৭.৮ মোহাম্মদ



ঈসার পরে মোহাম্মাদের আবির্ভাবের মধ্যে দীর্ঘকালের ব্যবধান। অতঃপর আল্লাহর নির্দেশ ব্যক্ত করিতে মোহাম্মাদ শেষ নবীরূপে প্রেরিত হন। মানবজাতির জন্য তিনি যে নির্দেশ আনিয়াছিলেন তাহা কোরানে বর্ণিত। তাঁহার জীবদ্দশায়ই কোরান লিখিত ও পুস্তকাকারে সংকলিত হয়, এবং রাসূলের জীবদ্দশায় অনেকেই ইহা মুখস্থ করেন। ফলে কোরানই একমাত্র প্রত্যাদেশ-গ্রন্থ যাহা সম্পূর্ণরূপে অবিকৃত রহিয়াছে, যেক্ষেত্রে পূর্ববর্তী নবীদিগকে প্রদত্ত ধর্মগ্রন্থ তাঁহাদের জীবদ্দশায় লিপিবদ্ধ করা হয় নাই বলিয়া মনুষ্যের হস্তক্ষেপের ফলে বিকৃত হইয়া গিয়াছে। উপরন্তু, কোরান সমগ্র মানবজাতির জন্য নির্দেশরূপে প্রেরিত হইয়াছিল, কেবলমাত্র একটি অংশবিশেষের জন্য নহে। অতএব, কোরান মানবজাতির নিকট আল্লাহর শেষ প্রত্যাদেশ এবং অবিকৃত ধর্ম্মগ্রন্থ, যাহা মানুষের হস্তক্ষেপে বিকৃত হয় নাই। মোহাম্মদ আল্লাহর এই প্রত্যাদেশপ্রাপ্ত শেষ নবী এবং কোরান তাঁহাকে ‘নবীদের সীল মোহর’ রূপে বর্ণিত করে।

(৩৩:৪০) মোহাম্মদ তোমাদের মধ্যে কোন পুরুষের পিতা নহে, বরং তিনি আল্লাহর বার্তাবাহক এবং নবীদের সীলমোহর, এবং আল্লাহ্ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ।

হাদিস সাহিত্য কোরানের যথার্থতা সম্বন্ধে সন্দেহর জন্ম দেয় এই বলিয়া যে খলিফা ওসমানের সময় বিভিন্ন ব্যক্তির নিকট হইতে কোরানের সমস্ত পৃষ্ঠা সংগ্রহ করিয়া কোরানকে গ্রন্থ হিসাবে সংকলিত করা হয়। যখন কোরানকে আল্লাহ্ সর্বদা ‘গ্রন্থ’ (আল-কিতাব) হিসাবে উল্লেখ করিয়াছেন, এবং যাহা প্রত্যাদেশের সঙ্গে সঙ্গেই লিখিত হইয়াছিল, সেইক্ষেত্রে ইহা অবিশ্বাস্য যে রাসূল কোরান প্রত্যাদেশ পাওয়ার সম্পূর্ণসময়ে — তেইশ বৎসরব্যপী, কোরানকে গ্রন্থ হিসাবে সংকলন করিতে পারেন নাই। এইরূপ চিন্তাধারা, বহু সংখ্যক মুসলিমের হাদিসের বাহিরে চিন্তা করা সম্বন্ধে চরম অক্ষমতার আভাস দেয়। ফলতঃ এই মতবাদের উৎপত্তি যে খলিফা ওসমানের সময় কোরান সংকলিত হইয়াছে।

গ্রন্থ হিসাবে কোরানের নিজস্ব উক্তি ব্যতীতও আমরা সম্পূর্ণ ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতে ইহা পরীক্ষা করিতে পারি। আমরা জানি যে ঐ সময় ভুমধ্যসাগর অঞ্চলে বিরাট গ্রন্থাগার, পুস্তকের দোকান এবং বহু লিপিকার ছিল। উপরন্তু যেহেতু আরব দেশ একটি বাণিজ্যিক অঞ্চল, এবং আরবরা ব্যবসায় জাতি ছিল, একথা নিঃসন্ধেহে বলা যায় যে অন্য কোন কারণ ব্যতীতও অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তার দরুণ ঐ অঞ্চলের অন্যান্য জাতির ন্যায় আরব জাতির মধ্যেও শিক্ষিত ব্যক্তি এবং লিপিকার ছিল (কোরান ইহা সমর্থন করে), এবং কোরান নবীর জীবিত অবস্থায় গ্রন্থ হিসাবে লিখিত ও সঙ্কলিত হইয়াছিল। এই যুক্তি অখণ্ডনীয় যখন আমরা স্মরণ করি যে ঈসার ৬০০ বৎসর পরে এই রাসূল প্রেরিত হইয়াছিলেন, আল্লাহর ভীতি ও কর্তব্যের প্রতি একান্ত বিশ্বস্থতার সহিত। অতএব ইহা সম্ভব নহে যে তিনি গ্রন্থ আকারে কোরানের বাণী সংরক্ষণ করিবার এই অত্যন্ত মৌলিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন নাই। হাদিস অনুসারে প্রচলিত উক্তি (বহুলোকের দ্বারা) কি ইহার অধিক যুক্তিসঙ্গত, যে বিভিন্ন অংশে গঠিত কোরানের পৃষ্ঠা সংগ্রহ করিয়া হজরত ওসমানের দ্বারা কোরান সঙ্কলিত হইয়াছিল?

