৮.৩ কোরান কি স্ত্রীলোকদের প্রহারের বিধান দেয়?



সর্বাপেক্ষা সফল বিবাহেও মধ্যে মধ্যে স্বামী-স্ত্রীদের ভিতর মনোমালিন্য ও বিভেদের উদ্ভব হয়। ইহার ফলে কখনও কখনও স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে প্রহৃতও হইতে হয়; কিন্তু ইহার স্বপক্ষে কোরানের বিধানের যে কথা বলা হয় তাহা আয়াত (৪:৩৪) এর ভুল ব্যাখ্যার জন্য। নিম্নে এই আয়াত উল্লেখ করা হইল এবং কেন ইহার ঐতিহ্যগত অনুবাদ ভুল তাহার ব্যাখ্যা দেওয়া হইল।

(৪:৩৪) ঐ সমস্ত স্ত্রীলোক যাহাদের সম্বন্ধে তোমরা বিরূদ্ধাচরণের (নুশুয) ভয় কর, তাহাদের তিরস্কার কর এবং পৃথক শয্যায় শয়নের ব্যবস্থা কর (এবং পরিশেষে) তাহাদের প্রহার (আদরিবূ) কর। তারপর যদি তাহারা বাধ্য হয়, তাহাদের বিরূদ্ধে কিছু করিও না।

এই সমস্যার মূলে দুইটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ‘নুশুয’ ও ‘আদিরবূ’র ভুল অনুবাদ। এই শব্দ দুইটির অভিধান অনুযায়ী কয়েকটি সম্ভাব্য অনুবাদ নিম্নে দেওয়া হইল। যথাযথ অর্থ অবশ্যই আয়াতটির প্রসঙ্গের উপর নির্ভর করিবে

নুশুয: বিদ্বেষ, শত্রুতা, বিদ্রোহ, দুর্ব্যবহার, মতানৈক্য, স্বামী বা স্ত্রীর বৈবাহিক কর্তব্য লঙ্ঘন।

আদরিবূ (মূল দারাবা): প্রহার করা, আঘাত করা, পৃথক হওয়া, বিচ্ছিন্ন হওয়া ইত্যাদি।

উপরের আয়াতের প্রসঙ্গে বিবেচনা করিলে ‘নুশুয’ শব্দের যথাযথ অর্থ হইবে স্বামী স্ত্রীর বিবাদ (অসম্প্রীতি বা মনোমালিন্য), এবং ‘আদরিবূ’ শব্দের অর্থ পৃথক হওয়া বা বিচ্ছিন্ন হওয়া। অন্যথায় ইহা কোন প্রকার মিটমাটের ব্যবস্থা না রাখিয়া তালাক আমন্ত্রণ করিবার সামিল হইবে; যাহা নিম্নে বর্ণিত আয়াত (৪:৩৫) অনুযায়ী কোরানের নির্দেশের পরিপন্থি। পুনর্মিলন প্রক্রিয়ার উপর নির্ভর করিয়া, বিচ্ছেদ সাময়িক অথবা চিরস্থায়ী হইতে পারে, যাহা কোরানে নির্দেশিত (৮.৫ দ্রষ্টব্য) বিবাহ বিচ্ছেদ প্রক্রিয়ার সহিত উত্তমরূপে মিলিয়া যায়। সুতরাং উপরের আয়াতের আরও সঠিক অনুবাদ হইবে:

(৪:৩৪) [...] ঐ সমস্ত স্ত্রীলোক যাহাদের বিদ্বেষ অথবা অসদিচ্ছাকে তোমাদের ভয় করার কারণ রহিয়াছে, তাহাদিগকে শয্যায় একাকী থাকিতে দাও, এবং তাহার পর পৃথক হও, এবং যদি তাহাতে তাহারা তোমাদের প্রতি মনোযোগী হয়, তাহাদের বিরূদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করিও না।

উপরের আয়াতের পরবর্তী আয়াত, উপরোক্ত অনুবাদকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে।

(৪:৩৫) এবং যদি তোমরা তাহাদের (স্বামী-স্ত্রীর) মধ্যে কোনপ্রকার বিভেদের ভয় কর, তাহা হইলে স্বামীর পক্ষ হইতে একজন বিচারক ও স্ত্রীর পক্ষ হইতে একজন বিচারক নিয়োগ কর।

