৮.১ চুরির জন্য শাস্তি



বিগত কয়েক বৎসরে দেখা গিয়াছে যে, ইসলামী রাষ্ট্র বলিয়া নিজেদের পরিচয় দেয়, এমন কতকগুলি দেশ, “ইসলামী আইন” (শরিয়াহ বা শরিয়ত) প্রচলিত করিয়াছে। বিশেষ করিয়া একটি আইন, যাহা পাশ্চাত্য দেশসমূহে বর্বরোচিত আখ্যা দিয়া বহুল প্রচার করা হয়, তাহা হইল চুরির জন্য হস্তচ্ছেদ। এই সমস্ত তথাকথিত ইসলামী দেশসমূহ, যাহারা এইরূপ শাস্তি দিয়া থাকে, তাহারা বিভিন্ন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাহা করে, যদিও মুখ্যতঃ তাহা ভীতি উদ্রেকের মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকিবার জন্য। দুর্ভাগ্যবশতঃ তাহারা কোনই প্রশ্নের সম্মুখীন হয় না কারণ অধিকাংশ ব্যক্তিই এইসমস্ত বিষয়ে কোরানের নির্দেশ সম্বন্ধে জ্ঞানশূন্য।

কোরান অনুযায়ী যে কোন প্রকার শস্তি অপরাধের গুরুত্ব অনুরূপ হইবে, এ বিষয়ে কোরানের বক্তব্য:

(৫:৪৫) এবং তাহার মধ্যে আমরা তাহাদের জন্য বিধান দিয়াছি: প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ, চক্ষুর বিনিময়ে চক্ষু, নাসিকার বিনিময়ে নাসিকা, কর্ণের বিনিময়ে কর্ণ, দন্তের বিনিময়ে দন্ত, এবং ক্ষতের প্রতিশোধে (সমান) ক্ষত। কিন্তু যে ইহা (দানের উদ্দেশ্যে) ক্ষমা করে, তাহার জন্য ইহা (পূর্বকৃত পাপের) প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ হইবে। যাহারা আল্লাহর প্রদর্শিত পথ অনুযায়ী বিচার না করে তাহারা অন্যায়কারী রূপে সাব্যস্ত হইবে।

আমরা যদি কোরানের বিধান মানি যে, শাস্তি অপরাধের তুল্য হইবে, তাহা হইলে আমরা চোরের হস্তচ্ছেদ করিতে পারি না, কারণ হৃত সম্পদ এবং হস্তহানি সমান নহে। সুতরাং যে সকল আয়াত এই বিষয়ে নির্দেশ দেয় সেগুলি আমাদিগকে খুবই সতর্কতার সহিত পর্যালোচনা করিতে হইবে। এই শাস্তির বিধান (৫:৩৮,৩৯) আয়াতে দেওয়া হইয়াছে। ৩৮ নং আয়াতে ব্যবহৃত ‘ইয়াদ’ শব্দ আক্ষরিক ভাবে অনুবাদ করা হইয়াছে ‘হস্ত’। ইহা ব্যতীত ইয়াদ শব্দের অন্যান্য অর্থ হস্তের শক্তি, ক্ষমতা, সম্পত্তি, সম্পদ, আশীর্বাদ, বাধ্যতা, সমর্থন ইত্যাদি। বহু আরবী শব্দ এইরূপ একাধিক অর্থ জ্ঞাপন করে, এবং ইহা খেয়াল রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে উপযুক্ত অর্থ কি প্রসঙ্গে শব্দটি ব্যবহৃত হইতেছে তাহার উপর নির্ভর করিবে। এক্ষেত্রে প্রসঙ্গ হইল সম্পদ অপহরণ। সে জন্য অপরাধের যোগ্য শাস্তি হওয়া উচিৎ সম্পদের বিনিময়ে সম্পদ, সম্পদের বিনিময়ে হস্ত নহে। অতএব চোরের এমন শাস্তি দেওয়া উচিৎ যাহাতে সে সম্পদ পরিত্যাগ করিতে বাধ্য হয়, যাহার দ্বারা সম্পদহৃত ব্যক্তির ক্ষতি পূরণ হয়। অতএব, মরহুম আহমেদ আলী খান জুলন্দরিকৃত গ্রন্থ ‘কোরানের অনুবাদ ও তফসির’-এ বর্ণিত আয়াতটির নিম্নলিখিত অর্থই সঠিক

