৮.৮ জিহাদ



ইসলামে জিহাদ শব্দের তাৎপর্য সম্বন্ধে অত্যন্ত ভুল ধারণা প্রচলিত আছে, বিশেষ করিয়া পাশ্চাত্য জগতে। বাস্তবপক্ষে, জিহাদ সকল মুসলিমদের জন্য — একটি ন্যায্য ও সুস্থ সমাজ গঠনের উদ্দেশ্যে — নৈতিক , আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক — সকল ক্ষেত্রে নিজেদেরকে আত্মনিয়োগের একটি কর্তব্য। সাধারণ ভাবে যাহা মনে করা হয় — ইহা অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে সেইরূপ কোন ‘ধর্মযুদ্ধ’ নয়। ‘ধর্মযুদ্ধ’ এই শব্দচয় ক্রুসেড (‘ধর্মীয়’ লাভের উদ্দেশ্যে চার্চ কর্তৃক প্ররোচিত একটি যুদ্ধ) — এর সময় মুসলিমদের সহিত দ্বন্দ চলচালে পাশ্চাত্যের দ্বারাই উদ্ভাবিত হইয়াছিল। আরবী ভাষায় আরও অনেক শব্দ আছে যাহা যুদ্ধ বিষয়ে ব্যবহারের জন্য আরও উপযুক্ত। এবং ‘জিহাদ’ শব্দ দ্বারা কোরানে যে ধারণার বর্ণনা দেওয়া হইয়াছে তাহার মূলে যুদ্ধের অভিপ্রায় থাকিলে এই সকল শব্দ অবশ্যই ব্যবহৃত হইতে। এইরূপ শব্দের উদাহরণ হইল হারব্ (যুদ্ধ) এবং মা’আরাকা (লড়াই)। নিম্নে জিহাদ সংক্রান্ত একটি প্রশ্নের উত্তরে হাজি এব্রাহিম গোলাইটলির বক্তব্য উদ্বৃত হইল।

“জিহাদের অর্থ হইল সংগ্রাম করা বা উদ্যোগ লওয়া, সাধারণতঃ ইসলামীয় প্রসঙ্গে, এই অর্থে যাহা কিছুই করিতে উদ্যোগের প্রয়োজন হয় তাহাই জিহাদ, এবং যে ব্যক্তি ইহা করিতেছে সে মুজাহিদ। সংবাদ-মাধ্যম আমাদিগকে বিশ্বাস করাইতে চায় যে ইহা আল্লাহের নামে যুদ্ধ এবং হত্যা করা। ইহা অবশ্যই আল্লাহর নামে, কিন্তু প্রচার-মাধ্যম ইহার অর্থ বিকৃত করিয়াছে, যাহাতে তাহারা ইহার নূতন অর্থ, ‘মৌলপন্থী মুসলিম’, যে কোন মুসলিম যাহারা পাশ্চাত্য জীবনধারা সম্পূর্ণরূপে মানিয়া লয় না, তাহাদের প্রতি প্রয়োগ করিতে পারে। বিভিন্ন ব্যস্ততার মধ্যেও কোরান অনুশীলন; নিকটতম অথবা সুবিধাজনক কোন মাংসের দোকানে না গিয়া হালাল মাংসের দোকানে যাওয়া; মুসলিম এবং অমুসলিম উভয়ের সঙ্গেই ইসলাম সম্পর্কে আলোচনা এবং তাহাদিগকে ইহার অধিকতর উপলব্ধিতে সাহায্য করা; কোরান, প্রকৃতি ও বিজ্ঞানে আল্লাহর আয়াত বা চিহ্নসমূহ অনুধাবন করা, যাহাতে জ্ঞানের বৃদ্ধি লাভ হয়; অন্যান্য মুসলিমদের সমক্ষে উৎকৃষ্ট উদাহরণ উপস্থাপন করা এবং অমুসলিমদেরকে মুসলিমদের সত্য পথ দর্শন; এই সমস্তই প্রাত্যহিক জীবনে জিহাদের উদাহরণ। জিহাদ কেবল আভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক মন্দের বিরুদ্ধেই সংগ্রাম নয়, আপন সত্তার এবং সর্বসম্প্রদায় বা গোষ্ঠির (মুসলিম এবং অমুসলিম) সহিত শান্তিতে বসবাস করিবার প্রচেষ্টাও ইহার অঙ্গ”।

