১০.২ হাদিসের ঐতিহাসিক পটভূমিকা (১)



হাদিস সাহিত্যের বিকাশের পটভূমিকা বুঝিতে হইলে রাসূলের সময় হইতে ২৫০ বৎসর পর্যন্ত ব্যাপ্ত ইসলামের ইতিহাসের মধ্যে অবশ্যই ঢুঁ মারিতে হয়।এই সময়কালের শেষ দিকেই হাদিস সাহিত্যের উৎপত্তি। সমস্যা এই যে, এই সময়ের মধ্যে কি হইয়াছে সে বিষয়ে বহু পরস্পরবিরোধী কাহিনী বিদ্যমান। বস্তুতঃ যে ইতিহাস আমরা পাই তাহা ইসলামের আসল ইতিহাস অপেক্ষা অধিকতর ভাবেই ইসলামের রাজনৈতিক ইতিহাস। বিতর্কমূলক কাহিনী সমূহের সূত্রে অবশ্যই মনে করিতে হইবে, এই সময়কার ইসলামের প্রকৃত ইতিহাসের অস্তিত্বই নাই। যে বিষয়ে নিশ্চিতভাবে জানা যায় তাহা এই যে, রাসূল ও তাঁহারা সাহাবিগণের জীবদ্দশায় হাদিস লিপিবদ্ধ না করাই নীতি ছিল। রাসূলের জীবদ্দশায় কোরান লিপিবদ্ধ করা হইয়াছিল; কিন্তু হাদিস কখনই লিখিত হয় নাই। ইহার দুইটি কারণ ছিল। একটি কারণ, ইহা কোরানকে বিকৃত করিত। অপর কারণ, লোকে হাসিদ অর্থাৎ রাসূলের বাণীর উপর অধিকতর মনোনিবেশ করিয়া কোরানকে অবহেলা করিত। ফলে রাসূল এবং তাঁহার সাহাবিগণ, যাহারা রাসূলের মৃত্যুর পর প্রায় ৩০ বৎসর ক্ষমতায় ছিলেন, রাসূলের বাণী ও কর্মপন্থা সম্বন্ধে যাহাতে কিছুই লিপিবদ্ধ না হয় সে বিষয়ে দৃঢ় ব্যবস্থা নিয়াছিলেন। আশ্চার্যের বিষয় এই যে, সাহাবিগণের পরেও, অর্থাৎ হজরত আলীর সময়কাল বা প্রায় ৪১ হিজরীর পরেও হাদিস বলিয়া কিছুই লিখিত হয় নাই। বস্তুতঃ রাসূলের সময়ের ১ম শতাব্দীর মধ্যে কোন হাদিসই লিখিত হয় নাই। ইহা কেবল মুখে মুখে প্রচলিত ছিল কিন্তু কখনই লিখিত হয় নাই, কারণ এই ধারণা সুবিদিত ছিল যে রাসূল ও তাহার সাহাবিগণ হাদিস লেখার পক্ষপাতি ছিলেন না, সুতরাং ইহা লিপিবদ্ধ করিবার বিরুদ্ধে তীব্র অনুভূতি বর্ত্তমান ছিল।

লিখিত হাদিসের মধ্যে আমরা দেখিতে পাই যে, প্রথম সুপরিচিত গ্রন্থের প্রণেতা ছিলেন মালিক ইবনে আনাস (মৃত্যু ১৭৯ হিজরী)। ইহা হিজরী দ্বিতীয় শতাব্দীর প্রথমাংশে। তিনি প্রধানতঃ আইনগত কার্যের উদ্দেশ্যে হাদিসের উক্তিসমূহ সংগ্রহ করেন, কারণ তিনি আইনগত ব্যাপারে হাদিসের প্রয়োগ অনুরাগী ছিলেন। তাঁহার সংকলন ‘মুওয়াত্তা’ নামে খ্যাত। ইহাই হাদিসের প্রথম বাস্তব সংকলন। তিনি হাদিসের দুইটি ক্ষুদ্র সংকলনের উল্লেখ করিয়াছেন, যেগুলি হিজরী দ্বিতীয় শতাব্দীর প্রথম দিকে বর্তমান ছিল, কিন্তু তাঁহার উল্লেখ ব্যতীত এগুলির আর কোন নিদর্শন পাওয়া যায় না।

