৮.৫ বিবাহ বিচ্ছেদ (তালাক) ও পুনর্মিলন প্রক্রিয়া (৭)



কখনও কখনও বলা হইয়া থাকে যে ইসলামে বিবাহ বিচ্ছেদ বা তালাক সহজেই হইয়া থাকে, এবং ইহা বিচ্ছেদের ইচ্ছা বা ‘তালাক’ একই সঙ্গে তিনবার উচ্চারণের মাধ্যমে হইয়া থাকে। ইহা বাস্তবের চূড়ান্ত বিকৃতি। কোরানের বর্ণনা অনুযায়ী প্রকৃত অবস্থা নিম্নরূপ:

তিনবার তালাক বলিতে হইবে ইহা সত্য। তবে প্রথম পর্যায়ে কেবলমাত্র একবারই তালাক বলা যাইবে। ইহার পর দ্বিতীয় দফায় তালাক বলিবার পূর্বে দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান থাকিতে হইবে এবং তৃতীয়বার তালাক বলিতে হইলে অনুরূপ বিলম্বের প্রয়োজন হইবে। তৃতীয়বার তালাক উচ্চারণে বিচ্ছেদ চূড়ান্ত হইবে। এই প্রক্রিয়ায় যে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয় তাহাতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আপস রফা হইয়া থাকে।

তালাক উচ্চারণের পূর্বে স্বামীর পক্ষে স্ত্রীর প্রতি ধৈর্য অবলম্বন করা উচিৎ। যদি সে স্ত্রীর ব্যবহারে এমন কিছু লক্ষ্য করে যাহা তাহার নিকট আপত্তিকর অথবা যাহা তাহার পছন্দনীয় নয় তাহা হইলে তাহার উচিৎ হইবে আপন অন্তরে স্ত্রীর গুণ ও ত্রুটিগুলির তুলনামূলক বিচার করিয়া দেখা।

(৪:১৯) [...] এবং তোমাদের স্ত্রীদিগের সহিত শোভনসূচক ঐক্য বজায় রাখ, যদি তুমি তাহাদিগকে অপছন্দ কর, হইতে পারে যে তুমি যাহা অপছন্দ কর, আল্লাহ্ তাহাই হয়ত অফুরন্ত মঙ্গলের উৎস করিয়া তুলিতে পারেন।

(৪:৩৪) [...] এবং যে সমস্ত স্ত্রীর বিদ্বেষ অথবা অসদ্ভাব তোমাদিগের ভয়ের কারণ হইতে পারে, তাহাদিগকে শয্যায় একাকিনী থাকিতে দাও, এবং পরে দূরত্ব বজায় রাখ, এবং ইহার পর তাহারা তোমাদিগকে মান্য করিলে, তাহাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা লইও না (৮.৩ দ্রষ্টব্য)।

যদি এই সমস্ত প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়, এবং স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে বিভেদ ঘনতর হয় তাহা হইলে মধ্যস্থতার পথ লওয়া উচিৎ হইবে এবং তজ্জন্য সদিচ্ছা ও সুষ্ঠু বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন দুইজন (স্ত্রী পক্ষ হইতে একজন ও স্বামীর পক্ষ হইতে একজন) ব্যক্তিকে নিয়োগ করিতে হইবে।

(৪:৩৫) এবং যদি তোমরা তাহাদের দুইজনের (স্বামী ও স্ত্রীর) মধ্যে বিচ্ছেদের ভয় কর, পুরুষের পক্ষ হইতে একজন এবং স্ত্রীর পক্ষ হইতে একজন সালিশের জন্য মনোনীত কর। যদি তাহারা সংশোধন চায় আল্লাহ্ তাহাদিগকে মানসিক একত্ব দিবেন। অবশ্যই আল্লাহ্ সর্বদাই অবগত, সচেতন।

যদি এই সমস্ত চেষ্টাই ব্যর্থ হয় তাহা হইলে স্বামী বিচ্ছেদের ব্যবস্থা লইতে পারে, কিন্তু তাহাকে কোরানে বর্ণিত পদ্ধতি অনুসরণ করিতে হইবে।

(২:২২৬,২২৭) যাহারা স্ত্রীর নিকট যাইবে না বলিয়া শপথ লই তাহাদিগকে চার মাস সময় দেওয়া হইবে; এবং যদি তাহারা শপথ রক্ষা না করে — তবে আল্লাহ্ অতীব ক্ষমাশীল, অনুগ্রহ দানকারী। কিন্তু যদি তাহারা বিচ্ছেদের জন্য স্থিরসঙ্কল্প হয়–তবে জানিও আল্লাহ্ সব কিছুই শুনিতে পান, তিনি সর্বজ্ঞাত।