তিনি তাঁহার বক্তব্যের সমাপ্তিতে বলিয়াছেন: “জিহাদের সত্য অর্থ যাহারা জানেনা, তাহাদের নিকট কেবল ইহা বোধগম্য করানোও হইবে জিহাদ”।১১

বস্তুতঃপক্ষে অন্য সকল শব্দের ন্যায় জিহাদ শব্দের তাৎপর্যও কেবলমাত্র কোরানের সেই সমস্ত আয়াত সমূহের প্রসঙ্গে বিচার করা যাইতে পারে, যে গুলিতে ইহা ব্যবহৃত হইয়াছে। জিহাদ শব্দ দ্বারা কোরান কি অর্থ সূচিত করে, তাহারা লক্ষণ হিসাবে যথাযথ মন্তব্যসহ নিম্নে কিছু আদর্শ নমুনামূলক আয়াত উদ্বৃত হইল। প্রায় সমস্ত অনুবাদসহ বিষয়বস্তু মাওলানা মোহাম্মদ আলি ‘দি রিলিজিয়ন অব ইসলাম’ গ্রন্থের পঞ্চম অধ্যায়ের ভিত্তিতে দেওয়া হইয়াছে।১২

(২২:৭৮) এবং আল্লাহর জন্য কঠোর সংগ্রাম (জাহিদু) কর–সেইরূপ প্রয়াসের সহিত, যাহা উপযুক্ত [...]

এই স্থলে জিহাদের বিশেষ অর্থ হইল, যুদ্ধে লিপ্ত না হইয়া আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য আল্লাহর উদ্দেশ্যে (নৈতিক আধ্যাত্মিক অথবা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে) আপনার সর্বশক্তি নিয়োগ করা।

(২৯:৬) এবং যে কেহ কঠোর সংগ্রাম (জাহাদা) করে, সে তাহার নিজের আত্মার জন্যই সংগ্রাম করে (ইউজাহিদু), কারণ আল্লাহ্ (তাঁহার) সৃষ্টজীব হইতে সর্বতোভাবেই স্বাধীন।

(২৯:৬৯) এবং যাহারা আমাদের উদ্দেশ্যে কঠোর সংগ্রাম (জাহাদু) করে, আমরা নিশ্চয়ই তাহাদেরকে আমাদের পথে পরিচালিত করিব, এবং আল্লাহ্ অবশ্যই সৎকর্মীদিগের সঙ্গে আছেন।

জাহাদু এই আরবী শব্দটি জিহাদ হইতে উৎপন্ন, এবং ফি-না (আমাদের জন্য) এই শব্দচয়ের সংযোগ ইঙ্গিত দেয় যে জিহাদ, এই ক্ষেত্রে আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে আধ্যাত্মিক প্রয়াস এবং এই জিহাদের ফলস্বরূপ উল্লেখ করা হইয়াছে আল্লাহর পথ সংগ্রামীদের জন্য তাঁহার পথ-নির্দেশনা।

(২৫:৫২) সুতরাং অবিশ্বাসীদিগকে অনুসরণ করিও না, এবং তাহাদের বিরুদ্ধে ইহা লইয়া কঠোর প্রয়াসের (জিহাদ-উন) সহিত দৃঢ় সংগ্রাম (জাহিদ চালাইয়া যাও)।

ইহা এই সর্বনাম স্পষ্টতঃই কোরানের প্রতি উদ্দিষ্ট, প্রসঙ্গ হইতে যাহা লক্ষ্য করা যায়। ইহা তরবারী নয়, কোরানের সাহায্যে অবিশ্বাসীদিগকে জয় করিবার জন্য সংগ্রাম (জিহাদ)।

(৬৬:৯) হে রাসূল! অবিশ্বাসী ও কপটাচারীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম (জাহেদে) করুন, এবং তাহাদের প্রতি অনমনীয় হউন [...]

