১৬. ইসলামী রাষ্ট্র (১)



(৬১:৯) তিনিই (আল্লাহ্) তাহার নির্দেশবাহী দূতকে পাঠাইয়াছেন বাস্তব, গঠনমূলক ও উদ্দেশ্যময় জীবন বিধান (দ্বীন-ইল-হাক্ব্) সহ, যাহাতে তিনি ইহাকে অন্যান্য জীবনধারার উপর প্রাধান্য দিতে পারেন; আল্লাহর অংশীদারকারীরা যতই ইহার বিরূদ্ধাচরণ করুক না কেন।

ইসলাম “দ্বীন-ইল-হাক্ক্” বলিয়া বর্ণিত হইয়াছে। ইহার অর্থ কি? কোরান ‘হাক্ক’ শব্দের অর্থ ‘সত্যে’র উপমা দ্বারা পরিষ্কার রূপে বুঝাইয়াছে।

(১৩:১৭) আল্লাহ্ আকাশ হইতে পানি বর্ষণ করেন, এবং নদ-নদী প্রবাহিত হয় তাহাদের নিজ নিজ পরিমাপে, এবং বন্যা উদ্বেলিত ফেনা বাহিয়া চলে। এবং গহনাপত্র ও প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি প্রস্তুতের উদ্দেশ্যে মানুষেরা আগুনে যে ধাতুসমূহ গলায়, তাহা হইতেও অনুরূপ ফেনা উত্থিত হয়। এইরূপে আল্লাহ্ সত্যের (হাক্ক্) এবং মিথ্যার (বাতিল) সাদৃশ্যের উপমা দেন। অতএব যাহা ফেনা তাহা তীরবর্তী এলাকা সমূহে গাদের মত হইয়া মিলাইয়া যায়, আর যাহা মানবকূলের জন্য উপকারী হয়, তাহা মৃত্তিকায় থাকিয়া যায়। এইরূপে আল্লাহ্ সাদৃশ্যের উপমা দেন।

তাই ইসলাম (দ্বীন-ইল-হাক্ক্) হইতেছে — মানবজাতির জন্য মঙ্গলজনক জীবনের সঠিক পথ, অর্থাৎ ইহাই হইতেছে মানুষের জীবন পন্থা।

(৩:১৯) নিশ্চয়ই যে জীবন-ধারা (দ্বীন) আল্লাহর নিকট গ্রহণীয় তাহাই ইসলাম।

দ্বীন-ইল-হাক্কের উৎস হিসাবে কোরানের স্থান কোরানেই বুঝাইয়া বলা হইয়াছে।

(১৪:১) আলিফ, লাম, রা, (ইহা) একটি ধর্মগ্রন্থ যাহা আমরা আপনার (মোহাম্মাদ) নিকট প্রকাশ করিয়াছি, যাহাতে ইহার সাহায্যে আপনি মানবজাতিকে তাহাদের প্রতিপালকের (রাব্ব্) এর অনুমতি অনুসারে অন্ধকার হইতে আলোকে আনিতে পারেন, সেই সর্বশক্তিমান, সকল প্রশংসার অধিকারীর পথে।

(৩:৮৩) তাহারা কি আল্লাহর দ্বীন ভিন্ন অন্য কিছুর অনুসন্ধান করে, যখন যাহা কিছু আকাশ ও পৃথিবীতে আছে, সমস্তই ইচ্ছায় হউক, বা অনিচ্ছায় হউক আল্লাহর নতি স্বীকার করে, এবং তাঁহারই নিকট তাহাদের প্রত্যাবর্তন করিতে হইবে?

