১২. কোরান প্রদত্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা



১২.১ ভূমিকা

কোরান কঠোরতম ভাষায় সুদ (রিবা) ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। সুতরাং কোরানের উপর ভিত্তিশীল কোন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তিস্তম্ভ কেবলমাত্র সর্বতোভাবে ও সম্পূর্ণভাবে সুদের ব্যবহার নিষিদ্ধ ব্যতীতও যাহা কিছু সুদের সহিত বিন্দুমাত্র সাদৃশ্যপূর্ণ তাহা সমস্ত হইতেই দূরে-স্থিত হওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া প্রয়োজন। নিম্নের আয়াতগুলি কোরানের এই দাবী সমূহের কিছু কিছু ইঙ্গিত দেয়:

(২:২৭৮) তোমরা যাহারা বিশ্বাসী! আল্লাহর প্রতি তোমাদের কর্ত্তব্য পালন কর, এবং তোমরা যদি (সত্যই) বিশ্বাসী হও তবে সুদের অংশ হইতে (তোমাদের প্রাপ্য) ব্যতীত সমস্তই পরিত্যাগ কর।

(২:২৭৯) যদি তোমরা তাহা না কর, তাহা হইলে আল্লাহ্ ও তাঁহার রাসূল হইতে (তোমাদের বিরুদ্ধে) যুদ্ধের সম্বন্ধে জ্ঞাত থাকিও। এবং তোমরা যদি অনুতপ্ত হও তবে (সুদ ব্যতীত) তোমাদের মূলধন ফিরাইয়া লও। অন্যায় করিও না, এবং তোমাদের প্রতিও অন্যায় করা হইবে না।

(৩:১৩০) তোমরা যাহারা বিশ্বাসী! সুদ গ্রাস করিয়া ঋণ দেওয়া অর্থ দ্বিগুন চতুর্গুণ করিও না। আল্লাহর প্রতি তোমাদের কর্তব্য পালন কর, যাহাতে তোমরা কৃতকার্য হইতে পার।

(৪:৬১) এবং নিষিদ্ধ করা সত্ত্বেও যাহারা সুদ গ্রহণ করে, ও যাহারা মিথ্যা অজুহাতের মাধ্যেমে অপরের সম্পত্তি গ্রাস করে, এই সমস্ত অবিশ্বাসীদিগের জন্য আমরা যন্ত্রণাকর পরিণতির ব্যবস্থা রাখিয়াছি।

(৩০:৩৯) (অন্যের) সম্পত্তি লাভের বৃদ্ধি হেতু সুদের জন্য যাহা তোমরা দাও আল্লাহর নিকট ইহার কোনই বৃদ্ধি নাই; কিন্তু আল্লাহর প্রসন্নতা লাভের উদ্দেশ্যে ‘যাকাত হিসাবে যাহা বিনিয়োগ কর’, ইহার বহুগুণ বৃদ্ধি আছে।

টীকা: (৩০:৩৯) আয়াতে প্রচলিত অনুবাদ যাকাতে “দান করো” স্থলে “যাকাতে বিনিয়োগ করো” ব্যবহার করা হইয়াছে। ১২.৩৩ বিভাগে ইহার কারণ দেওয়া হইয়াছে।

বর্তমানে অধিকাংশ আধুনিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই সুদের উপর এতই নির্ভরশীল যে সুদের সহিত প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত নাই এইরূপ কোন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ধারণা করাই কষ্টসাধ্য। বহু মুসলিমই কোরানের দাবী ও আধুনিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যের এই অসঙ্গতির মীমাংসা করিতে চেষ্টা করিয়াছেন, কিন্তু আজ পর্যন্ত কোন উপযোগী ব্যবস্থার উদ্ভব হয় নাই। ঔপনিবেশিক শৃঙ্খলামুক্ত তথাকথিত ইসলামী রাষ্ট্রসমূহ বহিশক্তি দ্বারা বুদ্ধিগত বা অর্থনৈতিক দিক দিয়াও নিয়ন্ত্রিত রহিয়াছে, সুতরাং কোন প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও একটি সত্যকার ইসলামী রাষ্ট্রের পূর্বপ্রতিষ্ঠা ভিন্ন প্রযোজিত ও পরীক্ষিত হইতে পারে না (১৬ অধ্যায় দ্র:)। বস্তুতঃ ইসলামের প্রথম অবস্থায় বা প্রথম কয়েক শতাব্দীব্যাপী যখন মুসলিমদিগের জন্য একমাত্র কোরানই ছিল নির্দেশ-নির্ভর সূত্র, সেই সময় কোরান ভিত্তিক একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল, এবং নিঃসন্ধেহে কালক্রমে ইহা আরও বর্ধিতভাবে বিকশিত হইত, যদি না মুসলিমগণ কোরান হইতে বিচ্যুত হইবার ফলে বিশ্বশক্তির মর্যাদা হারাইত। সেই শূন্যতা পূর্ণ করিয়াছে পাশ্চাত্য শক্তি, যাহার অর্থনীতি আজ মুখ্যতঃ সুদের উপরই প্রতিষ্ঠিত বলিয়া দেখিতে পাই।

আদর্শ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তি কোরানের মধ্যেই নিহিত। যাহা হউক, কোরান কেবলমাত্র মূলনীতি সমূহেরই উল্লেখ করে এবং বিশদ ব্যবস্থা সমূহ পূর্ণ করিবার ভার সমাজের প্রয়োজন অনুযায়ী মানুষের উপরই ন্যস্ত করে, কিন্তু মানুষের অভিজ্ঞতার কোন পর্যায়ই তাহারা সৃষ্টিকর্তা আরোপিত মূলনীতি সমূহের সীমা লঙ্ঘন করিতে পারিবে না।

১২.২ বর্তমানকালের বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ:

নিম্নবর্তী অনুচ্ছেদ (১২.২১) যাহার নিষ্প্রয়োজন, সাহিব মুস্তাকিম ব্লেহার রচিত, “ইসলাম: ইউরোপে মূল নিচ্ছে” (Islam: Taking root in Europe) নামক প্রবন্ধ হইতে উদ্ধৃত। পরবর্তী অনুচ্ছেদে (১২.২২) এফ ক্লেয়ারমন্ট এবং জে ক্যাভানা রচিত ৯.১.৮৭ তারিখের লণ্ডনের (Guardian) পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধের একাংশ সন্নিবেশিত হইয়াছে। ইহা তৃতীয় বিশ্ব যে অভূতপূর্ণ ঋণ সঙ্কটের সম্মুখীন, সেই সম্পর্কে, এবং ইহার প্রারম্ভে সে বিষয়ে আমার যে মন্তব্য তাহা দেওয়া হইয়াছে।

১২.২১ “প্রত্যেক ভাবতত্ত্বের যেরূপ অন্তর্নিহিত দর্শন থাকে (ধনতন্ত্র ব্যক্তির স্বাধীন ইচ্ছার উপর গুরুত্ব দিয়া থাকে, কমিউনিজম্ বা মার্কসীয় সাম্যবাদ ব্যক্তির উৎপাদন ক্ষমতার সহিত তাহার মূল্যমান নির্ণয় করিয়া থাকে, আধুনিক ঔদাসীন্যভাব প্রত্যেক ব্যক্তি বা অবস্থার আপেক্ষিকতার উপর গুরুত্ব দিয়া থাকে), সেইরূপ আমার চিন্তায় মনে হয় ইসলামের ভাবাদর্শের মূল হইল সমতা। যখন আল্লাহ্ বিশ্ব সৃষ্টি করিলেন তখন প্রত্যেক বস্তু আপন নির্দিষ্ট স্থানে ছিল। পৃথিবীতে অসংখ্য বিভিন্ন সত্ত্বা ও শক্তির মিথস্ক্রিয়ার ফলে এই শৃঙ্খলা সর্বদাই বিঘ্নিত হইতেছে এবং এই ভারসাম্যের হানি হইতেছে, যতক্ষণ না মানুষ সঠিক, সরল পথে ফিরিয়া আসে ও এই ভারসাম্যহীনতার সমন্বয় সাধন করে। এই নীতি মানুষের সকল অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যাইতে পারে। বস্তুভিত্তিক অগ্রগতির অতি-মূল্যায়ন আধ্যাত্মিক অগ্রগতিকে শ্বাস-রুদ্ধ করিয়া দিয়াছে, ফলে অনিয়ন্ত্রিত দূষণক্রিয়ায় পরিবেশের ভারসাম্য বিঘ্নিত হইয়াছে: লোভ সম্পদের অন্যায্য বন্টনের মাধ্যমে একটি বৈষম্যময় জগৎ সৃষ্টি করিয়াছে; বিশ্বের অগ্রগামী সমাজসমূহের বেহিসাবী সুখভোগ অগণিত জাতির দ্বারে যুদ্ধের সূচনা করিয়াছে এই সমস্ত উদাহরণের মধ্যের দৃষ্টিগোচর ভারসাম্যহীনতা একের প্রতি অন্যের অবিচারের সহিত সমীকৃত করা যায়। এই ভারসাম্য ফিরাইয়া আনিতে হইলে অবিচারের সহিত সংগ্রাম অবশ্যম্ভাবী। সুতরাং, ইসলাম কোন ক্রমেই কেবল গৃহে বা সন্ন্যাস আশ্রমে চর্চার মত কোন ব্যক্তিগত ধর্ম হইতে পারে না। রাজনীতিবিহীন হইলে তাহা ইসলাম নয়।

