৮.৯ উত্তেজক পানীয়সমূহ



কোরানে যে পানীয় নিষিদ্ধ হইয়াছে তাহা খামার শব্দ দ্বারা বর্ণিত হইয়াছে অর্থাৎ যে কোন উত্তেজক দ্রব্য যাহা বুদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত অথবা কুয়াসাচ্ছন্ন করে। কোরানের আয়াতগুলি হইতে লক্ষ্য করা যায় যে এ্যালকোহল বা সুরাসার রাতারাতি নিষিদ্ধ হয় নাই। প্রথম পর্বে উল্লেখ করা হইয়াছিল যে ইহার অপকারীতা ইহার উপকারীতার তুলনায় অধিক।

(২:২১৯) তাহারা আপনাকে উত্তেজক পানীয় এবং জুয়া খেলা সম্বন্ধে প্রশ্ন করে। বলুন উহাদের উভয়েরই ক্ষেত্রে মানুষের জন্য বিরাট পাপ ও কিছু লাভ আছে; কিন্তু পাপের অংশ লাভের অপেক্ষা অধিক।

পরবর্তী পর্বে মদমত্ত অবস্থায় মুসলিমদিগকে মসজিদে আসিতে নিষেধ করা হইয়াছিল।

(৪:৪৩) তোমরা যাহারা বিশ্বাসী! তোমরা যখন মত্ত অবস্থায় থাক তখন নামাজের জন্য আসিও না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা যাহা বলিতেছ তাহা বুঝিতে পার [...]

অবশেষে নেশা উদ্রেককারী পানীয় শয়তানের হস্তশিল্প হিসাবে নিষিদ্ধ হয়।

(৫:৯০) তোমরা যাহারা বিশ্বাসী! উত্তেজক পানীয়, জুয়া খেলা, মূর্ত্তি এবং তীর নিক্ষেপের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ গণনা এই সকলই কেবল শয়তানের অসৎ হস্তশিল্প। এই সকলই বর্জন কর, যাহাতে তোমরা কৃতকার্য হইতে পার।

(৫:৯১) শয়তানের ইচ্ছা কেবল মাদকদ্রব্য এবং জুয়া খেলার মাধ্যমে তোমাদের মধ্যে শত্রুতা এবং ঘৃণার উদ্রেক করা এবং আল্লাহকে স্মরণ ও (তাঁহার) বন্দনা হইতে তোমাদিগকে বিমুখ করা। তোমরা কি তাহা হইলে নিরন্ত থাকিবে?

এই প্রসঙ্গে আমি এস, এম ব্লেহার-এর রচিত “The Islamic view on the prohibition of alcohol” (এ্যালকোহল নিষিদ্ধকরণ সম্বন্ধে ইসলামী মতাদর্শ) নামক একটি নিবন্ধ হইতে নিম্নলিখিত অংশটি উদ্বৃত করিলাম।

“প্রত্যেকেই স্বীকার করিবেন সুরাসার সমস্যা-বিজড়িত: উদাহরণ স্বরূপ, সুরাপান করিয়া গাড়ি চালনা, অথবা হিংসাত্মক অপরাধ যাহাতে সুরাসারের প্রভাব থাকে। ইহা সত্ত্বেও অধিকাংশেরই মত এই যে পাশ্চাত্য সমাজে যে পরিমিত পরিমাণে সুরাসেবনের রীতি প্রচলিত আছে তাহা বিশেষ ক্ষতিকর নহে। তথ্যগুলি বিচার করিয়া দেখা যাউক।

