৭.৫ ইবরাহীম



ইবরাহীমের উপর কোরানে বহু আয়াত আছে। নিম্নে কয়েকটি উদ্ধৃত হইল:

(২:১২৪) এবং (স্মরণ কর) যখন ইবরাহীমকে তাঁহার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়া পরীক্ষা করিলেন, এবং ইবরাহীম তাহা প্রতিপালন করিলেন, আল্লাহ্ বলিলেন, দেখ! আমি তোমাকে মানবজাতির নেতা নিয়োজিত করিয়াছি। (ইবরাহীম বলিলেন): এবং আমার বংশধরগণের মধ্যেও (নেতা হইবে কি)? আল্লাহ্ বলিলেন: আমার এই প্রতিশ্রুতি অন্যায়কারীদের জন্য নয়।

(৩৭:১০০-১১০) হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সুপথগামীদের মধ্যে থাকিবার সম্মতি দিন। সুতরাং আল্লাহ্ তাঁহাকে একটি সৎ পুত্রের সংবাদ দিলেন। এবং যখন (তাঁহার পুত্র) বড় হইয়া তাঁহার সহিত হাঁটিবার যোগ্য হইল, (ইবরাহীম বলিলেন) হে আমার প্রিয় পুত্র, আমি স্বপ্নে দেখিয়াছি যে আমাকে অবশ্যই তোমাকে কুরবানি দিতে হইবে। অতএব দেখ, তুমি কি মনে কর? তিনি বলিলেন: হে পিতা! আপনাকে যে আদেশ দেওয়া হইয়াছে আপনি তাহাই পালন করুন। আল্লাহর ইচ্ছায়, আমাকে আপনি ধৈর্যশীল পাইবেন। তারপর যখন তাঁহারা উভয়েই (আল্লাহর নিকট) আত্মসমপর্ণ করিলেন এবং তিনি তাঁহার কপাল অবনত করিলেন, আমরা ডাকিয়া বলিলাম: হে ইবরাহীম! আপনি ইতিপূর্বেই আপনার স্বপ্ন-দৃষ্ট নির্দেশ পূর্ণ করিয়াছেন। দেখুন! আমরা এইরূপে সৎকর্মপরায়ণদিগকে পুরস্কৃত করি। নিশ্চয়ই উহা ছিল একটি স্পষ্ট পরীক্ষা। তৎপর আমরা তাঁহাকে একটি বিরাট (আযিম) উৎসর্গ দ্বারা দায়মুক্ত করাইলাম, এবং পরবর্তী বংশধরগণের নিকট তিনি এইরূপে স্মরণযোগ্য হইয়া রহিলেন। ইবরাহীমের উপর শান্তি বর্ষিত হউক! সৎকর্মপরায়ণদিগকে আল্লাহ্ এইরূপে পুরস্কৃত করেন।

‘আযিম’ শব্দের অর্থ ‘ভীষণ’ অথবা ‘শক্তিশালী’। অতএব এই বিরাট উৎসর্গ বলিতে মেষ-কুরবানি বুঝায়, ইহা সম্ভব নহে, যেরূপ বাইবেলে আছে: (জেনেসিস ২২:১৩) “একটি মেষ যাহা ইবরাহীম পাইয়াছিলেন এবং ইসহাকের স্থলে হত্যা করিয়াছিলেন”। কোরান মেষ বা ভেড়ার উল্লেখ করে নাই (বিশদ বিবরণের জন্য দ্রষ্টব্য অধ্যায় ১৮)। আল্লাহর ইচ্ছার প্রতি তাঁহাদের অখণ্ড আনুগত্যের দরুণ ইবরাহীম ও ইশমাইলকে যে দায়িত্ব প্রদান করা হইয়াছিল তাহা নিম্নের আয়াত দুইটি সুস্পষ্টরূপে ব্যক্ত করে। সুতরাং আল্লাহ যে বিরাট উৎসর্গ চাহিয়াছিলেন তাহা হইল যে, তাঁহারা উভয়েই আল্লাহর নিমিত্ত কাজ করিবেন। দুর্ভাগ্যবশতঃ মুসলিমরা বাইবেলের কাহিনী বিশ্বাস করে যাহাতে একটি মেষশাবক আছে এবং মনে করে যে হজ্জ্ব-শেষে লক্ষ-কোটি পশু উৎসর্গের দ্বারা তাহারা পাপ মুক্ত হইবে। কোরানকে অগ্রাহ্য করায় তাহারা উপলব্ধি করেনা, যে আল্লাহর জন্য বিশ্বাসীদের প্রকৃত উৎসর্গ হইল স্থির সংকল্পের সহিত আল্লাহর নিমিত্তে কর্মশীল হওয়া।

