৭. নবীগণ ও তাঁহাদের প্রত্যাদেশসমূহ



৭.১ ভুমিকা

নিম্নের অনুচ্ছেদটি আল্লামা মাশরিকির উর্দ্দূ গ্রন্থ ‘তাযকিরা’, (ইংরেজীতে অনুদিত ‘Man’s Destiny’) হইতে একটি সংক্ষিপ্ত উদ্ধৃতি। ‘তাযকিরা’ কোরানের উপর একটি উচ্চ পর্যায়ের ব্যাখ্যামূলক গ্রন্থ যাহাতে তিনি মানুষের নিকট আল্লাহর শেষবার্তা এবং স্বর্গীয় বিধানের পরিপূর্ণ অর্থভেদী অথবা প্রকৃতির ধর্ম হিসাবে কোরানকে বর্ণনা করেন। বস্তুতঃ নিম্ন উদ্ধৃতির অধিকাংশই ‘তাযকিরা’র “স্বর্গীয় বার্তার অভিন্নতা” অধ্যায় হইতে গৃহীত। এই পরিচ্ছেদের বাকি অংশ কোরানে উল্লিখিত কয়েকজন সুপরিচিত নবীদের উপরে। কোরান নিঃসন্দেহে প্রতিষ্ঠিত করে যে, বিশ্বের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের আচার ও আনুষ্ঠানিকতার বিভিন্নতা সত্ত্বেও সকল নবীদের প্রচারিত ‘মূল বার্তাসমূহ’ একই।

মাশরিকি বলিয়াছেন: “আচার ও আনুষ্ঠানিকতা এক বস্তু, এবং বাস্তবের মূল ভিত্তি অন্য বস্তু, এই ঘোষণার মাধ্যমে, আল্লাহর প্রত্যাদেশের সর্বশেষ গ্রন্থ (পবিত্র কোরান) মানবজাতির বর্তমান বিছিন্নতা, বস্তুতঃ ধর্মের বাস্তবতার উপর একটি সরাসরি রায় দিয়াছে। মাশরিকি ২২:৬৭ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলিতেছেন: হে মানবজাতি! প্রত্যেক জাতির জন্য আমরা একটি বাহ্যিক সাদৃশ্য নিযুক্ত করিয়াছি –আল্লাহর এবাদত ও বিধানের প্রতি আনুগত্য সম্পর্কে, যাহা তাহারা অনুসরণ করিয়া চলে। কিন্তু ‘মূল বিধান’ প্রত্যেকের জন্য একই (এবং ইহাই একত্ব)। অতএব লোকে যেন তোমাদের সহিত মূল বিধান সম্পর্কে বিবাদ না করে। তোমরা সমগ্র মানবজাতিকে একটি বিষয়ের উপর একত্রিত কর –এক আল্লাহর প্রতি আহবান জানাইয়া, এবং এই ‘তৌহিদে’র মাধ্যমে সকল বিশ্বকে সংযুক্ত কর। বিশ্ব সম্প্রদায়সমূহের মধ্যে এই একতা প্রতিষ্ঠিত করিতে পারিলে বলা যাইবে যে নিশ্চয়ই তোমরা সঠিক পথে আছ। ইহা হইতে বুঝিতে পারা যায় যে আচার আনুষ্ঠানিকতা বিষয় বিবাদ করিয়া আমরা যখন আল্লাহর বিধান সম্পর্কে মতভেদের সৃষ্টি করি, তখন আমরা ধর্ম এবং সরল পথ হইতে বিচ্যুত হই”

