৮.৪ নারীর অধিকার



ইসলামের নারীর অধিকার সম্বন্ধে পাশ্চাত্য দেশে বহু ভুল ধারণা বর্তমান আছে। কোরানের শিক্ষা সম্বন্ধে অজ্ঞতা এবং মুসলিম ও অমুসলিম উভয়ের দ্বারা ইসলাম সম্বন্ধে সাধারণ ভাবে ভুল বা মিথ্যা প্রচারণার জন্য, ইহাতে আশ্চর্য হইবার কিছুই নাই। ইহাও সত্য যে পাশ্চাত্য গণতন্ত্র পশ্চিম দেশসমূহে নারীকে যে স্বাধীনতা ও সম অধিকার দেওয়া হইয়াছে তাহা সম্বন্ধে প্রায়শঃই গর্ব করিয়া থাকে। বাস্তব পরিস্থিতিতে কি হইয়া থাকে তাহা জানিবার জন্য এই দাবী যাচাই করিবার প্রয়োজন আছে। পাশ্চাত্য সমাজে স্ত্রীলোকের বাস্তব অবস্থা কী, কতকগুলি তথ্যের উপর দৃষ্টিপাত করিলে তাহা সহজবোধ্য হইতে পারে এবং ইহার পরে কোরানের নির্দেশ অনুযায়ী ইসলামে নারীর প্রতি কিরূপ ব্যবহার করা হয় তাহা আলোচনা করা যাইতে পারে।

উদাহরণ স্বরূপ যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত তথ্যগুলি লক্ষণীয়:

১. যদিও পুরুষ অপেক্ষা নারীরা সংখ্যায় অধিক তবুও তাহারা স্বল্পই উচ্চপদ-অধিকারী, এবং সমতুল্য পদে নারীরা পুরুষের সমান হারে বেতন পায় না। ১৯৯৮ ডিসেম্বর সংখ্যা ‘লেবার মার্কেট ট্রেন্ড’ পত্রিকার ৬২৬ পৃষ্ঠায় ১৯৯৮ সালে এপ্রিল মাসে যুক্তরাজ্যের বয়স্ক পূর্ণমেয়াদী কর্মচারীর গড় বেতনের হার পাওয়া যায়: অশ্রমিক পুরুষ ৫০৬ পাউন্ড; অশ্রমিক নারী ৩৩০ পাউণ্ড; শ্রমিক পুরুষ ৩২৮ পাউণ্ড; এবং শ্রমিক নারী ২২১ পাউণ্ড।

. পার্লিয়ামেন্টে ছয়শতের অধিক সদস্য সংখ্যার মধ্যে মহিলা সদস্যার সংখ্যা অকিঞ্চিৎকর এবং হাউস অব লর্ডস্ সম্বন্ধেও একইরূপ উক্তি করা যায়। সোশ্যাল ট্রেণ্ডস (সামাজিক প্রবণতা) ২৮, ১৯৯৮ এর পৃ: ২২৯ এ দেখিতে পাওয়া যায় যে ১৯৯৭ এর নভেম্বরের শেষে পার্লিয়ামেন্টে মহিলা সদস্যার সংখ্যা সর্বমোট সংখ্যার ১৮ শতাংশ মাত্র।

. যৌনঘটিত ব্যবসা ব্যাপক এবং ইহার সহিত যে যৌন ব্যভিচার বিজড়িত তাহা স্বাধীনতার নামে প্রায়শঃই গোপন করা হয়। ইহা ব্যতীত নারীরা পুরুষ অপেক্ষা অধিকতর যৌননিগ্রহের শিকার হইয়া থাকে।

