৮.৬ ইসলামে বহুবিবাহ



কোরান বহুবিবাহ সমর্থন করে অথবা মার্জনা করে, এই ধারণা বহুল প্রচারিত। এই ধারণা পুরাপুরিই ভুল নহে, কিন্তু ইহা সর্ব ক্ষেত্রে সঠিক ও নহে। ইহার সঠিক অবস্থান জানিতে হইলে লোক পরম্পরায় বা অত্যল্প পাঠে যাহা জানা যায় আমাদিগকে তাহা অপেক্ষা আরও একটু গভীরে যাইতে হইবে। বহুবিবাহের সমর্থনে যে সমস্ত আয়াত প্রায়ই উল্লেখ করা হইয়া থাকে সেগুলি নিম্নরূপ:

(৪:২,৩) এতিমের ধনসম্পত্তি তাহাদেরকে দাও, (ইহার কর্তৃত্বের ব্যাপারে) ভালোর বিনিময়ে মন্দের স্থান দিবেনা, কিংবা তাহাদের সম্পদ আত্মসাৎ করিও না। স্মরণ রাখিও! তাহাতে গভীর পাপ হইবে। এবং যদি তোমরা শঙ্কিত হও যে এতিমদিগের সহিত সততার সহিত আচরণ করিতে পারিবেনা, নারীগণের মধ্য হইতে যাহাদের তোমাদের ভাল বলিয়া মনে হয়, দুই, তিন অথবা চারজিনকে বিবাহ করো; এবং যদি তোমরা মনে করো যে (এত জনের প্রতি) ন্যায়াচরণ করিতে পারিবে না তাহা হইলে (কেবল) একজন অথবা (বন্দিনীদেরকে) যাহারা তোমাদের অধিকারের আওতায় আছে। এইরূপে ইহাই অধিকতর সম্ভব যে তোমরা অন্যায় করিবে না।

শেষোক্ত আয়াত হইতে দৃঢ়ভাবে বলিতে পারা যায় যে এ বিষয়ে কোরানের অবস্থান হইল — যদি কেহ তাহার পত্নীদের প্রতি সমান আচরণ করিতে সক্ষম না হয় — তাহা হইলে তাহার পক্ষে একটির বেশী স্ত্রীর কথা চিন্তা কর ঠিক হইবে না। বাস্তব পরিস্থিতিতে এই শর্ত পূরণ করা অত্যন্ত কঠিন সুতরাং ইহাই বুঝিতে হইবে যে, সাধারণভাবে একবিবাহের প্রতিই ইঙ্গিত করা হইয়াছে। অধিকন্তু, আয়াতটির ইঙ্গিত অনুযায়ী, কেবল বিশেষ পরিস্থিতিতেই বহুবিবাহ ন্যায়ত সমর্থন করা যাইতে পারে। সে যাহাই হউক, একথা স্মরণ করিতে হইবে যে মানুষের অন্তরে যাহা আছে আল্লাহ তাহা জানেন, সুতরাং যে ঘটনা হইতে নিষ্কৃতি নাই তাহা এই যে চূড়ান্ত পরিণতি হিসাবে মানুষকে আল্লাহর উপস্থিতিতে তাহার সমস্ত কর্মের ন্যায় অন্যায় প্রতিষ্ঠিত করিতে হইবে। নিম্নে উদ্বৃত আয়াত যাহা দৃঢ়রূপে উল্লেখ করে তাহা এই যে, একের অধিক স্ত্রীগণের প্রতি ন্যায়সঙ্গত আচরণ অত্যন্ত দুরূহ হইবে। যদি কোন পুরুষ আপনা হইতে এই অবস্থান লই, তাহা হইলে ন্যায়সঙ্গতভাবেই দাবী করা যায় যে প্রথমা পত্নীকে অবহেলা করা তাহার উচিৎ হইবে না, বরং সেই স্ত্রীর প্রতি সকল প্রকার বাহ্যিক ও বাধ্যতামূলক কর্তব্যসকল পরিপূর্ণ করিতে হইবে।

(৪:১২৯) তোমরা (তোমাদের) স্ত্রীগণের প্রতি সমান ব্যবহার করিতে পারিবে না, যতই (তাহা করিতে) ইচ্ছা করনা কেন। কিন্তু (কোন একজনের প্রতি) বিমুখ হইয়া তাহাকে অবলম্বনহীন অবস্থার মধ্যে পতিত করিও না। যদি তোমরা মঙ্গল কর্মে লিপ্ত থাক এবং অসৎকর্ম হইতে বিরত থাক, তবে আল্লাহ্ সর্বদাই ক্ষমাশীল, করুণাময়।

ইসলামের বহু বিবাহ প্রবর্তনের আরও অন্যান্য কারণগুলি বুঝিতে হইলে আয়েষা লেমু কর্তৃক ১৯৭৬ সালের ৩রা হইতে ১২ই এপ্রিল আন্তর্জাতিক ইসলামীয় অধিবেশনে পঠিত একটি সমাচার হইতে নিম্নোদ্ধৃত বর্ণনাটি বিবেচনা করা যাইতে পারে। আয়েষা লেমু, একজন ইংরেজ মহিলা, তিনি এই অধিবেশনের ১৫ বৎসর পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেন।

