১৫. মানব জীবনের তাৎপর্য (১,২)



মানব জীবনের তাৎপর্য বুঝিতে হইলে ব্যক্তিসত্তা (নাফস) ও সমষ্টি সত্তাগত (আনফাস) স্তর ব্যতীতও বাহ্যিক জগতে (আফাক্ক) মানবীয় ভূমিকা সম্বন্ধে আমাদের বোধের প্রয়োজন আছে, কারণ কোরানে এইসকল বিষয়ের পরিষ্কার উল্লেখ আছে। ‘নাফস’, ‘আনফাস’ ও ‘আফাক্ক’, এই তিনটি সত্তার অস্তিত্ত্বের ভিত্তিমূলই হইল আল্লাহর নিকট প্রত্যাবর্তন। প্রত্যাবর্তনই সর্বাধিক গুরুত্বের বিষয়

১৫.১ ব্যক্তিগত পর্যায়ে, ‘নাফস’ (নূন-ফা-সীন):

কোরানে এই শব্দ ২৫৫ বার ব্যবহৃত হইয়াছে। ব্যক্তিগত পর্যায়ে অর্থাৎ নাফসের স্তরে মানব জীবনের উদ্দেশ্য আত্ম-উন্নয়ন। ‘নাফস’ কি? ইহা কেবলমাত্র বোধের অতীত নয়, ইহার উপযুক্ত ব্যাখ্যাও করা যায় না, কারণ ইহা কোন বস্তুগত পদার্থ নহে। কোরানে ইহাকে ‘রূহোনা’ বা ‘ইলাহি শক্তি’ হিসাবে উল্লেখ করা হইয়াছে। মানুষের প্রত্যেকটি কাজ, এমন কি তাহার চিন্তাধারাও ইহার উপর প্রভাব বিস্তার করে, হয় ব্যক্তিসত্তা (নাফস)র বৃদ্ধি ও উন্নতি সাধন অথবা ইহার অবক্ষয়ের মাধ্যমে।

(৬:১৬৪) [...] প্রত্যেক ‘নাফস’ তাহার নিজ কর্মের প্রতিফল বহন করিবে, এবং কেহই তাহাকে কোনভাবে সাহায্য করিতে পারিবে না [...]।

যখন নাফস আল্লাহর বিধান অনুযায়ী মানবতার উচ্চতর আদর্শগুলির উৎকর্ষ সাধনে ব্যবহৃত হয়, তখন ইহা ইতিবাচক (positive) বা মঙ্গলজনক হয় এবং পরিপুষ্টিও লাভ করে; কিন্তু স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হইলে, ইহা নেতিবাচক (negative) হইয়া পড়ে; এই অবস্থাকে কোরানে ‘হাওয়া’ (ধূর্ততার উৎস) বলা হইয়াছে। আরও ব্যাখ্যার জন্য আয়াত (১০:১০৮), (১৭:৭-১৫), (২৯:৬), (৩০:৪৪), (৩১:১২), (৩৫:১৮), (৩৯:৭, ৪১), (৪১:৪৬), (৪৫:১৫), এবং (৫৩:৩৮) দ্রষ্টব্য।

১৫.২ সমষ্টিগত পর্যায়ে ‘আনফাস’ (নাফস এর মত একই ধাতুরূপ):

ইহা ‘নাফস’ শব্দের বহুবচন। সমষ্টিগত পর্যায়ে মানব জীবনের উদ্দেশ্য হইল সমগ্র মানব গোষ্ঠীকে একটি একক সত্তায় (উম্মুত-উল-ওয়াহাদা) সম্মিলিত করা। ইহার জন্য প্রয়োজন ‘ইসলামিক রাষ্ট্রে’র প্রতিষ্ঠা, যেখানে মানুষ আল্লাহর বিধানসমূহ (দ্বীন), বা সমগ্র মানবজাতির জন্য মঙ্গলজনক সর্বার্থবোধক (comprehensive) জীবনধারা, চালু করিতে পারিবে। দ্বীনের ধারণা সম্বন্ধে বিস্তারিত বর্ণনা দ্বিতীয় অধ্যায়ে দেওয়া হইয়াছে।

১৫.৩ বাহ্যিক জগৎ ‘আফাক্ক’:

কোরান বহু আয়াতে প্রকৃতিতে অনুশীলনের জন্য মানুষকে উৎসাহিত করে কারণ মানুষের জন্য মঙ্গলজনক সকল গোপন তথ্যই প্রকৃতির মধ্যে নিহিত আছে এবং কেবলমাত্র গবেষণার মাধ্যমেই তাহা উদ্ভাসিত হইতে পারে। বস্তুতঃ প্রকৃতিই আল্লাহর গ্রন্থ এবং কোরান ইহার নির্যাস। আমরা বাস্তব জীবনে ইহাকে কার্যকর করিতে পারিলে প্রকৃতির মধ্যে গুপ্ত মানুষের জন্য মঙ্গলকর সকল কিছুই ইহা উদঘাটিত করিতে সাহায্য করিবে। অন্যান্য বহৃ আয়াতের ন্যায় নিম্নে বর্ণিত আয়াতটি আমাদিগকে প্রকৃতিকে অনুশীলন ও উপলব্ধি করিতে উদ্বুদ্ধ করিবে।
(৪৫:১৩) এবং তিনি নিজেই পৃথিবী ও আকাশে যাহা কিছু অবস্থিত সমস্তই তোমাদের অনুগত করিয়াছেন, চিন্তাশীল ব্যক্তিদের জন্য ইহার মর্মবাণী লক্ষণের বিষয়।

১৫.৪ আল্লাহর নিকট প্রত্যাবর্তন:

এই বিষয়টি বহু আয়াতে উল্লিখিত হইয়াছে। নিম্নে কয়েকটি দৃষ্টান্ত দেওয়া হইল।

(৫৩:৪২) তোমাদের শেষ গন্তব্য তোমাদের (রব্ব্) প্রতিপালকের নিকট।

(১৮:১১০) যে তাহার রব্ব্-এর সাক্ষাৎ আশা করে, সে যেন সৎকার্যকারী হয়, এবং তাহার প্রতিপালকের প্রতি আনুগত্যে যেন কাহাকেও অংশীদার না করে।

(২:৪৫,৪৬) ধৈর্য ও সালাত সহকারে সাহায্য প্রার্থী হও, এবং কেবলমাত্র বিনীতদের পক্ষ ব্যতিরেকে ইহা সত্যই কঠিন, কারণ তাহারা জানে যে তাহাদের রব্ব্-এর সহিত তাহাদের অবশ্যই মিলিতে হইবে এবং তাঁহারই নিকট তাহাদের প্রত্যাবর্তন।

(২৯:২৩) যাহারা আল্লাহর প্রত্যাদেশ এবং তাহার সহিত তাহাদের সাক্ষাতের কথা অবিশ্বাস করে, তাহাদের আমার অনুগ্রহ পাইবার কোনই আশা নাই। তাহাদের শেষ অবস্থা যন্ত্রণাময় হইবে।

আরও দৃষ্টান্ত পাওয়া যাইবে (২:২২৩,২৪৯), (৩:২৮), (৫:১৮,৪৮), (৬:১৫৪), (১১:২৯), (১২:২০), (২৪:৪২), (২৫:১৫), (৩১:১৪), (৪০:৩), (৪১:৫৪), (৫০:৪৩), (৫৩:৪২), (৫৬:৬০) এবং (৬৪:৩) আয়াতসমূহে।

এ সম্পর্কে শাব্বির হোসেন কর্তৃক উদ্ধৃত আল্লামা মাশরিকি চিন্তাধারার কথা উল্লেখ করা হইল:

“তাঁহার (আল্লামা মাশরিকি) যুক্তি অনুযায়ী অন্যান্য জৈব প্রজাতি ও উদ্ভিদের ক্ষেত্রে যে প্রাকৃতিক নিয়ম চলিতে পারে মানবজাতি তাহা হইতে ভিন্ন নিয়মে দ্বারা পরিচালিত। যে নিয়ম অনুসারে মানব সমাজ টিকিয়া থাকে বা বিনাশ পায় তাহা ধর্মীয় বিজ্ঞানের সহিত জড়িত যাহা সৃষ্টিকর্ত্তা তাঁহার মনোনীত দূতদিগের মাধ্যমে বিশেষভাবে মানুষের নিকট প্রকাশ করিয়াছেন। আল্লামার মূল উদ্দেশ্য ছিল এই বিজ্ঞান ও তাহার অভীষ্ট লক্ষ্যের মধ্যে যে ঐক্য আছে তাহার উপর ভিত্তি করিয়া মানবজাতিকে একতাবদ্ধ করা, ঠিক যেমন বৈজ্ঞানিকগণ বস্তুজগতের সমর্থনে বিভিন্ন ধারণার মধ্যে ঐক্য স্থাপন করেন। মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্বন্ধে যে কোন বিবর্ত্তনবাদী বা পদার্থবিজ্ঞানী যে ধারণা পোষণ করেন তিনি তাহা হইতে মহত্তর উদ্দেশ্যের কথা বলিয়াছেন। তিনি মনে করেন মানুষের সৃষ্টি হইয়াছে বিশ্ব জগৎকে জয় করিবার জন্য এবং বিশ্ব জগতের সৃষ্টি হইয়াছে মানুষের সুবিধার জন্য, তাহাকে সমৃদ্ধ করিতে, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ইহার উপযুক্ত ব্যবহার ও ইহাকে নবরূপে রূপায়নের জন্য। তিনি দাবী করেন যে মানুষের বর্ত্তমান রূপ তাহার সম্পূর্ণরূপ নহে, তাহার আরও বিবর্তন অনিবার্য যাহাতে সে মহাবিশ্বের সর্বত্রই চিরস্থায়ী হইয়া বাস করিতে পারে। তিনি বলেন ইহাই মানুষ সৃষ্টির একমাত্র উদ্দেশ্য হিসাবে স্পষ্টভাবে কোরানে উল্লিখিত হইয়াছে এবং বিশ্বরূপে ইহা উজ্জ্বলভাবে প্রতিভাত। তিনি দেখাইয়াছেন যে পদার্থ বিজ্ঞান ও ধর্মীয় বিজ্ঞানের উদ্দেশ্যের মধ্যে একটি গভীর ঐক্য আছে এবং আল্লাহ্ যাহা প্রকাশ করিয়াছেন তাহাই বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ রূপ, এবং মানব সৃষ্টির যে উদ্দেশ্য মহাবিশ্ববিজয় তাহা সফল করিতে এই দুই বিজ্ঞানের সাহায্যে অবশ্যম্ভাবী”।

References: (প্রসঙ্গ সূত্র)

১.Exposition of the Qur’an, by Gulam Ahmed Parwez.
Tolu-E-Isla Trust (Regd) 25B Gulberg, Lahore-11, Pakistan.
p.55, 56.
২.Islamic State–First Principle: Lecture by Syed Mustafa Ali.
৩.Man’s Destiny (Tazkira), by Allam Inayat Ullah Khan Al-
Mashriqi. Translated and edited from Urdu by Shabbir Hussain.
Publisher: Mujahid Publications, Rawalpindi, Pakistan. p. 13, 14.





Home Next >>