. সমাজ-জীবনে যে লাগামহীন যৌন-স্বাধীনতা প্রচলিত তাহার ফলে বিবাহ বিচ্ছেদের হার অতি উচ্চ পর্যায় উপনীত হয়। ইহার পশ্চাতের ভাবধারা এই যে, যতক্ষণ না কোন সমস্যায় পতিত হওয়া যায় ততক্ষণ পর্যন্ত সবকিছুই সঠিক চলিতেছে মনে করা। যৌন-জীবনের নৈতিক দিক সম্পূর্ণরূপে অবহেলিত। সোশ্যাল ট্রেণ্ডস ২৮, ১৯৯৮ এর ৪১ পৃ: হইতে নিম্নে কতকগুলি পরিসংখ্যান দেওয়া হইল।

সহবাস: কখনও বিবাহ করিয়াছে এইরূপ নরনারীর একচতুর্থাংশই বিবাহের পূর্বে সহবাস করিয়াছে এবং দ্বিতীয় বার বিবাহের পূর্বে শতকরা ৬৯ ব্যক্তি সহবাস করিয়াছে।

পরিবার: কেবল পিতা অথবা কেবল মাতা আছে, নাবালক শিশুসহ পরিবার সমূহের মধ্যে যুক্তরাজ্যে এইরূপ পরিবারের সংখ্যা শতকরা ২১ ভাগ। এই সংখ্যা ১৯৭১ সালের তুলনায় তিনগুণ বৃদ্ধি পাইয়াছে।

গৃহস্থালী: নাবালক শিশুসহ বিবাহিত দম্পতি বাস করে এইরূপ গৃহস্থালীর সংখ্যা ১৯৭১ হইতে ২৫ বৎসরে ৩৮ শতাংশ হইতে ১৯৯৬-৯৭ সালে শতকরা ২৫ ভাগে নামিয়া আসিয়াছে।

. সর্বশেষে উক্ত কিন্তু সামান্য নয়, অশ্লীল-রচনা-চিত্র, ভিডিও এবং ব্লু-ফিল্ম বা নীল ছবির ব্যবসায় ঘটিত অবাধ শোষণ। পছন্দের স্বাধীনতার নামে এইগুলি সহজেই প্রাপ্তিযোগ্য। নীতিজ্ঞান বর্জিত মানুষের দ্বারা প্রতারিত হইয়া তাহাদের শরীরের অপব্যবহারের জন্য নারীরা যে কি মূল্য দেয় তাহা পরিমাপ করা কঠিন।

উপরের বক্তব্যগুলি উল্লেখ সম্বন্ধে আমার উদ্দেশ্য নারীর স্বাধীনতা ও সম-অধিকার সম্বন্ধে পাশ্চাত্যের দাবী যে কাল্পনিক মাত্র তাহাই প্রকট করা। কোরানে বর্ণিত নারীর অধিকার পর্যালোচনা করিলে আমরা ইহার ভঙ্গিতে একটি মৌলিক পার্থক্য দেখিতে পাই। ভণ্ডামিপূর্বক কিছুই না করিবার পরিবর্তে কোরান বাস্তব অবস্থা অনুযায়ী ইহার ব্যবস্থা নেয় এবং নারীর অধিকারকে সেই প্রসঙ্গেই সংরক্ষণ করে। তবুও কোরানে নারী ও পুরুষকে সমান আলোকে দেখা হয় না বলিয়া প্রায়ই অভিযোগ পাওয়া যায়। ইহার সমর্থনে যে সমস্ত আয়াত উল্লেখ করা হয় তাহা নিম্নরূপ:

(২:২২৮) [...] (স্বামীর প্রসঙ্গে) স্ত্রীদিগের অধিকার তাহাদের প্রসঙ্গে তাহাদের (স্বামীদিগের) অধিকারের সমান যদিও তাহাদের উপর পুরুষদের কিছু অতিরিক্ত (প্রাধান্য) আছে। আল্লাহ সর্বশক্তিমান ও জ্ঞানী। (৯৯ পৃষ্টায় টিকা দ্রষ্টব্য)

(৪:৩৪) পুরুষেরা নারীর প্রতিপালক, কারণ আল্লাহ্ তাহাদের মধ্যে একের অপেক্ষা অপরকে উত্তম করিয়াছেন, এবং যেহেতু তাহারা নারীদের প্রতিপালনে স্বীয় ধন-সম্পদ হইতে ব্যয় করে [...]

