৭.৬ মূসা



কোরানে মূসার জীবন বৃত্তান্তের সহিত ইহুদি সম্প্রদায়ের ইতিবৃত্তও বিশদরূপে পাওয়া যায়। কিন্তু তাহাদের ইতিহাস কালানুক্রমে ঐতিহাসিক বিষয়-বস্তু হিসাবে বিবৃত্ত হয় নাই। বরং পুনঃ পুনঃ মানবজাতির নিকট ইহাই প্রকাশ করা হইয়াছে যে আল্লাহ্ কেবলমাত্র তাহাদেরই অনুগ্রহ করেন যাহারা নবীদের মাধ্যমে আল্লাহর প্রেরিত নির্দেশ হইতে বিপথগামী হয় না। সুতরাং অনুগৃহীত জাতি বলিয়া কিছু নাই, যেমন ইসরাইলীরা এখনও নিজেদেরকে মনে করে। আল্লাহর অনুগ্রহ লাভ করিতে হইলে, তাঁহার নির্দেশসমূহ পালন করিয়া সেই অনুসারে জীবন যাপন করা অত্যাবশ্যক।

ইহুদিদের প্রকৃত ইতিহাস ইসহাক হইতে আরম্ভ; কিন্তু ঘটনা প্রবাহের অধিকতর স্পষ্ট রূপ দেখা যায় ইউসুফ ও তাঁহার পরিবারের মিশর দেশে উপস্থিতির সময় হইতে। কোরান গতানুগতিক ভাবে সন-তারিখ সম্পর্কে উদ্বিগ্ন নহে, ইহার উদ্বিগ্নতা সর্বোপরি ইউসূফ নবীর ঘটনার নৈতিক বিষয় সম্পর্কিত, যাহা ১২ নং সূরাতে (সূরা ইউসূফ) সুন্দররূপে চিত্রিত হইয়াছে। মূসা নবীর সময় ইহুদিরা স্পষ্টতঃই মিশরে সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল এবং নিশ্চিতরূপে উৎপীড়িত হইতেছিল। কিন্তু ইউসূফের সময় হইতে মূসা নবীর আগমণের মধ্যে অতিবাহিত সময় সম্বন্ধে কোন বিশদ বর্ণনা কোরানে নাই। তৎপরিবর্তে ইহুদিরা কিরূপে উৎপীড়িত হইতেছিল এবং আল্লাহ্ মূসা নবীর মাধ্যমে তাহাদিগকে মিশর হইতে নির্গত করিয়া কিরূপে উদ্ধার করিলেন, এবং একই সময়ে ফেরাউন এবং তাহার দলবলকে ধ্বংশ করিলেন — এইসকল সম্পর্কে বিশদ বিবরণ রহিয়াছে। তীব্র বাধা-বিপত্তির মধ্যে সর্বশক্তিমান তাঁহার পরিকল্পনা কিরূপে বাস্তবায়িত করেন, মূসা নবীর কাহিনী তাহারই একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এই বিবরণের সহিত বাইবেলে বর্ণিত Exodus (বহু লোকের একই সাথে বহির্গমন) এর সাদৃশ্য আছে, কেবল একটি মূল পার্থক্য ব্যতীত; যাহা হইল নিমজ্জিত ফেরাউনের শবদেহ আল্লাহ ধ্বংস হইতে সংরক্ষণ করিয়াছিলেন, মানবজাতির জন্য ইহাকে একটি নিদর্শন করিবার ইচ্ছায়। কোরানে ইহা স্পষ্টরূপে বিবৃত।

(১০:৯০,৯১) এবং আমরা বনি-ইসরাইলদের সমুদ্র পার করাইলাম এবং ফেরাউন তাহার দলবল লইয়া ঔদ্ধত্যের সহিত তাহাদের পশ্চাদ্ধাবন করিল, যে পর্যন্ত না নিজজ্জিত হইবার অবস্থা তাহাকে অভিভূত করিল। তখন সে চীৎকার করিয়া বলিল: আমি বিশ্বাস করিলাম বনি-ইসরাইল যাঁহাকে বিশ্বাস করে, তিনি ব্যতীত আর কোন উপাস্য নাই, এবং আমি (আল্লাহর নিকট) আত্মসমর্পণ কারীদিগের দলভুক্ত। এখন! এ পর্যন্ত তো তুমি অমান্যই করিয়াছ এবং অন্যায়কারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলে। কিন্তু আজ আমি তোমার দেহকে রক্ষা করিব, যাহাতে তুমি পরবর্তীদের জন্য একটি নিদর্শন হইয়া থাক। যদিও মানবজাতির অধিকাংশই আমার নিদর্শন সম্পর্কে অমনোযোগী।

