১৪. কোরান ও বিজ্ঞান



কোরানে উল্লিখিত বিজ্ঞান বিষয় সম্বন্ধে বুঝিবার জন্য ডাঃ মরিস বুকাইলের “দি বাইবেল, দি কোরান এণ্ড সায়ন্স” শীর্ষক অতি উৎকৃষ্ট পুস্তকটির প্রতি পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করিতেছি। এই অধ্যায়ে তাঁহার পুস্তক হইতে কেবল কিছু কিছু অংশ উদ্ধৃত করিয়াছি এবং পুস্তকের বিষয়বস্তু সম্বন্ধে একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়াছি। যাঁহারা এই বিষয়ে জানিতে উৎসুক তাঁহাদের এই পুস্তকটি পাঠ করা অবশ্যই প্রয়োজন। ধর্মগ্রন্থে বিজ্ঞান সম্পর্কে আলোচনা নিশ্চিতভাবে স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক তথ্য এবং ব্যাখ্যামূলক প্রতিপাদ্য বা তত্ত্ব যাহা বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে পরিত্যক্ত হইতে পারে, এই দুইয়ের পার্থক্য সতর্কতার সহিত নিরূপণ করিতে হইবে। ডাঃ বুকাইল যাহা কিছু আলোচনা করিয়াছেন সেগুলি এ যাবত প্রতিষ্ঠিত তর্কাতীত তথ্য, এবং এই বিষয়ে বিজ্ঞান যদি কেবলমাত্র অসম্পূর্ণ তথ্য দিতেই সক্ষম হয় তাহা হইলেও বিষয়গুলি যথেষ্ট দৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত বলিয়া নির্বিরোধে ব্যবহৃত হইতে পারে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যেমন পৃথিবী সূর্যকে ঘিরিয়া ও চন্দ্র পৃথিবীকে ঘিরিয়া আবর্তন করে এবং এই বিষয়ে পরিবর্তনের সম্ভাবনা নাই। ভবিষ্যতে যাহা হইতে পারে তাহা এই যে, কক্ষপথ আরও নির্দিষ্টভাবে নির্দেশিত হইতে পারে। তাঁহার পুস্তকের কিছু কিছু অংশ দৃষ্টান্ত হিসাবে দেওয়া হইল:

“কোরান ইহার পূর্ববর্তী দুইটি প্রত্যাদেশের অনুগামী এবং ইহার বিবৃতিসমূহ কেবলমাত্র অসংগতি হইতে মুক্ত তাহাই নহে, যাহা মানুষের হস্তক্ষেপের নিদর্শনরূপে ‘গস্পেলে’ (Gospel) পাওয়া যায়; বরং যাহারা ইহাকে বাস্তব ভিত্তিতে এবং বিজ্ঞানের আলোকে নিরীক্ষণ করে তাহাদেরকে ইহা আপন বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করে (অর্থাৎ আধুনিক বৈজ্ঞানিক তথ্যের সহিত ইহার সম্পূর্ণ সংগতি)। অধিকন্তু, বিজ্ঞান-সংশ্লিষ্ট যে সমস্ত বক্তব্য ইহার মধ্যে পাওয়া যায়, সেগুলির লেখক মোহাম্মাদের সময়কালের কোন মনুষ্য হইতে পারে ইহা অচিন্তনীয়। সুতরাং আধুনিক বৈজ্ঞানিক জ্ঞান আমাদিগকে কোরানের কয়েকটি বিশেষ আয়াত বুঝিতে সাহায্য করে যেগুলির ব্যাখ্যা এ পর্যন্ত অসম্ভব ছিল”।1

