃথক কিছু নয় (১৩.৫ দ্র:)। বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ যে, রাসূল নামাজের প্রক্রিয়া অথবা তাহার নিজস্ব বক্তব্য এবং কর্মপন্থা লিপিবদ্ধ করেন নাই, কারণ কোরানে লিখিত বিষয় সমূহের সহিত তাহা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করিত। যাহা হউক, একটি আচারানুষ্ঠান যাহা একবার প্রতিষ্ঠিত হইয়া গিয়াছে এবং তৎকালিন মুসলিম সম্প্রদায় কর্তৃক নিয়মিত অনুসৃত হইতেছে, লিখিত না হইলেও তাহা ভাঙ্গিয়া পড়িবার সম্ভাবনা ছিলনা। সুতরাং হাদিস না থাকিলে নামাজ পড়িবার কোন সঠিক পদ্ধতি প্রবর্তন করা যাইত না এই যুক্তির কোন ভিত্তি নাই। সালাত সম্পর্কে তাঁহার গবেষণা ও রচনা ব্যতীত বর্তমানকালের নামাজের রীতি সম্ভব হইত না, এ সহজ ও কার্যকরী যুক্তির দ্বারা বুখারী রাসূল সম্বন্ধে তাহার উল্লিখিত বহু অবমাননাকর হাদিসের ব্যাপারে মানুষের ক্রোধ এড়াইতে সক্ষম হইয়াছেন। সত্য এই যে, হাদিসের প্রভাব ব্যতীত যে অভ্যাস ২৫০ বৎসর বিদ্যমান ছিল, তাহা অন্য কোন কারণে নহে তাহার নিয়মিত চর্চার জন্যই বিদ্যমান থকিত।

অধিকন্তু অল্প কয়েক দশকের মধ্যে ইসলামের দ্রুত বিচার, ইহার স্থায়িত্বে অধিকতর উদ্যম দিয়াছে। আব্বাসীয়দের সময় উদ্ভুত হানাফি, মালিকি, শাফি ও হানাবালি, এই চারি আইনগোষ্ঠীর প্রভাবে সালাতের প্রক্রিয়া ও চর্চার মধ্যে কিছু পরিবর্তন সাধিত হইয়াছে। আরও পরিবর্তন, বিশেষ করিয়া প্রত্যেক নামাজে কত রাকাত পড়িতে হইবে, কালক্রমে মানুষের হস্তক্ষেপের ফলে হইয়াছে। পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে কৃষ্টিগত পার্থক্যের কারণেও এই প্রক্রিয়ায় কিছু কিছু বিভিন্নতা আসিয়া পড়িয়াছে। এই সকল বিভিন্নতা প্রত্যক্ষ করিতে বিস্তৃত ভ্রমণেরও প্রয়োজন নাই। ইহার ব্যাখ্যা কি এবং নামাজের বিষয়ে মতের ঐক্য কোথায়?

একথা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করিতে চাই যে এই পুস্তকে আমি ‘সালাত’-এর অর্থ সর্বজন গৃহীত, ‘আনুষ্ঠানিক প্রার্থনা’র মধ্যে, সীমাবদ্ধ করিয়াছি। কোরানে ‘সালাত’ শব্দ ব্যাপকতর অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে যাহা হইতে প্রতীয়মান হয় যে নামাজ ব্যতীত সালাতের অর্থ আরও বিস্তৃত। আমরা আরও দেখিতে পাই যে ‘সালাত’ শব্দ কোরানের বহুবচন অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে। আমি সাধারণ অর্থে ‘নামাজের’র উপরই দৃষ্টি নিবন্ধ করিয়াছি যাহাতে এই দৈনন্দিন চর্চার ব্যাপারে আমাদের কিছু কিছু বিভ্রান্তি ও আবিষ্ট চিন্তার উদঘাটন হয়।

