১০.৩ কোরানের সহিত হাদিসের অসঙ্গতি (২)



বহু শত হাদিসের উল্লেখ করা যায় যেগুলি শুধু যে কোরানের সহিত অসঙ্গতিপূর্ণ তাহা নহে, রাসূলের বিরূদ্ধেও সরাসরিভাবে নিন্দামূলক উক্তিপূর্ণ। হাদিস সম্বন্ধে একটি সামগ্রিক আলোকপাতের উদ্দেশ্যে বুখারী হইতে বিভিন্ন বিষয়ের উপর কতকগুলি হাদিস নমুনাস্বরূপ নিম্নে আলোচিত হইল। কোরানের প্রাসঙ্গিক আয়াতসমূহও দেওয়া হইল যাহাতে পাঠক, কোরানের আয়াতগুলির সহিত হাদিসগুলির অসঙ্গতি আছে কি না, যাচাই করিতে পারে।

প্রথমতঃ দেখা যাউক বিবাহিত বা অবিবাহিত ব্যক্তির যৌন ব্যাভিচার অথবা অবৈধ সঙ্গমের জন্য প্রস্তরাঘাতের বিষয়, যেহেতূ এ বিষয়ে কোরানের আইন খুবই স্পষ্ট। কোরান এই দুইয়ের মধ্যে কোন বিভেদ করে না। আরবীতে দুইপ্রকার ব্যাভিচারকেই ‘যিনা’ বলা হয়। ইংরেজি আইন অনুসারে যৌন ব্যাভিচার বিবাহিত পুরুষ অথবা নারীর, অন্য কোন নারী বা পুরুষের সহিত সহবাসকে অ্যাডলটারি (adultery) বলে। অবিবাহিত পুরুষ অথবা নারীর সহবাসকে ফরনিকেশন (fornication) বলে। ইংরেজী আইন ইহাদের মধ্যে পার্থক্য করে। কোরান তাহা করে না। কোরানের বিধান এই বিষয়ে খুবই স্পষ্ট। প্রমাণিত ক্ষেত্রে শাস্তি একশত বেত্রাঘাত। এই শাস্তি সাধারণের সমক্ষে হইবে, যাহাতে সামাজিক চাপ সৃষ্ট হয়। বিবাহিতের ক্ষেত্রে প্রমাণের চারিজন সাক্ষির প্রয়োজন। এই শর্তের প্রায়ই অপব্যবহার করা হয়, কারণ চারিজন সাক্ষি পাওয়া প্রায় অসম্ভব, যদি না কোন ক্ষমতাবান ব্যক্তি স্বার্থগত কারণে ঘুষ দিয়া সাক্ষি দাঁড় করায়। পরিশেষে, যাহাতে নির্দোষ ব্যক্তি শাস্তি না পায় সেজন্য কোরানের বিধানে অভিযুক্ত পুরুষ বা নারীকে, আল্লাহর নামে অভিযোগ অস্বীকার করিবার সুযোগ দেওয়া হইয়াছে, অর্থাৎ তাহারা নির্দোষ এই বলিয়া আল্লাহর নামে শপথ করিতে হইবে। সেক্ষেত্রে আল্লাহর উপর শাস্তি বিধানের ভার ছাড়িয়া দিতে হইবে। মানুষের পক্ষে তাহাদিগকে শাস্তি দেওয়া চলিবে না। এ সম্পর্কে কোরানের বিধান পরিষ্কার, তথাপি আমরা দেখিতে পাই যে তথাকথিত ইসলামিক দেশ সমূহে অভিযুক্তকে, হাদিসের বিধান অনুসারে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করা হইতেছে, যাহা কোরানের বিধান অনুযায়ী নয়। স্ত্রীলোকের ক্ষেত্রে গ্রীবা পর্যন্ত মাটির নিচে প্রোথিত করিয়া মৃত্যু না হওয়া পযন্ত মস্তকে প্রস্তরাঘাত করা হয়। পুরুষের ক্ষেত্রে কটি পর্যন্ত প্রোথিত করিয়া প্রস্তরাঘাত করা হয়। ইহা একটি বর্বরোচিত ‘বিধান’ এবং স্বভাবতঃই পাশ্চাত্য দেশসমূহ ইসলামকে হেয় প্রতিপন্ন করিবার জন্য ইহার বহুল প্রচার করিয়া থাকে। দুঃখের বিষয় বুখারীতে এই ব্যাপারে বহু হাদিস আছে এবং এই বিধান রাসূলকে অত্যন্ত বিকৃত ভাবে প্রতিফলিত করে। দুর্ভাগ্যবশতঃ আমাদের মধ্যে অধিকাংশ লোকই এ বিষয়ে কোরানের বিধান সম্পর্কে অজ্ঞ। এই সরল দৃষ্টান্তে আইন সম্পূর্ণ ষ্পষ্ট, তবুও আমরা কোরানকে সম্পূর্ণ অবহেলা করিয়া হাদিসের নির্দেশ পুরোপুরি মানিয়া লই

তাহা হইলে কেন আমরা কোরানের নির্দেশ অনুসরণ করিতেছি না? বস্তুতঃ এই সকল হাদিস পড়িলে মনে হয় ইহার পিছনে কোন ষড়যন্ত্র ছিল। ডাঃ আব্দুল ওয়াদুদ তাহার “Conspiracies against the Quran” (কোরানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র) নামক গ্রন্থে ইহাই উল্লেখ করিয়াছেন। কারণস্বরূপ তিনি বলিয়াছেন যে, আরবরা পারসীকদের যুদ্ধে সম্পূর্ণরূপে পরাজিত করিয়াছিল। কিন্তু পারসীকরা আরবদের অপেক্ষা বিদ্যা-বুদ্ধিতে অনেক বেশী অগ্রসর ছিল। তাই তাহারা লেখনীর মাধ্যমে ইসলাম বিকৃতি সাধনে প্রয়াসী হয়। স্পষ্টতঃই কোরান বর্তমান থাকিতে ইসলামকে বিকৃত করা যায় না, এবং যতকাল আমরা কোরান অনুসরণ করিব ততকাল কোন সমস্যাই থাকিবে না। কিন্তু কিভাবে মানুষকে কোরান হইতে বিভ্রান্ত করা যায়? অবশ্যই লেখনীর মাধ্যমে, এবং এমন ভাবে যেন রাসূল স্বয়ং এই সমস্ত কার্যকারণের উদ্যোক্তা ছিলেন। তাহা হইলে লোকে সহজেই বিভ্রান্ত হইবে। বস্তুতঃ রাসূলের নাম উল্লেখ করিলেই আমরা ইহা সত্য বলিয়া বিশ্বাস করি এবং অন্ধের ন্যায় অনুসরণ করি। এই জন্যই ষড়যন্ত্রের প্রশ্ন আসিয়া পড়ে কারণ এই বিশিষ্ট ছয় ব্যক্তি যাঁহারা হাদিস লিখিয়াছিলেন তাঁহারা সকলেই পারস্য সাম্রাজের মধ্যেই জন্মগ্রহণ করেন এবং বাস্তবেই পারসীক ছিলেন। এই প্রসঙ্গে যে প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিকের উল্লেখ করা যায় তাঁহার নাম তারাবি, যিনি ৩১১ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন, যখন হাদিস লিখিত হইয়াছিল, এই সময়কাল তাহার অত্যন্ত নিকটবর্তী। তাবারি হাদিসের উপর ভিত্তি করিয়া কোরানের ৩০ খণ্ড তফসির (ব্যাখ্যা) রচনা করেন। পরে, তিনি হাদিসের ভিত্তিতে রচিত তাঁহার তফসিরের উপর নির্ভর করিয়া ১৩ খণ্ড ইসলামের ইতিহাস রচনা করেন। এইরূপে তাঁহার সকল গ্রন্থই পরস্পরকে সমর্থন দিতেছে, এবং কেহই তাঁহার বিরুদ্ধে যাইতে সাহস করে না, কারণ তাহা রাসূলের তথাকথিত হাদিসের বিরূদ্ধে যাওয়ারই সামিল হইবে। ফলে, তাবারির রচনা, সত্যাসত্যের প্রশ্ন ছাড়াই, একটি নজির-গ্রন্থ হিসাবে মুসলিমদের দ্বারা ব্যবহৃত হইয়া থাকে।