পরবর্তী উল্লেখযোগ্য সংকলন হিজরী তৃতীয় শতাব্দীতে হানবাল প্রণীত। তাহার এবং মালিকের সংকলনের মধ্যে যে সময়ের ব্যবধান তাঁহার মধ্যে বহু সংখ্যক মৌখিক হাদিস প্রচলিত ছিল, যদিও লিখিত ভাবে নহে; ফলে স্বভাবতঃই বহু হাদিসই ভুয়া ছিল। সুতরাং প্রশ্ন উঠিল, কিরূপে ভূয়া হাদিস হইতে সত্যকার হাদিস নির্বাচন করা যায়। বস্তুতঃ যাহা আহমদ বিন হানবাল করিয়াছিলেন তাহা এই যে প্রত্যেকটি হাদিসকে তাহার উৎস পর্যন্ত অনুসরণ করা, অর্থাৎ রাসূলের জীবনকাল পর্যন্ত। ফলে প্রত্যেকটি হাদিসকে ‘মসনদ’ (অর্থাৎ যে হাদিসের উৎস পর্যন্ত যোগসূত্র পাওয়া যায়) বলা হয়, এবং তাঁহার সংকলনকে আহমদ বিন হানবালের মসনদ বলিয়া আখ্যায়িত করা হয়। তিনি প্রায় ৩০,০০০ হাদিস সংগ্রহ করেন; কিন্তু এগুলি কোন ধারাবাহিকভাবে বিন্যস্ত হয় নাই।

পরবর্তী উল্লেখযোগ্য সংকলন হিজরী তৃতীয় শতাব্দীতে বুখারী প্রণীত। তিনি ২৫৭ হিজরীতে পরলোক গমন করেন। তাঁহার সংগৃহীত প্রায় ছয় লক্ষ হাদিস হইতে তিনি ৭২৭৫ হাদিস চয়ন করেন। তাঁহার সংকলনেক সহি হাদিস বা যথার্থ হাদিস বলা হয়। তিনিই প্রথম হাদিসকে বিভিন্ন অধ্যায়ে বিন্যস্ত করেন, এবং অধ্যায়গুলি বিষয়-বস্তুর ভিত্তিতে সন্নিবেশিত হয়। ইহা ঐতিহাসিক, নৈতিক, ধর্মসংক্রান্ত, আইনগত এবং অন্যান্য বিবিধ বিষয় সম্বলিত।

বুখারীর সমসাময়িক ছিলেন মুসলিম। তিনি হিজরী ২৬১ সনে মৃত্যবরণ করেন। তিনি প্রায় তিন লক্ষ হাদিস হইতে ৪৩৪৮টি হাদিস নির্বাচন করেন। তাঁহার হাদিস বুখারীর হাদিসের ন্যায় সুবিন্যাস্ত নহে। তাঁহার উদ্দেশ্য ছিল প্রচলিত হাদিসগুলিকে শোধন করা। অর্থাৎ তিনি বহু সংখ্যক হাদিস সংকলনের পরিবর্তে হাদিসগুলির বিশুদ্ধতার উপর গুরুত্ব দেন। তাঁহার সংকলনও সহি হাদিস রূপে পরিচিত। বহু মুসলিম জনসমাজ এই দুই হাদিস (বুখারী ও মুসলিম) কে এতই গুরুত্ব প্রদান করেন যে, কোরানের সহিত অনৈক্যের ক্ষেত্রে হাদিসই প্রাধান্য পাইয়া থাকে। আরও চারটি সংকলন রহিয়াছে যেগুলি কমবেশী হিজরী সনের তৃতীয় শতাব্দীর শেষ দিকে প্রণীত। এগুলির প্রণেতারা আবু দাউদ (মৃত্যু ২৭৫ হিজরী), ইবনে মাজা (মৃত ৩০৩ হিজরী), আল-তিরমিজি (মৃত ২৭৯ হিজরী) এবং আল নাসাই (মৃত ৩০৩ হিজরী)। এগুলি প্রায় সম্পূর্ণরূপে আইনগত বিষয়ে, অর্থাৎ কী নিষিদ্ধ এবং কী নিষিদ্ধ নহে; ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক বিষয়ে ইহাদের কোন নির্দেশ নাই। এই ছয়টি সংকলনকে একত্রে সহি ছত্তা, অর্থাৎ ছয়টি নির্ভুল হাদিস, বলা হয়। আবার ইহাদের মধ্যে বুখারী ও মুসলিমকে সর্বাপেক্ষা অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং বাকি চারটিকে দেওয়া হয় দ্বিতীয় স্থান।