নবী সম্বন্ধে প্রচলিত আর একটি ভ্রান্ত ধারণা যে তিনি নিরক্ষর ছিলেন, অর্থাৎ তিনি লিখিতে অথবা পড়িতে জানিতেন না। কোরান এই ধারণার সমর্থন করে না। ইহার ব্যাখ্যার জন্য পরিশিষ্ট ৬ (ক৬) দ্রষ্টব্য।

মোহাম্মাদের নিকট কোরান প্রেরিত হওয়ার বিষয়ে নিম্নের আয়াতগুলির উপলব্ধি প্রয়োজন।

(২:৯৭) বলুন (মানবজাতির নিকট হে মোহাম্মাদ): কে জিবরাইলের শত্রু! কারণ তিনিই ইহা (এই ধর্মগ্রন্থ) আপনার অন্তরে আল্লাহর নির্দেশে প্রকাশ করিয়াছেন, পূর্বে যাহা প্রকাশিত হইয়াছিল তাহার সত্যতার সমর্থন করিয়া, এবং যাহা বিশ্বাসীদের নিকট সুসংবাদ ও পথ-প্রদর্শক।

(১৬:২) তাহার বান্দাদের মধ্যে তিনি যাহাকে ইচ্ছা তাহার নিকট স্বীয় নির্দেশসহ ফেরেশতা প্রেরণ করেন (এই বলিয়া): মানবজাতিকে সতর্কিত কর যে, আমি ব্যতীত আর কোন উপাস্য নাই, অতএব আমার প্রতি তোমাদের কর্তব্য পালন কর।

(১৬:১০২) ইহা আপনার প্রতিপালকের নিকট হইতে সত্যসহ ঐ পবিত্র আত্মা (অর্থাৎ, জিবরাইল) নাজিল করিয়াছেন যাহাতে বিশ্বাসীদের ঈমান দৃঢ়তর হয় এবং (আল্লাহর নিকট) ইহা আত্মসমর্পণকারীদের জন্য পথ-প্রদর্শক ও সুসংবাদ বহনকারী হয়।

(২৬:১৯২-১৯৪) নিশ্চয়ই ইহা বিশ্বপ্রতিপালক হইতে অবতীর্ণ একটি প্রত্যাদেশ যাহা লইয়া ঐ সত্য আত্মা আপনার অন্তরে অবতরণ করিয়াছেন, যাহাতে আপনি সতর্ককারীদের (একজন) হন।

(১২:৩) আমরা সর্বাপেক্ষা উত্তম বিবৃতি দ্বারা আপনার (মোহাম্মাদ) নিকট বর্ণনা করিতেছি যে আমরা আপনাকে অনুপ্রাণিত করিয়া এই কোরান প্রেরণ করিয়াছি, যদিও ইতিপূর্বে আপনি সম্পূর্ণ অনবহিত ছিলেন।

উপরোক্ত (২:৯৭), (১৬:২,১০২), (২৬:১৯২-১৯৪), আয়াতসমূহ নিঃসন্ধেহে ব্যক্ত করে যে জিবরাইলের মাধ্যমে মোহাম্মাদের নিকট কোরান নাজিল হইয়াছিল।

অধিকন্তু উপরে বর্ণিত (১২:৩) আয়াত এবং (৩:৪৪), (৪:১৬৩), (৬:১৯,৫০,১০৬), (৭:২০৩), (১০:২,১৫,১০৯), (১১:৪৯), (১২:৩,১০২), (১৩:৩০), (১৬:২,১২৩), (১৭:৩৯,৭৩,৮৫), (১৮:১১০), (২০:১৩), (২১:৪৫,১০৮), (২৮:৮৬), (২৯:৪৫), (৩৩:২), (৩৫:৩১), (৪১:৬), (৪২:৩,৭, ১৩,৫২), (৪৩:৪৩), (৪৬:৯), (৫৩:৪) আয়াতসমূহের আল্লাহ্ বলেন যে তাঁহার প্রত্যাদেশ কোরান মোহাম্মাদের নিকট অনুপ্রেরণারূপে (ওহি) নাজিল হইয়াছিল। এবং এইরূপ অনুপ্রেরণার (ওহির) মাধ্যমেই আল্লাহর পন্থা কার্যকরী হয়। নিম্নের আয়াতসমূহ সুস্পষ্টরূপে ইহাই বর্ণনা করে।

(৪:১৬৩) আমি (আল্লাহ) আপনাকে অনুপ্রাণিত করিয়াছি, যেমন আমি অনুপ্রাণিত করিয়াছিলাম নূহ এবং তাঁহার পরবর্তী নবীগণকে; ইবরাহীম, ইশমাইল, ইসহাক, ইয়াকুব ও তাঁহার গোত্রদিগকে; ঈসা, আইয়ুব, ইউনূস, হারূন ও সুলায়মানকে; এবং যেরূপ আমি অনুপ্রাণিত করিয়াছিলাম দাউদকে ‘যাবুর’ দ্বারা।

(৭:১১৭) এবং আমি মূসাকে অনুপ্রেরণা দিলাম (এই বলিয়া): তোমার যষ্টি নিক্ষেপ কর এবং দেখ! উহা তাহাদের মিথ্যা প্রদর্শনীগুলিকে গ্রাস করিয়া ফেলিল।