“ফেরাউনের সময়কার সমাজ সম্বন্ধে কোরানের বর্ণনা হইতে জানিতে পারা যায় যে মানব সমাজ তিনটি ভিত্তিস্তম্ভের উপর নির্ভর করে: সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সামরিক ক্ষেত্র (প্রতিনিধি ফেরাউন), অর্থনৈতিক ক্ষেত্র (প্রতিনিধি কারূন/কোরাহ), এবং শিক্ষা, ধর্ম ও প্রচার-প্রচারণা ক্ষেত্র (প্রতিনিধি হামান)। এই তিনটি ক্ষেত্র পরস্পর সম্বন্ধযুক্ত এবং উৎপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রাম দুইটিকে বাদ দিয়া একটি ক্ষেত্রের বিরুদ্ধে চালাইলে তাহা অকৃতকার্য থাকিবে। অতীতে ইহাই ঘটিয়াছে। যখন মুসলিম বিশ্বের আভ্যন্তরীন বিভিন্নরূপ জাতীয়াতাবাদী জোটগুলি ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল মুক্ত হইল ও ফলে বহু দেশের সৃষ্টি হইল যাহারা বিজাতীয় রাজনৈতিক উপদেষ্টাসমূহ বিতাড়িত করিল বটে, কিন্তু বুদ্ধিমত্তা ও অর্থনৈতিক দিক দিয়া বাহিরের নিয়ন্ত্রণেই আবদ্ধ রহিয়া গেল। বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন মুসলিম দলের ইসলামীয় পুনর্জাগরণ ইসলামের আধ্যাত্মিক বিষয়েই নিবদ্ধ থাকিল, অর্থাৎ ব্যক্তি চরিত্রের শুদ্ধিগত প্রয়োজনের মধ্যেই (সীমাবদ্ধ থাকিল), ফলে কাহাকেও রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক দাসত্ব হইতে মুক্তি দিতে অক্ষম হইল। মুসলিমদিগের অর্থনৈতিক সংস্কার প্রচেষ্টা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকিল, কারণ তাহারা রাজনৈতিক ও প্রচারগত নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নের প্রতি লক্ষ্যপাত করে নাই। মনে হয় যে, সবকটি না হইলেও গত কয়েক শতাব্দীব্যাপী প্রায় প্রতিটি মুসলিম আন্দোলনই পাশ্চাত্যের বিভেদনীতির শিকার হইয়াছে, যাহাতে ইসলামের দাবী অনুযাযী সমষ্টিগত পথের পরিবর্তে, তাহাদের প্রয়াসের মধ্যে যুক্তিবাদী ও বিশ্লেষণবাদী বিখণ্ডিত পথের ধারাই প্রবর্তিত করিয়াছে। বর্তমান বস্তুবাদী সমাজের নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি এতই সূক্ষ্ম যে ইহার অবিচার ন্যায়সঙ্গত বলিয়া চালাইয়া দেওয়া যাইতে পারে। ইহার ইলাহি বিধান বর্জন এবং ব্যক্তি স্বত্ত্বার উপর গুরুত্ব দানের ফলে মনুষ্যকৃত আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে মানুষ বিছিন্ন ও অসহায় হইয়া পড়ে। ইহার সংবাদ প্রচার-প্রচারণা যন্ত্র প্রাপ্তিযোগ্য সমস্ত তথ্যকে একটি গ্রহণযোগ্য স্বাভাবিক স্তরে ফলপ্রদরূপে পরিস্রুত করা ব্যতীতও দ্বিমুখী ভাষ্যের দ্বারা ঘটনা সমূহের অনুভূতিবোধকে বিকৃত করিবার মাধ্যমে মিথ্যাকে সত্যে রূপান্তরিত করে। ইহার নিত্য বর্ধমান মাদকদ্রব্যশিল্প মানুষকে এমনি আচ্ছন্ন করিয়া ফেলে যে তাহারা অন্যের যাতনার প্রতি উদাসীন হইয়া পড়ে, যোগাযোগে অসমর্থ ও উদ্দেশ্যহীন অবস্থায় আপনার রূপান্তরকারী সমস্ত আভ্যন্তরীণ শক্তিকেই স্ববিমুখী করিয়া তোলে। ইহার রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলি, যাহা কিছু কার্যতঃ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ আপনাপন ইচ্ছানুযায়ী করিতে চায়, তাহার নীরব অনুমোদনকারী একটি বিস্তৃত ‘সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী প্রক্রিয়ার’ মাধ্যমে জঘন্যতম অন্যায় কার্যক্রমকেও যথার্থ্যতা দিয়া থাকে। ইহার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা স্পষ্টতঃই সুদকে অস্ত্রহিসাবে ব্যবহারের দ্বারা উৎপাদন-কারীদিগের নিকট হইতে সম্পদ লইয়া অবিরাম পুনর্বন্টনের জন্য একটি ক্ষুদ্র একচেটিয়া গোষ্ঠীর হস্তে পৌঁছাইয়া দেয়, যাহারা বিশ্বের প্রায় প্রতিটি ব্যক্তির জীবন বন্ধক লইয়াছে।

“যাহা বাস্তব নয় মানুষের মনকে তাহা কিভাবে বিশ্বাস করানো যায়, আধুনিক বিশ্ব অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তাহার একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত। ইহার আরম্ভ পূর্বেকার স্বর্ণকারকগণ হইতে যাহারা অপরের মূল্যবান দ্রব্যাদি ভূগর্ভস্থ ঘরে নিরাপদ রক্ষণের জন্য লইত। তাহারা সত্বর উপলব্ধি করিল যে গচ্ছিতকারীরা কেহই তাহাদের সমুদয় অর্থ ফিরত চাহিত না, বরং প্রতিবারে অল্প পরিমাণেই ফিরাইয়া লইত, এবং তাহারা নিশ্চিন্তে সুদের বদলে অপরের অর্থ ধার দিতে পারে, যদি দৈনন্দিন চাহিদা মিটাইবার জন্য যথেষ্ট রাখা যায়। ইহার অধিক, প্রায়শঃই তাহারা তাহাদের নিকট যাহা ছিল তাহা অপেক্ষাও অধিক ধার দিয়াও পার পাইত, যেহেতু প্রত্যর্থ-পত্র (গচ্ছিত অর্থ ফিরত দিবার অঙ্গীকার-পত্র) প্রাপ্ত ব্যক্তি প্রায়শঃই তাহা মুদ্রায় ফিরাইয়া লইত না, বরং মুদ্রার পরিবর্তে একটি স্বত্ব-প্রমাণকারী দলিলেই তাহার সন্তুষ্টি হইত, এই ধারণায় যে মুদ্রা স্বর্ণকারের ভূগর্ভস্থ ঘরে নিরাপদেই রক্ষিত আছে। এইরূপে স্বর্ণকারগণই প্রথম ব্যাঙ্ক মালিকের রূপ নিল, এবং ক্রমশঃই প্রতারণার মাধ্যমে অধিক হইতে অধিকতর ব্যক্তির কষ্টার্জিত সম্পদ আত্মাসাৎ করিয়া লইল। কাগজের নোট, চেক, প্লাষ্টিক কার্ড ও ইলেকট্রনিক অর্থ স্থানান্তর ইত্যাদির ব্যাপক ব্যবহারের মাধ্যমে এই ব্যবসা বিরাট আকার ধারণ করিয়াছে, এবং ব্যাঙ্ক পরিচালকগণ এক্ষণে সরকার সহ সমস্ত তাৎপর্যপূর্ণ কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করেন। যেহেতু ঐতিহাসিকভাবে সুদ-ব্যবসায় ক্রীষ্টানদিগের জন্য নিষিদ্ধ ছিল, এবং মুসলিমদিগের জন্য ইহা এখনও নিষিদ্ধ বা নিষিদ্ধ হওয়া উচিত, ইহুদিগণই এই ব্যবসায় নিজেদেরকে প্রথম প্রতিষ্ঠিত করে এবং আজ পর্যন্ত ইহা একচেটিয়া ভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। সুতরাং, ইহুদী-তান্ত্রিকেরা যে সদা-বর্দ্ধমান ঋণ-পীড়িত সকল সরকার হইতেই প্রায় সর্বদাই নিজ সুবিধা আদায় করিয়া লয় ইহা অল্পই আশ্চর্যের বিষয়।