হাদিস সংকলন কতকগুলি নির্বাচন বিধির মাধ্যমে করা হইয়াছিল, যাহাতে নিম্নের শর্তগুলি হাদিসের গ্রহণযোগ্যতা নিরূপণে ব্যবহৃত হয়:

১. যোগসূত্রের ধারাবাহিকতা: হাদিস গ্রহণযোগ্য হইতে হইলে যোগাযোগের সূত্র অবিচ্ছিন্ন থাকিতে হইবে।

২. সূত্রবাহকের বিশ্বাসযোগ্যতা: সূত্রবাহকের বিশ্বাসযোগ্যতা বাহ্যতভাবে তাহার ইসলামীয় আচরণের ভিত্তিতে নির্ণেয়।

৩. সূত্রবাহকদের স্মরণশক্তির নির্ভর যোগ্যতা: প্রত্যেক প্রেরকের স্মরণশক্তির নির্ভর যোগ্যতা হাদিসের জীবনীসাহিত্যের বিজ্ঞান হইতে যাচাই করিতে হইবে।

৪. হাদিসের সামঞ্জস্য: একই বিষয়ে বিভিন্ন হাদিসের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা গুরুত্বপূর্ণ।

৫. হাদিসের ক্রুটি-হীনতা: হাদিসের ত্রুটি বলিতে যাহা গুপ্ত ভাবে বিদ্যমান এবং বিশেষ রূপ অনুসন্ধানের মাধ্যমে যাহা উদঘাটিত হয়।

উপরোক্ত পাঁচটি শর্ত একে একে বিবেচনা করিলে একটি চূড়ান্ত বিচ্যুতি লক্ষ্য করা যায়, তাহা এই যে, কোরানের সহিত অসঙ্গতি হইলে কোনও হাদিস বাতিল করিতে হইবে তাহার কোন উল্লেখই নাই। কার্যতঃ, ইহার অর্থ হইল, হাদিস কোরানের উপর প্রাধান্য পাইতে পারে, অন্য অর্থে, হাদিস কোরান অপেক্ষা গুরূত্বপূর্ণ।

এক্ষণে উপরোক্ত পাঁচটি শর্ত পরীক্ষা করিয়া দেখা যাউক। প্রথমতঃ রাসূলের জীবনকাল পর্যন্ত যোগসূত্রের বিভিন্ন সূত্রবাহকের নাম নির্ধারণ করিতে বুখারীকে ব্যাপক পরিভ্রমণ করিতে হইয়াছিল ইহাই মনে করা হয়। হাদিস গ্রহণযোগ্যত হইতে হইলে এই সকল সূত্রের ধারাবাহিকতা অক্ষুন্ন থাকিতে হইবে এবং প্রতিটি সূত্রবাহকের যোগাযোগ অনুসন্ধানযোগ্য হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু এই ধারাবাহিকতা কিরূপে রক্ষিত হইতে পারে যখন হিজরী প্রথম শতাব্দীতে কোন লিখিত হাদিসই ছিল না। প্রকৃতপক্ষে, হাদিসের উপর বহু গবেষণা হইয়াছে, বিশেষ করিয়া পশ্চিম দেশীয় ঐতিহাসিকগণ (প্রাচ্যভাষাবিদ) কর্ত্তক, কারণ তাহারা হাদিস হইতে ইতিহাস পুনরুদ্ধার করিতে সচেষ্ট ছিলেন; কিন্তু তাঁহাদের সমীক্ষার প্রায় সর্ববাদীসম্মত সিদ্ধান্ত হইল যে দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতাব্দীর কিছু ইতিহাস পুনরুদ্ধার করা যাইতে পারে, কিন্তু প্রথম শতাব্দীর কিছুই নয়। ইহাতে স্পষ্টই প্রমাণিত হয় যে, আট পুরুষ ব্যাপী এই যোগসূত্র অবশ্যই মনগড়া ছিল। সুতরাং মনে হয় যে ইসনাদ (ISNAD) অর্থাৎ বিজ্ঞানরূপে কথিত হাদিসের সত্যতা নিরূপক নিয়ম, অথবা প্রক্রিয়ার মধ্যে বিরাট ত্রুটি রহিয়াছে।

তাহা হইলে লিপিবদ্ধ না থাকা সত্ত্বেও ২৫০ বৎসর পরে বুখারী যাহার অনুসন্ধান করিয়া উৎস (অর্থাৎ রাসূল) পর্যন্ত সকল যোগসূত্র স্থাপন করিলেন তাহা কিরূপে আমরা বিশ্বাস করিতে পারি?

