৪. কোরান দ্বারা কোরানের ব্যাখ্যা (১,২)



পূর্ববর্তী অধ্যায়ে আলোচিত হইয়াছে যে কোরানে বহু আয়াত আছে যাহা সহজেই বোধগম্য এবং যেগুলি আমাদের জীবনের মূল পথ-প্রদর্শক (দৃষ্টান্তের জন্য ৬.১ এবং ৬.২ বিভাগ দ্রষ্টব্য)। ইহাও গুরূত্বপূর্ণ যে বহু আয়াতে আল্লাহ্ বলিতেছেন যে তিনি কোরানের ব্যাখ্যাকারী। এই সকল আয়াতের কয়েকটি উদ্ধৃত্ব হইল:

(৭৫:১৯) এবং ইহা ব্যাখ্যা করা (বাইয়্যানাহু) আল্লাহরই কাজ।

(৪১:৩) ইহা একটি গ্রন্থ, যাহার নিদর্শন সমূহ বিশদরূপে আরবী ভাষায় ব্যাখ্যা করা হইয়াছে। (এই) কোরান জ্ঞানী ব্যক্তিদের জন্য সুসংবাদ বহনকারী এবং সেইসঙ্গে সাবধানবাণী ঘোষণাকারী।

এখানে বেশ কয়েকটি মনোযোগের বিষয় রহিয়াছে: ইহা একটি গ্রন্থ, যাহা বিশদরূপে ব্যাখ্যা করা হইয়াছে এবং আল্লাহ্ স্বয়ং ইহার ব্যাখ্যা করিতেছেন। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে ইহা জ্ঞানবান ব্যক্তিদের জন্য। অতএব, আমাদের কোরান অধ্যয়ন করিয়া বুঝিবার এবং তাহার ফলে, আল্লাহর সাহায্যে জ্ঞান লাভ করিবার ইচ্ছা ও চেষ্টা রাখিতে হইবে।

(১৭:৪১) আমরা কোরানের বিভিন্ন (বিষয়) বিভিন্ন (উপায়ে) ব্যাখ্যা করিয়াছি যাহাতে লোকে সতর্ক হইতে পারে; কিন্তু ইহা কেবল তাহাদের সত্যের প্রতি বীতরাগই বৃদ্ধি করে।

(১৭:৮৯) এবং আমরা এই কোরানে প্রত্যেক প্রকার সাদৃশ্য মানবজাতির নিকট ব্যাখ্যা করিয়াছি: তথাপি মানবজাতির বৃহত্তর অংশই অকৃতজ্ঞভাবে ব্যতীত (ইহা গ্রহণ করিতে) অনিচ্ছুক [...]

(৩৯:২৭) এবং প্রকৃত মানবজাতির জন্য আমরা এই কোরানে সকল প্রকার সাদৃশ্য উদ্ভাবন করিয়াছি, যাহাতে সম্ভবতঃ তাহারা চিন্তা করিবে [...]

(১৮:৫৪) আমরা এই কোরানে মানবজাতির মঙ্গলের জন্য প্রত্যেক প্রকার সাদৃশ্য বিশদরূপে ব্যাখ্যা করিয়াছি; কিন্তু মানুষ অধিকাংশ বিষয়ে কলহ-প্রিয়।

(৩০:৫৮) প্রকৃতই, আমরা কোরানে প্রত্যেক প্রকার উপদেশপূর্ণ গল্প মানবজাতির বিবেচনার জন্য উপস্থাপিত করিয়াছি [...]

(৬:৬৫) আমরা এই সমস্ত নিদর্শনের কত বিশেষ দিক দেখাইয়াছি যাহাতে তারা সত্য বুঝিতে পারে [...]

(৭:৫২) [...] বাস্তবিকই আমরা তাহাদিগকে একটি গ্রন্থ পাঠাইয়াছি যাহা আমরা জ্ঞান (ইলম) দ্বারা ব্যাখ্যা করিয়াছি। বিশ্বাসীদের জন্য (ইহা) একটি পথ প্রদর্শক (হুদা) এবং একটি করুণা (রাহমাত)।

(৬:১১৪) বল, ‘তবে কি আমি আল্লাহ্ ব্যতীত অন্যকে বিচারক মানিব – যদিও তিনিই তোমাদের প্রতি সুস্পষ্ট কিতাব অবতীর্ণ করিয়াছেন [....]