১১.২৪ আমার দৃষ্টিতে–কোরানের সহিত বর্তমান প্রচলিত নামাজের কতিপয় অসংগতি

প্রথমতঃ যে সকল সুরা পাঠ করা হয় সেগুলি নামাজের সহিত অবশ্যই সামঞ্জস্যপূর্ণ হইতে হইবে। বর্তমানে প্রথম সুরা (আল-ফাতিহা) ব্যতীত আমরা যে সকল সুরা পাঠ করি তাহাদের অনেকগুলির নামাজের সহিত কোন সামঞ্জস্য নাই এই কারণে যে, আমরা যাহা বলিতেছি তাহা আমাদের অবশ্যই জানিতে হইবে এবং ইহা আমাদের উদ্দেশ্যের সহিত অর্থপূর্ণ কি না তাহাও জানিতে হইবে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ, সুরা ১০২ পাঠে আমরা বলি: “বল, তিনি আল্লাহ্, একক! [...]” অর্থাৎ অন্যভাবে আমরা আল্লাহকে বলিতেছি, “বল: তিনি আল্লাহ্, একক! [...]” এবং ইহা হাস্যকর। যাহা হউক নামাজ আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসীদের আন্তরিক মিনতি, সুতরাং যে সমস্ত সুরা এই উদ্দেশ্য পূর্ণ করে না সেগুলি অনুপযুক্ত। আমরা কি বলি তাহা নির্দিষ্ট করিয়া সুরা নির্বাচন করা উচিত, (বিশেষ করিয়া দোয়া সমূহ, যাহার সংখ্যা বহু) যেগুলি আল্লাহর প্রতি আমাদের আন্তরিক বিনীত আবেদন নির্দেশ করে। তাহা না হইলে, প্রথম সুরা পাঠের পর রুকু ও সেজায় চলিয়া যাওয়াই বাঞ্ছনীয় হইবে। রুকু ও সেজদায় আমরা যাহা উচ্চারণ করি তাহা সুরা ১৭:১০৭, ১০৮ অনুসারী, অর্থাৎ ঐ সকল অবস্থানে আল্লাহর গৌরব বর্ণনা। কিন্তু আত্তাহিয়্যাতু ও দরূদ, যাহা বসিয়া পাঠ করা হয়, উভয়ের মধ্যেরই কিছু কথা কোরানের নির্দেশের বিরুদ্ধে যায়। দৃষ্টন্ত স্বরূপ, আত্তাহিয়্যাতুর শব্দসমূহের অনুবাদ:

“সকল সম্মান, সকল উপাসনা, সকল পবিত্রতা আল্লাহর প্রাপ্য। হে রাসূল! আপনার উপর শান্তি এবং আল্লাহর করুণা ও তাঁহার আশীর্বাদ বর্ষিত হউক। আমাদের ও আল্লাহর নেক ন্যায়পরায়ণ বান্দাদের উপর শান্তি বর্ষিত হউক। আমি সাক্ষ্য দিতেছি আল্লাহ্ ব্যতীত আর কোন উপাস্য নাই এবং আমি সাক্ষ্য দিতেছি মোহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।”

“হে রাসূল আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হউক”, এই বাক্যের অন্তর্ভুক্তিতে রাসূলের প্রতি সম্বোধনাত্মক কারক ব্যবহার করা হইয়াছে –ইহা একটি বাক্যারণগত গঠনকৌশল যাহাতে সম্বোধিত ব্যক্তি এখনও জীবিত আছেন বলিয়াই ধরিয়া লওয়া হয়। ইহা সম্পূর্ণ ভুল। তাহা ব্যতীত, যেহেতু নবীদের মধ্যে কোন পার্থক্য করিতে কোরান নিষেধ করে, উপযুক্ত উক্তি হওয়া উচিত ‘সকল নবীদের উপর শান্তি বর্ষিত হউক’, এবং ইহা কোরানের সহিত সঙ্গতিপূর্ণ (৩৭:১৮১)।