সুতরাং মানবজাতির মধ্যে একতা স্থাপনই আল্লাহর সমগ্র নবীদিগের মূল বার্তা, যাহাতে জীবন যাপনে শান্তি, নিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা আনয়ন করা যায়। সকল মহান বাণীর সারমর্ম ইহাই, যাহা সর্বশক্তিমানের নিকট হইতে সকল নবীগণ পাইয়াছিলেন, এবং ইহাই পৃকৃত নবীত্ব। ইহাই সর্বোচ্চ জ্ঞান ও বার্ত্তা, এবং সর্বত্তোম প্রত্যাদেশ ও প্রকাশনা। আল্লাহর নির্দেশের মাধ্যমে নবীগণ মানুষকে পৃথিবীতে বসবাসের সঠিক পথ শিক্ষা দিয়াছেন। তাঁহারা মানুষকে সমবেত ভাবে বাঁচিয়া থাকিবার পথ প্রদর্শন করিয়াছেন, এবং মূলনীতিসমূহ বর্ণনা করিয়াছেন যাহা জাতির উত্থাপন ও পতন নির্ধারন করে। তাহারা আল্লাহর শাসন ব্যবস্থার সম্পূর্ন ন্যায়পরায়ণতা প্রদর্শন করিয়াছেন, এবং ইহজগতের শান্তি ও পরজগতের ক্ষতিপূরণের মুল্যায়ন করিয়াছেন। তাহারা মানুষের ব্যক্তিগত আচরন সম্পর্কে ব্যাখ্যা করিয়াছেন, তাহাদের অনুসারীদিগকে সঠিক পথে চালিত করিয়াছেন, এবং বহু শতাব্দীর জন্য মানুষের অস্তিত্ব ও স্থায়িত্বের পথ সুনিশ্চিত করিয়াছেন। অবিশ্বাসীগণের অন্তিম দশা সম্বন্ধেও তাঁহারা ব্যাখ্যা দিয়াছেন। এই ‘দ্বীন’ তাঁহারা আনিয়াছেন, এবং আল্লাহ্ চাহিয়াছেন এই ‘দ্বীন’ই (কর্মধারা) মানুষ গ্রহণ করুক। অতএব ইহাই পৃথিবীতে মানুষের সঠিক পন্থা, বাস্তবিক রপে তাহার ‘ধর্ম’, এবং তাহার একান্ত কর্তব্য এই ‘অপরিবর্তনীয় বিধান’ সম্পর্কে বোধগম্য হওয়া, যেহেতু ইহাই জাতিসমূহের উত্থান ও পতন নিয়ন্ত্রণ করে। কেবলমাত্র এই জ্ঞানই ‘ধর্ম-বিজ্ঞান’ এবং এই পন্থাই প্রতিটি ব্যক্তির জন্য অত্যাবশ্যক। কোন নবীই ইহার বিপরীত পন্থা, কোন নূতন বিশ্বাস অথবা ভিন্ন ধর্ম প্রদর্শন করেন নাই। তাঁহারা সকলেই পুনরুক্তি করিয়াছেন ঐ একই আদি ও মৌলিক অমিশ্রিত সত্য ও অসীম বাস্তবতা, ঐ একই প্রকৃতির ধর্ম ও প্রত্যাদেশ যাহা বিদ্রোহী মনুষ্য সমাজ বহুবার বিস্মৃত হইয়া ভীষণ শাস্তির মাধ্যমে ধবংসপ্রাপ্ত হইয়াছিল। নবীরা তাঁহাদের বিশ্বাস, কর্মপন্থা, প্রচেষ্টা, অভ্যাস ও আচারনিষ্ঠা ঐ একই অকাট্য বিধানের উপর ভিত্তি করিয়াছেন। পরবর্তী বংশধরেরা বাহ্যাড়ম্বর ও প্রক্রিয়া সমূহ অনুসরণ করিল,যেগুলি ছিল আল্লাহর বিধান রূপে ‘দ্বীনে’র মূল নীতিসমূহ অনুসরণ করিবার কেবলমাত্র পন্থাবিশেষ। তাহারা মূল বাস্তবতা বর্জন করিয়া সহকারী আইনসমূহ মৌলিক বিধান রূপে গ্রহণ করিল এবং এইরূপে অপ্রয়োজনীয় ও মামুলি বিষয়সমূহের সহিত তাহারা সম্পূর্ণরূপে জড়িত হইয়া পড়িল। অধিকন্তু, বিভিন্ন জনগণ তাহাদের পছন্দ অনুযায়ী অনুশাসনের উপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়া নেতাদিগের প্রতি অনুচিত অতিরঞ্জিত এবং ব্যক্তিগত ভক্তি ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করিল। তাহারা এক নবীর ধর্মাচরণের পদ্ধতি ত্যাগ করিয়া অপর এক নূতন পদ্ধতি গ্রহণ করাকে অপমানজনক মনে করিল। ফলে, নবীগণের মাধ্যমে প্রত্যাদেশ অনুসরণ করিবার এবং সেই বিধানকে জ্ঞানের সত্য উৎসরূপে গ্রহণ করিবার পরিবর্তে তাহারা শ্রেণীবদ্ধরূপে বিভিন্ন নবীদের পশ্চাতে স্থান গ্রহণ করিল এবং পক্ষভুক্ত জনগণে পরিণত হইল। আল্লাহর ইচ্ছার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন ও বাধ্যতা প্রদর্শন করিয়া একজন সত্যকার মুসলিম হইবার পরিবর্তে তাহারা হইল মুসা-অনুসরণকারী (Mosesites), বুদ্ধ-অনুসরণকারী (Buddhists), ঈসা-অনুসরণকারী (Christians) এবং মোহাম্মদ-অনুসরণকারী (Mohammedans)। তাহারা মনে করিল যে কেবলমাত্র নবীদের উপর প্রশংসা স্তুপাকার করা এবং তাঁহাদের কার্যাবলীর জন্য তাহাদিগকে উপাস্য করাই হইল ‘দ্বীনে’র একান্ত অংশ। ফলে ধর্মের গুরুত্ব সম্পূর্ণ তিরোহিত হইয়া কতকগুলি অপ্রয়োজনীয় অনুষ্ঠান ও ভিত্তিহীন আচার আড়ম্বরের মধ্যে সীমিত হইয়া পড়িল।





Home Next >>