(২:২১৯) [...] বস্তুতঃ এইভাবে আল্লাহ্ তাঁহার নিদর্শনসমূহ তোমাদের জন্য সুস্পষ্টরূপে ব্যক্ত করেন, যাহাতে তোমরা চিন্তা কর।

(৩:১০৩) [...] এইভাবে আল্লাহ্ তোমাদের জন্য তাঁহার নিদর্শনসমূহ স্পষ্ট্যভাবে বিবৃত করেন যাহাতে তোমরা কল্যাণের পথ পাইতে পার।

(৬:৯৭) [...] স্পষ্টতঃ, বাস্তবিকই আমরা এই সমস্ত নিদর্শন জ্ঞানবান ব্যক্তিদিগের জন্য বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করিয়াছি।

(৬:৯৮) [...] স্পষ্টতঃ বাস্তবিকই আমরা এই সমস্ত নিদর্শন, যাহারা সত্য গ্রহণ করিতে পারে তাহাদের জন্য বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করিয়াছি।

(৬.৯৯) [...] প্রকৃতপক্ষে এই সমস্ত কিছুর মধ্যেই যাহারা বিশ্বাস করিবে তাহাদের জন্য নিদর্শন (আয়াত) আছে।

যেহেতু কোরান আপনা হইতেই ব্যক্ত করে যে: ইহা সকল প্রকার সাদৃশ্য বিবেচনার জন্য উপস্থাপিত করিয়াছে, ইহা নিদর্শন সমূহ বিভিন্ন আকারে প্রদর্শন করিয়াছে এবং বিশদরূপে ব্যাখ্যা করিয়াছে, ইহা জ্ঞানের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং যাহারা বিবেচনা ও চিন্তা করে সেইসব জ্ঞানবান মানুষের জন্য, এই সমস্ত হইতে আমরা একমাত্র সিদ্ধান্ত পাই যে কোরান আপনিই ইহার ব্যাখ্যা দান করে, অর্থাৎ কোরান হইতেছে স্ব-ব্যাখ্যাকারী। আমাদিগের পক্ষ হইতে আমরা অবশ্যই বিশ্বাস করিব যে ইহা আল্লাহর বাণী এবং আমরা কোরান অধ্যয়ন করিতে ও বুঝিতে সাধ্যমত চেষ্টা করিব। কোরানের একজন অনুবাদক মোহাম্মদ আসাদ বলিয়াছেন যে কোরান স্ব-ব্যাখ্যাকারী, ইহার অন্য কিছুই প্রয়োজন নাই। এই বিষয়ে অন্যান্য খ্যাতনামা পণ্ডিতেরা একমত, যেমন মিশরের মোহাম্মদ আবদু, ডঃ আব্দুল ওয়াদুদ, ইনায়েতউল্লা খান ইল-মাশরিকি এবং আল্লামা জি, এ, পারভেজ। এই গ্রন্থের অনুবাদ হওয়া উচিত, যেমন ইহা বলে, ইহার মাধ্যমেই ইহার ব্যাখ্যা করা উচিত। এবং ইহাই সঠিক পন্থা, যে পন্থা কোরান নির্দিষ্ট করে।

সার-সংক্ষেপ : (১) কোরানই সত্য এবং ব্যাপক পথ-প্রদর্শনের একমাত্র সূত্র। (২) কোরান আরবী ভাষায়। (৩) ইহা অধ্যয়ন করিতে জ্ঞান আহরণের ইচ্ছা সহ আমাদের মন মুক্ত থাকা অবশ্য প্রয়োজন, যেখানে কোনও পূর্ব-কল্পিত ধারণা বাধা দিবে না। (৪) কোরান সুস্পষ্টরূপে নির্দেশ দেয় যে ইহা ইহার ব্যাখ্যা (তফসির) স্বয়ং করে।

References: (প্রসঙ্গ সূত্র)
১. Tafseer Al-Qur’an Bil Qur’an (Explanation of the Qur’an by the Qur’an): Lecture by Syed Mustafa Ali. Section based on the handout supplied
২. Translation of the quoted Qur’anic verses are based on M.
Pickthall and Yusuf Ali.





Home Next >>