১১.১ বিশ্বাস বা ঈমানের শপথ



একজন মুসলিম তাঁহার ঈমান প্রকাশ করেন এই বলিয়া যে, “আল্লাহ্ ব্যতীত আর কোন মা’বুদ নাই এবং মোহাম্মাদ তাঁহার রাসূল।” প্রথমতঃ এই ঘোষণা কোরানে বিশেষ ভাবে বর্ণিত “আল্লাহর একত্ব” বা “তওহীদ” এর মূল ধারণার বিরুদ্ধাচারী বলিয়া মনে হয়। “আল্লাহ্ ব্যতীত আর কোন মা’বুদ নাই”, “এবং মোহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল” এই দুইটি উক্তি কোরানে কোথাও একত্রে সংযুক্ত হয় নাই। কোরানের উদাহরণে লক্ষ্য করা যায়:

(৩:১৮) আল্লাহ সাক্ষী দেন যে নিশ্চয়ই তিনি ব্যতীত আর কোন মা’বুদ নাই (লা-ইলাহা-ইল্লা-হু)– এবং ফেরেশতাগণ ও জ্ঞানিগণও; আল্লাহ্ ন্যায়নীতিতে প্রতিষ্টিত, তিনি ব্যতীত অন্য কোন মা’বুদ নাই (লা-ইলাহা-ইল্লা-হু), তিনি সর্বশক্তিমান, মহাজ্ঞানী।
নিম্নবর্ণিত আয়াতসমূহে আরও উদাহরণ পাওয়া যায়:

(২:১৬৩, ২৫৫), (৩:২, ৬), (৪:৮৭), (৬:১০২, ১০৬), (৭:১৫৮), (৯:৩১, ১২৯), (১১:১৪), (১৩:৩০), (১৬:২), (২০:৮, ১৪, ৯৮), (২১:২৫, ৮৭), (২৩:১১৬), (২৭:২৬), (২৮:৭০,৮৮), (৩৫:৩), (৩৯:৬), (৪০:৩, ৬২, ৬৫), (৪৪:৮), (৪৭:১৯), (৬৪:১৩), (৭৩:৯)
ইমানের প্রচলিত ঘোষণা দ্বিতীয়রূপে যে ভাবে কোরানের বিরুদ্ধাচরণ করে তাহা এই যে আল্লাহ্ অতিরিক্ত পক্ষে পাঁচবার উল্লেখ করিয়াছেন, আমরা তাঁহার নবীদের মধ্যে কোনই পার্থক্য করিতে পারিব না। এইরূপ করিলে আমরা অবিশ্বাসী হইব এবং কঠোর শাস্তির সম্মুখীন হইব। সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলি এই: (২:১৩৬,২৮৫), (৩:৮৪), (৪:১৫০, ১৫২), যাহা হইতে নিম্নের উদ্ধৃতি দেওয়া হইল:

(৪:১৫০-১৫২) যাহারা আল্লাহ্ ও তাঁহার বার্তাবাহকদের অস্বীকার করে, আল্লাহকে তাঁহার বার্তাবাহাকগণ হইতে পৃথক করিতে ইচ্ছা করে, এবং বলে যে, ‘আমরা কতককে বিশ্বাস করি, কতককে অবিশ্বাস করি, এবং ইহাদের মধ্যবর্তী একটি পথ পছন্দ করি’; ইহারাই প্রকৃতপক্ষে অবিশ্বাসী; এবং অবিশ্বাসীদের জন্য আমরা লাঞ্ছনাকর শান্তি প্রস্তুত রাখিয়াছি। কিন্তু যাহারা আল্লাহ্ এবং তাহার বার্তাবাহকদের বিশ্বাস করে এবং বার্তাবাহকদের মধ্যে কোন পার্থক্য করে না, আল্লাহ্ তাহাদের পুরস্কৃত করিবেন। আল্লাহ্ সদা ক্ষমাশীল, করুণাময়।

প্রকৃতপক্ষে মুসলিমদের জন্য শাহাদাহ্ (অর্থাৎ আমাদের বিশ্বাসের প্রকাশ) স্বয়ং কোরানেই রহিয়াছে, নিম্নোদ্ধৃত আয়াতে:

(২:১৩৬) (হে মুসলিমগণ) বল! আমরা আল্লাহকে বিশ্বাস করি এবং যাহা আমাদের নিকট প্রকাশিত হইয়াছে এবং যাহা ইবরাহীম এবং ইশমাইল এবং ইসহাক ও গোত্রদের নিকট প্রকাশিত হইয়াছিল, এবং যাহা মূসা ও ঈসা পাইয়াছিলেন, এবং যাহা নবীগণ তাহাদের প্রতিপালকের নিকট হইতে পাইয়াছিলেন ঐ সমস্তই আমরা বিশ্বাস করি। আমরা তাঁহাদের কাহারও মধ্যে পাথর্ক্য করি না এবং আমরা আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করিয়াছি।