“১৮৬৫ খৃষ্টাব্দে আব্রাহাম লিঙ্কন তাঁহার অর্থনৈতিক কর্মধারা বর্ণনা করেন: অর্থ আইনের জীব, এবং অর্থের প্রথম সৃষ্টি বা প্রচলন জাতীয় সরকারের একচ্ছত্র অধিকার হিসাবে বজায় রাখা উচিত। সংবহন বা প্রচারের মাধ্যমে অর্থের যে মান দেওয়া হইয়া থাকে রাষ্ট্রের নিকট তাহার ইহার অধিক মূল্য নাই [...]। সরকার ইহার অর্থ ও ঋণ এবং ব্যাঙ্কে গচ্ছিত জাতীয় আমানতের প্রতিরক্ষক হইবে। মূল্যস্ফীতি জনিত অর্থের অবমূল্যায়ন বা দেউলিয়া হইবার মাধ্যমে কাহারো অর্থক্ষয় হওয়া উচিৎ নয়। ঋণ এবং মুদ্রা সৃষ্টি ও প্রচলনে ক্ষমতাবান সরকারের সরকারী প্রকল্প বা সাধারণের কার্যনির্বাহের আর্থিক সংস্থানের জন্য সুদের ভিত্তিতে মূলধন সংগ্রহ করা প্রয়োজনও নয়, উচিতও নয়।” এক শতাব্দীর উর্দ্ধে এই সমস্ত উক্তিতে নূতন কিছু সংযোজনের প্রয়োজন নাই। কিন্তু লিঙ্কনকে হত্যা করা হয়, এবং অর্থ ব্যবসায়ীরাই ক্ষমতায় রহিল। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয় সঞ্চয় সংস্থা (Federal Reserve) এই শক্তি নির্বাহ করে এবং সরকারের পরিবর্তে ইহাই জাতীয় মুদ্রা প্রচলিত করে। জন এফ্ কেনেডী তাহাদের এই অধিকার বাতিল করিবার জন্য অগ্রণী হইয়াছিলেন, কিন্তু তিনিও নিহিত হন। এই অর্থশক্তি অন্য যে কোন নিয়ন্ত্রণ-পন্থা অপেক্ষা ভারসাম্যের অধিক হানি করিয়াছে। উর্বর, স্বনির্ভর দেশসমূহকে ঋণে নিমজ্জিত করিয়া বাহিরের অনুদানের উপর নির্ভরশীল করা হইয়াছে। তবুও, সুদ হইতে পাশ্চাত্যের আয় তৃতীয় বিশ্বের প্রতি অনুদানের কয়েকগুণ। কেবলমাত্র সুদ হইতে প্রাপ্ত আয় ঋণদাতারা পাইয়া থাকে, পরিবর্তে অনুদানের ব্যয়ভার জনসাধারণ ও তাহাদের সরকারই বহন করিয়া থাকে। এই অশুভ অর্থশক্তি যে এই পৃথিবীকে বিপদগ্রস্থকারী কতকগুলি চরম অবিচারের মূলে, যেমন — যুদ্ধ, পরিবেশ-দূষণ, অনাহার, সামাজিক বিশৃঙ্খলা ইত্যাদি, এই বিবেচনায় মুসলিমদিগেরই ইহার বিরুদ্ধে যুদ্ধে সর্বপ্রথম স্থান নেওয়া উচিত। এই শূন্য হইতে অর্থের উৎপত্তি, এই অসাধু উপায়ে সম্পদের আত্মাসাৎ যাহা প্রায় খোদার উপর খোদকারীর রূপ নেয় — এবং দাজ্জাল বা ভূয়া মসীহর আগমনী সূচনা করে –, এই বিবেচনায় ইহা মুসলিমদিগের কর্মসূচির সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে হওয়া উচিত। সঙ্গত কারণেই ইসলামে সুদ নিষিদ্ধ হইয়াছে। তবুও মুসলিমগণ সুদের অর্থে নির্মিত মসজিদ সমূহে আনন্দে সহিতই নামাজ পাঠ করিয়া থাকে, এবং তথাকথিত মুসলিম ব্যাঙ্কগুলি স্বস্তির সহিতই অন্যান্যদেরকে এই খেলায় হারাইবার উদ্দেশ্যে মাতিয়া যায়। একটি বাস্তব বিকল্প উত্থাপনের পরিবর্তে, তাহারা কেবলমাত্র একটি সহজ নামান্তর করিয়া নির্লজ্জভাবে ইহাকে ন্যায্য অংশীদারীত্ব (শরিকানী) বলিয়া থাকে, যখন উদ্যোগী ব্যবসায়ীকে কিছু অর্থ ঋণদানের পরিবর্তে তাহারা তাহার কষ্টার্জিত লাভের অর্ধেক লইয়া থাকে যদিও এই অর্থের জন্য তাহাদিগকে কোনই মূল্য দিতে হয় না”।

