৫. প্রথম সুরা: আল-ফাতিহা, কোরানের চাবি-কাঠি



মাত্র সাতটি আয়াত সম্বলিত এই প্রথম সূরা, “প্রারম্ভিক”, কেন কোরানের চাবি-কাঠি, তা দেখা যাউক। ইহার প্রথম আয়াতটি সাধারণতঃ নিম্নভাবে অনূদিত হয়:

(১:১) মঙ্গলময় (রাহমান) ও করুণাময় (রাহীম) আল্লাহর নামে।

ইহা আল্লাহর নাম লইয়া আরম্ভ, যিনি একঅদ্বিতীয়। আমরা ‘আল্লাহ্’র স্থলে ‘ঈশ্বর’ বা ইংরেজী শব্দ ‘গড’ ব্যবহার করিতে পারি না, কারণ ‘ঈশ্বর’ এবং ‘গড’ শব্দের অর্থ বিভিন্ন বিশ্বাসের মানুষের নিকট বিভিন্ন অর্থ ধারণ কর। (কোরানে আল্লাহ্ শব্দের ব্যবহারের জন্য এই গ্রন্থের ২য় অধ্যায় দ্রষ্টব্য)। উপরের আয়াতে আল্লাহ্ শব্দের পরে তাঁহার দুইটি প্রধান গুণবাচক শব্দ: রাহমান ও রাহীম ব্যবহৃত হইয়াছে। আরবীতে ‘রাহমান’ক৫ শব্দ দ্বারা বুঝার উপকার দানকারী, যেসমস্ত উপকার আমরা অবাধে পাই, যেমন পানি, বাতাস, সূর্য হইতে তাপ ও আলো, যাহা ব্যতীত জীবন ধারণ অসম্ভব। এবং ‘রহীম’ক৫ শব্দ দ্বারা বুঝায় করুণা বা উপকার বর্ষণকারী যে সমস্ত উপকার কেবলমাত্র পরিশ্রম ও সৎকার্যের মাধ্যমেই প্রাপ্তিসাধ্য। কেবলমাত্র আল্লাহর করুণার জন্য প্রার্থনা করিয়া এই সকল অনুগ্রহ পাওয়া যায় না।

দ্বিতীয় আয়াতের অনুবাদ নিম্নরূপ:

(১:২) সেই আল্লাহর প্রশংসা (হামদ) যিনি সমগ্র বিশ্বের (আ’লামিন) প্রতিপালক (রাব্ব্)।

‘হামদ’ শব্দ দ্বারা বুঝায় অবিমিশ্র প্রশংসা ও বিস্ময়বোধ, সমস্তই আল্লাহর প্রতি নিবদ্ধ। সাধারণতঃ প্রশংসা কোন কিছুর গুণ সম্বন্ধে স্বতঃস্ফূর্ত উপলব্ধি বুঝায়, যাহা আমাদের ইন্দ্রিয় দ্বারা অনুভূত হইতে পারে। আল্লাহর প্রতি আমরা আমাদের ‘হামদ’ বোধ প্রকাশ করিতে পারি কেবলমাত্র তাঁহার সৃষ্টির বিস্ময় সম্বন্ধে গভীর উপলব্ধির মাধ্যমে। ‘প্রভু’ দ্বারা ‘রাব্ব্’ শব্দের সঠিক অনুবাদ হয় না, বা ইহার পূর্ণ ধারণা প্রকাশিত হয় না। এই শব্দটি ‘লালনকারী’ ও ‘পালনকারী’ হিসাবে অনূদিত হওয়া উচিত। সুতরাং প্রকৃত অনুবাদ হওয়া উচিত এইরূপ:

“অবিমিশ্র প্রশংসা, অবিমিশ্র বিস্ময়বোধ, সমস্তই নিবদ্ধ আল্লাহর প্রতি, যিনি সমগ্র বিশ্বের লালনকর্তা ও পালনকর্তা।”

(১:৩) মঙ্গলময় (রাহমান), করুণাময় (রাহীম)।

তৃতীয় আয়াতটি প্রথম আয়াতের অংশ বিশেষের পুনরাবৃত্তি, যাহাতে আল্লাহর দুইটি অতি গুরুত্বপূর্ণ গুণের বিষয় পুনরায় স্মরণ করানো হইতেছে। প্রকৃতপক্ষে কোরানের অনেক বৈশিষ্ট্যের একটি হইতেছে পুনরাবৃত্তি, যাহাতে আমাদের বোধগম্যতা দৃঢ়তর হয় এবং আমরা ভুলিয়া না যাই

চতুর্থ আয়াতের সাধারণ অনুবাদ: (এবং নিম্নে প্রদত্ত ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য)

(১:৪) বিচার দিবসের (ইয়োওমিদ্দীন) প্রভু (মালিক)।

‘মালেক’ শব্দ দ্বারা বুঝায় যিনি শাসন ও কতৃত্বের অধিকারী এবং সমস্ত কিছুর নিয়ন্ত্রণকর্তা। ‘ইয়োওমিদ্দীন’ এর অর্থ দ্বীনের কাল, যে কাল বা সময়ে কোন ব্যক্তি বা কোন শক্তি অন্য কাহারও উপর অত্যাচার করিতে পারিবে না।

পঞ্চম আয়াতের অনুবাদ:

(১:৫) আমরা কেবলমাত্র আপনারই অনুগত; আমরা কেবলমাত্র আপনারই সাহায্য প্রার্থনা করি।

“কেবলমাত্র আপনাকেই আমরা মান্য করি ও আপনারই অধীনতা স্বীকার করি, এবং কেবলমাত্র আপনার নিকটই আমরা সাহায্যের জন্য ফিরিয়া আসি”। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর প্রতি আনুগত্য বলিতে বুঝায় কোরানে বর্ণিত বিধান সমূহ পালন করা। ইহাতে ইহাও বুঝায় যে, কেহ আমাদের হইয়া আল্লাহর সহিত মধ্যস্থতা করিতে পারিবে না, যেহেতু কেবলমাত্র তাঁহারই নিকট আমরা সাহায্য চাহি। যখন কেহ এই ‘আয়াত’ উচ্চারণ করে, সে (পুরুষ বা স্ত্রীলোক) তখন আল্লাহর নিকট প্রতিজ্ঞা করে যে, সে কেবল আল্লাহরই অনুগত এবং কেবলমাত্র তাঁহারই নিকট সাহায্য চাহিবে-আল্লাহর প্রতি এই অঙ্গীকারের পর কোন ‘পীর’ বা ‘ফকির’ (অধ্যায় ৯ দ্রষ্টব্য) স্মরণ করা যাইবে না। মূলতঃ এই অঙ্গীকারের পর আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কাহারো সাহায্য চাওয়া হইবে ‘শিরক্’ (অর্থাৎ আল্লাহর সহিত অংশীদারিত্ব), যাহা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ

ষষ্ট আয়াত নিম্নরূপ:

(১:৬) আমাদিগকে সরল পথে চালিত কর।

কোরানে ‘সরলপথ’ (সিরাতুল মুসতাকিম) বর্ণিত হইয়াছে, কিন্তু সেই সঠিক পথে চলিতে এবং আল্লাহর নির্দেশ অনুসরণ করিতে হইলে আল্লাহর সাহায্য ও আশীর্বাদ ব্যতীতও, আমাদের নিজেদের প্রচেষ্টার প্রয়োজন।

শেষ আয়াত সাধারণতঃ নিম্নরূপে অনূদিত হয় :

(১:৭) আপনার (আল্লাহর) অনুগৃহীতগনের পথ, যাহারা আপনার ক্রোধে পতিত, অথবা যাহারা বিপথগামী, উহাদের পথে নহে।

যাত্রাশেষে আমরা যাহাতে আল্লাহর অনুগ্রহভাজন হই সেজন্য আমরা উদ্বিগ্ন। আমরা ঐকান্তিকভাবে আশা করি যে, আমরা যে পথ অবলম্বন করি তাহা যেন ঐ পথ হয়, যাহার অনুসরণকারীদের উপর আল্লাহর সন্তুষ্টি বর্ষিত হইয়াছে; যাঁহারা আল্লাহর অসন্তুষ্টিভাজন হন নাই এবং যাঁহারা বিপথগামী হন নাই।

এই সূরা আমাদের প্রার্থনার প্রধান অংশ, কারণ প্রার্থনার মূল অবদান সমস্তই ইহাতে আছে: অর্থাৎ আল্লাহর প্রশংসা ও তাঁহার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, এবং তাঁহার নিকট করুণা ভিক্ষা করা। এই কারণে বহু উপলক্ষেই এই সূরা আবৃত্তি করা হয়, সর্বশক্তিমানের নিকট আমাদের বিনীত আবেদন হিসাবে।

আমাদের স্মরণে রাখা প্রয়োজন যে এই সূরাতে বেশ কয়েকটি ব্যাখ্যাকারী শব্দ আছে, যেমন ‘আল্লাহ্, ‘রাব্ব্’, ‘রাহমান’, ‘রাহীম’, ‘দ্বীন’, ইত্যাদি, যেগুলির ভাবার্থ আয়াতসহ সুস্পষ্টরূপে বুঝিতে হইবে। সূরা ফাতিহাকে কোরানের চাবি-কাঠি মনে করা হয়, যেহেতু ইহা আল্লাহর দ্বীন এবং কোরানের বাকি অংশের নির্দেশাবলী উন্মুক্ত করে। আমাদের অবশ্যই মনোযোগ সহকারে এবং মুক্ত মনে এই গ্রন্থ অধ্যয়ন করা প্রয়োজন। আমাদের ব্যক্তিগত মতধারায়, অথবা অপরে কি বলিতেছে তাহার দ্বারা আমরা যেন অবশ্যই পক্ষপাতদুষ্ট না হই। আল্লাহ্ যাহা বলিতেছেন আমরা তাহার প্রতি মনঃসংযোগ করিব এবং দেখিতে পাইব যে এই গ্রন্থ আপনিই আমাদের নিকট প্রকাশিত হইবে, যেরূপ আল্লাহ্ স্বয়ং অঙ্গীকার করিয়াছেন। সকল মূল্যবান কার্যের ন্যায় ইহাও হইবে ধীরগতিসম্পন্ন কার্য, কিন্তু আমরা ধৈর্য ও অধ্যবসায় এবং অবশ্যই আল্লাহর সাহায্যে জয়ী হইতে পারি –প্রথম সুরা সম্পূর্ণ সঠিকরূপে যাহা নির্দেশ করিতেছে।

References: (প্রসঙ্গ সূত্র)
১. Tafseer Al-Qur’an Bil Qur’an (Explanation of the Qur’an by the Qur’an): Lecture by Syed Mustafa Ali. Section based on the handout introductory part of the lecturer.





Home Next >>