নিম্নে কতগুলি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ও উহার সহিত সম্বন্ধযুক্ত কোরানের আয়াতসমূহ উদ্ধৃত করা হইল যাহাতে কোরানের সহিত হাদিসের অসঙ্গতি সুস্পষ্ট হয়।

১ম নির্বাচনঃ যৌন ব্যভিচারের (যিনা) সাজা

যৌন ব্যভিচারের জন্য প্রস্তরাঘাতে হত্যার উৎপত্তি হিব্রু বাইবেল (Old Testament) হইতে। ছয়জন হাদিস সংকলকের প্রত্যেকেই এই আইন অনুকরণ করিয়াছেন, তাহারা দাবী করেন রাসূল তাঁহার জীবদ্দশায় ইহা ব্যবহার করিয়াছেন। এই যুক্তির বিপক্ষে, প্রথমে এ বিষয়ে কোরানের বক্তব্য উল্লেখ করিয়া পরে বুখারীর হাদিসে ইহার অসঙ্গতি দেখান হইয়াছে।

কোরানের আয়াত:

(২৪:২) ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণী, তাহাদের প্রত্যেককে একশত বেত্রাঘাত করিবে। এবং তাহাদের উভয়ের প্রতি করুণাবশতঃ আল্লাহর আনুগত্য হইতে বিমুখ হইওনা, যদি তোমরা আল্লাহ্ এবং বিচার দিবসে বিশ্বাসী হও। এবং বিশ্বাসীদের একটি দল তাহাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করুক।

(২৪:৫-৯) যাহারা সম্মানীয় স্ত্রীলোককে অভিযুক্ত করে, কিন্তু চারিজন সাক্ষী আনিতে পারে না, তাহাদিগকে আশিটি বেত্রাঘাত করিবে এবং ভবিষ্যতে কখনই তাহাদের শপথ-বাক্য গ্রহণ করিবে না –তাহারা যথাযর্থই দৃষ্কৃতকারী। কিন্তু যাহারা পরে পরিতাপ করে এবং সংশোধনশীল হয়, স্মরণ রাখিও! (তাহাদের জন্য) আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, দয়াময়। যাহারা তাহাদের স্ত্রীদিগকে অভিযুক্ত করে, কিন্তু নিজ ব্যতীত অন্য কোন সাক্ষী আনিতে পারে না, সেক্ষেত্রে তাহাদের একজনের শপথ-বাক্য চারিজনের বলিয়া গণ্য হইবে, (তবে) আল্লাহর নামে শপথ করিতে হইবে যে, সে একজন সত্যবাদী। এবং পঞ্চমবার শপথ করিবে আল্লাহর অভিশাপ চাহিয়া, যদি সে মিথ্যা বলে। এবং অভিযুক্ত স্ত্রীলোক শাস্তি হইতে নিষ্কৃতি পাইবে যদি সে আল্লাহকে সাক্ষী রাখিয়া চারিবার বলে যে ঐ ব্যক্তি যাহা বলিতেছে তাহা বাস্তবিকই মিথ্যা। এবং তাহাকে পঞ্চমবার শপথ করিতে হইবে যে আল্লাহর ক্রোধ তাহার উপর বর্ষিত হইবে যদি তাহার স্বামী সত্য বলিয়া থাকে।

বুখারি হাদিস (৮.৮১৬) — ইবনে আব্বাসের বর্ণনা:

ওমর বলিলেন, “আমার ভয় হয়, বহুকাল গত হইলে লোকে বলিতে পারে যে, “আমরা প্রস্তরাঘাতে মৃত্যু (রজম) বিষয়ক আয়াত কোরানশরীফে পাইনা, এবং ফলে আল্লাহ্ যে নির্দেশ দিয়াছেন তাহা অমান্য করিয়া লোকে বিপথগামী হইতে পারে। সুতরাং, যে ব্যক্তি বিবাহিত হইয়াও অবৈধ সঙ্গমে লিপ্ত হয় এবং সাক্ষীগণ দ্বারা অথবা অন্তসত্ত্বা অবস্থা, অথবা স্বীকারোক্তি দ্বারা অপরাধ প্রমাণিত হয়, আমি তাহার উপর রজমের শাস্তি বিধান অনুমোদন করিতেছি”। সুফিয়ান বলিলেন, “আমি এ বর্ণনা এইভাবে মুখস্থ করিলাম”, ওমর আরও বলিলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসূল রজমের শাস্তি দিয়া গিয়াছেন, এবং আমরাও তাঁহার অনুসরণ করিয়াছি”।

বুখারী (৩.৮৫৫) — আবু হুরায়রা এবং যায়েদ বিন খালিদ আল-জুহানির বর্ণনা:

এক বেদুইন আল্লাহর রাসূলের নিকট আসিয়া বলিলেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আমি আপনাকে আল্লাহর নিয়ম অনুসারে আমার বিচার করিতে অনুরোধ করি”। তাহার বিপক্ষ, যে তাহা অপেক্ষা অধিকতর বিদ্বান ছিল, বলিল, “হ্যাঁ, আমাদের উভয়ের মধ্যে আল্লাহর নিয়ম অনুসারে বিচার করুন এবং আমাকে বলিতে দিন”। আল্লাহর রাসূল বলিলেন, “বল”। সে বলিল, “আমার পুত্র মজুর হিসাবে এক ব্যক্তির কাজ করিতেছিল, এবং সে তাহার স্ত্রীর সহিত অবৈধ সঙ্গমে লিপ্ত হয়। লোকে আমাকে বলিল যে, আমার পুত্রকে প্রস্তারাঘাতে বধ করাই বাধ্যতামূলক। সেইজন্য এই শাস্তির বিনিময়ে আমি একশত মেষ ও একটি ক্রীতদাসী তাহাকে প্রদান করি। তারপর আমি এই ব্যাপারে ধর্মীয় পণ্ডিতদের জিজ্ঞাসাবাদ করি। তাঁহারা বলিলেন যে, আমার পুত্রকে অবশ্যই একশত বেত্রাঘাত করিতে হইবে এবং এক বৎসর নির্বাসন দিতে হইবে, এবং এই ব্যক্তির স্ত্রীকে প্রস্তারাঘাতে হত্যা করিতে হইবে”। আল্লাহর রাসূল বলিলেন, “যাঁহার হস্থে আমার জীবন তাঁহার শপথ, আমি তোমাদের মধ্যকার বিবাদ আল্লাহর বিধান অনুযায়ী নিষ্পত্তি করিব। ঐ ক্রীতদাসী এবং মেষগুলি তোমাকে ফিরাইয়া দিতে হইবে, তোমার পুত্রকে একশত বেত্রাঘাত করিতে হইবে এবং এক বৎসর নির্বাসিত হইতে হইবে। উনাইস! তুমি এ ব্যক্তির স্ত্রীর নিকট যাও এবং যদি সে তাহার দোষ স্বীকার করে তাহাকে প্রস্তারাঘাতে বধ কর”। উনাইস পরদিন সকালে ঐ স্ত্রীলোকের নিকট গেলেন এবং সে অপরাধ স্বীকার করিল। আল্লাহর রাসূল আদেশ দিলেন যে, তাহাকে প্রস্তারাঘাতে বধ করা হউক।

উপরের দুইটি হাদিসই কোরানের বিধানকে সম্পূর্ণভাবে অগ্রাহ্য করিতেছে। যে আয়াতগুলি কোরান হইতে উপরের উদ্বৃত করা হইয়াছে তাহাতে দেখান হইয়াছে যে, খাটি ইসলামীয় বিধানের দৃষ্টিতে স্ত্রীলোকের ক্ষেত্রে প্রদত্ত ব্যবস্থা পুরাপুরিভাবে পুরুষের ক্ষেত্রে প্রদত্ত ব্যবস্থা সমান। কোরানের বিধানে অপরের বিরূপ সাক্ষ্য সত্ত্বেও নির্দোষ ব্যক্তি পরিত্রাণ পাইতে পারে।

২য় নির্বাচন

নিম্নের হাদিসগুলি স্ত্রীলোকের বিরূদ্ধে রাসূলের অত্যন্ত বিরূপ মন্তব্যের (পরোক্ষভাবে বিবৃত) কয়েকটি উদাহরণ যাহা সম্পূর্ণভাবে তাঁহার চরিত্র এবং কোরানের আদর্শের বিরুদ্ধে যায়।

বুখারী (১.৩০১)– আবু সাইদ আল-কুদরীর বর্ণনা:

একদা আল্লাহর রাসূল তাঁহার মুসাল্লা (নামাজের স্থান) হইতে ঈদ-উল-আজহার (নামাজ পড়িবার উদ্দেশ্যে) বাহির হইলেন। পথে কিছু স্ত্রীলোকদের অতিক্রম করিবার সময় তিনি বলিলেন, “হে স্ত্রীলোকেরা, দান-খয়রাত কর, যেহেতু আমি দেখিয়াছি যে দোজখের অধিকাংশ অধিবাসীই স্ত্রীলোক”। তাহারা জিজ্ঞাসা করিল, “হে আল্লাহর রাসূল, কেন এইরূপ হইল”। তিনি উত্তর দিলেন, “তোমরা প্রায়ই অভিশাপ দাও এবং তোমরা তোমাদের স্বামীদের প্রতি অকৃতজ্ঞ। আর আমি তোমাদের অপেক্ষা স্বল্পতর বুদ্ধিসম্পন্ন ও কর্ম ধর্মপরায়ণ কাহাকেও দেখি নাই”। স্ত্রীলোকেরা জিজ্ঞাসা করিল, “হে আল্লাহর রাসূল, আমাদের বুদ্ধি ও ধার্মিকতার কী অভাব?” তিনি বলিলেন, “দুই জন স্ত্রীলোকের সাক্ষ্য কি একজন পুরুষের সমান নহে?” তাহারা হ্যা বলিল। তিনি বলিলেন, “ইহাই তাহাদের বুদ্ধির অভাব। আর ইহা কি সত্য নয় যে, যখন কোন স্ত্রীলোক ঋতুমতী হয় তখন সে নামাজ বা রোজা রাখিতে পারে না?” স্ত্রীলোকেরা হা বলিল। তিনি বলিলেন, “ইহাই তাহাদের ধার্মিকতার অভাব”।

বুখারী (৭.০৩০)–আব্দুল্লাহ্ বিন ওমরের বর্ণনা:

আল্লাহর রাসূল বলিলেন, “স্ত্রীলোক, বাড়ি ও ঘোড়া, অকল্যাণের লক্ষণ”।

উপরোক্ত বক্তব্য সমূহ খণ্ডণ করিতে কোরান হইতে বহু আয়াত উদ্বৃত করা যায়। দৃষ্টান্ত স্বরূপ (২:২২৩), (৪:১৯), (১৬:৯৭), (৩৩:৩৫) এবং (৪৮:৫,৬) উল্লেখ করা যায়। কোরান স্ত্রীলোককে কোন ভাবেই হেয় প্রতিপন্ন করেনা; কিন্তু হাদিস সাহিত্যে স্ত্রীলোক-হেয়কারী বহু হাদিস আছে, যাহা স্ত্রীলোককে স্বভাবতঃ কুটিল, সংশোধনের অতীত, পুরুষ অপেক্ষা মন্দ এবং অল্প বুদ্ধিসম্পন্ন বলিয়া চিত্রিত করে, এবং কুকুর ও গাধা সমেত প্রার্থনায় বাধা সৃষ্টির কারণ বলিয়া অভিহিত করে। (দ্রষ্টব্য বুখারী ১.৪৯০, মুসলিম ১০৩২, ১০৩৪, আবু দাউদ ৭০৩)