(২:১২৫) এবং যখন আমরা (মক্কার) ঐ গৃহকে মানবজাতির জন্য একটি কেন্দ্র ও আশ্রয়-স্থল নির্দিষ্ট করিয়াছিলাম, এই (বলিয়া): যেখানে ইবরাহীম (প্রার্থনায়) দাঁড়াইয়াছিলেন সেইস্থানকে তোমার সালাতের স্থানরূপে গ্রহণ কর। এবং আমরা ইবরাহীম ও ইশমাইলের উপর একটি কর্ত্তব্য আরোপ করিয়াছিলাম এই বলিয়া যে: আমার গৃহকে তাহাদের জন্য পবিত্র কর যাহারা ইহার চতুর্দিকে ঘুরিবে এবং যাহারা সেইস্থানে চিন্তামগ্ন হইবে, এবং যাহারা রুকু ও সিজদায় আনত ও ভূমিষ্ট হইবে।

(২:১২৭,১২৮) এবং যখন ইবরাহীম ও ইশমাইল ঐ গৃহের ভিত্তি পত্তন করিতেছিলেন, (ইবরাহীম বলিলেন): হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের নিকট হইতে (এই কর্তব্যকর্ম) গ্রহণ করুন। আপনি কেবলমাত্র আপনিই, শ্রবণকারী ও মহাজ্ঞানী। হে আমাদের প্রতিপালক ! আপনার প্রতি আমাদের এবং আমাদের বংশধরদিগকে অনুগত করুন। আমাদিগকে এবাদতের প্রক্রিয়া দেখাইয়া দিন এবং আমাদের প্রতি ক্ষমাশীল হউন! নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।

(২২:২৭) এবং মানবজাতির নিকট হজ্জ্বের ঘোষণা করিয়া দাও। তাহারা তোমার নিকট আসিবে পায়ে হাঁটিয়া এবং সর্বপ্রকার ক্ষীণকায় উষ্ট্রে; তাহারা আসিবে প্রতিটি গভীর গিরিসংকট হইতে।

(১৯:৫৪) এবং ধর্মগ্রন্থে ইশমাইলকে উল্লেখ কর। জানিয়া রাখ তিনি তাঁহার প্রতিজ্ঞা রক্ষা করিতেন, এবং তিনি ছিলেন একজন বার্তাবাহক (আল্লাহর), একজন নবী।

কর্তব্য ও দায়িত্ব পূরণের উদ্দেশ্যে ইবরাহীম তাঁহার পরিবারের কতিপয় ব্যক্তিকে ‘কাবার’ নিকট বসবাস করাইলেন।

(১৪:৩৭) হে আমাদের প্রতিপালক! আমি আমার সন্তান-সন্ততিদিগের কয়েকজনকে পবিত্র গৃহের সন্নিকটে এক চাষ-বাসহীন উপত্যকায় বসবাস করিতে দিয়াছি; যাহাতে হে আমাদের প্রতিপালক, তাহারা যেন নিয়মিত ভাবে সালাত প্রতিষ্ঠিত করিতে পারে: অতএব কতক মানুষের হৃদয় তাহাদের প্রতি অনুরাগী করিয়া দিন, এবং খাইবার জন্য তাহাদিগকে ফলমূল দান করুন যাহাতে তাহারা কৃতজ্ঞ হইতে পারে।

আর একটি পুত্র-সন্তান দ্বারা আল্লাহ্ ইবরাহীমের বৃদ্ধ বয়সে তাঁহার প্রতি আরও আশীর্বাদ বর্ষণ করিয়াছিলেন যাহা নিম্নের আয়াতে বলা হইয়াছে:

(৩৭:১১২,১১৩) এবং আমরা তাঁহাকে ইসহাকের জন্মের সুসংবাদ দিলাম; সুপথগামীদের একজন নবী। এবং আল্লাহ্ তাঁহাকে ও ইসহাককে আশীর্বাদ করিলেন। এবং তাঁহাদের বংশধর হইতে কতক সৎকর্মপরায়ণ হইয়াছে এবং কতক সুস্পষ্টরূপে নিজেদের ক্ষতি করিয়া থাকে।