যদি তাহারা সংশোধন চায়, আল্লাহ্ তাহাদের মতৈক্য সাধন করিবেন। স্মরণ রাখিও আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ, সদা-জাগ্রত।

নিম্নে উদ্ধৃত (৪:১২৮) আয়াত উপরে নির্দেশিত ব্যাখ্যাসমূহকে আরও গুরুত্ব দেয়। এই আয়াতে একজন পুরুষের প্রসঙ্গে একই শব্দ ‘নুশুয’ ব্যবহৃত হইয়াছে; কিন্তু ইহার অনুবাদ করা হয় ‘দুর্ব্যবহার’ রূপে, স্ত্রীলোকের ক্ষেত্রে ‘বিদ্রোহ’ অনুবাদের বিপরীতে (৪:৩৪ আয়াতে)। এবং যেহেতু দুর্ব্যবহার স্বামীর পক্ষ হইতে হইয়াছে, সেজন্য পুনর্মিলন প্রক্রিয়াকে উৎসাহিত করা হয়।

(৪:১২৮) যদি স্ত্রী স্বামীর পক্ষ হইতে দুর্ব্যবহার (নুশুয) বা পরিত্যক্ত হইবার ভয় করে সেক্ষেত্রে যদি তাহারা নিজেদের মধ্যে একটি আপস মীমাংসা করে তবে তাহাদের পক্ষে তাহা দূষণীয় হইবে না এবং এইরূপ মীমাংসাই সর্বোৎকৃষ্ট।

ইহা অবশ্যই একটি দ্বিমুখী নীতি এবং এই দুই আয়াতের সমন্বয় করিবার উপায় হইল, তাহাদের প্রসঙ্গ অনুযায়ী, ‘আদরিবূ’ শব্দের অর্থ ‘পৃথক হওয়া’ অথবা ‘বিচ্ছিন্ন হওয়া’ হিসাবে গ্রহণ করা। এই সম্পর্কে আমি একটি উৎকৃষ্ট প্রবন্ধের প্রতি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করিতে ইচ্ছুক যাহার কিয়দংশ নিম্নে উদ্ধৃত হইল:

(ক) কেবল এই আয়াত নহে, অন্যান্য আয়াতেও কোরানের ভাষ্যকার ও অনুবাদকারীগণকে কোরানে ব্যবহৃত ‘আদরিবূ’ শব্দ লইয়া সমস্যায় পড়িতে হয়, কারণ ইহা বিভিন্ন প্রসঙ্গে এরূপভাবে ব্যবহৃত হইয়াছে যে ইহা দ্ব্যর্থবোধক বলিয়া মনে হয়, এবং ইংরেজি ভাষায় বিভিন্নভাবে ইহার অনুবাদ হইতে পারে। ‘দারাবা’ শব্দের অনুবাদ শতাধিকভাবে হইতে পারে

(খ) (৪:৩৪) এই বিশেষ আয়াতে ‘আদরিবূ’ শব্দের অনুবাদ ‘আঘাত করা’ অর্থের ভিত্তি নিম্নে বিবৃত বিষয় ভিন্ন অন্য কোন কিছুরই উপর প্রতিষ্ঠিত নহে:

(১) হাদিস সাহিত্যের (আবু দাউদ ২১৪১ এবং মিশকাত আল-মাসাবিহ্ ০২৭৬) কর্তৃত্বব্যঞ্জক দাবি যে, এই প্রসঙ্গে ‘আদরিবূ’ শব্দের অর্থ ইহাই হইবে।

(২) কোরানের প্রাথমিক পর্যায়ের ব্যাখ্যাকারীগণের কুসংস্কার ও পরিবেশ, যাহা তাহাদিগকে ধারণা দিয়াছিল যে, আয়াতটির পূর্ণ প্রসঙ্গ বিবেচনায় অন্যান্য সম্ভাব্য বহু ব্যাখ্যার মধ্যে ‘আদরিবূ’ শব্দের সর্বাপেক্ষা গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা ‘আঘাত করা’ হইবে”।





Home Next >>