৩য় নির্বাচন

ঋতুমতী স্ত্রীলোকদের নিকটে সহবাসের উদ্দেশ্যে গমন করা কোরানে নিষিদ্ধ। রাসূল কোরানের এই নিষেধের কথা জানিতেন না, ইহা চিন্তা করাও অসম্ভব। তবুও বুখারী রাসূলের এই অতীব ব্যক্তিগত গোপনীয় বিষয়সমূহ উদঘাটন করিতে সক্ষম হইয়াছিলেন বলিয়া মনে হয়। এবং নিঃসন্দেহে হযরত আয়েশাকে উদ্বৃত করিতে হইয়াছে বিষয়টিকে সঠিক দেখাইতে।

বুখারী (১.২৯৮)—আয়েশার বর্ণনা:

রাসূল এবং আমি সহবাসের পর একই পাত্র হইতে গোসল করিতাম। ঋতুর সময় তিনি আমাকে ইযার (কোমরের নিচে পরিহিত বস্ত্র) পরিতে বলিতেন এবং আমাকে সোহাগ করিতেন। ইতিকাফ (নিম্নে টিকা দ্রষ্টব্য) অবস্থায় তিনি তাহার মস্তক আমার নিকট আনিতেন এবং আমি ঋতুমতী থাকিয়াও তাঁহার মস্তক ধৌত করিয়া দিতাম।

টিকা: ইতিকাফ: আল্লাহর এবাদতের জন্য মসজিদের মধ্যে পর্দার আড়ালে বসবাস।

বুখারী (১.২৯৯) — আব্দুর রহমান বিন আসওয়াদের বর্ণনা:

আয়েশা বলিলেন, “যখনই আল্লাহর রাসূল আমাদের কাহাকেও ঋতুমতী অবস্থায় সোহাগ করিতে চাহিতেন, তিনি তাহাকে ইযার পরিতে বলিতেন; এবং তারপর তাহাকে আদার করিতেন”। আয়েশা আরও বলেন, “তোমাদের কেহই রাসূলের ন্যায় যৌনাকাঙ্খা আয়ত্তে রাখিতে পারিবে না”।

উপরের বিবৃতির সহিত কোরানের বিশেষ নিষেধাজ্ঞার তুলনা, নিম্নে দেওয়া হইল:

(২:২২২) (হে মোহাম্মদ) তাহারা আপনাকে স্ত্রীলোকদের ঋতু সম্বন্ধে প্রশ্ন করে। বলুন: ইহা একটি নাজুক অবস্থা; সুতরাং স্ত্রীলোকদের এ সময় একেলা থাকিতে দাও, এবং তাহারা পরিচ্ছন্ন না হওয়া পর্যন্ত তাহাদের নিকটবর্তী হইও না। এবং যখন তাহারা পরিচ্ছন্ন হইবে তখন তাহাদের নিকট যাও, যেমন আল্লাহ্ তোমাদের নির্দেশ দিয়াছেন।

৪র্থ নির্বাচন

এখানে কয়েকটি বিশেষ হাদিসের উল্লেখ করা হইয়াছে যাহাতে রাসূলের চরিত্রের কিছু কিছু দিক সম্পূর্ণ খামখেয়ালী হিসাবে দেখান হইয়াছে। এইগুলি রাসূলের বিরূদ্ধে ষড়যন্ত্রের ধারণাকে দৃঢ়তর করে যেহেতু এই বর্ণনাগুলি রাসূলের প্রকৃতির ও তাঁহার চরিত্রের ঐতিহাসিক বিবরণের সহিত অসংগত।

বুখারী (৭.৫৯০) –-আনাসের বর্ণনা:

মদিনার আবহাওয়া কিছু লোকের সহ্য না হওয়ায় রাসূল তাহাদের তাঁহার রাখাল ও উটের পালের সহিত যাইতে বলিলেন এবং উটের দুগ্ধ ও মূত্র (ঔষধ হিসাবে) পান করিতে নির্দেশ দিলেন। তাহারা তাঁহার রাখাল ও উটের পালের সহিত রওয়ানা হইল, এবং উটের দুগ্ধ ও মূত্র পান করিয়া তাহাদের শরীর সুস্থ করিয়া তুলিল। পরে তাহারা রাখালকে হত্যা করিয়া উটগুলিকে তাড়াইয়া দিল। এ সংবাদ যখন রাসূল পাইলেন, তিনি তাহাদের পিছনে তাড়া করিবার জন্য কিছু লোককে পাঠাইলেন। তাহাদের যখন ধরিয়া আনা হইল, তিনি তাহাদের হাত এবং পা কাটিয়া দিলেন এবং তাহাদের চক্ষু তপ্ত লৌহশলাকা দ্বারা ছ্যাঁকা দিলেন।

বুখারী (৭.২৫২/২৫৩/২৫৪)—উম্মে সালমা ও উম্মে আতীয়ার বর্ণনা:

এক স্ত্রীলোক স্বামীর শোকে সন্তপ্ত ছিল এবং তাহার আত্মীয়-স্বজন তাহার চক্ষুর (যাহা রোগগ্রস্থ ছিল) জন্য দুশ্চিন্তাগ্রস্থ ছিল। তাহারা আল্লাহর রাসূলের নিকট আসিল এবং ঐ স্ত্রীলোকের চক্ষু কোহল (এ্যান্টিমনি গুঁড়া) দ্বারা চিকিৎসার জন্য তাহার অনুমতি চাহিল।
কিন্তু তিনি বলিলেন, “[...] না, সে চারিমাস দশদিন অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত কোহল ব্যবহার করিতে পারিবে না”।

বুখারী (৯.১৩০) — আনাস বিন মালিকের বর্ণনা:

আল্লাহর রাসূল উম্মে হারাম বিনত্ মিলহানকে দেখিতে যাইতেন। তিনি উবাদা বিন আস-সামিতের স্ত্রী ছিলেন। একদিন রাসূল তাঁহার নিকট যাইলেন এবং তিনি তাঁহাকে খাবার পরিবেশন করিলেন ও তাঁহার মাথায় উকুন খুঁজিতে লাগিলেন। তৎপর আল্লাহর রাসূল নিদ্রা যাইলেন এবং পরে হাস্যমুখে জাগিয়া উঠিলেন [...]

