১০.৪ হাদিস গ্রন্থের প্রয়োজনীয়তা



হাদিস গ্রন্থের সমর্থনে যে দুইটি যুক্তি প্রায়ই উত্থাপিত হয়:

(১) কোরান কতকগুলি আয়াতে বিশেষভাবে বলিতেছে, “রাসূলকে অনুসরণ কর”। সুতরাং হাদিসকে বর্জন করিলে তাহা অসম্ভব হইবে।

(২) নামাজ কিরূপে পড়া যাইবে, কারণ কোরান নামাজ বিধি বিষয়ে বিশদ কিছুই বর্ণনা করে নাই।

দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর ১১.২ বিভাগে দ্রষ্টব্য।

প্রথম প্রশ্নের উত্তর খুবই স্পষ্ট। “রাসূলকে অনুসরণ কর”, বলিতে বুঝায় “রাসূলের মুখ হইতে যাহা নিঃসৃত হইয়াছে তাহা অনুসরণ কর”, এবং ইহাই কোরান। কোরানের ৬৯ সূরায় ৪০-৪৮ আয়াতগুলিতে এই বিষয়ে পরিষ্কারভাবে বলা হইয়াছে।

(৬৯:৪০-৪৮) ইহা যে সত্যই এক সম্মানিত দূতের বক্তব্য, কোন কবির কথা নহে: তোমরা তাহা অল্পই বিশ্বাস কর! ইহা কোন গণৎকারের বক্তব্যও নহে। তোমরা অতি অল্পই স্মরণ রাখ! মহাবিশ্বের প্রভু হইতে ইহা একটি প্রত্যাদেশ (আল্লাহর বাণী)। এবং যদি তিনি (রাসূল) আমাদের সম্বন্ধে মিথ্যা প্রচার করিতেন, তাহা হইলে আমরা নিশ্চই তাঁহার দক্ষিণ হস্থ ধৃত করিয়া তাঁহার জীবনবাহী-ধমনী ছিন্ন করিয়া দিতাম, এবং তোমাদের কেহই তাহা হইতে আমাদের প্রতিহত করিতে পারিতে না। কিন্তু বাস্তবিকই যাহারা অমঙ্গল হইতে দূরে থাকে ইহা তাহাদের জন্য একটি বাণী।

ইহা হইতে বুঝা যায় যে, আল্লাহ্ আমাদিগকে “রাসূলকে অনুসরণ করো” বলিতে কোরানকে অনুসরণ করিতে এবং কোরানের শিক্ষা প্রয়োগ করিতে বলিয়াছেন। পূর্বের আলোচনা অনুযায়ী, রাসূলের উপর আরোপিত হাদিস সমূহ প্রশ্ন-সাপেক্ষ; এবং সেইজন্য হাদিসকে অনুসরণ করিলে রাসূলকে অনুসরণ করা হয় না

অধিকন্তু আমাদের খেয়াল রাখিতে হইবে, রাসূলকে কোরানে সতর্ক করা হইয়াছে যে, কোরানের বিরূদ্ধে কোন কথা বলিলে তাহাকে শাস্তি পাইতে হইবে। (উপরে বর্ণিত আয়াত এবং নিম্নে প্রদত্ত ১০:১৫ আয়াত দ্রষ্টব্য)। এবং তা সত্ত্বেও, পূর্ব আলোচনা অনুযায়ী, হাদিস গ্রন্থ কোরানের সহিত অসামঞ্জস্যতায় পূর্ণ, সুতরাং রাসূল কর্তৃক সেগুলি উচ্চারিত হওয়া সম্ভাব্য ছিলনা। তাই হাদিস অনুসরণ করিলে প্রকৃতপক্ষে রাসূলকে অনুসরণের পরিবর্তে তাহার বিরূদ্ধাচরণই বুঝায়। বস্তুতঃই কোরানের অধিকাংশ আয়াতসমূহে যেখানে “রাসূলকে অনুসরণ কর” বলা হইয়াছে তাহাতে বুঝায়, “যাহা তাহার মধ্যে অনুপ্রাণিত হইয়াছে তাহাই, অর্থাৎ কোরান অনুসরণ কর”। এবং ইহা নিম্নে বর্ণিত আয়াতসমূহে পরিষ্কারভাবে দেখান হইয়াছে;

(১০:১৫) আর যখন আমাদের (আল্লাহর) সুস্পষ্ট প্রত্যাদেশ (ওহি) তাহাদের নিকট আবৃত্তি করা হয়, তখন যাহারা আল্লাহর সহিত সাক্ষাতের জন্য উদগ্রীব নয় তাহারা বলে, “ইহা ছাড়া অন্য কোন ভাষণ দাও, অথবা ইহা পরিবর্তন কর”। আপনি (হে মোহাম্মাদ) বলুন, “ইহা নিজ ইচ্ছায় পরিবর্তন করা আমার আয়ত্তের বাহিরে; আমার মধ্যে যাহা প্রত্যাদিষ্ট হইয়াছে আমি কেবল তাহাই অনুসরণ করি। স্মরণ রাখিও! আমি আমার প্রভুকে অমান্য করিলে একটি ভীতিময় দিবসের প্রতিফলের ভয়ে শঙ্কিত হই।