আমরা কোরান হইতে আরও পাই যে ইবরাহীমের সহিত ইসলামের কতকগুলি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হইয়াছিল। তাঁহার পুত্র ইশমাইল সহ তাঁহাকে আল্লাহর ঘর (কাবা) নির্মাণের নির্দেশ দেওয়া হইয়াছিল এবং ধর্মীয় কার্যপদ্ধতি, যেমন সালাত, রোজা, হজ্জ্ব ও জাকাত প্রবর্তন করিতেও নির্দেশ দেওয়া হইয়াছিল। প্রকৃতপক্ষে আমাদের সমস্ত প্রধান ধর্মীয় কার্যপদ্ধতি ইবরাহীম হইতেই আরম্ভ। কোন অংশীদার ব্যতীত কেবল মাত্র আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, ঈমানের প্রাথমিক শর্ত হিসাবে বজায় রহিল এবং মানবজাতিকে যে জীবনধারা (ব্যাপক অর্থে ‘ধর্ম’) অভ্যাস করিতে হইবে তাহারই নাম ‘ইসলাম’ দেওয়া হইয়াছিল।

ইসলাম শব্দের অর্থ “আনুগত্য” ও “শান্তি”—‘আনুগত্য’ যথার্থ রূপে গ্রহণের মাধ্যমে নিজের পছন্দ-অপছন্দ ও আচার-ব্যবহারকে আল্লাহর বিধানের সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ করিয়া ‘শান্তিতে বসবাস করা’। সেইই ‘মুসলিম’ যে নিজেকে আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করে। এইরূপে শুরু হইতেই ‘ইসলাম’ ও ‘মুসলিম’ উভয় শব্দদ্বয়ের উৎপত্তি হইয়াছিল।

(৩:১৯) ইসলামই আল্লাহর নিকট একমাত্র দ্বীন (ধর্ম) [ ...]

(৩:৬৭) ইবরাহীম ইহুদি ছিলেন না, খৃষ্টানও ছিলেন না; কিন্তু তিনি ছিলেন একজন ন্যায়পরায়ণ এবং (আল্লাহর নিকট), আত্মসমর্পণকারী ব্যক্তি এবং তিনি মূর্তীপূজারীদের দলভুক্ত ছিলেন না।

(২:১৩০,১৩১) এবং যে ইবরাহীমের ধর্ম ত্যাগ করে সে নিজ ব্যতীত আর কাহাকে নির্বোধ প্রতিপন্ন করে? যথার্থই আমরা তাঁহাকে পৃথিবীতে মনোনীত করিয়াছি, এবং পরকালেও তিনি সুপথগামীদের অন্তর্ভুক্ত। তাঁহার প্রতিপালক যখন তাঁহাকে বলিয়াছিলেন: আত্মসমর্পণ কর! তিনি বলিয়াছিলেন, আমি সমস্ত বিশ্বের প্রতিপালকের নিকট নিজেকে আত্মসমর্পণ করিয়াছি।

(২২:৭৮) এবং আল্লাহর নিমিত্ত আপ্রাণ চেষ্টা কর, সেই সব প্রচেষ্টার সহিত, যাহা আল্লাহর প্রাপ্য। তিনি তোমাদিগকে মনোনীত করিয়াছেন এবং তোমাদের উপর ধর্মের কোন কঠিনতা আরোপ করেন নাই। ইহা তোমাদের পিতৃপুরুষ ইবরাহীমের ধর্ম। আল্লাহ্ তোমাদের নামকরণ করিয়াছেন মুসলিম (যাহারা আত্মসমর্পণ করিয়াছে) পুরাতন যুগে এবং এই ধর্মগ্রন্থেও, যাহাতে আল্লাহর বার্তাবাহক তোমাদের জন্য সাক্ষী থাকেন এবং তোমরা সাক্ষী থাক মানবজাতির জন্য। সুতরাং সালাত প্রতিষ্ঠিত কর, যাকাত দাও এবং আল্লাহকে অবলম্বন কর। তিনিই তোমাদের রক্ষণকারী অভিভাবক। তিনিই পবিত্র প্রতিপোষক এবং উত্তম সাহায্যকারী!

মনে রাখা উচিত যে, রীতিগত ভাবে কেবলমাত্র নবী মোহাম্মাদের অনুসারীদের জন্য “ইসলাম” ও “মুসলিম” শব্দের ব্যবহার কোরানের মত-বিরুদ্ধ। উভয় শব্দই সার্বজনীন অর্থে এবং সর্বকালের সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রযোজ্য। অতএব কোরান অনুসারে আল্লাহর পুরস্কার কোন বিশেষ ধর্মসম্প্রদায়ের জন্য নির্ধারিত নহে, বরং সকলের জন্য উন্মুক্ত, যাহারা সজ্ঞানে আল্লাহর একত্ব স্বীকার করে, তাঁহার নির্দেশে আত্মসমর্পণ করে, এবং সৎ জীবন যাপনে এই সকল মনোভাবকে কার্য্যকরী করিয়া তোলে