প্রথম দুইটি হাদিসে রাসূলের স্বভাব যেরূপ নিষ্ঠুর বলিয়া বর্ণিত হইয়াছে তাহা ধারণা করা শক্ত। অপর একজনের স্ত্রী তাঁহার মাথায় উকুন খুঁজিবে ইহাও ধারণা কর শক্ত, বিশেষ করিয়া কোরান যখন বিশ্বাসী পুরুষ ও নারীদেরকে দৃষ্টি নত ও বিনীত হওয়ার নির্দেশ দেয়।

৫ম নির্বাচন

সাধারণের বিশ্বাস যে কোরান বুঝিবার জন্য হাদিস, (বিশেষ করিয়া বোখারীর ৬ষ্ঠ খন্ড) অত্যাবশক্যক। এই ধারণা বহু ভাবেই বিভ্রান্ত। প্রথমতঃ কোরানের মোট আয়াতসমূহের তুলনায় বুখারীতে নির্বাচিত আয়াতসমূহের সংখ্যা অতি নগণ্য। সুতরাং বুখারীতে যে বহু সংখ্যক আয়াত আলোচনা করা হয় নাই সেগুলি আমরা কিভাবে বুঝিব এবং মানিয়া চলিব ? দ্বিতীয়তঃ কোরানের কোন কোন আয়াত নাজিল হওয়ার কারণ হিসাবে একটি ঘটনা অথবা গল্পের বর্ণনা দেওয়া হইয়াছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে হাদিসের ঘটনা বা গল্পটি আজগুবি বলিয়া মনে হয়, এবং এরূপ ধারণা হয় যে কোন আয়াত নাজিল হওয়া একটি আকষ্মিক ঘটনা, আল্লাহর ইচ্ছাধীন নহে। নিম্নে কোরানের কয়েকটি আয়াত ও সেগুলির হাদিস অনুযায়ী ব্যাখ্যা এই বিষয়ে আলোকপাত করে।

(১১:১১৪) দিবসের দুই প্রান্তে ও রাত্রের কিছু সময় সালাত আদায় কর। নিশ্চয়ই ভাল কাজ মন্দ কাজকে খণ্ডন করে। ইহা মনোযোগীদের জন্য একটি স্মারক।

বুখারী (৬.২০৯) — ইবনে মাসুদের বর্ণনা:

একটি লোক একটি স্ত্রীলোককে চুম্বন করিল এবং আল্লাহর রাসূলের নিকট আসিয়া তাহা বলিল। সেই কারণে এই ইলাহি বাণী রাসূলের উপর নাজিল হইল।

(১১:১১৪) এবং দিবসের দুই প্রান্তে ও রাত্রের কিছু সময় সঠিকভাবে সালাত আদায় কর। নিশ্চয়ই ভাল কাজ মন্দ কাজকে (ক্ষুদ্র পাপসমূহ) দূরীভূত করে। ইহা মনোযোগীদের জন্য স্মরণার্থ।

লোকটি জিজ্ঞাসা করিল, “এই প্রত্যাদেশ কি শুধু আমারই জন্য?”। রাসূল বলিলেন, “ইহা আমার সকল অনুসারীদের জন্য যাহারা এইরূপ অবস্থার সম্মুখীন হয়”।

বুখারী (৬.২০৩)–মোহাম্মদ বিন আব্বাদ বিন জাফর বলিয়াছেন, তিনি ইবনে আব্বাসকে কোরান হইতে আবৃতি করিতে শুনিয়াছেন যে:

(১১:৫) “নিঃসন্দেহে! তাহারা তাহাদের অন্তর সঙ্কুচিত করে [...]”

এবং তিনি তাহাকে ইহার ব্যাখ্যা জিজ্ঞাসা করিলেন। তিনি বলিলেন, “কিছু লোক উন্মুক্ত স্থানে মলত্যাগের সময় নিজেদের আড়াল করিত যাহাতে তাহারা আকাশ হইতে দৃষ্ট না হয়, এবং তাহারা তাহাদের স্ত্রীদের সহিত উন্মুক্ত স্থানে সঙ্গম কালেও এইরূপ করিত, যাহাতে তাহারা আকাশ হইতে দৃষ্ট না হয়্ তাহাদের কারণেই উপরের ওহি নাজিল হয়।

৬ষ্ট নং নির্বাচন

ইসলাম শুরু হইতেই বিজ্ঞান শিক্ষা ও চর্চার জন্য মানুষকে প্ররোচিত করিয়াছিল। এই নীতির প্রয়োগের ফলে ইসলামী সভ্যতার মহাযুগে বিজ্ঞানের বিস্ময়কর প্রগতি হয়, পাশ্চাত্য দেশসমূহও যাহার সুফল পাইয়াছে। বর্তমান যুগে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের প্রভাবে, পূর্বে ভুল বোঝা হইয়াছে কোরানের এমন অনেক আয়াতের ব্যাখ্যা বহু উন্নতি হইয়াছে। সুরা ৩৮ এর ৩৬ আয়াত ইহাদের একটি। এখানে ব্যবহৃত ‘মুসতাকার’ শব্দের অর্থ হইল ‘স্থিরীকৃত স্থান’। কোরান সূর্যের বিবর্তনের (ক্রমবিকাশ) সমাপ্তি ও গন্তব্যস্থান নির্দেশ করিয়াছে। বর্তমান জ্যোতির্বিদ্যায় এই গন্তব্যস্থল সঠিকভাবে নির্দ্ধারণ করা সম্ভব করিয়াছে এবং ইহাকে ‘সোলার এ্যাপেক্স’ (Solar Apex) বলা হয়। এই আয়াতটির ডাঃ মরিস বুকাইলের অনুবাদ নিম্নরূপ।

(৩৬:৩৮) সূর্য একটি স্থিরীকৃত স্থানের দিকে অগ্রসর হইতেছে। ইহাই সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞের বিধান।

ইহার সহিত এই আয়াতের, বুখারী উক্ত “রাসূলকৃত” ব্যাখ্যার তুলনা করিয়া দেখা যাউক।

বুখারী (৪.৪২১)–আবু ধার বর্ণিত:

রাসূল সূর্যাস্তের সময় আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি কি জান (সূর্যাস্তের সময়) সূর্য কোথায় যায়?” আমি উত্তর দিলাম, আল্লাহ ও তাঁহার রাসূল ভাল জানেন। তিনি বলিলেন “আরসের নিচে প্রণিপাত না হওয়া পর্যন্ত ইহা চলিতে থাকে এবং পুনর্বার উদয়ের জন্য অনুমতি লয়; এবং এ অনুমতি দেওয়া হয়। পরে একটি সময় আসিবে যখন ইহা আবার প্রণিপাত হইতে যাইবে, কিন্তু তাহা গৃহীত হইবে না। তখন সূর্য নিজ পরিক্রমায় যাইবার অনুমতি চাহিবে, কিন্তু সেই অনুমতিও দেওয়া হইবে না। যে স্থান হইতে আসিয়াছে সেই স্থানেই প্রত্যাবর্তন করিতে বলা হইবে, এবং সেজন্য সে পশ্চিমে উদিত হইবে। এবং ইহাই আল্লাহর বক্তব্যের ব্যাখ্যা”।