(১৬:৬৮) এবং তোমাদের প্রতিপালক মৌমাছিদের অনুপ্রাণিত করিয়াছিলেন (এই বলিয়া): তোমরা বাসস্থান খুঁজিয়া লও বৃক্ষে, পাহাড়ে, এবং মানুষের তৈরী ঘরে।

এইরূপ আল্লাহ্ যাহাকে ইচ্ছা তাহার প্রত্যাদেশসমূহ প্রেরণ করেন এবং তাঁহার ব্যবহৃত পন্থা ইচ্ছাকৃত ও তাৎক্ষণিক, যেমন (৭:১১৭) আয়াতে মূসা অনুপ্রাণিত হইলেন তাহার যষ্টি নিক্ষেপ করিতে। ফেরেশতাগণ কেবলমাত্র আল্লাহর বার্তা বহনকারী এবং আদেশ পালনকারী; তাহাদের নিজস্ব চিন্তাশক্তি নাই। আমার মনে হয় এই হিসাবে ফেরেশতারা রেডিও তরঙ্গের অনুরূপ, যাহা সংবাদ (ওহি বা প্রত্যাদেশ) বহন করে, এবং এই সংবাদ সেই বস্তু বা ব্যক্তির দ্বারা গৃহীত হয় যাহাকে আল্লাহ্ তাঁহার প্রত্যাদেশ প্রেরণ করিতে ইচ্ছা করেন। ইহা সংবাদ প্রেরণের সমতুল্য, যেমন, আমরা যে কোন ব্যক্তিকে রেডিও, টেলিফোন অথবা Email এর মাধ্যমে সংবাদ প্রেরণ করিতে পারি, যদি আমরা সেই উদ্দিষ্ট ব্যক্তির ঠিকানা জানি।

মোহাম্মাদের নিকট প্রেরিত প্রত্যাদেশসমূহের কোন বার্তা পরিবর্তনের ক্ষমতা তাঁহার ছিল না। তাঁহাকে কোরান অনুসরণ করিতে নির্দেশ দেওয়া হইয়াছিল এই সতর্কবাণীসহ যে, কোরানে প্রদত্ত নির্দেশ হইতে বিচ্যুত হইলে তিনি অবশ্যই দণ্ডিত হইবেন। নিম্নের আয়াতগুলি ইহা স্পষ্টরূপে নির্দেশ করে, এবং প্রসঙ্গতঃ ইহা হাদিস গ্রন্থের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়।

(১০:১৫) এবং যখন আমার স্পষ্ট প্রত্যাদেশ সমূহ তাহাদের নিকট বিবৃত করা হয়, তখন তাহাদের মধ্যে আল্লাহর সহিত সাক্ষাতের জন্য যাহারা ইচ্ছুক নহে তাহারা বলে: ইহা ব্যতীত অন্য কোন উপদেশ আন, অথবা ইহা পরিবর্তন কর। বলুন (হে মোহাম্মদ): আমার পক্ষে আমার নিজের ইচ্ছায় ইহা পরিবর্তন করা সম্ভব নহে। আমি শুধু তাহাই অনুসরণ করি যাহা আমার নিকট প্রত্যাদেশরূপে আসে। জানিও! আমি এক ভীষণ দিনের শাস্তির আশংকা করি যদি আমি আমার প্রতিপালকের অবাধ্য হই।

(৬৯:৪০-৫২) নিশ্চয়ই ইহা এক সম্মানিত বার্তাবহকের বার্তা। ইহা কোন কবির উক্তি নহে — তোমরা অতি অল্প-বিশ্বাসী! কোন গণকের কথাও নহে — তোমরা অতি অল্পই স্মরণ রাখ! ইহা বিশ্বপ্রতিপালকের নিকট হইতে নাজিল হইয়াছে। এবং তিনি (মোহাম্মদ) যদি আল্লাহ্ সম্পর্কে মিথ্যা উক্তিসমূহ রচনা করিতেন, তাহা হইলে আল্লাহ্ নিশ্চয়ই তাঁহার দক্ষিণ হস্ত ধরিয়া তাঁহার জীবন-শিরা কাটিয়া দিতেন, এবং তোমাদের মধ্যে কেহই তাঁহার পক্ষ হইতে আল্লাহকে রোধ করিতে পারিতেনা। জানিও! যাহারা (মন্দ) নিবারণ করে তাহাদের জন্য ইহা একটি সতর্কবাণী। আল্লাহ্ অবহিত যে তোমাদের কতক (ইহা) অস্বীকার করে আর ইহা অবিশ্বাসীদের জন্য বাস্তবিক পক্ষে একটি নিদারুণ মনস্তাপ। অবশ্যই ইহা ধ্রুব সত্য। সুতরাং তোমাদের মহান প্রতিপালকের নাম মহিমান্বিত কর।

(৬:৫০) (হে মোহাম্মদ) বলুন: আমি তোমাদিগকে বলি না (যে) আমার নিকট আল্লাহর ধন-ভান্ডার আছে, অথবা আমি অদৃশ্য সম্বন্ধে অবগত। আমি তোমাদের বলিনা যে আমি একজন ফেরেশতা। আমাকে যাহা অনুপ্রেরণায় প্রদান করা হয় আমি কেবলমাত্র তাহাই অনুসরণ করি। বলুন: অন্ধ ব্যক্তি ও চক্ষুস্মান ব্যক্তি কি সমান? তোমরা কি তাহা হইলে চিন্তাশীল হইবেনা?

