৭.৭ ঈসা



ইহুদিদের কেবলমাত্র সংশোধন ও আল্লাহর পথে প্রত্যাবর্ত্তনের জন্যই ঈসা নবী প্রেরিত হন নাই; অধিকন্তু তিনি আসিয়াছিলেন মানজজাতির একতার সার্বজনীন বার্তা পুনর্ব্যক্ত করিতে, আর বিশেষ করিয়া ইহাই ইহুদিদিগকে তাঁহার বিরূদ্ধে প্ররোচিত করে। তাহাদের দৃঢ় বিশ্বাস যে তাহারা আল্লাহর অনুগৃহীত সম্প্রদায় এবং তাহাদের ধর্মগ্রন্থ ‘তাওরাত’ ইহা অনুমোদন করে। আল্লাহ্ মানবজাতিকে পুনরায় সঠিক পথে চালিত করিবার জন্য ঈসার মাধ্যমে ‘ইঞ্জিল’ প্রদান করেন। কিন্তু ৭০ খৃষ্টাব্দ হইতে আরম্ভ করিয়া পরবর্তী কালে যাহা লিখিত হইয়াছিল তাহা মৌখিক বক্তব্যের উপর প্রতিষ্ঠিত, এবং বিভিন্ন সময়ে বহু ব্যক্তি দ্বারা লিখিত। ফলে, প্রত্যেক লেখকের ব্যক্তিগত পক্ষপাতিত্ব তাহাদের লেখনীতে প্রকাশ পায় এবং বহু বিষয়ে তাহাদের মধ্যে অসংগতি দেখা যায়। পরিশেষে, কেবল চারটি গ্রন্থকে সিদ্ধ বলিয়া ঘোষণা করা হয়, যেগুলিকে বলা হয় ‘গসপেল’। কিন্তু আধুনিক বাইবেল-সম্বন্ধীয় পণ্ডিতদের অভিমতে মার্ক, ম্যাথিউ, লিউক ও জন এই চারিটি গসপেলের সৃজনকর্তা নন; তাঁহারা কেবলমাত্র অন্যদের সংগৃহীত বিভিন্ন বিষয়-বস্তুর সমন্বয়ে ইহাদের সংকলন করিয়াছেন। তবে সংকলনের সময় তাঁহাদের নিজস্ব চিন্তাধারাও ইহাদের মধ্যে প্রক্ষিপ্ত হইবার প্রকৃত সম্ভাবনা রহিয়াছে (পরিচ্ছেদ ১৮ দ্রষ্টব্য)। উপরন্তু এই চারিটি গ্রন্থের মধ্যে অনেক অসংগতি দেখা যায়, যাহার প্রধান উদাহরণ ঈসার স্বর্গারোহন। ম্যাথিউ ও জনের লেখায় স্বর্গারোহনের উল্লেখ নাই, লিউক ইহা উল্লেখ করিয়াছেন তারিখ সহ, আর মার্ক তারিখ ব্যতীত। যাহা হউক, এই ‘গসপেল’ নিঃসন্দেহে ঈসার গসপেল নহে, যাহাকে কোরানে ‘ইঞ্জিল’ বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে

আক্ষরিক অর্থে বিবেচনা করিলে, ঈসার জন্ম, তাঁহার মাতা মরিয়মের কোন পুরুষের সহিত শারীরিক সঙ্গ ব্যতীত, একটি অলৌকিক ঘটনা বলিয়া প্রতীয়মান হয়। তবে আরও ব্যাখ্যা করিতে হইলে আমাদের বিবেচনা করা প্রয়োজন যে মরিয়ম কি পরিবেশে প্রতিপালিত হন। তাঁহার শৈশাবস্থা হইতেই তিনি যাকারিয়ার তত্ত্বাবধানে একটি পবিত্র স্থানে বাস করিতেন (৩:৩৭)। মাওলানা মোহাম্মদ আলীর গ্রন্থ (Translation of the Holy Quran) অনুযায়ী মরিয়মের বয়স যথেষ্ট বৃদ্ধি পাইলে:

“আয়াত (৩:৪৫) স্পষ্টরূপে তাঁহাকে (মরিয়মকে) একটি শিশুর জন্মের সংবাদ দেয়, এবং সেইহেতু আয়াত (৩:৪৪) এ বর্ণিত বিশেষ ঘটনাটি হইতেছে তাঁহার বিবাহের ঘটনা। কলম নিক্ষেপ করিয়া ভাগ্য নির্ধারণ করা এবং ইহাতে যে তাঁহার তত্ত্বাবধানের অধিকার পাইবে, ইহার অর্থ স্ত্রীরূপে তাঁহার তত্ত্বাবধান ভিন্ন অন্য কিছুই হইতে পারে না। ভাগ্য নির্ধারণের প্রয়োজন ছিল, কারণ তিনি শিশুরূপে ঐ পবিত্র স্থানে (আশ্রয়স্থানে) উৎসর্গিত হইয়াছিলেন এবং এক্ষণে কেবলমাত্র ভাগ্য নির্ধারণের প্রতিযোগিতার মাধ্যমেই তাঁহাকে বিবাহ দেওয়া সম্ভব ছিল”।

“সেইহেতু যখন নিম্নে উদ্ধৃত (৩:৪৫) আয়াতে তাঁহাকে একটি পুত্রসন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হইল, তিনি সম্ভবতঃ জ্ঞাত হন নাই যে তাঁহার বিবাহ স্থিরীকৃত হইয়াছে। অতএব তিনি বলিয়াছিলেন যে কোন পুরুষ তাঁহাকে এখনও স্পর্শ করে নাই। এবং তাহার উত্তরে বলা হইয়াছিল “এইভাবেই”, অর্থাৎ আল্লাহ্ কতৃক সেই শিশুর জন্ম হইবে, –জন্মের জন্য যে সকল অবস্থা ও পরিবেশের প্রয়োজন তাহার মধ্য দিয়া। আয়াতের শব্দ দ্বারা এই বুঝায়না যে তিনি প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মের বিরুদ্ধে গর্ভবতী হইবেন। পরবর্ত্তী কথাগুলিতেও কেলমাত্র ইহাই প্রমাণিত হয় যে ভবিষ্যদ্বাণী অনুসারে মরিয়ম অবশ্যই একটি পুত্র সন্তানের জন্ম প্রদান করিবেন। আমাদিগকে পুনঃপুনঃ বলা হইয়াছে যে সকল সৃষ্টিরই সূচনা হয় আল্লাহ্ কর্তৃক ‘কুন’ (হও) শব্দ দ্বারা; তথাপি কেহই ধারনা করে না যে প্রকৃতির নিয়ম ব্যতীতই সৃষ্টি বাস্তবিত হইয়াছে”।

(৩:৪৫-৪৭) (এবং স্মরণ কর) যখন ফেরেশতাগণ বলিলেন: হে মেরী! দেখ! আল্লাহ্ তোমাকে তাঁহার নিকট হইতে একটি সুসংবাদ দিতেছেন; যাঁহার নাম ‘মেসায়া’, মেরীর পুত্র ঈসা; যিনি পৃথিবীতে ও পরকালে গৌরবান্বিত, এবং (আল্লাহর) সান্নিধ্য-প্রাপ্তগণের একজন। তিনি দোলনায় থাকা অবস্থায় ও পরিণত বয়সে মানুষের সহিত কথা বলিবেন এবং তিনি পুণ্যবাণগণের অন্তর্ভুক্ত হইবেন। তিনি (মরিয়ম) বলিলেন: হে আমার প্রতিপালক! কিরূপে আমার পুত্র হইবে যখন কোন পুরুষ আমাকে স্পর্শ করে নাই? (ফেরেশতা) উত্তর দিলেন: “এভাবেই: আল্লাহ্ যাহা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। তিনি যখন কোন কিছু সৃষ্টি করিতে স্থির করেন, তখন বলেন ‘হও’ — এবং উহা হইয়া যায়”।

“মরিয়মের স্বামীর বিষয়ে কোরানে কোন উল্লেখ নাই, ইহা বৈশিষ্ঠ্যপূর্ণ, এবং এই সম্পর্কে মূসার জন্ম সংক্রান্ত ঘটনার সহিত এই ঘটনাসমূহের দৃঢ় সাদৃশ্য আছে, কারণ সেখানেও মূসার পিতা সম্বন্ধে কোন উল্লেখ নাই। অতএব কোরানে ঈসার পিতার উল্লেখ নাই বলিয়াই যে তাঁহার কোন পিতা ছিল না, ইহা যথেষ্ট প্রমান নহে”।