(৩৬:৩৮) এবং সূর্য একটি নির্দেশিত কাল পর্যন্ত ইহার নির্দিষ্ট পথে চলিতে থাকে। ইহাই ক্ষমতায় মহিমান্বিত, সর্বজ্ঞের নির্দেশ।

৭ম নির্বাচন

রাসূলের সঙ্গীগন আল্লাহর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখিতেন, তাঁহারা অতি উচ্চস্তরের মানুষ ছিলেন, এবং তাঁহাদের চরিত্র ছিল অনিন্দনীয়। এই মন্তব্যের প্রমাণ কোরান অপেক্ষা বড় কিছুই হইতে পারে না, ইহার সমর্থনে কোরান হইতে নিম্নের আয়াতগুলি উদ্ধৃত করা হইল। ইহার পরে যে হাদিসগুলি দেওয়া হইয়াছে তাহা কোরানের আয়াতগুলির বিরোধিতা করে।

(৪৮:২৯) মোহাম্মাদ আল্লাহর দূত। আর যাঁহারা তাঁহার সহিত আছেন তাঁহারা অবিশ্বাসীগণের ঘোর বিপক্ষে এবং নিজেদের মধ্যে পরস্পর সহানুভূতিশীল [...]

(৮:৬৩) এবং তিনি তাঁহাদের অন্তরে পরস্পরের প্রতি স্নেহ প্রদান করিয়াছেন। আপনি (মোহাম্মাদ) পৃথিবীর সব কিছু ব্যয় করিলেও সেইরূপ অনুভূতি জাগাইতে পারিবেন না; কিন্তু আল্লাহ্ তাহা করিয়াছেন, কারণ তাঁহার শক্তি ও জ্ঞান অসীম।

এক্ষণে দেখা যাউক রাসূলের সঙ্গীগণের সম্বন্ধে হাদিস কি বলে। বেশ কয়েকটি হাদিস আছে, যাহাতে হযরত আবুবকর ও হযরত আলীর মধ্যে দ্বন্দ্ব বর্ণনা করা হইয়াছে, যাহার একটি নিম্নরূপ।

বুখারী (৫:৫৪৬) –আয়েশার বর্ণনা:

হযরত ফাতিমা রাসূলের মৃত্যুর পর ছয় মাস বাঁচিয়া ছিলেন। যখন তিনি মারা যান, হযরত আলী রাত্রিবেলা চুপচাপ তাঁহাকে কবর দেন এবং হযরত আবুবকরকে এই মৃত্যুর কথা জানান নাই। যতদিন হযরত ফাতিমা বাঁচিয়া ছিলেন লোকে হযরত আলীকে অত্যন্ত সম্মান করিত; কিন্তু হযরত ফাতিমার মৃত্যুর পর হযরত আলী তাঁহার প্রতি চতুষ্পার্শ্বস্থ সকলের আচরণে পার্থক্য বোধ করিতে লাগিলেন। ইহার পর তিনি হযরত আবুবকরকে খলিফার পদের উত্তরাধিকারী হিসাবে স্বীকার করিতে মনস্থ করিলেন। সেই উদ্দেশ্যে তাঁহার সহিত সাক্ষাত করিবার জন্য তিনি হযরত আবুবকরকে সংবাদ পাঠাইলেন কিন্তু হযরত ওমরকে সঙ্গে না আনিতে বলিলেন। হযরত ওমর অন্য দিকে বিপদ আশঙ্কা করিয়া হযরত আবুবকরের একা যাওয়া পছন্দ করিলেন না। কিন্তু হযরত আবুবকর হযরত আলীর সহিত সাক্ষাত করিতে দৃঢ়-চিত্ত ছিলেন তাই তিনি একাই গেলেন। এই সাক্ষাতে হযরত আলী বলিলেন, “আমরা আপনার ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব এবং যাহা কিছু আল্লাহ্ আপনার উপর বর্ষণ করিয়াছেন সকলই উপলব্ধি করি। আল্লাহ্ আপনাকে যে মহত্ত্ব দিয়াছেন তাহাতে আমরা ঈর্ষান্বিত নহি; কিন্তু আমরা মনে করি যে, রাসূলের নিকট-আত্মীয় হিসাবে আমরা খিলাফতের ন্যায়সঙ্গত উত্তরাধিকারী এবং আমাদের দাবী, জুলুম ও পীড়নের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হইয়াছে”।

৮ম নির্বাচন (মধ্যস্থতার বিষয়ে কল্পকথা)

অন্য কেহ আমাদের হইতে ধর্মীয় বিষয়ে মধ্যস্থতা করিবে বা আমাদের পাপ মোচন করাইতে পারে অথবা আমাদের ইচ্ছা পূরণ করাইতে পারে, এরূপ মনে করিবার অর্থ এই যে, আল্লাহর কোন অংশীদার আছে। ইহা পৌত্তলিকতা । কোরান ঘোষণা করে যে, “সকল মধ্যস্থতা আল্লাহর (৩৯:৪৪) এবং বিচার দিবসে কোন মধ্যস্থতাকারী থাকিবে না” (২:২৫৪)। বিচার দিবসে কোন মধ্যস্থতা থাকিবে না, এই উক্তির সমর্থন করে, এইরূপ অন্যান্য আয়াতের উদাহরণ, (২:৪৮), (২:১২৩), (৬:৫১,৭০,৯৪), (৭:৫৩), (২১:১০০), (৩০:১৩), (৩৬:২৩), (৪০:১৮), (৪৩:৮৬), (৭৪:৪৮)।