ডঃ মরিস বুকাইল হইতে এই সম্পর্কে আরও উদ্ধৃতি: “মানুষের জন্য ইতিহাসের ধ্বংসাবশেষের সংরক্ষণ সর্বদা বাঞ্চনীয়; কিন্তু এখানে আমরা যাহার নিদর্শন পাই তাহা আরো উচ্চপ্রকারের: ইহা মূসার পরিচিত এমন এক ব্যক্তির মমিকৃত দেহ (১৮৯৮ সনে আবিষ্কৃত), যে তাঁহার আবেদন সমূহ অগ্রাহ্য করিয়াছে, তাঁহার পলায়ন কালে পশ্চাদ্ধাবন করিয়াছে এবং এই প্রক্রিয়ায় পরিশেষে নিজের জীবন-হানী করিয়াছে। তাহার মৃতদেহ আল্লাহর ইচ্ছায় ধ্বংস হইতে উদ্ধার পাইয়াছে, যেমন কোরানে লিখিত আছে, যাহাতে মানুষের জন্য ইহা নিদর্শন হইতে পারে। যাহারা পবিত্র ধর্মগ্রন্থসমূহের সত্যনিষ্ঠার প্রমাণে আধুনিক তথ্যসমূহে অনুসন্ধান করে, তাহারা ফেরাউনের দেহ সম্পর্কে আলোচিত কোরানের আয়াতসমূহের একটি অত্যুৎকৃষ্ট উদাহরণ পাইবে কায়রোর মিশর যাদুঘরে রাজা রাণীদের মমিকৃত দেহ পরিদর্শন করিয়া”।

কোরান অনুসারে মূসা আল্লাহর নিকট হইতে সরাসরি বার্তা পাইয়াছিলেন। সুরা ২০ নং এর অধিকাংশই আল্লাহর সহিত তাঁহার কথোপকথন। কোরান আরও উল্লেখ করে যে ইহুদিরা আদিতে আল্লাহর মনোনীত সম্প্রদায় ছিল। অতঃপর তাহারা বহুবার আল্লাহর সহিত চুক্তি ভঙ্গ করিয়াছে। এবং পরিশেষে অভিশপ্ত হইয়াছে। ইহার উৎকৃষ্ট উদাহরণ যখন ফলকে মুদ্রিত আল্লাহর নির্দেশসমূহ গ্রহণ করিতে ৪০ দিনের জন্য পর্বতে মূসাকে আহবান করা হইয়াছিল। মূসার অনুপস্থিতির সময় তাঁহার সম্প্রদায় বিরক্ত হইয়া পড়িল এবং তাহাদের অলঙ্কারাদি গলাইয়া একটি স্বর্ণের গো-বৎস নির্মাণ করিয়া তাহার পূজা আরম্ভ করিল। মূসার ভ্রাতা হারূনের সকল আবেদন অগ্রাহ্য করিয়া তাহারা এই কার্যে নিবদ্ধ হইল। মূসা ফিরিয়া দেখিলেন যে তাঁহার সম্প্রদায় পৌত্তলিকতার আশ্রয় লইয়াছে। তিনি ইহাতে অত্যন্ত ত্রুদ্ধ হইলেন এবং তাহাদের ভ্রষ্টতার জন্য তিরস্কার করিলেন; কিন্তু পরিশেষে তাহাদের হইয়া আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিলেন। এইসময় এবং অন্যান্য আরো বহুবার আল্লাহ্ তাহাদিগকে ক্ষমা করিয়াছেন।