(৬:৫০) (হে মোহাম্মাদ, অবিশ্বাসীদিগকে) বলুন: আমি তোমাদের বলিনা যে, আমি আল্লাহর ধনসম্পদের অধিকারী, কিংবা আমার অদৃশ্য জগৎ সম্বন্ধে জ্ঞান আছে, কিংবা আমি বলিনা যে, আমি একজন ফেরেশতা। আমার মধ্যে যাহা অনুপ্রাণিত হইয়াছে আমি কেবল তাহাই অনুসরণ করি। বলুন: অন্ধ ব্যক্তি আর চক্ষুষ্মান কি সমান? তবুও কি তোমরা বুঝিবে না?

(৬:১০৬) আপনার প্রতিপালকের নিকট হইতে আপনার মধ্যে যাহা অনুপ্রাণিত হইয়াছে তাহাই অনুসরণ করুন; তিনি ব্যতীত উপাস্য নাই; এবং পৌত্তলিকদের সংশ্রব এড়াইয়া চলুন।

(৭:২০৩) এবং যখন তাহাদের জন্য আপনার নিকট কোন আয়াত আসেনা, তাহারা বলে: আপনি কেন ইহা আনেন নাই ? বলুন: “আমি কেবল তাহাই অনুসরণ করি যাহা আমার প্রভুর নিকট হইতে আমার মধ্যে অনুপ্রাণিত হয়। ইহা (কোরান) তোমাদের প্রভুর নিকট হইতে প্রাপ্ত অন্তর্দৃষ্টি এবং বিশ্বাসীদের জন্য পথ-প্রদর্শক ও করুণা।

(১০:১০৯) এবং (হে মোহাম্মাদ) যাহা আপনার মধ্যে অনুপ্রাণিত করা হয় তাহাই অনুসরণ করুন, এবং ধৈর্য ধরুন যে পর্যন্ত না আল্লাহ্ বিচার করেন। এবং তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারক।

(৩২:২) আপনার প্রভুর নিকট হইতে যাহা আপনাকে অনুপ্রাণিত করা হয় তাহাই অনুসরণ করুণ। আপনি যাহা করেন আল্লাহ্ তাহা অবগত।

(৪৬:৯) বলুন: আমি (আল্লাহর) বার্তাবাহাকগণের মধ্যে নূতন কিছুই নাহি, এবং আমার অথবা তোমাদের কি হইবে তাহা আমি জানিনা। আমার মধ্যে যাহা অনুপ্রাণিত করা হয়, আমি তাহাই অনুসরণ করি এবং আমি কেবল একজন সতর্ককারী।

আল্লাহ্ কোন নবীর মধ্যে যাহা অনুপ্রাণিত করেন তাহাই তাঁহার প্রত্যাদেশ (ওহি), এবং নবী মোহাম্মাদের জন্য নিঃসন্দেহে ইহা কোরান। উপরে উল্লিখিত আয়াতসমূহ কোনভাবেই হাদিসকে অনুসরণের সমর্থন করে না।

নিম্নের আয়াতগুলি প্রায়ই হাদিসের সমর্থনে ব্যবহৃত হয়। পরীক্ষা করিয়া দেখা যাউক।

(৩:৩২)বলুন: আল্লাহ ও তাহার রাসূলকে অনুসরণ কর। কিন্তু যদি তাহারা বিমুখ হয়, তবে স্মরণ রাখিও আল্লাহ্ (তাহার নির্দেশে) অবিশ্বাসীদিগের প্রতি প্রীত নহেন।

(৪:৮০) যে কেহ রাসূলের অনুগত হয়, সে আল্লাহর অনুগত হয়; এবং যে বিমুখ হয় আমরা তাহার জন্য তোমাকে রক্ষক রূপে প্রেরণ করি নাই।

এই আয়াত গুলির প্রসঙ্গ বিবেচনা করিলে দেখা যায় ইহারা যে সময়ের ইঙ্গিত দেয় তখন রাসূল জীবিত ছিলেন এবং আল্লাহর বাণী মানুষকে শুনাইতেছিলেন সুতরাং তাঁহার প্রতি আনুগত্য আল্লাহর প্রতিও আনুগত্য বুঝাইত। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্ (৪:৫৯) আয়াতে বলিতেছেন যাহাদের উপর ক্ষমতার ভার আছে তাহাদেরও মান্য করো।