এই পর্যন্ত উদ্ধৃত আয়াতসমূহে স্পষ্টরূপে দেখা যায় যে, বিশ্বপ্রতিপালক আল্লাহর নিকট হইতে মোহাম্মাদ অনুপ্রাণিত হইয়া প্রত্যাদেশ প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। কোরান ঐ সকল অনুপ্রাণিত প্রত্যাদেশের ফল, যেখানে কোন পরিবর্তনের বিন্দুমাত্র ক্ষমতা মোহাম্মাদের ছিলনা। আল্লাহর অনুপ্রেরণার বাহিরে তিনি ছিলেন কেবলমাত্র একজন মানুষ, যদিও নিঃসন্দেহে উত্তম গুণাবলী ও চরিত্র বিশিষ্ট।

কোরানের কতকগুলি আয়াতে স্পষ্টরূপে “রাসূলকে মান্য করিতে” নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে। নিম্নের আয়াতগুলি ইহার উদাহরণ।

(৩:৩২) বল: আল্লাহ্ ও তাহার বার্তাবাহকের অনুগত হও। কিন্তু যদি তাহারা বিমুখ হয় তবে জানিয়া রাখ যে আল্লাহ্ অবিশ্বাসীদের ভালবাসেন না।

(৩:১৩২) আল্লাহ্ এবং তাঁহার বার্তাবাহককে মান্য কর, যাহাতে তোমরা করুণা লাভ করিতে পার।

(৪:১৩) এইসকল আল্লাহর নির্ধারিত সীমা। যে কেহ আল্লাহ্ এবং তাঁহার বার্তাবাহককে মান্য করে আল্লাহ্ তাহাকে বেহেশতে প্রবেশ করাইবেন, যাহার তলদেশ দিয়া নদীসমূহ প্রবাহিত, এবং যেখানে সে অনন্তকাল থাকিবে। ইহাই হইবে বিরাট সফলতা।

(৪:৫৯) হে বিশ্বাসীগণ! আল্লাহকে মান্য কর, এবং মান্য কর বার্তাবাহককে, এবং তোমাদের মধ্যে যাহারা কর্তৃত্বে আছে তাহাদিগকে; তোমরা যদি আল্লাহ্ এবং শেষ দিবসে বিশ্বাস কর এবং তোমাদের মধ্যে কোন মতভেদ উপস্থিত হয় তবে তাহা আল্লাহ্ ও তাঁহার বার্তাবাহকের নিকট উপস্থাপিত কর। ইহাই উত্তম এবং পরিশেষে অপেক্ষাকৃত মঙ্গলজনক।

উপরোক্ত আয়াতের অনুরূপ অন্যান্য আয়াতসমূহ যাহাতে রাসূলের আনুগত্যের নির্দেশ আছে: (৪:৬৯), (৫:৯২), (৮:১,২০,২৪,৪৬), (৯:৭১), (২৪:৪২,৪৭,৫১,৫৪,৫৬), (৩৩:৩৩), (৪৭:৩৩), (৪৯:৭,১৪), (৫৮:১৩), (৬৪:১২)। লক্ষ্যণীয় যে, এই সমস্ত আয়াত সেই সময়ের যখন রাসূল জীবিত ছিলেন, এবং কেবলমাত্র তিনি আল্লাহর বার্তাবাহকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন জনগণের রাজনৈতিক নেতাও। প্রকৃত পক্ষে , (৪:৫৯) আয়াতে অন্যান্য নেতাদিগকেও মান্য করিতে বলা হইয়াছে। অতএব, ‘রাসূলকে মান্য করা’ অথবা ‘রাসূলের অনুগত হওয়া’ সেই পরিপ্রেক্ষিতেই সম্ভব যখন তিনি জীবিত ছিলেন। অধিকন্তু, ‘রাসূলকে মান্য করিবার’ অর্থ ‘বার্তাবাহককে মান্য করা’, অর্থাৎ তিনি যে বার্তা বহন করিয়াছিলেন তাহাই অনুসরণ করা। রাসূল এখন মৃত, এবং সেই হেতু তিনি এখন বার্তাবাহকের কার্য করিতে পারেন না। আমাদের পক্ষে তাঁহাকে মান্য অথবা অনুসরণ করিবার একমাত্র পন্থা হইল কোরানে প্রদত্ত নির্দেশ মান্য করিয়া চলা। ইতিপূর্বে বর্ণিত ৬৯ নং সুরার ৪০-৫২ আয়াতসমূহের ইহা সুস্পষ্টরূপে ব্যাখ্যা করা হইয়াছে। আল্লাহ্ এই আয়াতসমূহে বলিতেছেন যে আল্লাহর বাণী কোরান অবতীর্ণ হইয়া উচ্চারিত হইয়াছে রাসূলের বিবৃতিতে। কেবলমাত্র এইক্ষেত্রে আল্লাহর বাণী ও রাসূলের উক্তির মধ্যে কোন পার্থক্য নাই, দুইই এক বার্তা এবং নির্ভুল। যেহেতু কোরান মানবজাতির পথ-প্রদর্শনের একটি সম্পূর্ণ বিধান, কেবলমাত্র এই পথ-নির্দেশ অনুসরণ করিয়াই আমরা সক্রিয় রূপে রাসূলের অনুসরণ করিতে পারি, অর্থাৎ তিনি তাঁহার নবী-জীবনের ২৩ বৎসর ব্যাপী যাহা শিক্ষা দিয়াছেন তাহা মান্য ও পালন করিতে পারি। রাসূলকে আল্লাহ্ সতর্কিত করিয়াছিলেন যে, কোরানের শিক্ষার বিরুদ্ধে তিনি যদি কিছু বলেন বা করেন তাহা হইলে তিনি আল্লাহর নিকট হইতে দন্ডিত হইবেন, এবং কেহই তাঁহাকে উদ্ধার করিতে পারিবেনা। অতএব ইহা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে তিনি নিশ্চিতভাবে যাহা বলিয়াছেন এবং অনুসরণ করিয়াছেন তাহা অবশ্যই কোরানে আছে। এই প্রসঙ্গে ‘রাসূলের সুন্না’ (বিশদতর বিবরণ ১০.১ বিভাগে) শব্দ যূগলের তাৎপর্যও আমাদের বোধগম্য হওয়া আবশ্যক। কোরান অনুসারে আয়াত (৪৮:২৩)এ ‘সুন্না’ শব্দের প্রকৃত অর্থ: [...] ‘আল্লাহর অপরিবর্তনীয় বিধান ও পদ্ধতি’। সমগ্র কোরানে ‘সুন্না’ শব্দ একবারও রাসূলের সম্পর্কে ব্যবহৃত হয় নাই। উপরন্তু, পূর্বেই প্রতিষ্ঠা করা হইয়াছে যে রাসূলের কার্যপন্থা কোরান হইতে নিয়ন্ত্রিত, এবং সেইহেতু রাসূলের প্রতি আরোপিত কোন ‘সুন্নার’ উৎপত্তিও হইবে অবশ্যই কোরান হইতে।