(২:২২৮) এবং তালাকপ্রাপ্ত নারী, বিবাহ না করিয়া, তিনটি ঋতুকাল অপেক্ষা করিবে: কারণ তাহারা যদি আল্লাহ্ এবং শেষ দিবসে (বিচার দিবসে) বিশ্বাসী হয়, তবে আল্লাহ্ তাহাদের গর্ভে যাহা সৃষ্টি করিয়াছেন তাহা গুপ্ত করা বৈধ হইবে না। এবং এই অন্তর্বতীকালে স্বামীরা পুনর্মিলনে ইচ্ছুক হইলে তাহাদিগকে ফিরাইয়া লইবার পূর্ণ অধিকারী রহিবে: কিন্তু ন্যায় বিচার অনুযায়ী, (স্বামীর সূত্রে) স্ত্রীর অধিকার, স্ত্রীর সূত্রে তাহাদের (স্বামীর) অধিকারের সমান, যদিও পুরুষদিগের তাহাদের উপর কিছু আপেক্ষিক প্রাধান্য আছে।

টিকা: স্ত্রীর উপর স্বামীর আপেক্ষিক প্রাধান্য আছে এই অর্থে যে স্ত্রীকে সন্তান সম্ভাবনার জন্য অপেক্ষা করিতে হইবে। ইহা ব্যতীত সংসার চালনার প্রধান দায়িত্ব স্বামীর। অন্যান্য সকল ক্ষেত্রেই স্বামী এবং স্ত্রীর একে অন্যের সমান অধিকার বর্তমান, এবং ইহার তাৎপর্য এই যে স্ত্রীর পক্ষেও স্বামীকে তালাক দিবার অধিকার আছে। তাহা না হইলে (২:২২৮) অনুযায়ী ‘সমান’ অথবা ‘একইরূপ অধিকারের’ কোন অর্থ হয় না। ইহা ব্যতীত নিম্নলিখিত আয়াতটিও উল্লেখযোগ্য:

(৬৫:৬,৭) (সুতরাং) যে সমস্ত নারীরা (অপেক্ষা-কাল) অতিবাহিত করিতেছে, তোমরা যেমন বাস করিতেছ, তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী তাহাদিগকে তদনুরূপ বাস করিতে দাও; এবং তাহাদের জীবন তিক্ত হয় এইরূপ উদ্দেশ্য লইয়া তাহাদিগকে হয়রান করিও না। এবং তাহারা সন্তানসম্ভবা হইলে, সন্তান প্রসব না করা পর্যন্ত তাহাদের উদ্দেশ্যে মুক্ত হস্তে ব্যয় কর; (বিচ্ছেদ চূড়ান্ত হওয়ার পরও) যদি তাহারা তোমার শিশুকে পালন করে, তাহাদিগকে তাহাদের (ন্যায্য) পরিশোধ কর; এবং (শিশুর ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে) একে অন্যের সহিত ন্যায়োচিত পরামর্শ কর। এবং (মায়ের পক্ষে শিশুকে লালপালন করিবার ব্যাপারে) যদি তোমরা কোন অসুবিধার সম্মুখীন হও, তবে তাহার তরফ হইতে অন্য কোন নারীকে শিশুটিকে লালপালন করিতে নিয়োগ করো। (এই সমস্ত ব্যাপারে) যাহার প্রচুর সামর্থ্য আছে সে তাহার সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করুক; এবং যাহার জীবিকা নির্বাহের আর্থিক সংস্থান অতি অল্প সে আল্লাহর প্রদত্ত সামর্থ অনুযায়ীই ব্যয় করুক: আল্লাহ্ কোন মানুষকেই যাহা দিয়াছেন তাহার উপর তাহার অতিরিক্ত কোন ভারই ন্যস্ত করেন না — (এবং এমনও হইতে পারে যে) দুরাবস্থার পর আল্লাহ্ স্বস্তি দান করিবেন।

বিবাহ বিচ্ছেদ পদ্ধতির উপর অন্যান্য আয়াতসমূহ নিম্নরূপ:

(২:২২৯) তালাক উচ্চারণ কেবলমাত্র দুইবারই করা চলিবে: ইহার পর উভয় পক্ষের উচিৎ হইবে সমকক্ষভাবে বাস করা অথবা সহানুভূতির সহিত পৃথক হওয়া। দুই পক্ষেরই যদি শঙ্কা থাকে যে তাহারা আল্লাহর নির্ধারিত সীমা রক্ষায় অসামর্থ্য হইবে সেইরূপ অবস্থা ব্যতীত, (তোমাদের স্ত্রীদিগের) নিকট হইতে কোনরূপ দানসামগ্রী ফিরত লওয়া বৈধ হইবে না। যদি তোমরা সত্যই শঙ্কিত হও যে তাহারা আল্লাহর নির্ধারিত সীমা রক্ষা করিতে অসামর্থ্য হইবে, তাহা হইলে সেই স্ত্রী যদি তাহার স্বাধীনতার বিনিময়ে কোন কিছু ফিরত দেয় তাহা তোমাদের কাহারও পক্ষে দোষের হইবে না। এই সকলই আল্লাহর নির্দেশিত সীমা [...]