রাসূল এখন জীবিত নাই, সুতরাং তাঁহার জীবিত অবস্থায় মানুষ তাহাকে যেরূপ অনুসরণ করিত আমরা তাহাকে সরাসরী সেইরূপ অনুসরণ করিতে পারি না। কিন্তু কোরানের নির্দেশ মানিয়া চলিলে, প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ এবং নবীর নির্দেশ মানা হইবে কারণ কোরান প্রত্যাদেশরূপে নবীর মুখ হইতে আসিয়াছে। অপর পক্ষে, হাদিস গ্রন্থ প্রায় ২৫০ বৎসর পরে, লোক মারফত সংকলনের পর নবীর উপর আরোপ করা হইয়াছে।

ইহা অবশ্যই গণ্য করা প্রয়োজন যে রাসূল, তাহার জীবদ্দশায়, এক বর্ধিষ্ণু মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা ছিলেন। কাজেই কোরানের মূল নীতিসমূহের ভিত্তির মধ্যে সহকারী আইন প্রনয়ণের অধিকার রাসূলের ছিল, যেমন একটি সত্যকার ইসলামী রাষ্ট্রেরও থাকিবে, যাহাতে রাষ্ট্রের পক্ষে আইন প্রয়োগ সময়োপযোগী হইতে পারে। আমাদের প্রধান দুর্বলতা এই যে নবীর প্রতি ভক্তি ও বাধ্যতা প্রকাশ করিবার জন্য আমরা অন্ধের মত, যাহাই নবীর কথা ও কাজ বলিয়া চালানো হইয়াছে, কোরানের সহিত যাচাই না করিয়াই তাহাই অনুসরণ করিতেছি। দুঃখের বিষয় আমাদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতারা আমাদের এই দুর্বলতার পুরাপুরি সুযোগ লইয়া, আমাদের উপর তাহাদের আধিপত্য ও প্রভাব বিস্তারের জন্য সুবিধাজনক হাদিসও উদ্ভাবন করিয়াছেন।

আমাদের অবশ্যই স্মরণ রাখিতে হইবে যে কোরান সর্বশেষ প্রত্যাদেশ রূপে আসিয়াছিল, কারণ পূর্ববর্তী প্রত্যাদেশসমূহ মানুষের হস্তক্ষেপের ফলে কলুষিত হইয়া পড়িয়াছিল। যদি আমরা এক্ষণে বলি যে আমরা পূর্ববর্তী প্রত্যাদেশসমূহ গ্রহণযোগ্য মনে করিনা, কারণ সেগুলি মানুষের হস্তক্ষেপের ফলে কলুষিত হইয়া গিয়াছে, তাহা হইলে সেই একই কারণে আমরা বলিতে পারি না হাদিসগ্রন্থ গ্রহণযোগ্য হইবে, বিশেষ করিয়া যাহা মানুষের চেষ্টায় সৃংগৃহীত হইয়াছে এবং যাহার মধ্যে বহু হাদিস আছে যাহা কোরানের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ। হাদিস সাহিত্য কখনও প্রত্যাদেশরূপে গণ্য হইতে পারে না; কেবলমাত্র রাসূলের ‘তথাকথিত’ বক্তেব্যের ও কার্যধারার সংকলন মাত্র, যাহাতে কিছু কিছু সত্যতা আছে কিন্তু সেগুলির মূল্য কোন ঐতিহাসিক গ্রন্থ হইতে অধিকতর নহে, এবং তাহা কেবল এইরূপেই গণ্য হইতে পারে। এই সকল গ্রন্থকে কোরানের সহিত একই শ্রেণীভুক্ত এবং ইহার শিক্ষাকে রাসূলের ‘সুন্নাহ’ বলিয়া গ্রহণ করা, ইসলামের প্রকৃত অর্থকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার সামিল। কোরানই একমাত্র প্রত্যাদেশ-গ্রন্থ, যাহা অপরিবর্তীত রহিয়াছে, এবং একমাত্র ইহার শিক্ষা অনুসরণ করিয়াই আমরা আল্লাহর ‘দ্বীন’ প্রতিষ্ঠার দ্বারা মানবসমাজের মধ্যে একতা ও শান্তি আনিতে পারি।

References: (প্রসঙ্গ সূত্র)

১. Dvelopment of Muslim Theology Jurisprudence and constitutional Theory by Duncan B. Macdonald. Published by Premier Book House 4/5 Katchery Road, Lahore, Pakistan. Summary of p. 87-117.
২. Sahih Al-Bukhari – Volumes 1 to 9, Translated by Dr. Muhammad Muhsin Khan. Published by Kitab Bhaban, New Delhi, India. All hadiths are taken from Bukhari except a few taken from others (Muslim, and Abu Daud).
৩. The Bible The Our’an and Science, by Dr. Maurice Bucaille. Publisher Seghers, 6 Place Saint-Sulpice 75006 Paris, p. 172.
৪. The Holy Qur’an, by Yusuf Ali.
Published by Dar Al Arabia, Beirut, Lebanon, P.O. Box 6089. Note 2634.p.813.





Home Next >>