দুর্ভাগ্যবশতঃ, রাসূলকে মান্য করিবার প্রয়াসে, তিনি যাহা কিছু বলিয়াছেন অথবা করিয়াছেন এইরূপ তথাকথিত বর্ণনা ও বক্তব্যের প্রতি মানুষ আগ্রহান্বিত হইয়া পড়ে। এবং এই উদ্দেশ্যে রাসূলের মৃত্যুর প্রায় ২৫০ বৎসর পর “হাদিস” নামে পরিচিত বহু সাহিত্যের জন্ম হয়। যদিও হাদিসসমূহ মৌখিকভাবে বর্ণনার মাধ্যমে সংগৃহীত তথাপি এইগুলিকে রাসূলের কথা ও কাজের বর্ণনা বলিয়া গ্রহণ করা হয়। ১০.৩ বিভাগে প্রদর্শন করা হইয়াছে যে বহু হাদিস কোরানের মতবাদের বিরুদ্ধে যায়। সুতরাং এই সমস্ত রাসূলের উক্তি হইতে পারে না, কারণ অন্যথায় তিনি দণ্ডিত হইতেন (আয়াত ১০:১৫ এবং ৬৯:৪৪-৪৭ দ্রষ্টব্য)। অতএব “রাসূলকে মান্য কর” এই শব্দগুচ্ছের সরল উত্তর হইল যাহা রাসূলের মুখ হইতে সোজাসুজি নিঃসৃত হইয়াছিল তাহাই মান্য করা, এবং নিঃসন্দহে ইহা কোরান। ইহা হাদিস হইতে পারেনা, যাহা প্রায় ২৫০ বৎসর পরে লিখিত হইয়াছিল। রাসূলকে উপাস্য তৈরী করিবার দুর্বলতা মানুষের ক্ষেত্রে বোধগম্য; বিশেষ করিয়া পূর্ববর্তী নবীদের ক্ষেত্রে যখন এইরূপই হইয়াছে।

কোরানের একটি আয়াত (৩৩:৫৬) অনেকের দ্বারা ভ্রান্তরূপে ব্যবহৃত হয়। অপব্যাখ্যা ও অজ্ঞতার দরুণ এই আয়াতটি লক্ষ-কোটি মুসলিমকে আল্লাহকে গৌরবান্বিত করিবার পরিবর্তে রাসূলকে, তাঁহার ইচ্ছার বিরূদ্ধে, গৌরবান্বিত করিতে প্ররোচিত করে। কয়েকটি ব্যাখ্যা সহ এই আয়াতটির অনুবাদ নিম্নে প্রদত্ত হইল:

(৩৩:৫৬) আল্লাহ্ ও তাঁহার ফেরেশতাগণ রাসূলের উপর আশীর্বাদ বর্ষণ করেন: হে বিশ্বাসীগণ! তোমরাও তাহার উপর আশীর্বাদ বর্ষণ কর, এবং পূর্ণ সম্মানসহ তাহাকে অভিনন্দন জানাও। (ইউসূফ আলী)

