৯. পরবর্তী সময়ের (পীর) আউলিয়াগণ



মুসলিম বিশ্বে বেশ কিছু ব্যক্তি জনাসাধারণের হৃদয় ও মন এমন গভীর ভাবে জয় করিয়াছেন যে তাহারা সাধু (পীর ও আউলিয়া) রূপে অবহিত হন। এই সাধুদিগকে দুই শ্রেণীতে ভাগ করা যায়, (ক) যাঁহারা কোরানের আলোকে ইসলাম ধর্মকে অধ্যয়ন করিয়াছেন ও বুঝিয়াছেন এবং জনসেবায় নিজেদের নিয়োজিত করিয়াছেন। তাঁহারা নিজগুণে মহত্ত্ব অর্জন করিয়াছেন, এবং কখনও চাহেন নাই যে তাঁহাদের কবর সকল অপূর্ণ মনষ্কামনা পূরণের উদ্দেশ্যে লোকের প্রার্থনার স্থানে পরিণত হউক। (খ) অপর শ্রেণী যাহারা ধনশালী ও প্রভাবশালী হইবার উদ্দেশ্যে পীরের মর্যাদা দাবী করিয়া থাকে। ইহারা নিজেদের অলৌকিক ক্ষমতা প্রচার করিবার উদ্দেশ্যে বেতনভুক লোক নিয়োজিত করে, এবং অধিকাংশ মানুষ তাহাদের মনের দুর্বলতার জন্য ইহাদের কবলে পড়িয়া যায়। ইহারা ইসলামী বিশ্বের হাঙ্গর-বিশেষ এবং প্রায় অবধারিতভাবে শাসকশ্রেণীর ইহাদের সহিত ঘনিষ্ঠতা থাকে। এইসব ব্যক্তিদের প্রচলিত পদ্ধতি হইতেছে আমাদের পক্ষ হইতে বেহেশতে স্থান পাইবার জন্য আল্লাহর নিকট আবেদন করিবার ক্ষমতা তাহাদের আছে, ইহা প্রচার করা। সুতরাং বেহেশতে স্থান পাইতে হইলে লোককে তাহাদের যথাযথ আনুগত্য স্বীকার করিয়া ও নির্ধারিত অর্থ দান করিয়া শিষ্য হইতে হইবে। ইহারা শিষ্য সংখ্যা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে বাৎসরিক অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করে। এই সকল অনুষ্ঠানে তাহারা নিজেদের অলৌকিক ক্ষমতা বিজ্ঞাপিত করিতে অর্থ দিয়া এমন লোক নিযুক্ত করে যাহারা এই সব শক্তির সত্যতা সম্বন্ধে শপথ করিতে প্রস্তুত। এই সকল সাধুব্যক্তিগণ মৃত্যুর পরও তাহাদের প্রভাব বিস্তার করিয়া থাকে কারণ তাহাদের কবরগুলি ‘মাজার’ হইয়া যায়। লোকে তাহাদের কবরে গিয়া এমন সমস্ত অনুগ্রহ কামনা করে যাহা আল্লাহ্ ব্যতীত আর কেহই দিতে পারে না। যাহারা এই সকল মাজারের তত্ত্বাবধানে আছে তাহারা অনিবার্যভাবে এগুলিকে নিজেদের আয়ের উৎসরূপে ব্যবহার করে।

দুর্ভাগ্যবশতঃ প্রকৃত সাধুদিগের কবরগুলির তত্ত্বাবধায়করাও এইগুলিকে অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করিয়া থাকে। এইসব তত্ত্বাবধায়করা বাৎসরিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে এবং কবর রক্ষণাবেক্ষণের নামে চাঁদা সংগ্রহ করে এবং কবর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অর্থ দিলে আউলিয়াগণ তাহাদের বেহেশতে যাইবার জন্য আল্লাহর নিকট সুপারিশ করিবেন এই বলিয়া লোকের উপর প্রভাব বিস্তার করে। ইহার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হইল ভারতের আজমীরে অবস্থিত মাজার। মৃত আউলিয়ার অনুগ্রহ পাইবার জন্য হাজার হাজার লোক সেখানে গিয়া দিনের পর দিন প্রাথনা এবং ক্রন্দন করিয়া থাকে। মুসলিম হিসাবে কাহারও কবর জিয়ারত করিতে কোন দোষ নাই, কিন্তু তাহা কেবলমাত্র সম্মান প্রদর্শন এবং পুনরুত্থান দিবসে মৃত ব্যক্তির পাপ মুক্তির জন্য প্রার্থনার উদ্দেশ্যেই করা যাইতে পারে। ইহা অবশ্যই বুঝিতে হইবে যে এমনকি আউলিয়াগণেরও কাহারও জন্য আল্লাহর নিকট সুপারিশ করিবার কোন ক্ষমতা নাই। ইহা ব্যতীত, মৃত্যু হইলে, তাঁহারা পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত মৃতই থাকিবেন এবং সেই দিন কোন শিষ্যের সহিত সংস্পর্শের কথা অস্বীকার করিবেন। আশা করি নিম্নের আয়াতগুলি আলোচ্য বিষয়সমূহ সুস্পষ্ট করিবে:

(৩৫:২২) জীবিতেরা মৃতের আদৌ সমান নহে। আল্লাহ্ যাহাকে চাহেন সেই কেবল শুনিতে পাইবে। যাহারা কবরে শায়িত তোমরা তাহাদের সহিত যোগাযোগ করিতে পারিবে না।

(৩০:৫২) কারণ, প্রকৃতই তোমরা মৃতকে কিংবা বধিরকে তোমাদের ধ্বনি শুনাইতে পারিবেনা [...]