“প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মৃতদের সংখ্যা স্মরণ করিলেই বুঝিতে পারা যাইবে যে বহু লক্ষ স্ত্রী ও নারী তাহাদের স্বামী ও ভবিষ্যৎ স্বামীকে হারাইয়াছিলেন এবং তাহাদের নিজের অথবা সন্তানদের জন্য কোন প্রকার আয় অথবা যত্ন অথবা নিরাপত্তা ব্যতিরেকে নিঃসঙ্গ অবস্থায় পতিত হইয়াছিলেন। এইরূপ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেও যদি দাবি করা হয় যে একজন পুরুষ কেবল একজন নারীকেই বিবাহ করিতে পারিবে তাহা হইলে লক্ষ লক্ষ অন্যান্য নারী যাহাদের বিবাহের কোনই সম্ভাবনা রহিল না তাহাদের জন্য কি উপায় বাকি রহিল? স্পষ্ট ভাষায় বলিতে গেলে তাহাদের জন্য যে পথ দুইটি খোলারহিল তাহা হয় সন্তানহীনা চরিত্রবতী অনূঢ়া বার্দ্ধক্য অবস্থায় অথবা কাহারও উপপত্নি বা অঘোষিত দ্বিতীয়া স্ত্রী যাহার নিজস্ব অথবা সন্তানদিগের জন্য কোন আইনগত অধিকার নাই। অধিকাংশ নারীই এই দুইটির কোনটাই চাহিবে না যেহেতু অধিকাংশ নারীই বৈধ স্বামী ও সংসারের নিরাপত্তা সর্বদাই চাহিয়াছে এবং এখনও পর্যন্ত তাহাই চায়।

“সুতারাং আপস-মিমাংসা এই যে, বাস্তবকে স্বীকার করিতে হইলে, এইরূপ পরিস্থিতির অধীন নারীদিগের সম্মুখে বিকল্প প্রস্তাব হিসাবে পেশ করিলে তাহারা কোন স্বামী না পাওয়ার পরিবর্তে স্বামীকে অন্য স্ত্রীর সহিত ভাগ করিয়া লইতে চাহিবে। এবং নিঃসন্দেহে ইহা প্রথমা স্ত্রীকে প্রতারণার প্রচেষ্টায় গুপ্তভাবে চলিবার পরিবর্তে সর্বজনস্বীকৃত প্রথা হইলে, স্বামীকে ভাগ করিয়া লওয়া আরও সহজ হইবে।

“এবং এক ধরণের বহুবিবাহ যে ইউরোপ ও আমেরিকায় বিস্তৃতভাবে চলিতেছে ইহা কোন গোপন কিছু নয়। পার্থক্য এই যে পাশ্চাত্যের পুরুষের যে ক্ষেত্রে তাহার দ্বিতীয়া, তৃতীয়া অথবা চতুর্থা উপপত্নী এবং তাহাদের সন্তানগণের প্রতি আইনগত বাধ্যবাধকতা নাই, সেক্ষেত্রে একজন মুসলিম স্বামীর তাহার দ্বিতীয়া, তৃতীয়া এবং চতুর্থা পত্নী এবং তাহাদের সন্তান সন্ততিদের প্রতি পুরামাত্রায় আইনগত বাধ্যবাধকতা বর্তমান”।

তিনি আরও বলিয়াছেন: “যুদ্ধের সহিত সংস্পর্শ নাই এইরূপ আরও পরিস্থিতি থাকিতে পারে — ব্যক্তিগত পরিস্থিতি যে ক্ষেত্রে অন্যান্য বিকল্প অপেক্ষা একটির অধিক নারীর সহিত বিবাহ বাঞ্ছনীয় হইতে পারে — উদাহরণ স্বরূপ, প্রথমা স্ত্রী চিররুগ্না অথবা প্রতিবন্ধী হইলে। অবশ্য এইরূপ কিছু স্বামী আছে যাহারা এই পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেন, কিন্তু ইহার মধ্যে যে ঝুঁকির সম্ভাবনা আছে তাহা কেহ অস্বীকার করিবেন না। কোন কোন ক্ষেত্রে দ্বিতীয় একটি বিবাহ তিন জনের জন্যই একটি সমাধান হইতে পারে”।

তিনি তাঁহার বক্তব্যের উপসংহারে বলিয়াছেন: “আমি এই সমস্ত উদাহরণের কিছু কিছু উল্লেখ করিয়াছি, কারণ বহুবিবাহ সম্বন্ধে অধিকাংশ পাশ্চাত্যবাসীদের চিন্তা কেবল হারেম ভর্তি আকর্ষণীয়া যুবতীদের প্রসঙ্গের ভিত্তিতেই হইয়া থাকে, পাশ্চাত্য সমাজের কিছু কিছু সমস্যার সম্ভাব্য সমাধানের ভিত্তিতে নয়”।

যাহা হউক, কোরান অনুযায়ী, বিবাহজনিত সমস্যা এবং বিবাদ — স্বামী ও স্ত্রীর পরিবারবর্গকে সঙ্গে লইয়াই — যথাযথ আলোচনা ও আপসমিমাংসার ভিত্তিতেই আয়ত্বে আনা প্রয়োজন — ৪:২,৩ আয়াতে যাহা উল্লেখ করা হইয়াছে ইহা ব্যতীত কোরান আর অন্য কোনও কারণে বহুবিবাহ অনুমোদন করেনা।





Home Next >>