ইফসূফ আলীর মন্তব্য: আল্লাহ্ ও ফেরেশতাগণ পবিত্র রাসূলকে সর্বশ্রেষ্ঠ মানব হিসাবে সম্মান করেন এবং আর্শীবাদ করেন। আমাদিগকে বলা হইয়াছে আরও বিশেষরূপে তাঁহার সম্মান ও আর্শীবাদ করিতে, কারণ তিনি আল্লাহর অনুগ্রহের প্রতি এবং সর্বোত্তম অন্তর্জীবনের প্রতি আমাদিগকে পথ-প্রদর্শন করিবার জন্য তাঁহার নিজস্ব জীবনে বহু দুঃখ কষ্ট সহ্য করিয়াছেন।

(৩৩:৫৬) দেখ! আল্লাহ্ এবং তাঁহার ফেরেশতাগণ রাসূলের উপর আশীর্বাদ বর্ষণ করেন। হে বিশ্বাসীগণ! তাঁহার জন্য আশীর্বাদ প্রার্থনা কর এবং যথাযোগ্য মর্যাদাসহ তাহাকে অভিনন্দন জানাও। (এম্ পিক্থল)

এই আয়াতের উপর এম্ পিক্থলের কোন মন্তব্য নাই।

(৩৩:৫৬) প্রকৃতই, আল্লাহ্ ও তাঁহার ফেরেশতাগণ রাসূলকে আশীর্বাদ করেন। (অতএব) হে বিশ্বাসীগণ, তাঁহাকে আশীর্বাদ কর এবং (তাঁহার পথ-প্রদর্শনে) পূর্ণ আত্মসমর্পণের মাধ্যমে নিজদিগকে উৎসর্গ কর! (এম আসাদ)

এম আসাদের এই আয়াতের উপর কোন মন্তব্য নাই।

লক্ষণীয়, ঐ একই সুরায়, আরো ১৩টি আয়াতের পূর্ববর্তী আয়াত সমূহে আমরা দেখিতে পাই যে আল্লাহ্ ও তাঁহার ফেরেশতাগণ সকল বিশ্বাসীদের প্রতি আশীর্বাদ প্রেরণ করেন।

(৩৩:৪১-৪৩) হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা অধিক করিয়া আল্লাহর প্রশংসাসমূহ স্মরণ কর, এবং সকাল ও সন্ধ্যায় তাঁহার মহিমা ঘোষণা কর। তিনি তোমাদের উপর আশীর্বাদ প্রেরণ করেন, এবং তাঁহার ফেরেশতাগণও তাহাই করেন, যাহাতে তিনি তোমাদিগকে অন্ধকারের গভীরতা হইতে আলোকে লইয়া আসিতে পারেন। এবং তিনি বিশ্বাসীদের প্রতি পরম করুণাময়।

এইরূপে আল্লাহ্ ও ফেরেশতাগণ কেবলমাত্র রাসূলের উপরই আশীর্বাদ বর্ষন করেন না, সকল বিশ্বাসীদের উপরও তাঁহারা আশীর্বাদ বর্ষণ করেন। অনুরূপভাবে আমরা, যাহারা বিশ্বাসী, তাহাদিগকে বলা হইয়াছে রাসূলের উপর আশীর্বাদ বর্ষণ করিতে, এবং রাসূলকেও সকল বিশ্বাসীদের উপর উহা করিতে বলা হইয়াছে

(৯:১০৩) [..] এবং তাহাদের জন্য প্রার্থনা কর: দেখ, তোমাদের প্রার্থনা তাহাদের (সান্তনার সূত্র) হইবে। আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ।

উপরোক্ত আয়াতসমূহ বিবেচনা করিলে আমরা অধিকতর উপলব্ধি করি যে সকলের জন্য শান্তি কামনা করা (সাল্লাম), এবং আল্লাহর নির্দেশ অনুসারে জীবন যাপন করিয়া সেই শান্তি প্রতিষ্ঠিত করা, ইসলামের একটি প্রধান অঙ্গ। হাদিস দ্বারা ৩৩:৫৬ আয়াতের অন্য কোন অর্থ বা ব্যাখ্যার অনুমোদন করা যায় না। বিশেষ করিয়া রাসূলকে আমরা এখন অভিনন্দন করিতে পারি না, ইহা সম্ভব ছিল যখন তিনি জীবিত ছিলেন। তথাপি অধিকাংশ মুসলিম এই সহজ বিষয়টি অগ্রাহ্য করে এবং কোন কোন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে তাহারা বিশ্বাস করে যে রাসূলের আত্মা উপস্থিত হয়। সুতরাং তাহারা দণ্ডায়মান হয় এবং ঐক্যস্বরে বলে, “হে রাসূল, আমরা তোমাকে অভিবাদন জানাই [...]”। তাহাদের উক্তিতে এইরূপ বর্ণনাও থাকে যেমন “যদি মোহাম্মদ সৃষ্ট না হইতেন তবে আল্লাহ্ এই বিশ্ব সৃষ্টি করিতেন না”, যাহার ভাবধারা ইঙ্গিত করে যে অন্যান্য নবীগণ অপেক্ষাকৃত কম গুরূত্বপূর্ণ। একই প্রসঙ্গে বিবেচ্য যে ‘মোহাম্মাদ’ উল্লেখ করিলে অথবা তাঁহার নাম উচ্চারণ করিলে আমরা বলি “সাল্লাল্লাহ-আলায়হি-ওয়াসাল্লাম”, অর্থাৎ “তাঁহার উপর আল্লাহর আশীর্বাদ ও শান্তি বর্ষিত হউক”। অথচ অন্যান্য নবীর ক্ষেত্রে আমরা বলি “আলায়হি-সাল্লাম”, অর্থাৎ “তাহার উপর শান্তি বর্ষিত হউক”। আমরা উপলব্ধি করিনা যে কোরানে নিষেধ থাকা সত্ত্বেও মোহাম্মাদকে অধিকতর গুরুত্ব দিয়া আমরা নবীদের মধ্যে পার্থক্য করিতেছি। অথচ এ বিষয়ে কোরান সুস্পষ্ট এবং সুনিশ্চিত। উদাহরণ স্বরূপ দ্রষ্টব্য (২:১৩৬,২৮৫), (৩:৮৪), (৪:১৫০-১৫২) আয়াতসমূহ যাহাদের শেষের কয়েকটি নিম্নে উদ্ধৃত হইল। এই আয়াতগুলি দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে যে নবীদের মধ্যে পার্থক্য করিলে আমরা অবিশ্বাসীতে পরিণত হইব এবং “লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি’র শিকার হইব। সুতরাং ইউসূফ আলীর ৩৩:৫৬ আয়াতের উপর মন্তব্য যে ‘রাসূল মানুষের মধ্যে শ্রেষ্টতম’ কোরানের বিরুদ্ধে যায় এবং এই কারণে গ্রহণীয় নহে।