দ্বিতীয় ও তৃতীয় শর্ত অনুযায়ী বুখারীকে বাহ্যত ইসলামীয় আচরণের ভিত্তিতে সূত্রবাহকের বিশ্বস্ততা নিরূপণ ও স্মরণশক্তির নির্ভরযোগ্যতা নির্ণয় করিতে হইয়াছিল। তিনি প্রত্যেক সূত্রবাহকের জীবন বৃত্তান্ত পর্যালোচনা ভিত্তিতে তাহা করিয়াছিলেন। আট পুরুষ ব্যাপী সময়কালের কোন লিখিত বিবরণী না থাকা সত্ত্বেও তিনি কিরূপে তাহা করিয়াছিলেন তাহা কল্পনার অতীত। বুখারী হইতে দৃষ্টান্ত লইলে দেখা যায় যে, বহু হাদিসে আবু হুরায়ারাকে, বৃত্তান্তসমূহের যোগসূহের শেষ ধাপ হিসাবে লওয়া হইয়াছে। তাঁহার স্মরণশক্তি ভাল ছিল না; কিন্তু বুখারী তাহারও একটি সমাধান পাইয়াছিলেন, যাহা নিম্নে উদ্ধৃত করা হইল।

বুখারী (৪.৮৪১)–আবু হুরায়ারা বর্ণনা:

আমি বলিলাম, “হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনার নিকট হইতে অনেক বিবৃতি শ্রবণ করি, কিন্তু আমি ভুলিয়া যাই।” তিনি বলিলেন, “তোমার গায়ের চাদর বিছাও। ” আমি আমার চাদর বিছাইলাম, এবং তিনি তাঁহার উভয় হস্ত সঞ্চালিত করিয়া যেন কোন কিছু সংগ্রহ করিলেন এবং সেগুলি চাদরে ঝাড়িয়া দিলেন, এবং বলিলেন, “ইহা জড়াইয়া লও।” আমি চাদরটি আমার গায়ে জড়াইলাম, এবং তখন হইতে আমি কখনও কোন হাদিস ভুলি নাই।

চতুর্থ শর্ত হইল হাদিসে হাদিস মিল। অর্থাৎ একই বিষয় বর্ণনার ক্ষেত্রে যে কোন হাদিসের অনুরূপ হাদিসের সহিত সামঞ্জস্য থাকিবে, যাহাতে ইহার যথাযোগ্যতা স্বীকৃত হইতে পারে।

শেষোক্ত শর্ত হাদিসের ক্রটিশূণ্যতা। স্বভাবতঃই হাদিসের ভাল মন্দ মীমাংসার পূর্বে উপযুক্ত অনুসন্ধান প্রয়োজন। বস্তুতঃ হাদিস সাহিত্য বিশুদ্ধতার ভিত্তিতে বিভিন্ন হাদিসকে বিভিন্ন পর্যায়ভুক্ত করে।

উল্লেখযোগ্য যে হিজরী ৪১ হইতে ১৩২ সন পর্যন্ত ব্যাপৃত উমাইয়া বংশের রাজত্বকালে, প্রকৃতপক্ষে বিশেষ কোন হাদিসই লিখিত হয় নাই। উমাইয়ারা রাসূলের মক্কা বিজয়ের পরই ইসলাম গ্রহণ করেন। আব্বাসীয়রা, যাঁহারা রাসূলের চাচার বংশোদ্ভুত, উমাইয়াদের পরে ক্ষমতায় আসেন। তাহাদের শাসনকাল ৬৫৬ হিজরী পর্যন্ত বিরাজিত ছিল। তাঁহাদের রাজত্বকালেই হাদিস লিখিত হয় এবং আইনের বিভিন্ন শাখাও স্থাপিত হয়। প্রকৃতপক্ষে আব্বাসীয়রা তাঁহাদের শাসন এবং পরিকল্পনা অনুকূল হাদিসসমূহ লিখিতেই উৎসাহ প্রদান করেন।





Home Next >>