(২:২৮২) তোমরা যাহারা বিশ্বাসী! যখন তোমরা একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ঋণ কর, তখন তাহা লিখিতভাবে নথীভুক্ত কর। কোন লেখক তোমাদের মধ্যে ন্যায়ের ভিত্তিতে তাহা লিখিতভাবে লিপিবদ্ধ করুক। এবং সাক্ষ্য হিসাবে তোমাদের পুরুষদিগের মধ্য হইতে দুইজন সাক্ষী ডাক। এবং যদি দুইজন পুরুষ (নিকটে) না পাওয়া যায় তাহা হইলে একজন পুরুষ ও দুইজন নারী, এমন হইবে যাহাদিগকে সাক্ষী হিসাবে তোমরা মান্য করিতে পার, যাহাতে একজন ভুল করিলে অপরজন তাহা স্মরণ করিবে [...]

প্রথম দুইটি আয়াতের প্রসঙ্গে মানুষের কর্মকাণ্ডে আল্লাহর ভূমিকা পরীক্ষার প্রয়োজন আছে। এই বিষয়ে কোরান (২০:৫০), (১৬:৬৮), (৬:৩৮), (২৪:৪১), (৪১:১২) এবং অন্যান্য অনেক আয়াতে স্পষ্ট বক্তব্য দিয়াছে, তাহা হইতে (২০:৫০) আয়াত নিম্নে উদ্বৃত হইল।

(২০:৫০) [...] আমাদের রব্ব তিনিই, যিনি প্রতিটি (সৃষ্ট) বস্তু (বা জীবকে) ইহার আকার ও প্রকৃতি দিয়াছেন, এবং অধিকন্তু (ইহাকে) পথ-নির্দেশ দিয়াছেন।

সুতরাং (২০:৫০) আয়াত অনুযায়ী আল্লাহ্ পুরুষকে একটি আকার ও প্রকৃতি দিয়াছেন যাহা নারীর আকার ও প্রকৃতি হইতে ভিন্ন। বস্তুতঃ পুরুষ ও নারীর আকৃতি ও প্রকৃতি হইতেছে একটি অপরটির পরিপূরক, এবং একত্রে সুখী ও সুষম জীবন যাপনের জন্য, এ বিষয়ে একে অন্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শনই সর্বোৎকৃষ্ট আপোষজনক সমাধান। তবে এই আকৃতি ও প্রকৃতি নারী ও পুরুষের বুদ্ধিমত্তার সহিত একত্র করা উচিৎ হইবে না কারণ এ বিষয়ে কোন পার্থক্য নাই (অনতিপরে উদ্ধৃত ৩৩:৩৫ আয়াত দ্রষ্টব্য)। পুরুষকে প্রদত্ত প্রকৃতির একটি হইল তাহার শারীরিক ক্ষমতা যাহার দ্বারা পরিসংখ্যানগতভাবে সে (নারীর) ভরণপোষণের অগ্রাধিকারীর অংশ নেয় (কিন্তু কোরানের কিছু কিছু অনুবাদে বর্ণিত শাসক হিসাবে নয়)। পুরুষের কর্তৃত্বব্যঞ্জক অংশকে প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে কোরান নারীর অর্থনৈতিক স্বাতন্ত্র্যের উৎসাহ দেয়, এই অর্থে যে নারীর আয় তাহার নিজস্বই থাকিবে এবং সাংসারিক ব্যয়নির্বাহের সহিত তাহা মিশ্রিত করিবার প্রয়োজন নাই।

(৪:৩২) [...] পুরুষের অর্জিত সম্পদ তাহাদের অংশ, এবং নারীর অর্জিত সম্পদ তাহাদের অংশ, (একে অন্যকে হিংসা করিও না) বরং আল্লাহর প্রাচুর্যের দান চাহিয়া লও। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ সমস্ত বস্তু সম্বন্ধেই সদা সচেতন।