নিম্নের আয়াতসমূহ সালাতের উপর আরও প্রাসঙ্গিক যুক্তি প্রদান করে।

(৭২:১৮,১৯) এবং নামাজের স্থানসমূহ কেবলমাত্র আল্লাহর জন্য। সুতরাং আল্লাহর সহিত অন্য কাহাকেও আবেদন করিও না। এবং যখন আল্লাহর বান্দা (রাসূল) তাঁহার (আল্লাহর) প্রার্থনায় উঠিয়া দাড়ান, লোকে প্রায় শ্বাসরূদ্ধ ভাবে তাঁহাকে ঘিরিয়া ভীড় করে।

(৭২:২০) (হে মোহাম্মাদ) তাহাদিগকে বল: আমি কেবলমাত্র আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি, এবং তাঁহার সহিত কাহাকেও অংশীদার করি না।

আমাদের বুঝিতে হইবে যে আমরা যে প্রকারে প্রার্থনা করি তাহা আনুষ্ঠানিক, যদিও এই আনুষ্ঠানিকতা জামায়াতে সম্পাদন করিবার গুরুত্ব আছে, কারণ ইহা মানুষকে একত্র করিতে সাহায্য করে। কিন্তু মসজিদের ব্যবহার কেবলমাত্র জামায়াতের নামাজ পাঠ অপেক্ষা আরও অধিক হওয়া আবশ্যক। ইমাম অথবা যে ব্যক্তি নামাজ পরিচালনা করেন তাঁহাকে অবশ্যই কোরানে সুপণ্ডিত হইতে হইবে, যাহাতে তিনি ইহা অর্থপূর্ণরূপে ব্যবহার করিতে পারেন এবং সময় সময় কোরান সম্বন্ধে বক্তৃতা বা আলোচনার জন্য ব্যবস্থা করিতে পারেন। ইহাও অত্যাবশ্যক যে মসজিদ কেবলমাত্র নামাজের সময় ব্যতীত অন্য সকল সময় বন্ধ না রাখিয়া সমাজ ও এলাকার মঙ্গলকর অনুষ্ঠানাদির জন্যও উন্মুক্ত রাখা হয়। (১১.২৫ বিভাগ দ্রষ্টব্য)

কোরানে অনেক আয়াত আছে যেগুলি আমাদের প্রার্থনার জন্য সুসংগত। নিম্নে কয়েকটি উদ্ধৃত করা হইল, ইহার মধ্যে নবীরা তাঁহাদের জীবনকালে প্রার্থনায় যাহা ব্যবহার করিতেন তাহাও আছে।

(২:২৮৬) [...] হে আমাদের প্রতিপালক! যদি আমরা বিস্মৃত বা বিভ্রান্ত হই আমাদিগকে দোষী সাব্যস্ত করিবেন না। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদিগের উপর এরূপ ভার ন্যস্ত করিবেন না যেরূপ আপনি আমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ন্যস্ত করিয়াছিলেন। আমাদের উপর এমন কিছু আরোপ করিবেন না যাহা বহিবার ক্ষমতা আমাদের নাই। আমাদের ক্ষমা করুন, আমাদের অব্যাহতি দিন এবং আমাদের উপর করুণা করুণ। আপনি আমাদের রক্ষাকর্তা, তাই যাহারা আপনাকে অস্বীকার করে তাহাদের হইতে আমাদের রক্ষা করুন।

(২:১২৭,১২৮) এবং যখন ইবরাহীম ও ইশমাইল (কাবা) গৃহের ভিত্তি স্থাপন করিতেছিলেন, (ইবরাহীম প্রার্থনা করিলেন): হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের (এই কর্তব্যের) নিবেদন গ্রহণ করুন। আপনি, একমাত্র আপনিই, শ্রোতা ও সর্বজ্ঞ। হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার প্রতি আমাদের বিনীত করুন, এবং আমাদের বংশধরগণের মধ্যে হইতে আপনার অনুগত এক জাতিকে উৎপন্ন করুন। এবং আমাদেরকে প্রার্থনার নিয়ম শিক্ষা দিন, এবং আমাদের প্রতি দয়ার্দ্র্য হউন। আপনি, একমাত্র আপনিই, দয়ার্দ্র, করুণাময়।