(২:৬২) (যাহা আপনার নিকট প্রকাশিত হইয়াছে, হে মোহাম্মদ) তাহাতে যাহারা বিশ্বাস করে এবং ইহুদিরা, এবং খৃষ্টান ও সাবিঈনরা — যাহারাই আল্লাহ্ এবং বিচার দিবসকে বিশ্বাস করে এবং সৎকার্য করে –তাহাদের পুরস্কার রহিয়াছে তাহাদের প্রতিপালকের নিকট। তাহাদের কোন ভয় নাই এবং তাহারা মনোকষ্টও পাইবে না।

সাবিঈনরা একরূপ একেশ্বরবাদী ধর্মীয় সম্প্রদায়, যাহাদের এখনও ইরাকে দেখা যায়।

(২:১১১,১১২) এবং তাহারা বলে: ইহুদি অথবা খৃষ্টান ব্যতীত অন্য কেহই বেহেশতে যাইবে না। ইহা তাহাদের নিজস্ব কল্পনা। বলুন: যদি তোমরা সত্যবাদী হও তবে (তোমরা যাহা বল তাহার) প্রমাণ আনয়ন কর। পরন্তু, যে কেহই আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করে এবং সৎকর্মপরায়ণ হয়, তাহার পুরস্কার তাহার প্রতিপালকের নিকট এবং তাহাদের কোন ভয় নাই এবং তাহারা মনোকষ্টও পাইবে না।

সুতরাং ইসলাম সেই আদি ‘দ্বীনে’রই (ধর্ম) অবিচ্ছিন্ন ধারা, যাহা প্রথম নবী প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন। পরবর্তী সকল নবীই সেই একই ধর্ম প্রচার করেন। ইবরাহীম হইতে তাঁহার দুই পুত্র ইশমাইল ও ইসহাকের মাধ্যমে বহু নবীর আবির্ভাব হয়। ইশমাইল আরব অধিবাসীদের আদি পুরুষ এবং মোহাম্মদ তাঁহারই একজন বংশধর। ইসহাক হইতে বেশ কিছু সংখ্যক নবীর উৎপত্তি হইয়াছিল, যেমন তাঁহার পুত্র ইয়াকুব, পৌত্র ইউসূফ, এবং পরবর্ত্তীকালে মূসা, দাউদ, সুলায়মান, ইয়াহহিয়া ও ঈসা।

(২:১৩২-১৩৪) ইবরাহীম ও ইয়াকুব তাঁহার পুত্রদের একই নির্দেশ দিয়াছিলেন (এই বলিয়া): হে পুত্রগণ! আল্লাহ্ তোমাদের জন্য এই (সত্য) দ্বীন মনোনীত করিয়াছেন। অতএব (তাঁহার নিকট) আত্মসমর্পণকারী না হইয়া মৃত্যুবরণ করিও না। অথবা তোমরা কি উপস্থিত ছিলে যখন ইয়াকুবের নিকট মৃত্যু আসিয়াছিল এবং তিনি তাঁহার পুত্রদিগকে বলিয়াছিলেন: ‘আমার পরে তোমরা কিসের এবাদত করিবে’? তাঁহারা বলিয়াছিল: আমরা এক আল্লাহর এবাদত করিব, যাহাকে আপনি ও আপনার পিতৃপুরুষ ইবরাহীম, ইশমাইল ও ইসহাক এবাদত করিয়াছেন, একমাত্র প্রভু, এবং তাঁহারই নিকট আমরা আত্মসমর্পণ করিয়াছি। সেই সকল মানুষ আজ অতীত হইয়াছে। তাহারা যাহা অর্জন করিয়াছিলেন তাহা তাঁহাদের এবং তোমরা যাহা অর্জন করিবে তাহা তোমাদের। তাঁহারা কি করিতেন সে সম্বন্ধে তোমাদিগকে প্রশ্ন করা হইবে না।

(২:১৩৬) (হে মুসলিমগণ) বল: আমরা আল্লাহে বিশ্বাস রাখি এবং যাহা আমাদের প্রতি অবতীর্ণ হইয়াছে, এবং ইবরাহীম, ইশমাইল, ইসহাক, ইয়াকুব ও তাঁহার গোত্রসমূহের প্রতি অবতীর্ণ হইয়াছিল, এবং যাহা তাঁহাদের প্রতিপালকের নিকট হইতে মূসা, ঈসা এবং অন্যান্য নবীগণ প্রাপ্ত হইয়াছিলেন, আমরা তাহা বিশ্বাস করি। আমরা তাঁহাদের মধ্যে কোন পার্থক্য করিনা এবং আমরা তাঁহারই (আল্লাহর) নিকট আত্মসমর্পণ করিয়াছি।





Home Next >>