(৪:১৫০-১৫২) যাহারা আল্লাহকে এবং তাঁহার বার্তাবাহকদিগকে অস্বীকার করে, এবং আল্লাহকে তাঁহার বার্তাবাহকগণ হইতে পৃথক করিতে চাহে এই বলিয়া যে: ‘আমরা কতককে বিশ্বাস করি ও কতককে অবিশ্বাস করি এবং মধ্যবর্তী কোন পথ অবলম্বন করিতে ইচ্ছা করি’; ইহারাই প্রকৃত অবিশ্বাসী, এবং অবিশ্বাসীদের জন্য আমরা লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত রাখিয়াছি। কিন্তু যাহারা আল্লাহ্ এবং তাহার বার্তাবাহকদিগকে বিশ্বাস করে, এবং তাঁহাদের মধ্যে কোন পার্থক্য করেনা আল্লাহ্ তাহাদিগকে পুরস্কৃত করিবেন; আল্লাহ্ পরম ক্ষমাশীল ও করুণাময়।

তথাপি আমরা ৩৩:৫৬ আয়াতের অপব্যাখ্যা করিয়া সর্বক্ষণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে, আল্লাহকে স্মরণ করিবার পরিবর্তে মোহাম্মাদকে স্মরণ করি, যেমন নিম্নের আয়াতসমূহে নির্দেশিত হইয়াছে:

(৩৩:৪১,৪২) হে বিশ্বাসীগণ! আল্লাহকে অধিকরূপে স্মরণ কর, এবং সকাল ও সন্ধ্যায় তাঁহার মহিমা ঘোষণা কর।

আরো দুভার্গ্য যে, অসংখ্য মুসলিম বিশ্বাস করে যে, মোহাম্মাদের নিকট মধ্যস্থতা করিবার ক্ষমতা আছে (১০.৩ বিভাগ, নির্বাচন নং ৮ দ্রষ্টব্য)। অথচ কোরানে নির্দিষ্টরূপে বলা হইয়াছে যে, কাহারাও উপকার অথবা ক্ষতি করিবার কোন ক্ষমতা রাসূলের নাই (৭:১৮৮, ৪৬:৯)। তথাপি হাদিস সাহিত্য বহু লোককে মধ্যস্থতার ধারণায় বিশ্বাস করিতে প্রতারণা করিয়াছে, কারণ বুখারী ও মুসলিম শর্তহীনভাবে বলে যে রাসূলকে মধ্যস্থতা করিবার ক্ষমতা দেওয়া হইয়াছে (১০.৩ বিভাগ নির্বাচন নং ৮ দ্রষ্টব্য)। প্রকৃতপক্ষে ইহার বিপরীত হইবে, যেহেতু আমরা কোরান হইতে আন্তরিকভাবে নির্দেশ গ্রহণ করি না। ফলে বিচারের দিন রাসূল আল্লাহর নিকট তাঁহার অনুসারীগণের মধ্যস্থতা করিবার পরিবর্তে, তাহাদিগকে অস্বীকার করিবেন।

(২৫:৩০) এবং রাসূল বলিলেন: হে আমার প্রতিপালক! আমার সম্প্রদায় তো এই কোরানকে ধর্তব্যের মধ্যেই গণ্য করে নাই

মোহাম্মাদ সম্পর্কে উপরের আলোচনার এই উদ্দেশ্য যে তাঁহার সম্বন্ধে মুসলিমদের কিছু কিছু ভ্রান্ত ধারণা দূরীভূত হইবে। তাহারা ভুলিয়া যায় যে, কোরান সমগ্র মানবজাতির জন্য জীবন-বিধান ও পথনির্দেশের গ্রন্থ, এবং সেই বার্তা বিস্তার করাই ছিল একজন বার্তাবাহকরূপে রাসূলের নির্দিষ্ট কাজ, ঠিক যেমন তাহার পূর্ববর্তী আল্লাহর বার্তাবাহকগণ করিয়া গিয়াছেন। পর্থ-নির্দেশনার মূল বিধানসমূহ সম্পর্কে কোরান স্বয়ং ব্যাখ্যাকারী, এবং ইহা বুঝিবার জন্য অপর কোন সূত্র অথবা আদর্শের প্রয়োজন নাই। আল্লাহর বার্তা মানবজাতির নিকট পৌঁছাইয়া দিবার বিশেষ দায়িত্ব মোহাম্মাদের উপর অর্পণ করা হইয়াছিল এবং এই বিশেষ কার্য তিনি অতি প্রশংসনীয়রূপে সমাধা করিয়াছেন। কোরানের উক্তি অনুসারে ইহার অতিরিক্ত কোন শক্তি বা সামর্থ্য তাঁহাকে দেওয়া হয় নাই।