বাস্তব পরিস্থিতি এই যে জীবনের অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুরুষরা যে নিয়ন্ত্রণ কায়েম করিয়াছে, এই পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে পরিসংখ্যানগতভাবে তাহারাই সমাজের দখলকার। ইহার অর্থ এই নয় যে, নারীরা কখনই দেশের উচ্চতম পদসমূহের অধিকারী হইবে না, কিন্তু সংখ্যাগতভাবে অধিকাংশ সমাজেই গুরুত্বপূর্ণ পদসমূহের সর্বাধিক অংশ পুরুষেরাই দখল করিবে, অতএব তাহারাই নারীর উপর অর্থনৈতিক ও পূঁজিঘটিত নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখিবে। তবুও ইহার অর্থ এই নয় যে নারীরা বুদ্ধিগত বা আধ্যাত্মিকভাবে হীন। কোরান নিম্নে উদ্ধৃত আয়াতে তাহা পরিস্কার ভাবে উল্লেখ করে।

(৩৩:৩৫) নিশ্চই! আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণকারী পুরুষ, এবং আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণকারী নারী, বিশ্বাসী পুরুষ ও বিশ্বাসী নারী, অনুগত পুরুষ ও অনুগত নারী, সত্যভাষী পুরুষ ও সত্যভাষী নারী, (ন্যায়পথে) ধৈর্যশীল পুরুষ ও ধৈর্যশীলা নারী, বিনয়ী পুরুষ ও বিনয়ী নারী, দানশীল পুরুষ ও দানশীলা নারী, রোজাদার পুরুষ ও রোজাদার নারী, লজ্জাস্থান সংরক্ষণকারী পুরুষ ও লজ্জাস্থান সংরক্ষণকারিণী নারী, এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী পুরুষ ও অধিক স্মরণকারী নারী–আল্লাহ্ তাহাদের জন্য ক্ষমা ও প্রকাণ্ড প্রতিদান প্রস্তুত রাখিয়াছেন।

(১৬:৯৭) যে কেহই ন্যায় কর্ম করে পুরুষ অথবা নারী, এবং বিশ্বাসী, তাহাকে সত্বরই আমরা উত্তম জীবন দিব; এবং সে যাহা করিত সেই অনুপাতে আমরা (আল্লাহ্) তাহাকে প্রতিদান দিব।

অতএব পুরুষ যাহা হইতে পারে অথবা করিতে পারে কোরানে নারীকে অনুরূপ সামর্থ্যই দেওয়া হইয়াছে। পূর্বে উদ্বৃত (২:২৮২) আয়াতের পরিপ্রেক্ষিতে সমালোচনার সম্বন্ধে, (অর্থাৎ একটি পুরুষ সাক্ষীর পরিবর্তে দুইটি নারী সাক্ষীর প্রয়োজন কেন সে বিষয়ে) কয়েকটি সম্ভাব্য উত্তর আছে যাহার মধ্যে দুইটি নিম্নে দেওয়া হইল:

পুরুষের জন্যও কোরান সাক্ষী হিসাবে দুইটি পুরুষের আদালতে উপস্থিতির প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করিয়াছে। যদি একজন সাক্ষীর এজাহারে অসম্পূর্ণতা থাকে অন্য সাক্ষী তাহা পূরণ করিতে পারে — অর্থাৎ কোনও সম্ভাব্য ঘাটতি পূরণ করিতে পারে। ইহা এক ব্যক্তির বিবৃতির অন্যের দ্বারা সমর্থনসূচক। দুইটি নারী সাক্ষীর ক্ষেত্রেও অনুরূপ। পুরুষের তুলনায় লজ্জা নারীর একটি বিশেষ প্রাকৃতিগত বৈশিষ্ট্য। এইরূপ অবস্থায় একজন নারীর অবশ্যই অপর একজন পরিচিত নারীর প্রয়োজন হইবে যে তাহার পার্শ্ববর্তিনী হইয়া তাহার এজাহারে সমর্থন দিবে।