১২.২২ তৃতীয় বিশ্বের সম্মুখীন অভূতপূর্ব ঋণ-সঙ্কট: এইবার আমরা পাশ্চাত্য জগতের কিছু দেশের প্রতি দৃষ্টিপাত করিব যাহারা নিজেদের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র সম্বন্ধে গর্বিত কিন্তু অন্যান্য দেশের প্রতি তাহাদের আচরণ ও মনোভাবে প্রায়শঃই এই দুই গুণের অভাব থাকিয়া যায়। ইহার কারণ এই যে, যে সকল ব্যক্তি এই সমস্ত দেশ শাসন করিয়া থাকে তাহারা কেবলমাত্র একটি ক্রমবর্ধনশীল জীবিকা-মানের প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতেই ক্ষমতায় থাকিতে পারে, যাহা অধিকাংশ ক্ষেত্রে তৃতীয় বিশ্বের সম্পদ অপহরণের মাধ্যমেই অর্জিত হইয়া থাকে। এই সমস্ত বিত্তশালী দেশগুলির অধিকাংশই অর্থগ্রাসী হাঙ্গরের ন্যায় আচরণ করিয়া থাকে। তাহারা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির শাসনকর্তাদিগকে দ্রব্যাদি আমদানির জন্য বিপুল পরিমাণে ঋণ দিয়া দুর্নীতি পরায়ণ করিয়া দেয়, বহুক্ষেত্রেই এই সমস্ত দ্রব্যাদি দেশের প্রয়োজন না থাকিলেও রাজনৈতিক চাপের ফলে লইতে হয়। এইরূপে চাপের ফলে ঋণভার বিপুল হইয়া উঠে, এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বাধাদানে স্বল্পই সক্ষম হয়, কারণ তাহা হইলে তাহারা নিহত হইবে অথবা তাহাদের পরিবর্তে অন্যান্য ব্যক্তিগণ প্রতিষ্ঠিত হইবে, যাহারা পুনরায় বিত্তশালী দেশগুলির অনুগত হইবে। প্রায়শঃই এই সকল তৃতীয় বিশ্ব নেতৃবর্গ বিরাটকার ঘুষের চাপ ব্যতীতও অঘোষিত লভ্যাংশের বিনিময়ে বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলির সহিত চুক্তিবদ্ধ হইতে বাধ্য হয়। ইহার ফলে স্বদেশবাসীর মঙ্গলজনক উন্নয়নে ইচ্ছুক কোন আন্তরিক তৃতীয় বিশ্ব নেতার পক্ষে কৃতকার্য হওয়া অসম্ভব হইয়া পড়িয়াছে। তাহারা কোনরূপে প্রতিষ্ঠালাভ করিলেও তাহাদিগকে কমিউনিষ্ট বা অগণতান্ত্রিক বলিয়া সংবাদ মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয় এবং তাহাদিগকে উৎখাত করিতে সর্বপ্রকার সম্ভাব্য চাপের সৃষ্টি করা হইয়া থাকে। এই বিরাট শোষণ-প্রক্রিয়া এবং ইহার অবশ্যম্ভাবী ভয়ঙ্কর পরিণতির কথা উল্লেখ না করিলে আমার কর্তব্যের হানি হইবে। এই ঋণদান এবং বিরাট পরিমাণ সুদ-আহরণ এই সমস্ত দেশগুলিকে পঙ্গু করিয়া ফেলিতেছে। ইহা এমন একটি পর্যায়ে পৌছিয়াছে যে পুঞ্জীভূত সুদের ভার মূল ঋণকে ছাড়াইয়া গিয়াছে, এবং ঋণভার এতই স্ফীত হইয়াছে যে আদি ঋণ মিটাইয়া দেওয়া অসম্ভব হইবে, সুতরাং সুদ প্রদান অনন্তকালব্যাপী চলিতে থাকিবে। এই সমস্ত ঋণগুলি এমন ভাবে দেওয়া হইয়াছে যে অর্থগ্রাসী হাঙ্গরেরা যেন তৃতীয় বিশ্বের দুর্দশাবস্থা হইতে বরাবরই অর্থসঞ্চয় করিয়া চলিতে পারে। এই বিশ্বজনীন সমস্যা সম্বন্ধে চার্চের কিছুই বলিবার আছে বলিয়া মনে হয় না। তৃতীয় বিশ্বের সম্মুখীন অভূতপূর্ব ঋণ-সঙ্কট সম্বন্ধে ৯/১/৮৭ তারিখে লন্ডনের গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত এফ ক্লেয়ারমন্ট ও জে ক্যাভানা রচিত একটি প্রবন্ধের অংশবিশেষ উল্লেখ না করিয়া পারিলাম না। এই প্রবন্ধ প্রকাশের পর প্রায় ১২ বৎসর অতিবাহিত হইয়াছ। তৃতীয় বিশ্বের অবস্থা এই সময়ের মধ্যে শোচনীয় হইতে শোচনীয়তর হইয়াছে, এবং ইহার একমাত্র কারণ হইল সুদ প্রদানের মাধ্যমে শোষণ, যাহা কোরান নিঃশর্ত ভাবে নিষিদ্ধ করে।

“তৃতীয় বিশ্ব একটি অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক সঙ্কটের সম্মুখীন, ইহার ঋণভার অত্যধিক হারে বর্দ্ধিত হইতেছে কিন্তু ইহার রপ্তানীমূলক আয় দ্রুত নিম্নগামী। দানবীয় পরিমাণ সম্পদ দরিদ্র দেশসমূহ হইতে ধনী-দেশগুলিতে প্রবাহিত হইতেছে — ইহার ফলাফল হিসাবে ১৯৮১ সালে, যুদ্ধোত্তর (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ) ইতিহাসে এই প্রথম তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহ সর্বমোট পুঁজি রপ্তানীকারী হইয়া দাঁড়াইয়াছে। অন্যভাবে দেখিলে তাহাদের ঋণ বাবদ পাওনা আদায় নূতন ঋণ ও ঋণ পুনর্বিন্যাসের পরিমাণ অতিক্রম করিয়াছে। –১৯৮১ হইতে ১৯৮৫ সালের মধ্যে ল্যাটিন আমেরিকার মোট পুজি রপ্তানী ৫০ কোটি আমেরিকান ডলার হইতে ৪২৪০ কোটি ডলারে পৌঁছায় অর্থাৎ ৮৫ গুণ বৃদ্ধি, আফ্রিকার ক্ষেত্রে ৫৩০ কোটি হইতে ২১৫০ কোটি, এবং এশিয়ার ক্ষেত্রে ১৭০ কোটি হইতে ৯৭০ কোটিতে পৌঁছায়। এই সমস্ত পুঁজি চালানোর মধ্যে তৃতীয় বিশ্বে অবস্থিত বিদেশীয় কোম্পানীগুলির লভ্যাংশ প্রত্যাবান (স্বদেশে স্থানান্তরন) এবং পুঁজি অপসারণ (ও মধ্যপ্রাচ্যের রপ্তানীকারকদের) গণ্য করা হয় নাই। এই সমস্ত অতিরিক্তগুলি পাল্লায় উঠাইলে সর্বমোট পুজি বর্হিগমন ২৩০০০-২৪০০০ কোটি ডলার হইতে অপেক্ষাকৃত কম হইবে না। –এই অঙ্ক মার্শাল প্ল্যান অনুদানের চতুর্গুণ, এবং এহা একান্তভাবে উল্লেখযোগ্য যে মার্শাল প্ল্যান অনুদান আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রকে সুদসহ মিটান হইয়াছিল। বিপরীতভাবে দরিদ্র দেশসমূহ হইতে ধনী দেশগুলিকে দেওয়া এই কর ফিরৎ দেওয়া হইবে না। — এই ভীতিজনক পরিস্থিতিকে আরও হীনতর করিয়াছে আন্তর্জাতিক ব্যাঙ্কঋণ, যাহা ১৯৮৫ সালে ২১৬০০ কোটি ডলার অতিক্রম করিয়াছে। যেমন সধারণতঃ হইয়া থাকে শিল্পপণ্যেৎপাদী দেশগুলিই ইহার প্রায় সমস্তই শুষিয়া লইয়াছে: ১৯৮৪ সালের ১১৯০০ কোটি ডলারের পরিবর্তে ১৯৪০০ কোটি ডলার। অনুন্নত দেশগুলি লইয়াছে ৩০০ কোটি ডলার (১৯৮৪): একটি উপহাসমূলক অংশ যাহা তাহাদের বিশ্বব্যাপী সুদ পরিশোধ-অংকের দুই শতাংশ পরিমাণ হইবে। — অতীব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বিশ্বব্যাঙ্কের পণ্যদ্রব্যাদির মূল্যের পূর্বাভাস, যাহার কোনই বৈজ্ঞানিক যথার্থতার দাবী নাই। ১৯৮০ সাল হইতে সমস্ত পণ্যদ্রব্যাদির মূল্যের উঠাপড়ার হার অপেক্ষা বিশ্বব্যাঙ্কের ঐ সমস্ত পণ্যদ্রব্যাদির মূল্যের পূর্বাভাস সাধারণতঃই উচ্চে ছিল। বিশ্বব্যাঙ্কের এই পূর্বাভাসের প্রতারণামূলক রূপ — যাহার উদ্দেশ্য অতিমাত্রায় পণ্যদ্রাব্যাদির সরবরাহ বৃদ্ধি করা এবং ফলতঃ দ্রব্যমূল্য হ্রাস করা—তৃতীয় বিশ্বের ক্রমবর্দ্ধমান বুদ্ধিমান শিল্পউৎপাদনবীদগণ উপলব্ধি করিতেছেন। — ফলাফল, গ্রীক বিয়োগান্ত নাটকের ন্যায় অবশ্যাম্ভাবী: তৃতীয়-বিশ্বের দেশ সমূহকে উচ্চতর মূল্যের দ্রব্যাদি এবং কর্মঘটিত আমদানীর বিনিময়ে উত্তরোত্তর বৃহৎ অঙ্কের পণ্য সামগ্রী নিম্ন হইতে নিম্নতর মূল্যে বিশ্ববাজারে বাজারজাত করিতে চালিত করা হইতেছে। — বস্তুতঃপক্ষে, মূল ঋণ এবং সুদ কোনটিই কোনকালেই পরিশোধ করা সম্ভব হইবে না। ইহা আশা করাও ঠিক নয় যে এই ঋণ পরিশোধ করা উচিত। ঋণ পরিহারই তৃতীয়-বিশ্বের জন্য একমাত্র নীতিগত ভাবে সম্ভাব্য ও যুক্তিপূর্ণ সমাধান হিসাবে মান্য করা যাইতে পারে”।