এই স্থলে রাসূলকে অবিশ্বাসী ও কপটাচারীদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালাইয়া যাইতে চলা হইতেছে। যাহাদিগকে কপটাচারী বলা হইয়াছে তাহারা বাহ্যিকভাবে মুসলিম ছিল এবং মুসলিমদের মধ্যেই বাস করিত, এবং তাহাদের প্রতি সর্বতোভাবে মুসলিমসুলভ আচরণ করা হইত। তাহারা মসজিদে আসিত এবং মুসলিমদের সহিত নামাজ পড়িত। তাহাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অচিন্ত্যনীয় ছিল এবং কোন যুদ্ধ করাও হয় নাই। তাহারা কখনও কখনও মুসলিমদের সহিত অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিত। সুতরাং অবিশ্বাসী এবং কপটাচারীদের বিরুদ্ধে জিহাদের নির্দেশের অর্থ তাহাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালনা হইতে পারিত না। উপরের আয়াতগুলিতে জিহাদ যে অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে, ইহা সেইরূপ অর্থেই জিহাদ ছিল; ২৫:৫২ আয়াতের বর্ণনা অনুযায়ী কোরানের সাহায্যে পরিচালিত জিহাদ, কঠোর সংগ্রামের মাধ্যমে তাহাদিগকে ইসলামের পথে আনয়ন। ২৫:৫২ এবং ৬৬:৯ উভয় আয়াতেই জিহাদ নৈতিক এবং রাজনৈতিক অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে। পুনরায় বলা যায়, ইহাতে যুদ্ধের ইঙ্গিত সূচীত হয় না

(২:২১৮)যাহারা বিশ্বাস করে, এবং যাহারা (উৎপীড়ন এড়াইবার জন্য) আপন বাসভূমি ত্যাগ করে, এবং আল্লাহর পথে কঠোর সংগ্রাম করে (জাহাদু), তাহাদের অবশ্যই আল্লাহর করুণা পাইবার আশা আছে। আল্লাহ্ ক্ষমাশীল ও দয়াবান।

(৮:৭৪) যাহারা বিশ্বাস করিয়াছিল এবং স্বগৃহ ত্যাগ করিয়াছিল এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যে কঠিন সংগ্রাম (জাহাদু) করিয়াছিল, এবং যাহারা তাহাদিগকে আশ্রয় দিয়াছিল এবং সাহায্য করিয়াছিল — ইহারাই সত্য বিশ্বাসী। তাহাদের জন্য ক্ষমা এবং প্রভূত ব্যবস্থা রহিয়াছে।

(৩:১৪২) তোমরা কি মনে করিয়াছিলে আল্লাহ্ জানিলেন না তোমাদের মধ্যে কে কঠোর সংগ্রামী (জাহাদু), অথবা (তোমাদের মধ্যে) কাহারা দৃঢ়চিত্ত, আর তোমরা বেহেশতে প্রবেশ করিবে?

এই সমস্ত আয়াতের মধ্যেই জিহাদ নৈতিক, আধ্যাত্মিক ভাবে কঠোর প্রচেষ্টার সাধারণ অর্থেই ব্যবহৃত হইয়াছে এবং তাহা আমাদের দৈনন্দিন জীবনকেই কেন্দ্র করিয়া। সকল ক্ষেত্রেই জিহাদ যুদ্ধে লিপ্ত না হইয়া উদ্দেশ্য সাধনের জন্য আল্লাহর পথে প্রবল সংগ্রামের অর্থই সূচিত করে।





Home Next >>