(৭:১৫৫) এবং যখন মুসা তাহার লোকদের সত্তর জনকে আল্লাহর সহিত সাক্ষাতের স্থানে লইয়া গেলেন, তখন তাহারা ভীষণরূপে ভুকম্পনে আক্রান্ত হইল। তিনি প্রার্থনা করিলেন: হে আমার প্রতিপালক, আপনার ইচ্ছা থাকিলে, আপনি বহু পূর্বে আমাকে ও তাহাদের সকলকেই ধ্বংস করিতে পারিতেন। আমাদের ভিতরের নির্বোধ লোকদের কর্মের জন্য আপনি কি আমাদের ধ্বংস করিয়া দিবেন? ইহা আপনার পরীক্ষার অধিক কিছু নয়। ইহা দ্বারা আপনি যাহাকে ইচ্ছা বিপথগামী করেন এবং যাহাকে ইচ্ছা সঠিক পথে চালিত করেন। আপনি আমাদের রক্ষণকারী। তাই আমাদেরকে মার্জনা করুন, এবং আমাদের উপর আপনার করুণা বর্ষণ করুন, কারণ আপনিই সর্বাপেক্ষা উত্তম ক্ষমাকারী।

(৫:১১৮) আপনি তাহাদের শাস্তি দিন, অথবা আপনি তাহাদের ক্ষমা করুন, (তাহারা আপনারই বান্দা)। আপনি, একমাত্র আপনিই, সর্বশক্তিমান, মহাজ্ঞানী (ঈসার প্রার্থনা)

(২৩:৯৭,৯৮) হে আমাদের প্রতিপালক! বিরোধীগণের কুপ্ররোচনা হইতে আমি আপনার আশ্রয় প্রার্থী এবং উহাদের নৈকট্য হইতে রক্ষার জন্যও আমি আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করি (মোহাম্মাদের প্রার্থনা)

কোরানে অন্যান্য প্রার্থনা-জ্ঞাপক আয়াত সমূহের সূত্র, যাহা আমরা আল্লাহর নিকট আমাদের আন্তরীক বিনীত প্রার্থনায় ব্যবহার করিত পারি: (২:১২৭, ১২৮, ২০১, ২৮৬), (৩:৮, ১৬, ২৬, ২৭, ৩৮, ৫৩, ১৯১, ১৯২, ১৯৩, ১৯৪), (৪:৭৫), (৫:৮৩,৮৪), (৭:২৩, ১২৬), (১১:৪৫), (১২:১০১), (১৪:৪০, ৪১), (২০, ২৫, ২৬, ২৭, ২৮, ২৯, ১১৪), (২১:৮৩, ৮৭, ৮৯, ১১২), (২৩:২৮, ২৯, ৯৩, ৯৪, ৯৭, ৯৮, ১১৮), (২৪:৬৫, ৬১), (২৫:৭৪), (২৬:৮৩,৮৪, ৮৫), (২৭:১৯), (৩৭:১০০), (৪০:৭, ৮, ৯), (৪৩:১৩,১৪), (৫৯:১০), (৬০:৪,৫), (৬৬:৮,১১)।

পরিশেষে, আমাদের অবশ্যই স্মরণ রাখিতে হইবে যে আল্লাহ্ সকল সময় আমাদের নিকটেই আছেন (২:১৮৬)। যদি আমরা তাঁহার নিকট প্রার্থনা করি তিনি আমাদের কথা শুনিবেন এবং সাহায্য করিবেন। অবশ্যই তাহার জন্য আমাদের “সঠিক পথে” চলিতে হইবে। যদি তাহার গুণগান এবং নির্দেশের জন্য প্রার্থনার পরিবর্তে কোরানে যাহা আছে আমরা তাঁহাকে শুনাই, বিশেষ করিয়া আমাদের প্রার্থনার সহিত কোন সম্বন্ধ নাই এইরূপ আয়াত, তবে কিরূপে তিনি আমাদের উপকার করিবেন? আমরা তাহাকে নিকটে পাইতে পারি; কিন্তু তাহার জন্য আমাদের তাঁহার ডাক শুনিতে হইবে ও তাঁহার নির্দেশ মানিতে হইবে, যাহার সকল কিছুই আমাদের সৎকর্মের সহিত জড়িত।