ইহাও বলিতে হয়, এমনকি এই সমস্ত ধনী দেশসমূহের সাধারণ মানুষেরাও অনুরূপ শোষণ প্রক্রিয়ার শিকার হইয়া থাকে। তৃতীয়-বিশ্বের ন্যায় ইহাদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম কাজ করিয়া থাকে। এই সমস্ত অর্থগ্রাসী হাঙ্গরদের হাতে সাধারণ মানুষ যে চরম দুর্দশায় পতিত হয় পত্রিকা মাধ্যমে তাহার সামন্যই প্রকাশিত হয়। চার্চও এই সমস্ত বিষয়ে একেবারেই নিশ্চুপ। বিস্ময়ের নয় যে আল্লাহ্ সুদ নিষিদ্ধ করিয়াছেন, এবং আমাদের অতিরিক্ত সম্পদে এই সমস্ত অর্থগ্রাসী হাঙ্গরদের তহবিল স্ফীত করিবার পরিবর্তে মানুষের মঙ্গলের জন্য ইহার ব্যবহার দ্বার্থহীনভাবে উল্লেখ করিয়াছেন।

১২.৩ কোরানে ব্যবহৃত কতকগুলি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক চেতনা

১২.৩১ দান: (কোরানের সামাজিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত প্রযোজ্য থাকিবে)। নিঃস্বার্থ এবং স্বেচ্ছাকৃত।

১২.৩২ সাদাক্বাত: আমাদের বেতন, লভ্যাংশ বা অনুরূপ কোন প্রকার আয় হইতে কোন কোন বাধ্যতামূলক (ধর্মীয়) প্রয়োজন মিটাইতে যাহা দেওয়া হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে সাদাক্বাত দান হিসাবেও দেওয়া হইয়া থাকে।

১২.৩৩ যাকাত: অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য, বিনিয়োগ হিসাবে দেয়, যাহার মুল উদ্দেশ্য সমাজের হিতের জন্য অর্থকরী প্রচেষ্টা।

১২.৩৪ ব্যবসা জনক আদান প্রদান ও ক্রয় বিক্রয়।

১২.৩১ দান: কোরানের সামাজিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হইলে দানের প্রয়োজন থাকা উচিত নয়। যদিও অন্তবর্তী সময় দানের প্রয়োজন সর্বদাই থাকিবে। কিন্তু স্বচ্ছল ব্যক্তিগণ আপন ইচ্ছায় কেবলমাত্র সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশেরর জন্য দান করুক, ইহাই আল্লাহ্ পছন্দ করেন। নিম্নের আয়াতগুলি আল্লাহভীত সমাজে দানের ধারণা বর্ণনা করে:

(২:১৭৭) [...] এবং তাহার প্রতি প্রেমবশতঃ, আপন ধন আত্মীয় স্বজন, অনাথ, অভাবগ্রস্থ, প্রার্থী ও দাসদিগকে মুক্ত করিবার জন্য দিয়া থাকে।

(৭৬:৮) এবং তাঁহার প্রতি প্রেমবশতঃ দুস্থ অভাবগ্রস্থ, অনাথ এবং বন্দীদিগকে আহার দিয়া থাকে।

(৭৬:৯) (এই বলিয়া যে): আমরা তোমাদিগকে আহার দিই কেবলমাত্র আল্লাহর জন্য। আমরা তোমাদিগের নিকট কোন পুরস্কার বা ধন্যবাদ আশা করি না।

অভাবগ্রস্থদিগকে সাহায্য করিবার জন্য এই নিঃস্বার্থ কর্ম সমাজে দুইটি ধারার সূত্রপাত করে: প্রথমতঃ অভাবগ্রস্থদিগকে বাস্তবভিত্তিক সাহায্যের জন্য সমাজে একটি ঐক্যবদ্ধ ভাবের জন্ম লয়, দ্বিতীয়তঃ দাতা একটি আধ্যাত্মিক উপকার পাইয়া থাকেন, এই হিসাবে যে বস্তুসামগ্রীর প্রতি তাঁহার লোভ খর্ব হওয়ার ফলে সমাজের পথে বাধা সৃষ্টি করিতে ইহা তাহাকে বিরত করিবে। বস্তুতঃই যখন মানুষ স্বইচ্ছায়, সৃষ্টিকর্তার প্রতি তাহাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য দান কর্মে অগ্রণী হয়, তখন লোভ বিপরীতমুখী হয়।

(১২:৩২) সাদাক্বাত: এই ধারণা বুঝিবার জন্য নিম্নের আয়াতগুলি দেখুন।

(৯:৬০) সাদাক্বাত কেবলমাত্র গরীব ও অভাবগ্রস্থদের জন্য, এবং তাহাদের জন্য যাহারা তাহা সংগ্রহ করিয়া থাকে, যাহাদের অন্তর শান্ত করিতে হইবে, এবং বন্দী ও ঋণীদিগকে মুক্তি দিবার জন্য, এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যে, ও মুসাফিরদিগের জন্য; ইহা আল্লাহ্ কর্তৃক নির্দিষ্ট একটি কর্তব্য। আল্লাহ্ জানেন, আল্লাহ্ জ্ঞানী।

(৯:১০৩) তাহাদের সম্পদ (সাদাক্বাত) হইতে ভিক্ষা লও, যাহাতে তাহারা বিশুদ্ধ হইতে পারে এবং তাহারা বৃদ্ধিলাভ করে, এবং তাহাদের জন্য প্রার্থনা কর। আল্লাহ্ শুনিতে পান, এবং তিনি জানেন।

এই ব্যবস্থা সহজবোধ্য যদি মনুস্যগণ বিশ্বাস করে যে পার্থিব লাভ হইতেছে, সৃষ্টিকর্তা বিভিন্ন সম্পদ প্রাপ্তিসাধ্য করিতেছেন বলিয়া, এবং এই লাভের একটি অংশ সমাজের সাধারণের মঙ্গলের জন্য ব্যয় করিতে হইবে। এই উদ্দেশ্য (৯:৬০) এবং (৯:১০৩) আয়াতে সাদাক্বাত দেওয়া আল্লাহর উদ্দেশ্যে বলিয়া গণ্য হইয়াছে। সহজ ভাষায় সাদাক্বাতের অর্থ রাজ্যস্থ ব্যক্তি এবং ব্যবসাসমূহের দেয় কর, যাহা অতঃপর সাধারণের কল্যাণে ব্যয় করিতে হইবে। খেয়াল রাখিতে হইবে যে বহু অর্থবোধক অনেক আরবী শব্দের ন্যায়, সাদাক্বাত অর্থ ‘দান’ হইতেও পারে। কোন বিশেষ ক্ষেত্রে যে অর্থ কার্যকরী হইবে তাহা প্রসঙ্গের উপর নির্ভর করিবে।

(৫৭:১৮) পুরুষ ও নারী, যাহারা সাদাক্বাত দেয়, এবং আল্লাহকে একটি উত্তম ঋণ দেয়, তাহাদের প্রাপ্তি দ্বিগুণ হইবে এবং তাহাদের পুরস্কার প্রভূত হইবে।

নিম্নে বর্ণিত (৬:১৪১) আয়াতে এই ইলাহী-অংশ কখন দিতে হইবে তাহা পরিষ্কার ভাবে বলে: ফসল সংগ্রহের দিন। বর্তমান সূত্রে ইহার অর্থ, বেতন পাইবার সময় যে কর অবশ্যই দিতে হয়।

(৬:১৪১) বাগান জাফরি সমেত বা জাফরি ব্যতীতই হউক, এবং খর্জুর বৃক্ষ, বিভিন্ন প্রকার সৌরভ পূর্ণ শস্যাদি, জলপাই, এবং দাড়িম্ব, সাদৃশ্যজনক অথবা সাদৃশ্যহীন, তিনিই তাহা উৎপন্ন করেন। ফল আসিলে সেই সকল ফল ভক্ষণ কর এবং শস্য সংগ্রহের দিন তোমার অংশ হইতে দান কর, এবং অপচয়ী হইও না। স্মরণ রাখিও আল্লাহ্ অপচয়ীকে পছন্দ করেন না।