(৪৬:৫) আর উহাদের অপেক্ষা কে অধিকতর বিপথগামী যাহারা আল্লাহর পরিবর্তে এমন কাহারও নিকট প্রার্থনা করে, যাহারা বিচার দিবস পর্যন্ত তাহাদের প্রার্থনা শুনিতে পাইবে না, এবং তাহাদের প্রার্থনার বিষয় অচেতন থাকিবে।

(১০:১০৫) এবং (হে মোহাম্মদ) একজন স্বভাব বৈশিষ্ট্যে সৎ মানুষ হিসাবে ধর্মে তোমার উদ্দেশ্য দৃঢ় করো এবং যাহারা (আল্লাহর) অংশীদার সৃষ্টি করে তাহাদের সামিল হইও না।

(১০:১০৬) এবং আল্লাহ্ ব্যতীত এমন কাহারও নিকট ক্রন্দন করিও না, যাহারা তোমার কোন উপকার অথবা কোন ক্ষতিও করিতে পারে না, কারণ এইরূপ করিলে তুমি বিপথগামীদিগের মধ্যে গণ্য হইবে।

(১০:১০৭) যদি আল্লাহ্ তোমাকে কোন যন্ত্রণাকর অবস্থায় পতিত করেন তবে, তিনি ব্যতীত আর কেহই তাহা দূরীভূত করতে পারিবে না; এবং তিনি যদি তোমার মঙ্গল চাহেন তাহা হইলে তাহার করুণাকে বাধা দেওয়ার কেহই নাই। তিনি তাঁহার বান্দাদিগের মধ্যে যাহাকে ইচ্ছা ইহা দিতে পারেন। তিনি ক্ষমাশীল, করুণাময়।

(২২:৭৩) হে মানবজাতি! একটি সাদৃশ্য উপস্থাপিত হইল, সুতরাং ইহার প্রতি মনোযোগ দাও: আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য যাহাদের নিকট তোমরা আবেদন কর, তাহারা একটি পতঙ্গ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে একত্রিত হইলেও তাহা কখনই করিতে পারিবে না। এমনকি পতঙ্গটি তাহাদের নিকট হইতে কিছু ছিনাইয়া লইলেও তাহারা তাহা উদ্ধার করিতে সক্ষম হইবে না। প্রার্থী এবং প্রার্থনীয় এতই অক্ষম।

(২৯:৪১) যাহারা আল্লাহ্ ব্যতীত অন্যকে পৃষ্টপোষক হিসেবে গ্রহণ করে, তাহারা যে মাকড়সা আপন গৃহে আশ্রয় লয় তাহার সহিত তুলনীয়। নিশ্চয় মাকড়সার গৃহই সকল গৃহ অপেক্ষা ভঙ্গুর, যদি তাহারা ইহা জানিত!

অনুরূপ আরও অনেক আয়াতে স্পষ্টরূপে বলা হইয়াছে যে আল্লাহ্ ব্যতীত আর কাহারও আমাদের প্রার্থনা মঞ্জুর করিবার ক্ষমতা নাই। অবশ্যই মনে রাখিতে হইবে ইসলামে মানুষ ও আল্লাহর মধ্যে কোন মধ্যস্থতাকারী নাই। আল্লাহর সাহায্য পাইতে হইলে আমাদের কি করা উচিৎ নিচের আয়াতটি তাহা সুস্পষ্ট করে।

(২:১৮৬) যখন আমার বান্দারা আপনাকে আমার সম্বন্ধে প্রশ্ন করে, তাহাদেরকে বলুন যে, আমি সর্বদাই নিকটে আছি। আমিতো প্রার্থীর প্রার্থনা শুনি, যখনই কেহ আমাকে ডাকে। অতএব তাহাদেরকে আমার ডাক শুনিতে বলুন এবং আমার উপর বিশ্বাস রাখিতে বলুন, যাহাতে তাহারা সঠিকপথে চালিত হইতে পারে।

“আমরা (কেবলমাত্র) আপনারই অনুগত, (কেবলমাত্র) আপনাকেই আমরা সাহায্যের জন্য আবেদন করি (১:৪)”, এইরূপ সূরা ফাতিহা পাঠের মাধ্যমে প্রত্যহ পুনঃ পুনঃ আল্লাহর নিকট ওয়াদা করা সত্ত্বেও, আমাদের জন্য সুপারিশ করিতে আমরা যখন অন্যদের সাহায্য সন্ধান করি তখন ইহা ক্ষমার অযোগ্য। সেক্ষেত্রে আমরা কিরূপে ‘সঠিক পথ প্রদর্শিত’ হইবার যোগ্য?

References: (প্রসঙ্গ সূত্র)

১. A Restoration of Fith, by M. A. Malek. p. 27, 28.





Home Next >>