অন্যান্য আয়াতসমূহও এই ঘোষণা অনুমোদন করে (দৃষ্টান্ত স্বরূপ, আয়াত ২:১১৭, ২৮৫ এবং ৩:৮৪)

টীকা: মানুষের হস্তক্ষেপের ফলে কোরান ব্যতীত অন্যান্য নবীদের নিকট প্রদত্ত আল্লাহর প্রত্যাদেশসমূহের মূলগ্রন্থ বিদ্যমান নাই। ইহা অবশ্য কোন সমস্যা নহে, কারণ যে সকল বার্তাঅন্যান্য নবীদের দেওয়া হইয়াছিল তাহা সমস্তই বিদ্যমান আছে কোরানে, যে গ্রন্থ ইহার মূল আকারে অবিকৃতরূপে বর্তমান। কোরান স্পষ্টরূপে ব্যক্ত করে যে নবী (মোহাম্মাদ) কে এমন কিছুই বলা হয় নাই যাহা তাহার পূর্ববর্তী অন্যান্য বার্তা বাহকদের বলা হয় নাই।

(৪১:৪৩) যাহা আপনার পূর্ববর্তী বার্তাবাহকগণের নিকট ব্যক্ত করা হইয়াছিল উহা ব্যতীত আপনাকে (মোহাম্মাদ) কিছুই বলা হয় নাই।
কিন্তু আমাদের ঈমান ব্যক্ত করাই যথেষ্টও নহে, কারণ আমাদের নিশ্চয়ই পরীক্ষা করা হইবে যে আমরা আমাদের ঈমানে অবিচলিত কি না। পরবর্তী আয়াতসমূহ ইহার দৃষ্টান্ত।

(২৯:২) মানুষেরা কি ধারণা করে যে তাহাদের (আরামের-মধ্যে ছাড়িয়া দেওয়া হইবে, দুঃখ-কষ্ট দিয়া পরীক্ষা করা হইবে না, কারণ তাহারা বলে, “আমরা ঈমান আনিয়াছি”?

(৩:১৪২) অথবা তোমরা কি মনে কর যে তোমরা বেহেশতে প্রবেশ করিবে যখন আল্লাহ্ জানেন না যে, তোমাদের মধ্যে কাহারা সত্যই চেষ্টাশীল, অথবা কাহারা (তোমাদের মধ্যে) দৃঢ়চিত্ত?

(২:১৫৫,১৫৭) এবং নিশ্চয়ই আমরা ভীতি ও ক্ষুধা এবং সম্পদ, জীবন ও শস্যহানির কোন কিছু দিয়া তোমাদের পরীক্ষা করিব; কিন্তু যাহারা দৃঢ়চেতা তাহাদের জন্য সুসংবাদ। যাহারা, দুর্ভাগ্যে পতিত হইয়া বলে: আমরা আল্লাহর বান্দা এবং তাহারাই নিকট আমরা প্রত্যাবর্তন করিব। ইহারাই সেইরূপ ব্যক্তি যাহাদের উপর প্রতিপালকের আর্শীবাদ ও করুণা বর্ষিত হয়। ইহারাই সঠিক ভাবে চালিত।

নবীগণ নিজেরাই, নবীত্বে স্বীকৃত হওয়ার পূর্বে, কঠিন পরীক্ষা সমূহের সম্মুখীন হইয়াছিলেন। ইবরাহীম (৭.৫ অনুচ্ছেদ দ্রঃ), মানবজাতির নেতারূপে গণ্য হওয়ার পূর্বে, পরীক্ষার সম্মুখীন হইয়াছিলেন। অনুরূপভাবে মোহাম্মাদ কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হইয়াছিলেন, নিম্নের আয়াত যাহার ইঙ্গিত দেয়।

(২:২১৪) অথবা আপনি কি মনে করেন যে আপনি বেহেশতে প্রবেশ করিবেন যখন আপনার পূর্ববর্তীগণের নিকট যাহা আসিয়াছিল, আপনার নিকট এখনও সেইরূপ কিছু আসে নাই?

দুঃখ-কষ্ট ও দুর্ভাগ্য তাহাদের উপর বর্তিয়াছিল, তাহারা ভূমিকম্প সমান আলোড়িত হইয়াছিল, যতক্ষণ না (আল্লাহর) বার্তাবাহক এবং তাঁহার সহিত বিশ্বাসীগণ বলিল: কখন আল্লাহর সাহায্যে আসিবে? এক্ষণে নিশ্চয়ই আল্লাহর সাহায্য নিকটবর্তী।

প্রকৃতপক্ষে একমাত্র উপায় যাহাতে আমরা আল্লাহর মহিমা ও একত্বের প্রতি সত্যবিশ্বাসী হইতে পারি তাহা এই যে, কোরানে প্রদত্ত আল্লাহর বাণীবুঝিতে পারা সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়া, যাহাতে আমরা আমাদের সাধ্যমত, দৈনন্দিন জীবনে পথ-প্রদর্শক রূপে, ইহা অনুসরণ করিতে পারি।





Home Next >>