আল্লাহর উদ্দেশ্যে দেওয়া এই অংশ ইসলামী রাষ্ট্রের উদ্দেশ্যেই দেওয়া হয়, সাধারণের কল্যাণের জন্য। একই রূপে (৫৮:১২, ১৩) আয়াতে বার্তাবাহককে দেওয়ার অর্থ সাধারণের মঙ্গলের জন্য রাষ্ট্রকেই দেওয়া, যেহেতু বার্তাবাহক রাষ্ট্রের পক্ষ হইতেই তাহা সংগ্রহ করিতেছেন।

(৫৮:১২) তোমরা যাহারা বিশ্বাসী! তোমরা যখন বার্তাবাহকের সহিত পরামর্শে রপ্ত হও, পরামর্শের পূর্বে সাদাক্বাত প্রদান কর। তোমাদের পক্ষ হইতে ইহা উত্তম ও পবিত্রতর। কিন্তু যদি তোমরা সক্ষম না হও তবে খেয়াল রাখিও! আল্লাহ্ ক্ষমাশীর, দয়াবান।

(৫৮:১৩) তোমরা কি পরামর্শের পূর্বে সাদাক্বাত প্রদান করিতে ভয় পাও? তবে যদি তাহা না কর, এবং আল্লাহ্ তোমাদিগকে ক্ষমা করেন, অতঃপর সালাত কায়েম কর এবং যাকাতে বিনিয়োগ কর এবং আল্লাহ্ ও তাহার রাসূলকে মান্য কর। এবং তোমরা যাহা কর আল্লাহ্ সে বিষয়ে সচেতন।

ইহা স্মরণ রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে আল্লাহ্ মুসলিম পুরুষদিগের জন্য তাহাদের স্ত্রীদিগকে বিবাহের উপলক্ষে দেয় দেনমোহর কর্তব্য বলিয়া বিবেচনা করিতে আদেশ দিয়াছেন (৪:২৪), এবং এই পাওনাকে বলা হইয়াছে ‘সাদাক্বাত’ (৪:৪)। এই ক্ষেত্রে সাদাক্বাত কোন দান নহে বরং বাধ্যতামূলক, অবশ্যই দিতে হইবে।

(৪:২৪) [...] এবং (বিবাহের মাধ্যমে) তোমরা যাহাদের সম্মতি সন্ধান কর, (কর্তব্য হিসাবে) তাহাদের প্রাপ্য অংশ দাও। কর্তব্য কর্মের পরে পরস্পর সম্মতির ভিত্তিতে তোমরা যাহা কর তাহাতে কোন পাপ নাই। আল্লাহ্ সর্বদাই সচেতন, জ্ঞানী।

(৪:৪) এবং (যাহাদিগকে তোমরা বিবাহ কর) সেইসব নারীদিগকে তাহাদের বিবাহের অংশ হিসাবে উপহার (সাদাক্বাত) দাও; কিন্তু তাহারা যদি নিজ হইতে তাহার কিছু অংশের দাবী প্রত্যাহার করে, তাহা হইলে তোমরা তাহা নিজ সম্পদের অন্তর্ভুক্ত করিতে পার।

মানবজাতিকে এই অপরিহার্য নীতি অবশ্যই বুঝিতে হইবে যে শান্তিময় ও সুদৃঢ় সমাজ তখনই আসিবে যখন একটি ন্যায্য আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিরাজ করিবে। এইরূপ একটি সংগঠনে সম্পদ মানব দেহে রক্তের ন্যায়; রক্ত সমস্ত শরীরে সর্বদাই সঞ্চালন করিতে হইবে, এবং শরীরের প্রতিটি কোষে তাহা পৌঁছান প্রয়োজন। তবেই কেবল শরীর সুস্থ থাকিবে। সম্পদ ভাণ্ডারজাত করা থ্রম্বোসিসের (টিকা দ্রষ্টব্য) ন্যায়: সমাজের মধ্যে সম্পদ মজুদ দেওয়া বিস্তার লাভ করিতে দিলে অর্থনৈতিক কাঠামো ভাঙ্গিয়া পড়িবে। এই জন্যই আল্লাহ্ সম্পদ মজুদ করা নিষিদ্ধ করিয়াছেন, নিম্নের আয়াতগুলিতে তাহা লক্ষ্য করা যায়।

টিকা: থ্রম্বোসিস –এই রোগে ধমনীর মধ্যে রক্ত জমাট বাঁধিয়া যায়; অতিরিক্ত মাত্রায় ইহা ধমনীর বিভিন্ন অংশে রক্ত সঞ্চালন বিঘ্নিত করে। হৃদযন্ত্র বা মস্তিষ্কের ক্ষেত্রে মৃত্যু ঘটিতে পারে।

(৯:৩৪) [...] যাহারা স্বর্ণ এবং রৌপ্য মজুদ করে, কিন্তু আল্লাহর উদ্দেশ্যে বয় করেনা, (হে মোহাম্মাদ) তাহাগিদকে শোচনীয় পরিণতির সংবাদ দাও।

(১০৪:১-৪) প্রত্যেক লোভী ও দাম্ভিক যাহারা (দুনিয়ায়) সম্পদ সঞ্চয় করিয়া সজ্জিত করিয়া রাখিয়াছে, তাহারা দুর্দশায় পতিত হউক। তাহারা চিন্তা করে যে এই সম্পদ তাহাদিগকে অমর করিবে। কখনই নহে, বরং তাহাদিগকে একটি সর্বগ্রাসী (অগ্নিতে) নিক্ষেপ করা হইবে।

একটি সত্যকার ইসলামী রাষ্ট্রে সকলের জন্যই নিরাপত্তা থাকিবে, সুতরাং উদ্বৃত্ত সম্পদ বিনয়োগ করা হইবে, এইরূপে মজুদ করিবার ফলাফল এড়ানো যাইবে। ইহা ব্যতীত আল্লাহ্ মৃত ব্যক্তির সম্পদ বন্টনের উপর বিশেষ গুরূত্ব দিয়া থাকেন, এবং কোরানে উত্তরাধীকার সম্বন্ধে অত্যন্ত বিশদ ও স্পষ্ট বর্ণিত আইনের উল্লেখ আছে। ইহা একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা যাহার সাহায্যে রাজ্যের সম্পদ সুবন্টিত থাকে, এবং ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সম্মিলিত সংস্থান গঠন সম্ভব হয় না। দুর্ভাগ্য বশতঃ মুসলিমগণ এই গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এড়াইবার জন্য নানা প্রকার উপায় ও পথ আবিষ্কার করিয়াছে। তাহারা সাদাক্বাতের সংজ্ঞা দিয়াছে স্বেচ্ছাকৃত দান এবং যাকাতের সঞ্চয় ও পুঞ্জীভূত সম্পদের ২.৫ শতাংশে সীমিত করিয়াছে, যাহাতে ধনীগণ তাহাদের সম্পদ আঁকড়াইয়া ধরিয়া রাখিতে পারে। বিপরীতভাবে, নারীদিগের দেনমোহর (অর্থাৎ স্বামীর পক্ষ হইতে বিবাহের পূর্বে দেয় যৌতুক) অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একটি না-দাবীকৃত চুক্তি হিসাবেই রহিয়া যায়, যদিও ইহা নারীর জন্য বিনিয়োগ করা উচিত, যেহেতু সংসারের রক্ষণাবেক্ষণ পুরুষেরই দায়িত্ব। ইহা ব্যতীত, কোরানের স্পষ্ট নির্দেশ সত্বেও, নারীরা প্রায়শঃই পিতৃসম্পদের উত্তরাধীকার হইতে বঞ্চিত হয়।

১২.৩৩ যাকাত: আক্ষরিক ভাবে, যাকাতের অর্থ বৃদ্ধি, বিশুদ্ধকরণ বা ন্যায়পরায়ণতা। আল-শওকানী নিম্নরূপে সংজ্ঞা দিয়াছেন: “ভাষাগতভাবে যাকাহ্ অর্থ বৃদ্ধি: ‘যাকাহায-যার’ অর্থ ‘চারাটি বৃদ্ধি পাইল’। ইহার অর্থ বিশুদ্ধকরণ বা পবিত্রকরণও হইতে পারে। শরীয়াহ (ইসলামীয় বিধি) অনুযায়ী দুইটি অর্থই হইতে পারে। প্রথম অর্থে, সম্পদের বৃদ্ধির যাহা কারণ, এইরূপ ব্যাখ্যা করা যাইতে পারে, অথবা যাহা অধিক ফলদানের কারণ হইতে পারে, অথবা ব্যবসা বা কৃষির ক্ষেত্রে বৃদ্ধির সম্পর্কে হইতে পারে”।