টীকা: ‘দোলনা হইতে মানবজাতির সহিত কথা বলিবেন’ ইহা একটি রূপকমূলক বর্ণনা যে ঈসা অল্প বয়স হইতেই মানুষের নিকট ধর্ম প্রচার করিবেন (অধিকন্তু ১৯:২৯-৩৪ দ্রষ্টব্য)। প্রকৃতপক্ষে আমাদের নিকট তাঁহার জন্ম সম্পর্কিত আয়াতগুলি রূপকাত্মক, যেহেতু আমাদের বর্তমান জ্ঞানের পরিধিতে এইগুলির পূর্ণরূপ ব্যাখ্যা সম্ভব নহে। নিম্নোক্ত আয়াতগুলিও একই শ্রেণীতে পড়ে।

(৩:৪৮,৪৯) এবং আল্লাহ্ তাঁহাকে ধর্মীয় গ্রন্থ, জ্ঞান, তাওরাত ও ইঞ্জিল শিক্ষা দিবেন এবং তাঁহাকে বনি-ইসরাইলের জন্য বার্তাবহক করিবেন। (তিনি বলিবেন) দেখ! আমি তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হইতে তোমাদের জন্য নিদর্শন সহ আসিয়াছি। দেখ! আমি তোমাদের জন্য কর্দম দ্বারা পক্ষীসদৃশ্য আকৃতি গঠন করিব, এবং আমি ইহাতে ফুঁ দিব আর আল্লাহর আদেশে ইহা একটি পক্ষী হইয়া যাইবে। আমি অন্ধ ও কুষ্ঠ-রোগীকে নিরাময় করিব এবং আল্লাহর আদেশে মৃতকে জীবিত করিব। এবং তোমরা কি আহার করিয়াছ ও তোমাদের গৃহে কি জমা করিয়া রাখিয়াছ—তদ্বিষয়ে বলিয়া দিব। যদি তোমরা বিশ্বাসী হও, তবে নিশ্চয়ই ইহাতে তোমাদের জন্য নিদর্শন রহিয়াছে।

মোহাম্মদ আসাদ তাঁহার ‘কোরানের অনুবাদ’ গ্রন্থে ইহার উপর কিছু ব্যাখ্যা দিয়াছেন, যাহা হইতে তাঁহার ৩৮ নং পাদটিকা উদ্ধৃত করা হইল:

৩৮। “ইহা সম্ভব যে ঈসার ‘মৃতকে পুনর্জীবিত করা’ একটি রূপকান্তক বর্ণনা, যাহাতে তিনি আধ্যাত্মিকরূপে মৃত ব্যক্তিদিগকে নূতন জীবন দান করিয়াছিলেন; তুলনীয় (৬:১২২) দ্রষ্টব্য): ‘তাহা হইলে যে মৃত ছিল (আত্মায়), এবং যাহাকে আমরা (আল্লাহ্) পরে জীবিত করিয়াছি এবং আলো দিয়াছি যাহাতে সে লোকের মধ্যে পথ দেখিতে পায় — সেই ব্যক্তি কি ঐ ব্যক্তির ন্যায়, গভীর অন্ধকারে (যে হারাইয়া গিয়াছে), যাহা হইতে সে বাহির হইতে পারে না?” যদি এই ব্যাখ্যা সঠিক হয়, তবে ‘অন্ধ ও কুষ্ঠরোগীর আরোগ্যলাভ’ এর অনুরূপ তাৎপর্য রহিয়াছে; অর্থাৎ যাহারা আধ্যাত্মিকরূপে সত্যের প্রতি ব্যাধিগ্রস্ত ও অন্ধ ছিল তাহাদের আভ্যন্তরীণ পুনরুত্থান।

ঈসার নবুয়ত সম্বন্ধে কোরানে অনেক আয়াত আছে।

(৩:৫০,৫১) এবং (আমি আসিয়াছি) উহাই অনুমোদন করিতে যাহা আমার পূর্বে তাওরাতে আসিয়াছে, এবং তোমাদের জন্য যাহা নিষিদ্ধ ছিল উহার কতকগুলিকে বৈধ করিতে। আমি তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হইতে নিদর্শন সহ তোমাদের জন্য আসিয়াছি। সুতরাং আল্লাহর প্রতি তোমাদের কর্তব্য পালন কর এবং আমাকে অনুসরণ কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ আমার এবং তোমাদের প্রতিপালক। সুতরাং তাঁহার এবাদত কর। ইহাই সরল পথ।