“সুরাসার সমস্যা আমরা যে পরিমাণে স্বীকার করি, তাহারও অধিক, এবং ইহা অল্প বয়সে আরম্ভ হয়। জনস্বাস্থ্যের অবস্থা সম্বন্ধে সরকার প্রকাশিত (১৯৯৩) তথ্যানুযায়ী, ৯ হইতে ১৫ বৎসর বয়স্কদের ২০%, ৮ বৎসর বয়সেই তাহাদের প্রথম সুরাপান করে, এবং ৮৯%, ১৫ বৎসর বয়ঃসীমার মধ্যে তাহা করে। ১১ হইতে ১৫ বৎসর বয়স্কদের ১২% (এক-দশমাংশের অধিক!) নিয়মিত সুরাপায়ী এবং ‘সামাজিক প্রবণতা’ (Social Trend-HMSO ১৯৯৪) মতে বৃটেনবাসী পুরুষদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বিবেচনা-সঙ্গত সীমার উর্দ্ধে সুরাসার পান করিয়া থাকে (স্ত্রীলোকদের ক্ষেত্রে বিবেচনা-সঙ্গত সীমার উর্দ্ধে সুরাপান অপেক্ষাকৃত কম, মোট সংখ্যার ১১%)। মদমত্ততা অথবা সুরাপান করিয়া গাড়ি চালনার ব্যাপারে নির্ভজাল দণ্ডদান ব্যতিরিকেও পারিবারিক উৎপীড়ন (শিশুদের অত্যধিক আঘাত সহ) গুরুতর ধ্বংশলীলা অথবা মারাত্মক শারীরিক ক্ষতি ইত্যাদি সুরাসারের প্রভাবে সংঘটিত বহু সংখ্যক অপরাধের ব্যাপারে আদালতগুলি ব্যস্ত থাকে। সরকারের স্বাস্থ্য এবং নিরাপত্তা প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ ও নিয়োগ বিভাগ সমূহকে যৌথভাবে ‘কর্মক্ষেত্রে সুরাসক্তদের সমস্যা’ সম্বন্ধে নীতিপত্র প্রকাশিত করিতে হইয়াছিল; এবং জাতীয় স্বাস্থ্য (National Health Service) সুরাসার জনিত অথবা সুরাসারের প্রভাবে অতিবর্দ্ধিত পীড়ার জন্য মূল্যবান অর্থসম্পদ হইতে বিরাট অংশ ব্যয় করিয়া থাকে। প্রত্যেক ক্রিষ্টমাসে (বড়দিনের সময়) রাজ্যব্যাপী প্রচারণা চলে। সরকারী প্রতিনিধিগণ জাতীয় স্বাস্থ্য এবং সুরাপানের অভ্যাস সম্বন্ধে হা-হুতাস করেন, কিন্তু তাহার অধিক কিছু করেন না। সুরাসার জাতীয় পানীয় বিক্রয় হইতে বৃহৎ পরিমাণ শুল্ক আদায় হইয়া থাকে।

“ইসলাম ভিন্ন মতাদর্শ অবলম্বন করিয়া থাকে। ইহা জাতির দৈহিক সুস্থতাকে যেরূপ মূল্য দেয় জাতির নৈতিক এবং আধ্যাত্মিক স্বাস্থ্যকেও সেইরূপ মূল্য দিয়া থাকে। যাহা কিছু মনের স্বাভাবিক ক্রিয়াকর্মের সহিত বিরোধ সৃষ্টি করে, ইন্দ্রিয়গুলিকে শিথিল করে, ও তাহার মাধ্যমে লজ্জা ও দায়িত্বজ্ঞানের মাত্রার অবনতি ঘটায় অথবা আমাদের চেতনাবোধকে কুয়াসাচ্ছন্ন করে এই সকলকেই ইসলাম ক্ষতিকর বলিয়া মনে করে (সুরাসর সমেত অন্যান্য মাদকদ্রব্যও যাহা আমাদের মানসিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটায় ইহার অন্তর্ভুক্ত)। এবং একই পরিমাণ মাদকদ্রব্যের প্রতি বিভিন্ন ব্যক্তির প্রতিক্রিয়া বিভিন্ন রূপ হইয়া থাকে, ইহা উপলব্ধির পর কি পরিমাণ গ্রহণযোগ্যতা হইবে তাহা বিচারবুদ্ধির উপর ন্যস্ত করে না। বহু সংখ্যক ব্যক্তি আপনার পানাভ্যাসের উপর নিয়ন্ত্রণ আছে এইরূপ চিন্তা করিবার পর ‘এক গ্লাস অতিরিক্ত’ পান করিবার অবস্থায় নিপতিত হইয়াছে। ইসলাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে যে, কোন দ্রব্য অধিক পরিমাণে মানসিক স্বচ্ছতাকে ব্যহত করিতে পারিলে, এমনকি অল্প পরিমাণেও তাহা ক্ষতিকর হইবে। অতএব, ইসলাম, সুরাসার সমেত সর্বপ্রকার মাদকঔষধ সর্বতোভাবে নিষিদ্ধ করিবার পক্ষে সমর্থন দেয়। ইহা এই সমস্ত দ্রব্যের কেবল অপব্যবহার নয়, ব্যবহারও নিষিদ্ধ করে১৩





Home Next >>