(৩০:৩৯) কাহারও কাহারও সম্পদ বৃদ্ধির জন্য সুদের যে ব্যবহার প্রচলিত, তাহাতে আল্লাহর চক্ষে কোন বৃদ্ধি নাই। কিন্তু আল্লাহর আনুকূল্য লাভের উদ্দেশ্যে যাহারা যাকাত বিনিয়োগ করে, তাহারাই বহুগুণ ফললাভ করিয়া থাকে।

যাকাত এবং সুদ উভয় ক্ষেত্রেই বাস্তব লাভের উদ্দেশ্যে সম্পদের বিনিয়োগ করা হইয়া থাকে। কিন্তু যাকাত আল্লাহর সমর্থিত বিনিয়োগ পন্থা এবং সুদ তাঁহার নিকট সম্পূর্ণ অপ্রীতিকর। সুদ হইতে উৎপন্ন সম্পদ লাভ আল্লাহর দৃষ্টিতে কোনরূপ লাভজনক নয় ইহার পরিবর্তে যাকাত হইতে প্রাপ্ত ফললাভ আল্লাহর আশীর্বাদ-পুষ্ট, উপরের আয়াত হইতে এই মৌলিক নীতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এই সহজ ব্যাখ্যার পথ অনুসরণ না করিয়া ঐতিহ্যপন্থীগণ যাকাতকে (৯:৬০) এবং (৯:১০৩) আয়াতের সহিত যুক্ত করিয়াছেন যাহা সাদাক্বাতের সহিত সম্পর্কিত, এবং তাহারা রাষ্ট্র কর্তৃক যে দান সংগ্রহ করা হইয়া থাকে সেই অর্থ ব্যবহার করিয়াছেন। তাহারা এতদূর অগ্রণী হইয়াছিলেন যে, এই দান সংগ্রহের একটি মাপকাটিও নির্ণয় করিয়াছিলেন, এবং এই প্রথার আবির্ভাব আল্লাহর রাসূলের সহিত জড়িত করিয়াছিলেন। ইহা অচিন্তনীয় যে আল্লাহর রাসূল এমন একটি অর্থনৈতিক পদ্ধতি চালু করিয়া থাকিবেন যাহাতে অসৎ উপায়ে বর্দ্ধিত ধনের শতকরা ২.৫ ভাগ নিষ্কাশন করিয়া লইলেই তাহা ‘বিশুদ্ধ’ হইয়া যাইবে। (৯:৬০) এবং (৯:১৩০) আয়াতে যাহা নির্দেশিত হইয়াছে, যাকাত তাহা হইতে ভিন্ন, এই বিষয় তদন্ত করিবার পর (২:১১৭) আয়াতের ইঙ্গিতে আমরা দেখিতে পাই যে, স্বেচ্ছাকৃতভাবে দানে ব্যয় করিবার পরও যাহা বাকি থাকিয়া যায়, তাহা ‘যাকাত’ বলিয়া গণ্য। (২২:৪১) আয়াতে নির্দেশ দেয় যে তাহারাই সত্যই বিশ্বাসী, যাহারা শক্তি এবং প্রভাবের অধিকারী হইলে, আপনাদের জীবন ধারায় ‘যাকাতের’ পদ্ধতি প্রতিষ্ঠিত করে।

(২২:৪১) এবং সেই সমস্ত ব্যক্তিগণ, ভূখণ্ডে যদি আমরা তাহাদিগকে শক্তি দান করি, তাহারা সালাত প্রতিষ্ঠিত করে এবং যাকাতে বিনিয়োগ করে, এবং দয়াধর্ম পালন করে ও পক্ষপাতীত্ব নিষিদ্ধ করে। এবং সমস্ত ঘটনার শেষ পরিণতি আল্লাহ্।

(২২:৭৮) আয়াত এই নির্দেশ আরও অধিকতর প্রতিপন্ন করে।

(২২:৭৮) [...] সুতরাং সালাত প্রতিষ্ঠিত কর, যাকাতে বিনিয়োগ কর এবং আল্লাহকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়াইয়া ধর। তিনিই তোমাদের রক্ষাকারী সুহৃদ। একটি মহিমান্বিত রক্ষক এবং একটি মহিমান্বিত সাহায্যকারী!

আর কোন উল্লেখ না করিয়া যাকাত সম্বন্ধে সরাসরি আলোচনাকারী আয়াত সমূহের দ্রষ্টব্য সংখ্যা দেওয়া হইল। সেগুলি: (২:৪৩, ৮৩, ১১০, ১৭৭, ২৭৭), (৪:১৬২), (৫:১২), (৭:১৫৬), (৯:৫, ১১, ১৮, ৭১), (২১:৭৩), (২২:৪১,৭৮), (২৪:৩৭, ৫৬), (২৭:৩), (৩১:৪), (৩৩:৩৩), (৪১:৭)।

যাকাত অর্থ-মজুদ প্রতিরোধ করে এবং সম্পদ বৃদ্ধির সহায়তা করে যাহাতে মানুষ দানের উপর নির্ভর না করিয়া জীবিকা উপার্জনে সক্ষম হয়। যাকাত অন্যরূপে দেখিলে অনুমান হয় যে উদ্বৃত্ত অর্থ কেবলমাত্র দানে ব্যয় করিলে অদূর ভবিষ্যতে দানশীল ব্যক্তি দান করিতে সক্ষম নাও হইতে পারেন, এবং অবস্থার পরিবর্তন হেতু স্বয়ং দাননির্ভর হইয়া পড়িতে পারেন। কিন্তু যাকাত ধন-বৃদ্ধিরূপে বিনিয়োগ করিলে, ব্যক্তির পক্ষে পরিমিত মাত্রার জীবন-যাপন সম্ভব হইতে পারে, এবং সমাজকে কর্মসংস্থানে সাহায্য করিতে পারে, যাহাতে কাহাকেও দানের উপর নির্ভর করিতে না হয়। একই সঙ্গে মজুদদারীর প্রশ্নও তিরোহিত হয়। অতএব বিনিয়োগ হিসাবে যাকাত কোরানের বহু আবশ্যকীয় শর্ত পূর্ণ করে।

টিকা: কোরানে অনেকগুলি আয়াতে ‘সাবীলিল্লাহ্’ শব্দটি পাওয়া যায়। দৃষ্টান্ত হিসাবে:

(২:২৬১) যাহারা আল্লাহর পথে (সাবীলিল্লাহ্) তাহাদের সম্পদ ব্যয় করে তাহাদের সহিত তুলনীয় একটি শস্যকণা যাহাতে সাতটি শীষ জন্মায় এবং প্রত্যেকটি শীষে একশত শস্যকণা জন্মায়। আল্লাহ্ যাহাকে খুশি বহুগুণ দিয়া থাকেন। আল্লাহ্ সমস্তই বেষ্টন করিয়া থাকেন, তিনি সর্বজ্ঞানী।

সাবীলিল্লাহ্ শব্দের আক্ষরিক অর্থ হইল ‘আল্লাহর পথ’। ঐতিহ্যবাদীগণের বিবেচনায় ইহা দানের সমার্থক, যদিও সমগ্র কোরানে এই শব্দ কখনও ঐ অর্থে ব্যবহৃত হয় নাই। কার্যত ইহার অর্থ আল্লাহর পথে মুক্তহস্থে ব্যয় করা: অর্থ, সময়, সম্পদ বা যাহা কিছু।

১২.৩৪ ব্যবসা সংক্রান্ত আদান প্রদান (বাইয়ী) এবং বাণিজ্য।

ব্যবসা সংক্রান্ত আদান প্রদান ও বাণিজ্য যথাক্রমে দুইটি পৃথক প্রচেষ্টা, যাহা নিম্নলিখিত আয়াতসমূহে উল্লিখিত হইয়াছে।