(১৮:১১০) (হে মোহাম্মাদ) বলুন: আমি তোমাদের ন্যায় কেবলমাত্র একজন মরনশীল ব্যক্তি। আমার প্রতিপালক আমাকের প্রত্যাদেশ দ্বারা অনুপ্রাণিত করিয়াছেন যে, এক মাত্র আল্লাহ তোমাদের উপাস্য। এবং যে কেহ তাহার প্রতিপালকের সহিত সাক্ষাতের আশা রাখে, সে যেন সৎকর্ম করে, এবং তাহার প্রতিপালকের প্রতি করণীয় এবাদতে কাহাকেও শরীক না করে।

(৪৬:৯) বলুন: আমি রাসূলদের মধ্যে কোন নূতন কিছু নহি। আমি জানিনা আমার বা তোমাদের ব্যাপারে কি করা হইবে। আমার প্রতি যাহা অনুপ্রাণিত হইয়া আসিয়াছে (ওহী) আমি কেবলমাত্র তাহারই অনুসরণ করি; আমি কেবলমাত্র একজন স্পষ্ট সতর্ককারী।

(৭:১৮৮) বলুন: আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত আমার নিজের ভাল-মন্দ করিবার ক্ষমতা আমার নাই। আমি যদি অদৃশ্যের খবর জানিতাম তবে তো আমি প্রচুর সম্পদ অর্জন করিতাম এবং কোন অকল্যাণই আমাকে স্পর্শ করিতনা। আমি বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য একজন সতর্ককারী এবং সুসংবাদদাতা ব্যতীত আর কেহ নহি।

(৪১:৬) বলুন: আমি তোমাদের ন্যায় কেবলমাত্র একজন মরণশীল ব্যক্তি। আমাকে অনুপ্রেরণা দেওয়া হইয়াছে যে, একমাত্র আল্লাহ্ তোমাদের উপাস্য। অতএব তাঁহার প্রতি সরল পথ অনুসরণ কর এবং তাঁহার ক্ষমা প্রার্থনা কর। আর অংশীবাদীরা ধ্বংশ হউক।

বস্তুতঃ নবীদিগের প্রধান কার্য আল্লাহর বার্তা উপস্থাপিত এবং প্রচার করা। কেবলমাত্র কোরানেই আদি এবং সর্বজনীন বার্তা সুস্পষ্ট ও অবিকৃত রহিয়াছে। আল্লাহ্ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতি প্রয়োগযোগ্য আয়াতসমূহ সম্পূর্ণরূপে স্পষ্ট এবং সহজবোধ্য করিয়া দিয়াছেন যাহাতে ইহাদের অনুসরণে কোন সমস্যা না হয়। তথাপি, যেহেতু কোরান অনুসারে জীবন যাপনে সততা ও আন্তরিকতার প্রয়োজন, আমাদের স্বভাবগত স্বার্থপরতা আমাদিগকে কোরানের সেই সরল পথ অনুসরণ করিতে প্রতিরোধ করে। তৎপরিবর্তে আমরা ধর্মাচরণ পদ্ধতি লইয়া ব্যস্ত হই, এবং কোন সজ্ঞান প্রচেষ্টা ও ত্যাগ ব্যতীত সেই সমস্ত যান্ত্রিকরূপে সমাধা করি।

References: (প্রসঙ্গ সূত্র)

১. Man’s Destiny (Tazkira). by Allama Inayat Ullah Khan Al-Mashriqi. Translated and edited from Urdu by Shabbir Hussain.
Publisher: Mujahid Publications, Rawalpindi, Pakistan, p. 56, 57.
২. God, Man and Universe, by Inayat Ullah Khan El-Mashriqi. Akhuwat Publications, Rawalpindi, Pakistan. Extract from “Unity of Divine Message”, p. 26-35.
৩. Exposition of the Qur’an, by Gulam Ahmed Parwez. Tolu-E-Islam Trust (Regd) 25B Gulberg, Lahore-11, Pakistan, p. 11.
৪. The Bible The Our’an and Science, by Dr. Maurice Bucaille. Publisher Seghers, 6 Place Saint-Sulpice 75006 Paris, p. 233.
৫. Ibid,. p. 256.
৬. The Holy Our ‘an by Maulana Muhammad Ali. Published in USA by Specialty Promotions Co. Inc. Chicago, Illinois. p. 141, note 422.
৭. Ibid,. p. 143, note 427.
৮. Ibid,. p142-143, note 424.
৯. The Message of the Quran, by Muhammad Asad. Published by Dar Al-Andalus, Gibralter. p. 74. Foot note 38
১০. Ibid,. p. 861. Foot note 6.





Home Next >>