(৬১:১৪) হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহর সাহায্যকারী হও, যেমন মরিয়মের পুত্র ঈসা তাঁহার শিষ্যদিগকে বলিয়াছিলেন: আল্লাহর পথে কাহারা আমার সাহায্যকারী হইবে? তাহারা বলিয়াছিলেন: আমরাই আল্লাহর পথে সাহায্যকারী। এবং বনি-ইসরাইলের একদল বিশ্বাস করিল, আর অপর দল অবিশ্বাস করিল। তখন আল্লাহ্ শত্রুদের বিরুদ্ধে বিশ্বাসীদের শক্তিশালী করিলেন এবং তাহারা জয়ী হইল।

(৩:৫২) কিন্তু যখন ঈসা তাহাদের অবিশ্বাস সম্পর্কে সজাগ হইলেন, তিনি উচ্চরবে বলিলেন: কাহারা আল্লাহর পথে আমার সাহায্যকারী হইবে? তাঁহার শিষ্যেরা বলিলেন আমরাই আল্লাহর পথে সাহায্যকারী হইব। আমরা আল্লাহকে বিশ্বাস করি, এবং আপনি সাক্ষী থাকুন যে আমরা (আল্লাহর নিকট) আত্মসমর্পন করিয়াছি।

(৩:৫৪,৫৫) এবং তাহারা (অবিশ্বাসীরা) ষড়যন্ত্র করিল, এবং আল্লাহ্ (তাহাদের বিরুদ্ধে) কৌশল করিলেন : আল্লাহ কৌশলীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ট। আল্লাহ্ বলিলেন: হে ঈসা! যথার্থই আমি তোমাকে মৃত্যুবরণ করাইব এবং তোমাকে আমার নিকট উত্তোলন করিব, এবং যাহারা সত্যকে অস্বীকার করিয়াছে তাহাদের হইতে তোমাকে পবিত্র করিব। আর পুনরুত্থান-দিবস পর্যন্ত তোমার অনুসারীদিগকে অবিশ্বাসীদের উপর সমুন্নত করিব। পরিশেষে, আমার নিকট অবশ্যই তোমাদের প্রত্যেকের প্রত্যাবর্তন হইবে, এবং আমি বিচার করিব তোমাদের মধ্যে, ঐ সকল বিষয়ে যাহাতে তোমরা মতভেদ করিতে।

এখানে ‘অবিশ্বাসীরা ষড়যন্ত্র করিল’ — সেই ইহুদিগের সম্বন্ধে বলা হইয়াছে যাহারা ঈসাকে নবী হিসাবে মানিয়া লইতে অস্বীকার করিয়াছিল এবং তাঁহাকে ক্রুশ-বিদ্ধ করিবার জন্য গোপনে ষড়যন্ত্র করিয়াছিল। অপর পক্ষে, আল্লাহ্ তাঁহাকে উদ্ধার করিবার উপায় উদ্ভাবন করিলেন। আল্লাহ্ ঈসাকে আশ্বাস দিলেন যে তিনি (ঈসা) তাঁহার নিয়োজিত কার্য পূর্ণ করিয়া স্বাভাবিক ভাবে মৃত্যু বরণ করিবেন। তাঁহার অনুসারীগণ দুর্বল ছিল, কিন্তু পরিশেষে তাহারা শত্রুদের পরাজিত করিয়া বিজয়ী হইতে পারিবে। প্রকৃত পক্ষে উপরের আয়াত (৬১:১৪) নিশ্চিত করে যে ঈসা তাঁহার নবুয়তের কার্য সমাধা করিয়াছিলেন, অথবা অন্যকথায়, তিনি ‘দ্বীন’ প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন এবং তাঁহার অনুসারীগণ ছিলেন ‘মুসলিম’। কিন্তু সময়ের সাথে, মনুষ্যের হস্তক্ষেপের ফলে, সেই বার্তা আবার বিকৃত হইয়া পড়িল। পরবর্তী অনুসারীগণ কেবলমাত্র যে সত্যপথ হইতে বিচ্যুত হইল তাহাই নহে, উপরন্তু তাহারা বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত হইয়া পড়িল।