(২৪:৩৭) এইরূপ ব্যক্তিগণ যাহারা বাণিজ্য বা ব্যবসা সংক্রান্ত আদান-প্রদান কালে (বাইয়ী) আল্লাহকে স্মরণ করে।

এই আয়াতে ‘বাইয়ী’ শব্দের নিকটতম ধারণা বা ভাব বলিতে ব্যবসা সংক্রান্ত আদান-প্রদান বুঝায়, যাহা অর্থের লেনদেন সম্পর্কিত কিন্তু বিনিময়ে কোন পণ্যদ্রব্য হস্তান্তারিত হয় না। বাহ্যিকভাবে, ইহা সুদের ব্যবহারের সমতুল্য হইবে যদিও একটি সূক্ষ্ম ও গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বর্তমান, এবং কেবলমাত্র সেই ক্ষেত্রেই নিম্নলিখিত আয়াতের শব্দযোজনা অর্থবহ হইবে।

(২:২৭৫) [...] তাহারা বলিয়া থাকে ‘বাইয়ী’ সুদের ন্যায়: যদিও আল্লাহ্ ‘বাইয়ী’ অনুমোদনের করেন কিন্তু সুদ নিষিদ্ধ করেন [...]।

উদাহরণ স্বরূপ ‘বাইয়ী’র উপর ভিত্তিশীল অর্থনৈতিক আদর্শের মধ্যে লাভ ও ক্ষতির অংশ ন্যায়সঙ্গত রূপে ভাগাভাগি হইবে।

বিকল্প হিসাবে ঋণশোধ এমন ভাবে হইবে যে মূল অর্থের আদি ক্রয়ক্ষমতা বজায় রহিবে। মূল্যমান হ্রাস পাইয়াছে এইরূপ অর্থে ঋণশোধের প্রশ্নই উঠেনা। তুলনামূলক ভাবে ‘সুদে’র উপর ভিত্তিশীল ঋণ ব্যবস্থায়, যেক্ষেত্রে পূর্বনির্ধারিত সুদের হারে অর্থ সরবরাহ করা হয়, তাহা ঋণগ্রহণকারীর লাভ বা ক্ষতির উপর নির্ভর করিবে না।

নিম্নে (২:২৮২) আয়াতে সহজবোধ্যভাবে বলা হইয়াছে যে ‘বাইয়ী’ মুলতঃ একটি পারস্পারিক চুক্তি, যাহা কিছুকাল স্থায়ী হইবে, সুতরাং ইহা সাক্ষীর উপস্থিতিতে স্বাক্ষরিত হইবে। বাণিজ্য অপরপক্ষে দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে অথবা সরাসরি ভাবে হইতে পারে, যেক্ষেত্রে অর্থের বদলে পণ্যদ্রব্য বিনিময় করা হইয়া থাকে। ইহাতে পণ্যদ্রব্য রহিত অর্থের আদান প্রদানের স্থান নাই।

(২:২৮২) তোমরা যাহারা বিশ্বাসী! তোমরা যখন নির্দিষ্ট কোন কালের জন্য ঋণের চুক্তি কর, তাহা লিখিতভাবে চুক্তিবদ্ধ কর –এবং তোমাদের মধ্য হইতে দুইজন সাক্ষী উপস্থিত রাখ। [...]

১২.৪ কোরানের অর্থনীতির সংক্ষিপ্তসার:

১. স্বাধীন কর্মপ্রচেষ্টা এবং ব্যক্তিগত মালিকানার অধিকার, কিন্তু ন্যায় সঙ্গত ভাবে (উপরের অনুচ্ছেদগুলির ব্যাখ্যা অনুযাযী)।

২. সুদের ভিত্তিতে অর্থলগ্নী বা ঋণগ্রহণ নিষিদ্ধ। কোন প্রকার সুদের ব্যবহার চলিবে না।

৩. সুদের পরিবর্তে যাকাত ব্যবহার করিতে হইবে। সরাসরি অথবা ‘বায়ত-উল-মাল’ (ব্যাঙ্ক) এর মাধ্যমে অর্থ বিনিয়োগ করিতে হইবে; এবং যে সংস্থাকে অর্থলগ্নী করা হয় তাহার লাভ ক্ষতির অংশ লইতে হইবে। অর্থ স্থানান্তরকরণ, ঋণপত্র, অনুমতি পত্র (লাইসেন্স) ইত্যাদি করণীক কার্যবিধি সরকার অনুমোদিত শুল্ক বা মাশুলের পরিবর্তে করিতে হইবে।

৪. কোরানে বর্ণিত (১২.৩১ দ্র:) সূত্র অনুযায়ী ব্যক্তিবিশেষকে দানে ব্যয় করিতে হইবে এবং একটি স্বাধীন ইচ্ছা ও কুষ্ঠাহীন পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের পরিবেশ রক্ষা করিতে হইবে: শতকরা অংশ বিধিবদ্ধ না করিবার বিরূদ্ধ কোরানের গভীর উদ্দেশ্য রহিয়াছে। ইহা সময় বিশেষে এবং ব্যক্তি বিশেষে ভিন্ন হইবে: যাহা প্রয়োজন তাহা হইল লোভের বিপরীতমুখী করণ প্রক্রিয়া।

৫. রাজ্যসরকার শুল্কের মাধ্যমে সমাজ হইতে যাহা লইবে তাহার প্রধান উদ্দেশ্য হইবে উদ্বৃত্তের অপসারণ করিয়া সাধারণের মঙ্গলার্থে সম্পদের পুনর্বিন্যাস (১২;৩২ দ্র:)

৬. কোন ব্যক্তিই যাহা ক্রয় করে নাই তাহা বিক্রয় করিতে পারা উচিত নয়। পাশ্চাত্যে মানুষ যেরূপ কোন দ্রব্যের মালিক না হইয়াই ভবিষ্যৎ (‘futures’–একরূপ শেয়ার বেচাকেনা) সম্বন্ধে ফটকা খেলিয়া থাকে, তাহা সম্ভব হইবে না। লণ্ডন শহরের (শেয়ার মার্কেটে) লেনদেনের মাধ্যমে কিছু ব্যক্তি যেরূপ প্রভূত সম্পদের অধিকারী হয় ইসলামীয় বিধানে তাহা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ হইবে।

৭. নূতন অংকের নোট প্রচলন তখনই হইবে যখন সমমূল্যের দ্রব্যাসামগ্রী বা কর্মকাণ্ডের উদ্ভব হইবে। ইহা মূল্যস্ফীতি, মুদ্রাস্ফীতি ও মুদ্রাবিনাশ ইত্যাদি কার্যকরীভাবে রোধ করিবে। সমাজের ব্যক্তিবর্গের পারস্পারিক সম্মতির ভিত্তিতে নূতন মুদ্রাসংবহন বন্টিত হইবে।

৮. একটি আস্থাপূর্ন অবস্থার বিকাশ হইবে যাহাতে মানুষ স্বেচ্ছায় অর্থ বিনিয়োগে অগ্রণী হইবে (দ্র: ১২.৩৩)

কোরানের আদর্শে গঠিত ন্যায়নিষ্ঠ সমাজ ও ফলপ্রসূ বিনিয়োগ ব্যবস্থার উপর প্রতিষ্ঠিত একটি অর্থনৈতিক পদ্ধতি বর্তমান সমাজের বহু অর্থবৈষম্য দূর করিতে পারে।

References: (প্রসঙ্গ সূত্র)

১. Freedom for Qur ‘an by Ahmad Nawaz and published by Ahmad
Nawaz. Mr. Nawaz has dedicated his book for the service of
mankind and as such there is no copyright restriction. The basic
concepts are based on this book.
২. “Islam: Taking root in Europe” by Sahib Mustaqim Bleher.
Published by “Islamic Party of Britain” in their official Party
News report, “Common Sense” dated Last Quarter 1992.Issue
number 8. p. 10, 11.
3.The Guardian: (i) News item on front page dated 7.3.87.
(ii) Passages from the article “Impossible debt on road to global
ruin” by F. Clairmonte and J. Cavanagh, dated 9.1.87.
4. Zakah by Abdul Rehman Ansari.
Published by IPCI, 481 Coventry Road, Small Heath, Birmingham
B10 OJS. p. 5.
5. Freedom for Qur ‘an by Ahmad Nawaz and published by Ahmad
Nawaz. p. 167-169.





Home Next >>