আয়াত ২:২৮২ কেবলমাত্র অর্থঘটিত অথবা ব্যবসায়ঘটিত আদান প্রদানের প্রতি ইঙ্গিত দেয় (যেখানে ২৪:৮ আয়াতে আমরা লক্ষ্য করি নারী একাকীই সাক্ষী হইতে পারে)। যেহেতু ঐতিহ্যগতভাবে পুরুষেরাই উপার্জনকারী এবং সংসার চালনায় আইনত দায়িত্ববদ্ধ, এইরূপ ধারণা করা যুক্তিসঙ্গত যে (পরিসংখ্যানগতভাবে বলিতে গেলে) তাহারাই বাণিজ্যঘটিত আদান-প্রদানের সহিত অধিকতর পরিচিত হইবে। নারীর ব্যবসা ঘটিত বিষয় সংরক্ষণের স্বার্থে তাহার একটি সহ-সাক্ষীর জন্য সুপারিশ করা হইয়াছে। লক্ষণীয় যে পুরুষের জন্যও একই সুপারিশ করা হইয়াছে।

কোরান বিবাহ বিচ্ছেদ (তালাক) অনুমোদন করেনা কিন্তু যখন অন্য সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হইয়াছে তখন ইহা প্রয়োজন বলিয়া গণ্য করে। এই সুত্রে কোরান বিশ্বাসীদিগকে অত্যন্ত সাবধান হইতে সতর্ক করে এবং স্বামীর স্ত্রীর মধ্যে চরম মতানৈক্যের ক্ষেত্রে সমন্বয় সাধনের জন্য উভয় পক্ষকে যে যে পদক্ষেপ লইতে হইবে তাহার নির্দেশ দিয়াছে। বস্তুতঃ পক্ষে ইসলামে তালাকের পদ্ধতি এমনই যে তাহা সমন্বয় সাধনের পক্ষেই উৎসাহ দেয় (৮.৫ দ্রষ্টব্য)।

বিবাহের ক্ষেত্রে একটি সাধারণ ভুল ধারণা এই যে ইসলামে একজন পুরুষ একই সঙ্গে চারিটি বিবাহ করিতে পারে। এ ভুল ধারণার উৎপত্তি হাদিস হইতে। বাস্তবে কোরান এক বিবাহের পক্ষেই উৎসাহ দেয় এবং বহুবিবাহ ব্যতিক্রম বলিয়া গণ্য করে (৮.৬ দ্রষ্টব্য)। মূল বিবেচনার বিষয় এই যে, যদিও সমাজে পুরুষের শক্তি ও প্রতিপত্তি বেশী, সমস্ত মানবিক বিষয়েই নারীর প্রতি আচরণে সাম্য বজায় রাখিতে হইবে। আমাদের দৈনন্দিন আচরণ সম্বন্ধে কোরান দৃঢ় নির্দেশ দেয় এবং এ বিষয়ে অবহেলার বিরুদ্ধেও দৃঢ়ভাবে সতর্ক করে।

সুরা ৪ এর ৭-১৩ নং আয়াতে উত্তরাধিকার সম্বন্ধীয় নিয়ম ও বিধান দেয়। যাহা হউক, ইহা লক্ষ্য রাখা, সকল ক্ষেত্রেই, গুরুত্বপূর্ণ যে উত্তরাধিকারের প্রয়োগ কেবলমাত্র মৃতের উইল কার্যকরী হওয়া ও তাহার সমস্ত ঋণ পরিশোধের পরেই সম্ভব। নারীর অংশ সম্বন্ধে বলা যায় যে তাহারা সাধারণতঃ পুরুষদের অংশের অর্ধেক পাইবার অধিকারী। ইহা অন্যায় নহে কারণ নারীকে তাহার অংশ কেবল তাহারই জন্য রাখিতে অনুমতি দেওয়া হইয়াছে; পরিবর্তে পুরুষকে তাহার সংসারের ব্যয়নির্বাহ করিতে হইবে। ৪:৩৪ আয়াত (এই অনুচ্ছেদে পূর্বেই উদ্বৃত হইয়াছে) ইহার সমর্থন দেয়। নিম্নে উদ্বৃত আয়াতও লক্ষণীয়:

(২:২৩৩) মাতারা তাহাদের শিশুদের পুরা দুই বৎসর যাবৎ স্তন্যপান করাইবে: (অর্থাৎ) যাহারা স্তন্যপান ক্রিয়া সম্পূর্ণ করিতে চাহে। সন্তান পালনকারী মাতাদের যথাযোগ্য অন্নবস্ত্র সংস্থানের দায়িত্ব সন্তানের পিতার। কাহারও উপর তাহার সামর্থ্যের অধিক ভার ন্যস্ত করা ঠিক হইবে না।

আরও বহু আয়াতে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে আল্লাহর দৃষ্টিতে — নারী ও পুরুষের মর্যাদা সমান, এবং এইগুলি আমাদের ব্যবহার সম্বন্ধে সুস্পষ্ট নির্দেশ দিতে পারে। এমনকি শাস্তি এবং পুরস্কারের ক্ষেত্রেও সাম্য নীতির নিদর্শন পাওয়া যায়, নিম্নের উদাহরণ লক্ষণীয়:

(৪৮:৫,৬) যাহাতে তিনি বিশ্বাসী পুরুষ এবং বিশ্বাসী নারীদিগকে নদীপ্রবাহ পার্শ্বের উদ্যানে স্থান দিতে পারেন, যেখানে তাহারা বাস করিবে, এবং তিনি তাহাদিগকে তাহাদের কুকর্মের ফল হইতে মুক্তি দিতে পারেন — তাহা আল্লাহর দৃষ্টিতে সর্বাপেক্ষা গৌরবময় — এবং যাহাতে তিনি কপট পুরুষ এবং কপট নারীদিগকে এবং মূর্তিপূজারী পুরুষ ও মূর্তিপূজারী নারীদিগকে শাস্তি দিতে পারেন, যাহারা আল্লাহর সম্বন্ধে অসাধু চিন্তা করে [...]

বস্তুতঃ উপরের আয়াতের ন্যায় আয়াত কোরানে প্রায়শঃই লক্ষ্য করা যায়। তা সত্ত্বেও কোরানের দুর্ণামকারীরা (উৎকট পুরুষত্বের তথাকথিত উদাহরণ হিসাবে) একটি বিষয় প্রায়ই উল্লেখ করিয়া থাকে যে কোরানে অনেকগুলি আয়াত আছে যাহাতে বলা হইয়াছে বিশ্বাসী পুরুষদিগকে বেহেশতে সুন্দর আয়াতলোচনা সহচরী (হুরী) দেওয়া হইবে। প্রাধানতঃ নিম্নলিখিত আয়াতগুলির ভুল অনুবাদ এবং ভুল ব্যাখ্যাই ইহার কারণ:

(২:২৫) [..] সেখানে তাহাদের জন্য নিষ্পাপ সঙ্গী (যউজ) থাকিবে; সেখানে তাহারা অনন্তকাল থাকিবে।

(৪৪:৫৪) এমনকি (ইহাও হইবে)। এবং আমরা তাহাদিগকে সুন্দর বিশালনয়নযুক্ত (হুর-আয়ীন) সঙ্গীদিগের (যউজ) সহিত যুক্ত করিব।

(৫২:২০) (তাহারা) পরস্পর সুসজ্জিত আরাম-কেদারায় হেলান দিয়া থাকিবে। এবং আমরা তাহাদিগকে বিশাল সুনয়না সঙ্গীদিগের (যউজ) সহিত যুক্ত করিব।