(৬৫:২) সুতরাং তাহারা যখন তাহাদের অপেক্ষাকালের প্রায় নিকটবর্তী হইবে, তখন তাহাদিগকে হয় সঙ্গতরূপে বজায় রাখ অথবা সঙ্গতরূপে বিদায় দাও। এবং তোমাদের মধ্য হইতে ন্যায়পরায়ণ হিসাবে জ্ঞাত দুইজন ব্যক্তি (তাহাদের সিদ্ধান্তের) সাক্ষ্য থাকুক; এবং তোমরাও আল্লাহর সম্মুখে সত্যরূপে সাক্ষ্য রাখিও [...]

(২:২৩০) এবং যদি সে স্ত্রীকে চূড়ান্তভাবে (তৃতীয়বার) তালাক দেয়, তাহার পর সেই নারী তাহার জন্য বৈধ হইবে না; যদি না সে অন্য কাহাকেও স্বামীরূপে লয়, এবং সেই স্বামী তাহাকে পরে তালাক দেয়, এবং তাহারা দুইজন যদি পুনরায় একত্র হয়, তাহাদের কাহারও ইহাতে পাপ হইবে না — এই শর্তে যে দুইজনই এইরূপ চিন্তা করে যে তাহারা আল্লাহর নির্দ্ধারিত সীমার মধ্যে অবস্থান করিতে পারিবে।

উপরে টিকার উল্লেখ মতো স্ত্রীরও বিচ্ছেদের অধিকার আছে। সে যদি স্বামী কর্তৃক পরিত্যক্তা বা নিগৃহীতা হইবার সম্বন্ধে শঙ্কা বোধ করে, তবে সে বিচ্ছেদ ব্যবস্থার সূচনা করিতে পারে। যদিও, সম্ভব হইলে, বিচ্ছেদের পূর্বে তাহাদের দুইজনেরই মতপার্থক্যের আপসে নিষ্পত্তির চেষ্টা করা উচিৎ হইবে। আত্মস্বার্থই এইরূপ নিষ্পত্তির প্রধান বাধা।

(৪:১২৮) এবং যদি কোন নারীর তাহার স্বামীর পক্ষ হইতে দুর্ব্যবহার, অথবা স্বামীর তাহার প্রতি বিমুখ হইতে পারে, এইরূপ আশঙ্কা করিবার কারণ থাকে, তবে উভয়ের পক্ষে শান্তিপূর্ণভাবে সমস্ত কিছুর সঠিক নিষ্পত্তি করা দোষের হইবে না: কারণ শান্তিই সর্বাপেক্ষা উত্তম, এবং মানুষের অন্তরে স্বার্থপরতা সর্বদাই বিরাজমান। কিন্তু যদি তোমরা সৎকর্ম কর এবং তাহার (আল্লাহ্) সম্বদ্ধে সচেতন হও — তবে জানিবে যে তোমরা যাহা কিছুই কর আল্লাহ্ তাহা সম্বন্ধে বাস্তবিকই সচেতন।

যদি আপস সম্ভব না হয়, তাহা হইলে পূর্বে বর্ণিত ৪:৩৫ আয়াত অনুযায়ী দুইজন (স্ত্রীর পক্ষ হইতে একজন ও স্বামীর পক্ষ হইতে একজন) সদিচ্ছা ও সুষ্ঠু বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিকে নিয়োগের মাধ্যমে সালিশের ব্যবস্থা হইতে পারে। যদি ইহাও ব্যর্থ হয় তখন একমাত্র পথ হইল বিচ্ছেদ, যাহা নিম্নে বর্ণিত আয়াত উল্লেখ করে:

(৪:১৩০) এবং যদি স্বামী ও স্ত্রী পৃথক হয়, আল্লাহ্ তাঁহার অফুরন্ত ভাণ্ডার হইতে তাহাদের প্রত্যেকের জন্যই জীবন ধারণের উপকরণ সরবরাহ করিবেন: আল্লাহ্ বাস্তবিকই অসীম, জ্ঞানী।

ইহা ব্যতীত এই সকল ক্ষেত্রে, প্রয়োজন হইলে, আল্লাহ্ নির্দেশিত সীমার মধ্যে আনিবার জন্য, একজন নারী তাহার যৌতুক বা বিবাহজনিত দান সামগ্রীর আংশিক বিনিময়ে নিজেকে মুক্ত করিতে পারে (উপরে বর্ণিত ২:২২৯ আয়াত দ্রষ্টব্য)।





Home Next >>