(৭:১৪৮-১৫০) এবং মূসার সম্প্রদায় (তিনি তাহাদের ছাড়িয়া যাওয়ার পরে) নিজেদের অলঙ্কার দ্বারা এক জাফরান রংয়ের হাম্বা-রবকারী গো-বৎস নির্মাণ করিল। তাহারা কি দেখিলনা যে উহা তাহাদের সহিত কথা বলে না অথবা তাহাদিগকে কোথাও পথ দেখায় না? তাহারা উহাকে গ্রহণ করিয়া অন্যায়কারী হইল। এবং তাহারা যখন ইহার পরিণাম সম্বন্ধে ভীত হইয়া বুঝিল যে তাহারা বিপথগামী হইয়াছে, তাহারা বলিল: আমাদের প্রতিপালক যদি আমাদের উপর করুণা না করেন তবে আমরা অবশ্যই পথভ্রান্ত হইব। এবং মূসা স্বীয় সম্প্রদায়ের নিকট ফিরিয়া ক্রুদ্ধ ও বিষন্ন হইয়া বলিলেন: আমার অনুপস্থিতিতে তোমরা যে পথ অনুসরণ করিয়াছিলে তাহা অসৎ ও অনিষ্টকর। তোমরা কি তোমাদের প্রতিপালকের বিচার দ্রুত আনিতে চাও? এবং তিনি ফলকগুলি ছড়াইয়া ফেলিয়া তাঁহার ভ্রাতার মস্তক ধরিয়া জোর করিয়া নিজের দিকে টানিয়া আনিলেন। (ভ্রাতা) বলিলেন: হে আমার সহোদর! ইহারা আমাকে দুর্বল মনে করিয়াছিল এবং আমাকে প্রায় হত্যা করিয়াছিল। তুমি আমার শত্রুদিগকে আমার উপর বিজয়ী করিও না এবং আমাকে দুষ্কৃতকারীদিগের অন্তর্ভুক্ত করিও না।

(৭:১৫২-১৫৬) জানিও, যাহারা ঐ গো-বৎস (উপাস্যরূপে) গ্রহণ করিয়াছে তাহাদের জন্য এই পার্থিব জীবনে তাহাদের প্রতিপালকের নিকট হইতে ভীতি ও লাঞ্চনা উপস্থিত হইবে। মিথ্যা রটনাকারীদিগকে আমি এইরূপে প্রতিফল প্রদান করি। কিন্তু যাহারা অসৎকার্য করিয়া পরে অনুতপ্ত হয় এবং বিশ্বাস করে, — জানিও! তাহাদের জন্য, নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালক পরম ক্ষমাশীল ও পরম করুণাময়। অতঃপর যখন মূসার ক্রোধের উপশম হইল, তিনি ঐ ফলকগুলি তুলিয়া লইলেন, যেগুলির লেখনিতে যাহারা তাহাদের প্রতিপালককে ভয় করে তাহাদের জন্য নির্দেশ ও করুণার বর্ণনা ছিল। তৎপর মূসা স্বীয় সম্প্রদায় হইতে সত্তর জনকে আমাদের (আল্লাহর) নির্ধারিত স্থানে সমবেত হইবার জন্য মনোনীত করিলেন। যখন ভয়ের দরুণ তাহাদের কাঁপুনি আরম্ভ হইল, তিনি বলিলেন: হে আমার প্রতিপালক! আপনি ইচ্ছা করিলে বহু পূর্বেই ইহাদিগকে এবং আমাকেও ধ্বংস করিতে পারিতেন। আপনি কি আমাদের মধ্যকার নির্বোধরা যাহা করিয়াছিল তাহার জন্য আমাদিগকে ধ্বংস করিবেন? ইহা কেবল আপনার পরীক্ষা (আমাদের উপর)। তদ্বারা আপনি যাহাকে ইচ্ছা বিপথগামী করেন ও যাহাকে ইচ্ছা পথ প্রদর্শন করেন। আপনি আমাদের রক্ষাকারী অভিভাবক। অতএব, আমাদের ক্ষমা করুন এবং আমাদের উপর করুণা বর্ষণ করুন। আপনি সর্বশ্রেষ্ঠ ক্ষমাশীল, আমাদের জন্য যাহা এই পৃথিবী ও পরকালে কল্যাণময় তাহাই নির্ধারিত করুন। আপনার নিকট আমরা অনুতপ্ত হয়াইছি। আল্লাহ্ বলিলেন: আমি যাহাকে ইচ্ছা শাস্তি দিয়া থাকি আর আমার দয়া সকল বস্তুব্যাপী। সুতরাং আমি ইহা (করুণা) তাহাদের জন্য নির্ধারিত করিব যাহারা অসৎ কার্য ত্যাগ করে, যাকাত প্রদান করে এবং আমার প্রত্যাদেশসমূহে বিশ্বাস করে।

পরিশেষে আল্লাহর সহিত তাহাদের কৃত চুক্তির অবিরত লঙ্ঘনের জন্য ইসরাইলীদের উপর হইতে আল্লাহ্ সকল অনুগ্রহ প্রত্যাহার করিলেন। নিম্নের আয়াতগুলি এই সম্পর্কে বহু আয়াতের প্রতিরূপ, যাহাতে ইহুদিদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ প্রত্যাহারের কারণ বর্ণনা করা হইয়াছে।

