৮.৭ পর্দা (হিজাব)



বহু বিতর্কিত প্রশ্ন হিজাব সম্বন্ধে যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন তাহা এই যে কোরান পুরুষ এবং নারী উভয়ের জন্যই শালীনতার নির্দেশ দেয়

(২৪:৩০,৩১) বিশ্বাসী পুরুষদিগকে তাহাদের লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করিতে ও দৃষ্টি অবনত করিতে বলুন। উহাই তাহাদের পক্ষে পবিত্রতর। তাহারা যাহা করিয়া থাকে আল্লাহ্ অবশ্যই তাহা সম্বন্ধে সচেতন। এবং বিশ্বাসী নারীদিগকে বলুন তাহাদের দৃষ্টি অবনত ও লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করিতে এবং তাহাদের রূপ ও সজ্জার যাহা প্রকাশ্য কেবল তাহাই প্রকাশ করিতে [...]

নারীর ক্ষেত্রে বিশেষ করিয়া, এই ইঙ্গিত দেওয়া হইয়াছে যে জনসমক্ষে তাহার পরিধান মূলতঃ শালীন হইবে কিন্তু তাহা তাহার কাজকর্মে ব্যাঘাত সৃষ্টি করিবে না। এই জন্যই বুকের উপর চাদর টানিয়া দেওয়া তাহাকে একটি সীমা হিসাবে দেওয়া হইয়াছে, যাহার লঙ্ঘন সে না করে।

(২৪:৩১) বিশ্বাসী নারীদিগকে তাহাদের দৃষ্টি অবনত করিতে ও লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করিতে বলুন; এবং তাহারা যেন তাহাদের রূপ ও সজ্জার যাহা প্রকাশ্য তাহাই প্রকাশ রাখে, এবং তাহাদের বক্ষদেশের উপর চাদর টানিয়া দেয়, এবং তাহাদের রূপ ও আভরণ, তাহাদের নিজ স্বামী অথবা পিতা অথবা স্বামীর পিতা, অথবা তাহাদের পুত্র অথবা স্বামীর পুত্র অথবা তাহাদের ভ্রাতা বা ভ্রাতার পুত্র অথবা ভগ্নীর পুত্র অথবা তাহাদের আপন নারী বা দাসী বা কামনাহীন পুরুষ অথবা যে সমস্ত শিশু নারীর নগ্নতা সম্বন্ধে অজ্ঞ তাহাদের ব্যতীত অন্য কাহারও সমক্ষে প্রকাশ না করে। এবং তাহারা যেন তাহাদের গুপ্ত আভরণ প্রকাশ করিবার জন্য মাটিতে পা দাপিয়া না চলে। এবং হে বিশ্বাসীগণ! সমবেত ভাবে আল্লাহর প্রতি নিবদ্ধ হও, যাহাতে তোমরা সফলকাম হও।

৩৩:৫৯ আয়াতে আল্লাহ্ রাসূলের আত্মীয়া নারী ও বিশ্বাসীদের নারীসকলকে নির্দেশ দিতেছেন যে (বাহিরে যাইবার সময়) তাহারা যেন একটি চাদর বা বর্হিবাস ব্যবহার করে—‘যাহাতে তাহাদিগকে চিনিতে পারা যায়’। মস্তক আবরিত করা অথবা না করায় কিছুই আসে যায় না, যেহেতু মস্তক আবরণ করা সম্বন্ধে কোরান বিশেষ কোন উল্লেখ করে না।

(৩৩:৫৯) হে রাসূল! আপনার স্ত্রীদিগকে এবং কন্যাদিগকে এবং বিশ্বাসীদের নারীদিগকে বলুন (বাহিরে যাইবার সময়) তাহারা যেন নিজেদের গায়ে একটি চাদর জড়াইয়া লয়। ইহাই অপেক্ষাকৃত ভাল, যাহাতে তাহাদেরকে চিনিতে পারা যাইবে এবং কেহ তাহাদের বিরক্ত করিবে না। আল্লাহ্ সতত ক্ষমাশীল, করুণাময়।

এই উলক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্টাকী প্রদেশের লুইভিল শহরে অবস্থিত ইসলামিক রিসার্চ ফাউণ্ডেশনের প্রেসিডেন্ট ডক্টর ইবরাহিম বি, সৈয়েদ (পি এইচ ডি, ডি এস সি) এর একটি নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধের উদ্ধৃতি দিলাম।

“কোরান অনুযায়ী গৃহের বাহিরে যাইবার সময় মুসলিম নারীদিগের বর্হিবাস ব্যবহারের কারণ হইল যাহাতে তাহাদিগকে ‘বিশ্বাসী’ নারী হিসাবে চিনিতে পারা যায় এবং পথচারী অন্যান্য নারীদের হইতে পার্থক্য করা যায়, যাহাদের জন্য যৌননিগ্রহ একটি পেশাজড়িত বিপদ। এই আয়াতের উদ্দেশ্য নারীদেরকে গৃহে আবদ্ধ করিয়া রাখা নয়, বরং তাহারা যাহাতে অপ্রীতিকর আকর্ষণের শিকার না হইয়া তাহাদের দৈনন্দিন কাজের উদ্দেশ্যে যাওয়া আসা করিতে পারে।