(৫:৪৬) এবং আমরা মরিয়মের পুত্র ঈসাকে তাঁহাদের পদচিহ্ন অনুসরণ করাইলাম, ‘তাওরাত’এ তাহার পূর্বে যাহা (নাজিল) হইয়াছিল তাঁহার অনুমোদন করিয়া। এবং আমরা তাহাকে ‘ইঞ্জিল’ প্রদান করিলাম যাহাতে পথনির্দেশ ও আলোক রহিয়াছে এবং যাহা পূর্বে অবতীর্ণ তাওরাতের সমর্থক—যাহারা মন্দ নিবারণ করে তাহাদের জন্য (এই গ্রন্থ) নির্দেশ ও সতর্কবাণী বহনকারী।

(৪:১৭১) হে গ্রন্থপ্রাপ্ত জাতি! তোমাদের দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করিও না, অথবা আল্লাহ্ সম্বন্ধে সত্য ব্যতীত অন্য কিছু উচ্চারণ করিও না। মরিয়মের পুত্র ঈসা মেসায়া আল্লাহর একজন বার্তাবহক মাত্র এবং তাঁহার বাণী ও আদিষ্ট আত্মা, যাহা তিনি মরিয়মের নিকট প্রেরণ করিয়াছিলেন। অতএব আল্লাহ্ এবং তাঁহার বার্তাবাহকগণের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর, এবং বলিও না “তিন” — নিবৃত হও! ইহা তোমাদের জন্য অধিকতর মঙ্গলজনক! — নিশ্চয়ই একমাত্র আল্লাহই উপাস্য; তাঁহার একটি পুত্র হইবে — ইহা তাঁহার অলৌকিক মাহাত্ম্য হইতে বহু দূরে অবস্থিত। নভোমন্ডলে ও ভূমন্ডলে যাহা আছে সকল কিছুই তাঁহার (আয়ত্তাধীন), এবং রক্ষাকারী হিসাবে আল্লাহই যথেষ্ট।

(৫:৭২) তাহারা নিশ্চয়ই অবিশ্বাস করে যাহারা বলে: দেখ! মরিয়ম-পুত্র মেসাসাই আল্লাহ্। মেসায়া (নিজে) বলিয়াছিলেন: হে ইসরাইল-সন্তানেরা, তোমরা আমার ও তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহর এবাদত কর। দেখ! যে কেহ আল্লাহর অংশীদার করিবে আল্লাহ্ তাহার জন্য বেহেশত নিষিদ্ধ করিবেন এবং অগ্নিকুণ্ড হইবে তাহার বাসস্থান। দুরাচারীদের জন্য কোন সাহায্যকারীই থাকিবে না।

(৫:৭৫) মরিয়মের পুত্র মেসায়া কেবলমাত্র একজন বার্তাবাহক ব্যতীত অন্য কিছুই ছিলেন না এবং তাঁহার পূর্বে আরো বার্তাবাহকগণ গত হইয়াছেন। তাঁহার মাতা ছিলেন একজন সাধ্বী নারী। তাঁহারা উভয়েই (পার্থিব) খাদ্যাহার করিতেন। দেখ! আমরা কি সুস্পষ্ট ভাবে মানুষের জন্য প্রত্যাদেশসমূহ বর্ণনা করি, অথচ দেখ কিরূপে উহারা সত্য হইতে বিতাড়িত হয়।

(৫:১১৬) আর যখন আল্লাহ্ বলিবেন: হে মরিয়ম পুত্র! তুমি কি মানবজাতিকে বলিয়াছিলে যে: আল্লাহ্ ব্যতীতও আমাকে ও আমার মাতাকে দুই দেবতারূপে গ্রহণ কর? তিনি বলিবেন: আপনি মহিমান্বিত! যাহাতে আমার কোনই অধিকার নাই তাহা আমি বলিতে পারিনা। যদি আমি ইহা বলিয়া থাকিতাম, আপনি অবশ্যই জানিতেন। আমার অন্তরের কথা আপনি অবগত, কিন্তু আপনার অন্তরের ইচ্ছা আমি অবগত নহি। আপনি, কেবলমাত্র আপনি, অদৃশ্য সম্বন্ধে সর্বজ্ঞ।