(৫:১২,১৩) আল্লাহ্ বনি ইসরাইলদের সহিত একটি চুক্তি করিয়াছিলেন এবং তাহাদের মধ্য হইতে তিনি বারজন নেতা নিযুক্ত করিয়াছিলেন। আল্লাহ্ বলিয়াছিলেন: দেখ! আমি তোমাদের সঙ্গে; যদি তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর, যাকাত প্রদান কর, আমার বার্তাবাহকদিগকে বিশ্বাস ও সাহায্য কর এবং আল্লাহকে উত্তম ঋণ প্রদান কর, তবে আমি তোমাদের পাপ মোচন করিব এবং নিশ্চয়ই আমি তোমাদিগকে ঐসকল উদ্যানে প্রবেশ করাইব যাহার নিম্নদেশ দিয়া নদী প্রবাহিত। ইহার পরেও যদি কেহ তোমাদের মধ্যে অবিশ্বাস করে তবে সে সঠিক পথ হইতে বিচ্যুত হইবে। এবং তাহাদের চুক্তি ভঙ্গের কারণে আমি তাহাদিগকে অভিশপ্ত করিয়াছি এবং তাহাদের অন্তকরণ কঠিন করিয়াছি। তাহারা শব্দের অর্থ বিকৃত করে এবং যাহাতে তাহাদের সতর্ক করিয়া দেওয়া হইয়াছে তাহার অংশ-বিশেষ ভুলিয়া যায়। তোমরা তাহাদের অল্পসংখ্যক ব্যতীত সকলকেই বিশ্বাসঘাতকতা করিতে দেখিবে। কিন্তু তাহাদিগকে সহ্য করিও এবং ক্ষমা করিও। আল্লাহ্ দয়াশীলদিগকে ভালবাসেন।

(৪:১৬১) এবং তাহাদের সুদ গ্রহণের জন্য, যদিও উহা তাহাদের জন্য নিষিদ্ধ করা হইয়াছিল; এবং তাহাদের অন্যায়ভাবে মানুষের ধন-সম্পদ গ্রাস করিবার জন্য। তাহাদের মধ্যস্থ অবিশ্বাসীদের জন্য আমি যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির ব্যবস্থা করিয়াছি।

(৫:৬৬) যদি তাহারা ‘তাওরাত’ ও ‘ইঞ্জিল’ এবং তাহাদের প্রতি তাহাদের প্রতিপালক হইতে যাহা অবতীর্ণ হইয়াছে তাহা মান্য করিত, তাহা হইলে তাহারা নিশ্চয়ই তাহাদের উপর ও পদতল হইতে আহার্য লাভ করিত। তাহাদের মধ্যে মধ্যপন্থী ব্যক্তি আছে, কিন্তু তাহাদের অনেকেই মন্দপ্রকৃতির।

সুলায়মানের সময় ইহুদিরা তাহাদের সমৃদ্ধির শীর্ষে উঠিয়াছিল। তারপর তাহারা বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়িল, এবং অদ্যাবধি তাহারা সেইরূপই থাকিত, যদি না যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মৌন সহায়তায় ইসরাইল রাষ্ট্রের সংগঠন হইত। প্যালেস্টাইনে বর্তমান সংঘর্ষের সমাধান হইবে না, যতক্ষণ না ইসরাইলের পক্ষ হইতে কোন আপোষের ব্যবস্থা হয়। মূসার আদি আইন সমূহের (দ্রষ্টব্য ১৮:৫৩ পরিচ্ছেদ) কয়েকটির প্রতি দৃষ্টিপাত করিলে উপলব্ধি করা যায় যে ইহার সম্ভাবনা অত্যল্প। যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ইসরাইল তাহার শক্তিশালী অবস্থার সুযোগ গ্রহণ করিয়া (১২.২১ এর ২য় পংক্তিতে দ্রষ্টব্য) প্যালেস্টিনীয়দের ফলতঃ দাসত্বের দিকে ঠেলিয়া দিয়াছে। কিন্তু পরিশেষে ইসরাইলের পতন অবশ্যম্ভাবী, যদি এইরূপে তাহারা আল্লাহর বিধানসমূহের বিরুদ্ধে যায়।





Home Next >>