(৫:৩৮) চোর পুরুষ বা স্ত্রীলোক হউক, তাহার আয়ের উৎস ও অনুগ্রহের পথ বন্ধ করিয়া দাও, তাহার সম্পদ ও সঞ্চিত বস্তু ক্রোক কর, এবং তাহার হস্ত ও শক্তিকে কর্মে নিয়োগ কর (যে ব্যক্তির সম্পদ সে চুরি করিয়াছে তাহার মূল্য এবং কিছু জরিমানা উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত), আল্লাহর পক্ষ হইতে তাহাদের গুরুতর অপরাধের ইহা একটি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং আল্লাহ্ ক্ষমতাবান, মহা শক্তিশালী, মহাজ্ঞানী ও সর্বোত্তম সমাধানকারী

উপরে প্রদত্ত অনুবাদ পরবর্তী আয়াতের বক্তব্যকেও সুস্পষ্ট করে ।

(৫:৩৯) কিন্তু চোর যদি অনুতপ্ত হয় এবং চুরির সমস্ত সম্পদ ফিরত দেয় এবং নিজেকে সংশোধন করে, তবে সত্যই আল্লাহ্ তাহাকে ক্ষমা করিবেন; আল্লাহ্ নিশ্চয়ই ক্ষমাশীল, করুণাময়।

অপর পক্ষে, (৫:৩৮) আয়াতের আক্ষরিক অনুবাদ করিয়া হস্তচ্ছেদ অর্থ আরোপ করিলে, (৫:৩৯) আয়াতের যুক্তিসঙ্গত অবস্থান বজায় থাকিতে পারে না। হস্তচ্ছেদের পরে চোর অনুতপ্ত হইলে আল্লাহ তাহাকে ক্ষমা করিবেন, এই প্রস্তাব যুক্তিসঙ্গত নহে। এইরূপ দুর্বহ শান্তির পর ক্ষমা করিবার আর কী বাকি রহিল? কিন্তু যদি সে হৃত সম্পদ ফিরাইয়া দেয় এবং অনুতপ্ত হয় ও নিজেকে সংশোধন করে তাহা হইলে সে ক্ষমা প্রাপ্তির যোগ্য। সুযোগ পাইবার যোগ্য হইলে তাহাকে সেই সুযোগ দেওয়া উচিত এবং সেক্ষেত্রে স্বাভাবিক ভাবেই হস্তচ্ছেদের প্রশ্ন উঠিবে না।

বস্তুতঃ সত্যকার ইসলামী রাষ্ট্রে হস্তচ্ছেদের প্রশ্নই উঠিবে না। সেখানে সামাজিক ন্যায়-বিচার থাকিবে এবং রাষ্ট্র সমস্ত অধিবাসীদিগের তত্ত্বাবধায়ক রূপে কাজ করিবে। ক্ষুধা, অবিচার, এবং দারিদ্র দূরীভূত হইবে, কারণ সম্পদ মানুষের মঙ্গলের জন্যই নিয়োজিত হইবে। অধিকন্তু, কোরানে পরিষ্কার ভাবে বলা হইয়াছে যে, দারিদ্র, ক্ষুধা, ইত্যাদি অপরাধের গুরুত্ব লাঘবকারী অবস্থা বর্তমান থাকিলে, এইরূপ কোন অপরাধ ক্ষমা করিতে হইবে, নিম্নের আয়াতে তাহার উল্লেখ পাওয়া যায়।

(৫:৩) [...] যে কেহ ইচ্ছাকৃত ভাবে নহে, ক্ষুধায় পতিত হইয়া, পাপ করে, (তাহার জন্য) আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, করুণাময়।

তবে কিরূপে এই আয়াতসমূহ হস্তচ্ছেদের কথা বলিতে পারে? তুলনামূলক ভাবে হাদিসে চুরির জন্য হস্তচ্ছেদের ব্যবস্থা দেওয়া হইয়াছে (বুখারি ৫.৫৯৭, মুসলিম ৪১৯০, আবু দাউদ ৪৩৬৭, ৮৩৯৬, এবং স্পষ্টতঃ ইহা (৫:৩৮) আয়াতের অপব্যাখ্যার সহিত যথেষ্ঠ ভাবে জড়িত।

৮.২ ব্যভিচার (১০.৩ দ্রষ্টব্য)





Home Next >>