“অতএব কিরূপে (ইসলামী কৃষ্টির শীর্ষবিন্দুর লেখকবৃন্দ সহ) কোরানের ভাষ্যকারগণ বহু শতাব্দিব্যাপী কতকগুলি বিশেষ আয়াতের ব্যাখ্যা করিতে অনিবার্যভাবে ভুল করিয়াছিলেন তাহা সহজেই বুঝিতে পারা যায়, কারণ সেগুলির সঠিক অর্থ উপলব্ধি করা তাহাদের পক্ষে সম্ভব ছিলনা। বহুকাল গত না হওয়া পর্যন্ত এবং আমাদের সময় হইতে অতি পূর্বেও নহে, এগুলি সঠিকভাবে অনুবাদ এবং ব্যাখ্যা করা সম্ভব হইয়াছে। ইহার অর্থ এই যে, কোরানের এই সব আয়াত বুঝিবার জন্য গভীর ভাষাগত জ্ঞানই যথেষ্ট নহে। ইহার সহিত আরও প্রয়োজন বিজ্ঞান সম্পর্কে বিভিন্নমুখী জ্ঞান। বর্তমান এই অনুশীলনটির ন্যায় প্রচেষ্টা বিভিন্ন বিষয়ের জ্ঞানের পরিমণ্ডল বেষ্টন করে এবং ইহা বিশ্বকোষরূপ জ্ঞানের তুলনীয়। উত্থাপিত প্রশ্নসমূহ আলোচনার সহিত কোরানের কিছু কিছু আয়াত বুঝিবার জন্য যে বিবিধ প্রকার বৈজ্ঞানিক জ্ঞান অত্যাবশ্যক, তাহা স্পষ্ট হইয়া উঠিবে।

“কোরান অবশ্য বিশ্ব নিয়ন্ত্রণমূলক নিয়ম বা সূত্র ব্যাখ্যা করিবার উদ্দেশ্যপূর্ণ কোন গ্রন্থের অনুরূপ গ্রন্থ নহে; ইহার উদ্দেশ্য সম্পূর্ণই ধর্মগত। ইলাহি শক্তির সর্বব্যাপিতার বিবরণই মানুষকে প্রধানতঃ সৃষ্টিকার্য সম্বন্ধে গভীরভাবে চিন্তা করিতে প্ররোচিত করে। এই সমস্ত বিবরণীর সহিত মানুষের পর্যবেক্ষণাধীন সংশ্লিষ্ট ঘটনাবলী অথবা আল্লাহর নির্ণীত বিধান সমূহের উল্লেখ আছে; আল্লাহ্ যিনি মহাবিশ্বের সংগঠনে প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ও মানুষ উভয়ের উপরই কর্তৃত্ব করেন। এই সকল দৃঢ়নিশ্চয় উক্তির একটি অংশ সহজেই বোধগম্য, কিন্তু অপর অংশের তাৎপর্য উপলব্ধি কেবলমাত্র বিজ্ঞান সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় জ্ঞান থাকিলেই সম্ভব। ইহার অর্থ এই যে, পূর্বে মানুষ কেবলমাত্র আপাত-বোধক অর্থ নির্ণয়েই সমর্থ হইত যাহা আলোচ্য সময়ে তাহর অপর্যাপ্ত জ্ঞানের জন্য তাহাকে ভুল সিদ্ধান্তে চালিত করিত”।

কোরানে অর্ন্তভুক্ত কতকগুলি বৈজ্ঞানিক বিষয় নিম্নে দেওয়া হইল, এবং এইগুলির বিশদ বিবরণ ডাঃ বুকাইলের গ্রন্থে ১৩৯ হইতে ২২০ পৃষ্ঠায় পাওয়া যাইবে। তাঁহার পুস্তকে বাইবেলের “বন্যা” (The Flood) ও “অভিনিষ্ক্রমণ” (The Exodus) শীর্ষক আখ্যানের সহিত কোরানে প্রদত্ত আখ্যানের তুলনায় যে সকল পার্থক্য একটি বর্ণনাকে বর্তমান যুগে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে গ্রহণীয় এবং অপরটিকে অগ্রহনীয় করে তাহা বিশেষ ভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে।

মহাবিশ্ব ও পৃথিবীর সৃষ্টি।

জ্যোতির্বিদ্যা।

পৃথিবী।

প্রাণী ও উদ্ভিদ জগত।

মানুষের জনন-প্রক্রিয়া।

পরিশেষে ইহাই বলা যায় যে, বিজ্ঞান ও ধর্মের মধ্যে কোন বিরোধ কোরানে পাওয়া যায় না। কিন্তু কোরানে বর্ণিত বৈজ্ঞানিক ধারণাগুলি আরও স্পষ্টরূপে বুঝিবার জন্য আমাদের বৈজ্ঞানিক এবং ভাষাগত জ্ঞান উভয়ই প্রয়োজন

References: (প্রসঙ্গ সূত্র)

১.The Bible Qur’an and Science, by Dr. Maurice Bucaille.
Publisher Seghers, 6 Place Saint-Sulpice 75006 Paris. p. 268.
২.Ibid,. p. 129, 130.





Home Next >>