কোরান অবশ্য স্বীকার করে যে, উপরের আয়াতগুলির শর্তহীন বর্ণনা অনুসারে যদিও বিচার দিবসে কোন মধ্যস্থকারী থাকিবে না, তাহা সত্ত্বেও আমাদের মনুষ্যোচিত দুর্বলতা আমাদের প্রিয়জনদের জন্য জীবিত অথবা মৃত সন্ত বা নবীদের মধ্যস্থতার সাহায্য চাহিতে আমাদিগকে প্ররোচিত করিবে। কোরানের কতক আয়াতে (২:২৫৫), (১০:৩), (১৯:৮৭), (২০:১০৯), (২১:২৮) এবং (৩৪:২৩) এই বিষয়ে আলোকপাত করা হইয়াছে। এই সকল আয়াতের তাৎপর্য এই যে যাহাদের ব্যাপার আল্লাহ্ পূর্বেই অনুমোদন করিয়াছেন অর্থাৎ, যাহারা তাহাদের বিশ্বাস ও সৎকাজের জন্য আল্লাহর নিকট হইতে পুরস্কৃত হইবেই কেবল তাহাদের ক্ষেত্রেই মধ্যস্থতা কার্যকরী হইবে। (৪০:১৮) আয়াতের সেই অংশ বিশেষভাবে লক্ষণীয় যেখানে বলা হইয়াছে, দুষ্কর্মকারীরা কোন ঘনিষ্ট বন্ধু বা মধ্যস্থতাকারী পাইবে না যাহাদের কথা আমল দেওয়া হইবে। কিছু কিছু আয়াতের অনুবাদে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয় যে, আল্লাহ যাঁহাদের (যেমন রাসূলকে) অনুমতি দিয়াছেন, বা যাঁহাদের (মধ্যস্থতার) কথা আল্লাহ্ গণ্য করিবেন তাহারা ব্যতীত অন্য কাহারও মধ্যস্থতা মূল্যহীন হইবে। এই সকল আয়াতের অনুবাদ পাঠের সময় এই অনুবাদের উপর নির্ভরের ব্যাপারে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। উদাহরণ স্বরূপ (২০:১০৯) আয়াতের ২৬৩৪ নং টীকায় ইউসুফ আলীর মন্তব্য এইরূপ: (তুলনীয় ২:২৫৫ আয়াতুল কুরসী)। এখানে মানুষ কর্মকারক এবং ‘তানফা’উ’ (উপকার) দ্বারা পরিচালিত। সুতরাং যে ব্যাখ্যা দেওয়া হইল তাহাই অধিকতর উপযোগী বলা যায়। যাহাদের জন্য আল্লাহ্ অনুমতি দিয়াছেন, এবং যাহাদের অনুতাপ সত্য ও আন্তরীক, অতএব আল্লাহর গণ্য তাহারা ব্যতীত মধ্যস্থতা কাহারও উপকারে আসিবে না। অন্যেরা অনুবাদ করে: আল্লাহ্ যাহাদের মধ্যস্থতা করিবার অনুমতি দিয়াছেন এবং যাহাদের (মধ্যস্থতার) কথা আল্লাহ্ গণ্য করেন তাহারা ব্যতীত অন্য কাহারও কোন মধ্যস্থতাই উপকারে আসিবে না। তাহা হইলে বাক্যটির দুইটি বিভিন্ন অংশের কোন সুস্পষ্ট অর্থ হয়না।

কোরান হইতে বিশেষ বিশেষ উদাহরণের মাধ্যমে আমরা জানিতে পারি যে, আল্লাহর প্রিয় ভ্রত্য ইব্রাহীম তাঁহার পিতার জন্য মধ্যস্থতা করিতে পারেন নাই (৯:১১৮), নূহ তাঁহার পুত্রের জন্য (১১:৪৬), মোহাম্মদ তাহার চাচার (১১১:১-৩), অথবা অন্যদের জন্য (৯:৮০) মধ্যস্থতা করিতে পারেন নাই। (৭:১৮৮) এবং (৪৬:৯) আয়াতে কোরান পরিষ্কার ভাবে বলে যে, রাসূলের কাহারও উপকার বা ক্ষতি করিবার ক্ষমতা ছিল না।

(৭:১৮৮) বল: আল্লাহ্ যাহা ইচ্ছা করেন, তাহা ব্যতীত আমার কাহারও কোন উপকার বা ক্ষতি করিবার ক্ষমতা নাই। আমার যদি অদৃশ্য বিষয়ে জ্ঞান থাকিত, তবে আমরা প্রচুর ধনসম্পদ হইত এবং দুর্ভোগ আমাকে স্পর্শ করিত না। কিন্তু আমি একজন সতর্ককারী মাত্র এবং বিশ্বাসীদের জন্য সুসংবাদ বহনকারী।

(৪৬:৯) বল: আমি আল্লাহর দূতগণের মধ্যে নূতন কিছু নহি, কিংবা আমি জানিনা আমার অথবা তোমাদের কি হইবে। আমার মধ্যে যাহা অনুপ্রাণিত হয়, আমি তাহাই অনুসরণ করি, এবং আমি কেবল একজন সতর্ককারী মাত্র।

অতএব, কিরূপে মনে করিতে পারা যায় যে একজন নবী অথবা আউলিয়া আমাদের পক্ষে মধ্যস্থতা করিতে পারিবেন? প্রকৃতপক্ষে তাঁহারা আমাদের পক্ষে মধ্যস্থতা নয় বরং আমাদেরকে অস্বীকার করিবেন।

(৩৫:১৪) যদি তোমরা তাহাদের নিকট প্রার্থনা কর, তাহারা তোমাদের প্রার্থনা শুনিতে পাইবে না। আর শুনিতে পাইলেও তাহারা ইহা পূর্ণ করিতে পারিত না। পুনরুত্থান দিবসে তাহারা তোমাদের সহিত সম্পর্কের কথা অস্বীকার করিবে। যিনি সচেতন, তাঁহার ন্যায় কেহই তোমাদিগকে অবহিত করিতে পারে না।

সেইরূপ (২৫:৩০) আয়াতে বলা হইয়াছে যে বিচার দিবসে আল্লাহর নিকট রাসূলের আবেদন হইবে, “হে আমার প্রতিপালক! আমার আপন অনুসারীগণই এই কোরানকে অগ্রাহ্য করিয়াছে”—-অর্থ্যাৎ আমরা (মুসলিমগণ) কোরান হইতে কোন নির্দেশ গ্রহণ করি নাই।

অপর পক্ষে, হাদিস গ্রন্থ মধ্যস্থার ধারণায় মানুষকে প্রতারণা করিতে সক্ষম হইয়াছে, কারণ বুখারী ও মুসলীম সুস্পষ্ট বলিতেছে রাসূলকে মধ্যস্থতার অধিকার দেওয়া হইয়াছে। উল্লিখিত হাদিসগুলি দ্রষ্টব্য: বুখারী (১.০৯৮), (১.৩৩১), (৫.২২৪), (৬.২৪২), (৮.৫৬৩), (৮.৫৭১), মুসলিম ০৩৮৯, ০৭৪৭, ২০৭১, ২৫১৬। নিঃসন্ধেহে এই সকল হাদিসের সমস্তই কোরানের বিরুদ্ধাচারী, অতএব নিম্নোক্ত হাদিসগুলি যাহা দাবী করে রাসূলের পক্ষে তাহা বলা কিরূপে সম্ভব হইতে পারে?