“বয়স্কা” নারী যাহারা বিবাহের সম্ভাবনা অতিক্রম করিয়াছে তাহাদের এই ‘বর্হিবাস’ পরিধানের প্রয়োজন নাই। ‘যে সমস্ত বয়স্কা নারী বিবাহের সম্ভাবনা পশ্চাতে ফেলিয়া আসিয়াছে, তাহারা যদি তাহাদের (বর্হিবাস) ত্যাগ করিয়া রাখে তাহাতে তাহাদের কোন দোষ নাই, যদি না তাহারা তাহাদের রূপের যথেচ্ছাচারী প্রদর্শন করে। তবে তাহাদের জন্য সংযমই উত্তম। এবং আল্লাহ্ সকলই দেখিয়া থাকেন, এবং সকল বিষয়েই জ্ঞাত’ (২৪:৬০)

“নারীদের পর্দায় রাখা উচিৎ অথবা পুরুষের জগৎ হইতে স্বতন্ত্র রাখা উচিৎ কোরান এইরূপ ইঙ্গিত দেয় না। বরং নারীদেরকে সমাজে এবং ধর্মীয় আচার অনুশীলনে সম্পূর্ণরূপে অংশগ্রহণ সম্বন্ধে কোরান দৃঢ় ইঙ্গিত দেয়।

“পর্দার নৈতিকতা অপেক্ষা নিজস্ব নৈতিকতা ও বিবেকের পরিচ্ছন্নতা বহুগুণে উত্তম। ভণ্ডামি হইতে ভাল কিছুই আসিতে পারে না। পুরুষেরা যে তাহাদের মাতা, কন্যা, স্ত্রী এবং ভগিনীদিগকে সম্ভাব্য বিশ্বাসঘাতক বলিয়া সন্দেহ করে, নারীর উপর পর্দা আরোপ তাহার চূড়ান্ত প্রমাণ। মুসলিম পুরুষেরা কীরূপে পর্দাহীন অমুসলিম নারীদিগের সাক্ষাতে আসে এবং তাহাদের সহিত সম্মানের সহিত ব্যবহার করিতে পারে, কিন্তু মুসলিম নারীদিগকে সেইরূপ সম্মান দিতে পারে না?

“হিজাব পরিধান নারীর উপর অবশ্যই কোন ইসলামীয় বাধ্যবাধকতা নহে। ইহা সেই সমস্ত ধার্মিকতার জটিলতা পীড়িত মানুষের আবিষ্কার (বিদা’হ্) যাহারা আধ্যাত্মিক দিক দিয়া এতই দুর্বল যে নিজেদেরকে বিশ্বাস করিতে পারে না!

“মুসলিম নারীগণ হিজরী ষষ্ট শতাব্দীর শেষভাগ অথবা খৃষ্টীয় একাদশ শতাব্দী পর্যন্ত পুরুষদের সাহচর্যে ছিল। তাহারা অতিথি আপ্যায়ন করিত, সভা সমিতিতে যোগ দিত, এবং ভ্রাতা ও স্বামীদিগকে সাহায্যের জন্য যুদ্ধে যাইত, এবং তাহারা তাহাদের দুর্গ ও দুর্গপ্রাচীর রক্ষা করিত।

“মুসলিম পুরুষ ও নারীদিগের মধ্যে ইহা একটি ক্রমঃবর্ধমান অনুভূতি যে তাহারা আর পাশ্চাত্যের সহিত শনাক্ত হইতে চাহে না, এবং মুসলিম হিসাবে তাহাদের আত্মপরিচয়ের পুনপ্রতিষ্ঠার জন্য সেইরূপ দৃশ্যমান প্রতীক চিহ্নের প্রয়োজন যাহা রক্ষণশীল পরিচ্ছদ হইতে প্রতীত হয়।

“এই সকল নারীদিগের জন্য রক্ষণশীল পোষাক পরিতেই হইবে ইহা কোন বিচার্য বিষয় নয়, কিন্তু তাহারা তাহাই মনোনয়ন করে। ইরানে ইমাম খোমেনি প্রথমে দাবী করিয়াছিলেন যে নারীদিগকে চাদর এবং পর্দা পরিতেই হইবে, কিন্তু নারীদের বিরাট আন্দোলনের মুখে তিনি তাঁহার অবস্থান পরিবর্তন করেন এবং স্বীকার করেন যে চাদর বাধ্যতামূলক না হইলেও শালীন পরিচ্ছদ অবশ্যই বাধ্যতামূলক”।১০

কোরান অনুশীলন করিলে ইহা স্পষ্ট হয় যে কোরান সকল পরিস্থিতির জন্য বিশেষ বিশেষ বিধান দিবার জন্য সচেষ্ট নয় বরং মূল নীতিগুলিই দিয়া থাকে যাহা আমাদিগকে জীবনের সর্বক্ষেত্রেই আমাদের ব্যবহারের মূল পথনির্দেশগুলি প্রতিষ্ঠিত করিতে সহায়তা করে। ইহা মূল নীতিগুলির (১৩.৫ অনুচ্ছেদ দ্রষ্টব্য) ভিত্তিতে সাধারণ জ্ঞান ও যুক্তি ব্যবহারেই উপরই নির্ভর করে। বস্তুতঃপক্ষে আল্লাহ্ আমাদের আনুষ্ঠানিকতার ব্যাপারে যত গুরুত্ব দেন, আমাদের ব্যবহার এবং কর্মের উপর তাহা অপেক্ষা আরও অধিক গুরুত্ব দেন, তাহা সত্ত্বেও আমরা ইহার বিপরীতকেই সত্য বলিয়া মনে করি





Home Next >>