(৬১:৬) এবং যখন মরিয়মের পুত্র ঈসা বলিয়াছিলেন: হে ইসলাইল-সন্তানেরা! দেখ! আমি তোমাদের জন্য আল্লাহর বার্তাবাহকরূপে আসিয়াছি, আমার পূর্বে তাওরাতে যাহা আসিয়াছিল তাহার সমর্থন করিয়া, এবং আমার পরে একজন বার্তাবাহকের আগমণের সুসংবাদ লইয়া, যাঁহার নাম হইবে আহমদ (প্রশংসিত)। তথাপি তিনি যখন উহাদের নিকট স্পষ্ট প্রমাণ সহ আসিলেন, উহারা বলিল ইহাতো কেবল জাদু মাত্র।

উপরের আয়াতে ‘আহমদ’ নামদ্বারা নবী মোহাম্মাদের আগমণ নির্দেশ করা হইয়াছে। আরো উদ্ধৃত করি: “এই ভবিষ্যদ্বাণী সেন্ট্ জনের গসপেলে ‘প্যারাক্লিটসের’ (সাধারণতঃ ‘সান্তনাদানকারী’ হিসাবে বর্ণিত) বিবিধ উল্লেখ দ্বারা সমর্থিত হয়, যাহার আগমণ ঈসার পরে হইবে। এই উপাধিটি প্রায় নিশ্চিতরূপে ‘পেরিক্লিটস্’ (বহু প্রশংসিত, একটি এ্যারামিক-ভাষার পদ অথবা নাম ‘মওহামানা’র হুবহু গ্রীক অনুবাদ) এর বিকৃতি [...] ১০

আল্লাহর বার্তাবাহকরূপে ঈসার আবির্ভাব প্রায় তিন বৎসরব্যাপী ছিল, কিন্তু তাঁহার জীবনের শেষ অংশ তাঁহার জন্মের মতই রহস্যময়। নিম্নে প্রদত্ত কোরানের আয়াত (৪:১৫৭) নিশ্চিতরূপে বলে যে ঈসা ইহুদিদের দ্বারা ক্রুশ-বিদ্ধ বা নিহত হন নাই, যদিও কতগুলি বাহ্যিক ঘটনা এইরূপ বিভ্রম উৎপন্ন করিয়াছে। খৃষ্টীয় চার্চের একটি প্রধান মতবাদ যে ঈসা ক্রুশ-বিদ্ধ হইয়াছিলেন এবং তাঁহাকে সমাধিস্থ করা হইয়াছিল; কিন্তু তৃতীয় দিবসে তিনি তাঁহার ক্ষতসহ শশরীরে উত্থান করিয়া চলাচর ও বাক্যালাপ করিয়াছিলেন এবং তাঁহার শিষ্যদিগের সহিত আহার করিয়াছিলেন। ইহার পরে তাঁহাকে শশরীরে স্বর্গে উত্তোলন করা হয়। উপরন্তু, কালক্রমে আর একটি কাহিনীর উদ্ভব হয় যে মানবজাতির ‘আদি পাপের’ প্রায়শ্চিত্তের উদ্দেশ্যে ঈসা ক্রুশ-বিদ্ধ হইয়া মৃত্যুবরণ করিয়াছিলেন। কোরান এইসকল মতবাদের কোনটিই সমর্থন করে না।

(৪:১৫৭) এবং তাহাদের (ইহুদিদের) উক্তি যে: আমরা মরিয়মের পুত্র ও আল্লাহর বার্তাবাহক মেসায়া ঈসাকে হত্যা করিয়াছি — তাহারা তাঁহাকে হত্যা অথবা ক্রুশ-বিদ্ধ করে নাই যদিও তাহাদের এইরূপই মনে হইয়াছিল। এবং দেখ! ইহার সহিত মতভেদকারীরাও (অর্থাৎ খৃষ্ঠানরা) এ বিষয়ে সন্দিহান। এই সম্বন্ধে অনুমানের অনুসরণ ব্যতীত তাহাদের কোন জ্ঞান নাই। নিশ্চিত যে, তাহারা (ইহুদিরা) তাঁহাকে হত্যা করে নাই।





Home Next >>