(৫৬:২২-২৪) এবং (সেখানে থাকিবে) সুন্দর বিশালনয়নযুক্ত (হুর-আয়ীন) সঙ্গীগণ (যউজ), (কোষ রক্ষিত) গুপ্ত মুক্তার ন্যায়, তাহারা যাহা করিত তাহার পুরস্কার হিসাবে।

যউজ শব্দের অর্থ “জুড়ির একটি”, এবং ইহা উভয় লিঙ্গের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। সুতরাং “জুড়ির একটি” অর্থে অনুবাদ না করিয়া “সঙ্গী” হিসাবে অনুবাদ করাই শ্রেয় যাহা পুরুষ এবং নারী উভয়ের ক্ষেত্রেই অর্থপূর্ণ।

“হুর” শব্দের যথার্থ অর্থ হইল, “চক্ষুর শ্বেত অংশ এবং কণীনিকার মধ্যে লক্ষণীয় বৈসাদৃশ্য”। অতএব “হুর-আয়ীন” শব্দের যথোপযুক্ত অনুবাদ “সুন্দর বিশালনয়নযুক্ত” বলা যায়। অধিকন্তু “হুর” শব্দ বহুবচন অর্থে ব্যবহৃত হয় এবং পুরুষ ও নারী উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। ইহার স্ত্রীলিঙ্গ “হাওরা” এবং পুংলিঙ্গ “আহআর”।

সুতরাং উপরে উল্লিখিত আয়াতগুলিতে যাহা বলা হইয়াছে তাহা ন্যায়নিষ্ঠ বিশ্বাসীদিগের উপলক্ষে এবং স্ত্রী পুরুষ হিসাবে বিশেষ পার্থক্য করা হয় নাই।

জনসমাজে নারীদিগের পর্দা অবলম্বন সম্বন্ধে বলা যায় যে স্ত্রীলোককে অপর পুরুষের উপস্থিতিতে সম্পূর্ণ আচ্ছাদিত থাকিতে হইবে ইহার কোন উল্লেখ কেরানে নাই। বস্তুতঃ নম্রতা পুরুষ ও নারী উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, নারীর ক্ষেত্রে অধিক গুরুত্ব দেওয়ার কারণ সমাজে তাহাদের অবস্থান স্বভাবতঃই দুর্বল (৮.৭ দ্রষ্টব্য)। মুসলিম সমাজ-জীবনে পুরুষের নারীবান্ধবী বা নারীর পুরুষবন্ধু, অবাধ যৌনমিলন, নারী পুরুষের নৃত্য, মদ্যপান এবং এইরূপ আরও অন্যান্য বিষয় যাহা হইতে বিবাহ-পূর্ব অথবা বিবাহ বহির্ভূত যৌন সম্বন্ধের হরহামেশাই উৎপত্তি হইয়া থাকে সমস্তই নিষিদ্ধ।

পরিশেষে, যাহা বিশেষ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করিতে হয়, তাহা এই যে, সেবা এবং যত্নের মাধ্যমে সংসারকে একত্র রাখিবার মাধ্যমে পরিবারের মধ্যে নারী একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানের অধিকারী। শিশুদিগের এবং পিতামাতা অথবা পিতামহ পিতামহী ইত্যাদির মধ্যে স্নেহসুলভ সম্বন্ধ শিশুদের পরবর্তী জীবনে দীর্ঘকালীন স্থায়ীত্ব দিয়া থাকে; এবং এই সকল ব্যাপারেই নারীর অবস্থান অত্যন্ত বৈশিষ্ট্যপূর্ণ।

(৩১:১৪) এবং পিতামাতা সম্বন্ধে মানুষের উপর আমরা নির্দেশ দিয়াছি–তাহার মাতা তাহাকে দুর্বল হইতে দুর্বলতর অবস্থায় পালন করিয়াছে, এবং তাহার মাতৃস্তন্যপান দুইবৎসর পর্যন্ত–আমাকে এবং তোমার পিতামাতাকে ধন্যবাদ দাও। তোমাদের যাত্রা আমারই অভিমুখে।





Home Next >>