(২:১৮৬) যখন আমার বান্দাগণ আপনাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে তাহাদের বলিবেন যে আমি সবসময় নিকটেই আছি। আমি প্রার্থনাকারীর প্রার্থনা শুনি যখনই সে আমাকে ডাকে। অতএব, তাহারা আমার ডাক শ্রবণ করুক এবং আমার উপর নির্ভরশীল হউক যাহাতে তাহারা সঠিক পথে চালিত হইতে পারে।

১১.২৫ মসজিদের ভূমিকা

কোরানে বর্ণিত আমাদের অন্যান্য কর্তব্যের অনুপাতে বর্তমানে আমরা পাচবার নামাজের গুরুত্ব খুবই অত্যধিক দিয়া থাকি। একটি উদাহরণের মাধ্যমে ইহার ব্যাখ্যা করা যায়: যুক্তরাজ্যে মুসলিমরা ১০০০ এর অধিক মসজিদ প্রতিষ্ঠা করিয়াছেন, মূলতঃ নামাজের উদ্দেশ্যেই। এই মসজিদগুলি কোরানের উপর আলোচনা অথবা এই দেশের মুসলিমদের সমস্যা সম্বন্ধে গঠনমূলক আলোচনার জন্য ব্যবহার করা অসম্ভব, যদি না আমাদের মতামতের সহিত এ সমস্ত মসজিদের পরিচালক ও ইমামের মতামতের মিল হয়। ইহার অর্থ এই যে এই মসজিদগুলি সম্পূর্ণরূপে ব্যবহৃত হইতেছে না। ইহাদের নির্মাণে বহু পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হইয়াছে; কিন্তু নামাজ পড়া ব্যতীত মুসলিমরা ইহার বিশেষ ব্যবহার করিতে পারে না। ইমামের নিকট হইতে একমাত্র বক্তৃতা, যাহা শুনা যায়, তাহা জুমা নামাজের পূর্বে, এবং বিষয়টি অধিকাংশ ক্ষেত্রে হাদিসের উপর ভিত্তিমূলক এবং এগুলি তরুণদের পক্ষে স্বল্পই বোধগম্য। তরুণদের ধর্মীয় শিক্ষার বিষয়ে এতই অল্প প্রয়াস লেওয়া হয় যে বয়স্কদের তিরোধানের পর মসজিদগুলির অবস্থা এই দেশের চার্চ গুলির মত হইবে, অর্থাৎ সেগুলির হয় খালি পড়িয়া থাকিবে। অথবা বিংগো (bingo) ক্লাবে পরিণত হইবে। অধিকন্তু, মসজিদ আয়ত্তাধীন রাখিবার জন্য ক্রমাগত অন্তর্কলহ এতই ব্যাপক যে, লোকে বিরক্তিতে দূরে সরিয়া যাইতেছে। সুতরাং আমরা যদি মসজিদ সমূহে সুশিক্ষিত, এদেশে লালিত এবং তরুণ সমাজের সহিত যোগাযোগে সক্ষম, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদির উপর আলোচনা সভা আয়োজন ও তরুণদের জন্য কোরানের অর্থপূর্ণ শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করিতে পারে এইরূপ ইমামদের নিয়োগ করিতে না পারি, তাহা হইলে এদেশের মুসলিমদের ভবিষ্যত ঘোর অন্ধকারাচ্ছন্ন বলিয়া মনে হয়। যাঁহারা সমাজের উপকারের জন্য বক্তৃতা অথবা শিক্ষা ব্যবস্থা আয়োজনে উৎসাহী তাহারা এই সকল মসজিদ ব্যবহার করিতে পারেন না। সেইজন্য তাঁহারা অনাবশ্যক অর্থ ব্যায়ে চার্চ হল অথবা অন্য কোন হল ভাড়া নিয়া ব্যবহার করেন।

১১.৩ যাকাত (১২.৩৩ দ্রষ্টব্য)




Home Next >>