বুখারী (১.০৯৮) –-আবু হুরায়রার বর্ণনা:

আমি বলিলাম: “হে আল্লাহর রাসূল, কে সেই ভাগ্যবান যিনি পুনরুত্থান দিবসে আপনার মধ্যস্থতা লাভ করিবেন” ? আল্লাহর রাসূল বলিলেন: “হে আবু হুরায়রা! আমি মনে করিয়াছি তোমার পূর্বে আর কেহ ইহা জিজ্ঞাসা করিবে না, কারণ হাদিস (শিখিবার জন্য) তোমার ঐকান্তিক ইচ্ছা আছে আমি জানি। পুনরুত্থান দিবসে আমার মধ্যস্থতা পাইবে সেই সর্বাপেক্ষা ভাগ্যবান ব্যক্তি যে অন্তরের গভীর হইতে বলিয়াছে, “আল্লাহ্ ব্যতীত আর কাহারও উপাস্য হইবার যোগ্যতা নাই”।

বুখারী (১.৩৩১) — যাবির ইবনে আব্দুল্লাহর বর্ণনা:

রাসূল বলিলেন, “আমাকে পাঁচটি বস্তু দেওয়া হইয়াছে যাহা আমার পূর্বে আর কাহাকেও দেওয়া হয় নাই:

১. আল্লাহ ভীতি-বিহবলতার মাধ্যমে (আমার শত্রুদের ভীত করিয়া) একমাস কালীন দূরত্বে রাখিয়া আমাকে জয়যুক্ত করিয়াছেন।

২. পৃথিবী আমার (এবং আমার অনুসারীদের) জন্য নামাজ ও তায়াম্মের (নামাজ পড়িবার আগে পরিষ্কার মাটি দ্বারা নিজেকে বিশুদ্ধ করা) ভূমিতে রূপান্তরিত করা হইয়াছে। সুতরাং যে কোন স্থানে নামাজের সময় হইলে আমার অনুসারীদের যে কেউ প্রার্থনা করিতে পারিবে।

৩. (যুদ্ধে) লুণ্ঠিত দ্রব্য আমার জন্য হালাল (বৈধ) করা হইয়াছে যদিও আমার পূর্ব আর কাহারও জন্য ইহা বৈধ করা হয় নাই।

৪. (পুনরুত্থান দিবসে) আমাকে মধ্যস্থতা করিবার ক্ষমতা দেওয়া হইয়াছে।

৫. প্রত্যেক নবী তাঁহার সম্প্রদায়ের জন্য প্রেরিত হইতেন। কিন্তু আমাকে সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরণ করা হইয়াছে।

বুখারী (৫.২২৪) — আবু সায়িদ আল-খুদরীর বর্ণনা:

একজন কেহ তাঁহার চাচা অর্থাৎ আবু তালিবের কথা উল্লেখ করিলে, আমি রাসূলকে বলিতে শুনিয়াছি “পুনরুত্থান দিবসে হয়ত আমার মধ্যস্থতা তাহাকে সাহায্য করিবে, যাহাতে তাঁহাকে এমন অগভীর অগ্নিকুণ্ডে রাখা হয়, যে অগ্নি কেবলমাত্র তাঁহার গোড়ালি পর্যন্ত পৌছায়। তাঁহার মস্তিষ্ক সেই অগ্নিতে ফুটিতে থাকিবে।

বুখারী (৬.২৪২) — আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমরের বর্ণনা:

পুনরুত্থান দিবসে লোকে তাঁহাদের হাটুর উপর পড়িবে এবং প্রত্যেক জাতি তাহাদের নবীকে অনুসরণ করিবে এবং তাঁহারা বলিবে, “হে নবী! (আমাদের জন্য আল্লাহর নিকট) মধ্যস্থতা করুন”, যে পর্যন্ত না মধ্যস্থতার অধিকার নবী (মোহাম্মাদ) কে দেওয়া হইবে, এবং সেই দিন আল্লাহ্ তাহাকে প্রশংসা ও গৌরবের স্থান দান করিবেন।

বুখারী (৮.৫৭১)–ইমরান বিন হোসেনর বর্ণনা:

রাসূল বলিলেন, “আমার মধ্যস্থতার ফলে কোন কোন ব্যক্তিকে অগ্নি হইতে বাহির করিয়া লওয়া হইবে। তাহারা বেহেশতে প্রবেশ করিবে এবং তাহাদের বলা হইবে ‘আল-জাহান্নামিয়িন’ (দোজখের আগুনের মানুষ)।

মুসলিম (০৩৮৯) –আবু হুরায়রার বর্ণনা:

আল্লাহর রাসূল বলিলেন: প্রত্যেক নবীর জন্য একটি প্রার্থনা মঞ্জুর করা হয়। কিন্তু প্রত্যেক নবী তাঁহার প্রার্থনায় ব্যস্ততা দেখাইয়াছিলেন। আমি যদিও আমার প্রার্থনা পুনরুত্থান দিবসে আমার অনুসরণকারীদের পক্ষে মধ্যস্থতার জন্য, সংরক্ষণ করিয়া রাখিয়াছি, এবং আল্লাহ্ ইচ্ছা করিলে আমার প্রত্যেক অনুসরণকারীদের জন্য ইহা অনুমোদন করা হইবে, যদি সে আল্লাহর সহিত কাহাকেও কোন অংশীদার না করিয়া মৃত্যুবরণ করিয়া থাকে।

মুসলিম (২০৭১)–আয়েশার বর্ণনা:

আল্লাহর রাসূল বলিলেন: যদি একশত মুসলিমের একটি দল একজন মৃতব্যক্তির জন্য প্রার্থনা করে এবং প্রত্যেকেই তাহার সমর্থন করে, তাহা হইলে তাহার জন্য তাহাদের মধ্যস্থতা গৃহীত হইবে।

মুসলিম (০৭৪৭)–আব্দুল্লাহ্ ইবনে আমার ইবনে আল-আসের বর্ণনা:

আল্লাহর রাসূল বলিলেন: যখন মুয়াজ্জিনের ধ্বনি শুনিবে তাহা পুনরুচ্চারণ করিয়া, আমার জন্য দোওয়া চাহিও, কারণ যে আমার জন্য দোয়া চাহিবে সে আল্লাহর নিকট হইতে দশটি নেকি পাইবে। তারপর আল্লাহর নিকট আমার জন্য ‘আল-ওয়াসিলা’ চাহিবে যাহা বেহেশতে কেবলমাত্র আল্লাহর একজন ভৃত্যের জন্য উপযোগী পদ, এবং আমি আশা করি যে আমিই সেই ভৃত্য হইব। যদি কেহ আমাকে ‘আল-ওয়াসিলা’ দিবার জন্য প্রার্থনা করে তবে সে আমার মধ্যস্থতার বিষয়ে নিশ্চিত হইবে।





Home Next >>