প্রকৃতপক্ষে, দ্বীন-ইল-হক্ক্ ভিন্ন অন্য কোন জীবনধারা আল্লাহর নিকট গ্রহণীয় নহে

(১২:৪০) তোমরা আল্লাহ্ ব্যতীত যাহাদের উপাসনা কর, তাহারা কেবলমাত্র নাম সর্বস্ব, যে সকল নাম তোমরা এবং তোমাদের পূর্বপুরুষেরা তাহাদের দিয়াছে। আল্লাহ্ তাহাদের স্বীকৃতি দিয়া কোন কিছু প্রকাশ করেন নাই। আর শুধু আল্লাহই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যিনি তোমাদেরকে আদেশ দিয়াছেন যে তাহাকে ব্যতিত তোমরা আর কাহারও এবাদত করিবে না। ইহাই জীবনের সত্যপথ (দ্বীন); কিন্তু অধিকাংশ লোকই তাহা জানে না।

(৩:৮৫) আর যে কেহ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন জীবনধারা (দ্বীন) অনুসন্ধান করে, তাহার ঐ প্রচেষ্টা কখনই গৃহীত হইবে না, এবং সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্থ হইবে।

যেহেতু অন্য প্রকার জীবনধারা মানবজাতির জন্য মঙ্গলজনক নহে, ‘দ্বীন-ইল-হাক্ক্’ নামক জীবনধারাই অন্য সকল জীবনধারাকে বাতিল করিবে।

(৬১:৮) তাহারা সানন্দেই আল্লাহর বাতি ফু দিয়া নিভাইয়া দিত; কিন্তু অবিশ্বাসীরা যতই বিরূপ হউক না কেন আল্লাহ্ তাঁহার বাতি নিখুঁত করিবেন।

প্রকৃতপক্ষে একটি ইসলামী রাষ্ট্র বলিয়া বিবেচিত হইতে হইলে, ঐ রাষ্ট্রকে আল্লাহর দ্বীন অর্থাৎ দ্বীন-ইল-হাক্কের উপর অবশ্যই প্রতিষ্ঠিত হইতে হইবে। ইহা বাস্তব ও আদর্শগত নীতি নির্ভরশীল হইবে।

আদর্শ ভিত্তিক রূপান্তর প্রয়োজন, কারণ:

(৮:৫৩,১৩:১১) আল্লাহ কখনও একটি জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যে পর্য্যন্ত না তাহারা স্বীয় আভ্যন্তরীন অবস্থা পরিবর্তন করে।

চিন্তার প্রয়োগ যেমন প্রয়োজন, সেইরূপ আদর্শবাদের ব্যবহারিক প্রকাশ প্রয়োজন হয়। নীচের আয়াতগুলি লক্ষণীয়:

(২৯:২,৩) তবে কি লোকেরা ধারণা করে যে, তাহাদের ছাড়িয়া (আরামে) দেওয়া হইবে কারণ তাহারা বলে আমরা বিশ্বাস করি এবং আমাদের দুঃখ-কষ্ট দিয়া পরীক্ষা করা হইবে না? দেখ! আল্লাহ্ তোমাদের পূর্ববর্তীদের পরীক্ষা করিয়াছেন। এইরূপে আল্লাহ জ্ঞাত হন কাহারা অকপট আর কাহারা ছলনা করে।

(৩:১৪২) তবে কি তোমরা মনে কর যে তোমরা বেহেশতে যাইবে যখন আল্লাহ্ জানেন না তোমাদের মধ্যে কাহারা সংগ্রামী, আর কাহারা অটল?

(২:২১৪) অথবা তোমরা কি মনে কর যে তোমরা বেহেশতে যাইবে যখন তোমাদর পুরোগামীদের উপর যাহা আসিয়াছিল এ যাবৎ তোমাদের নিকট তেমন কোন কিছু আসে নাই? তাহাদের উপর ক্লেশ ও দুর্ভাগ্য আপাতিত হইয়াছিল, তাহারা ভুমিকম্পসম প্রকম্পিত হইয়াছিল, যে পর্য্যন্ত না আল্লাহর নবী এবং তাহার সহিত সমবিশ্বাসীরা বলিল: আল্লাহর সাহায্য কখন আসিবে? এক্ষণে, নিশ্চয়ই আল্লাহর সাহায্য নিকটবর্তী।

এইরূপে মানুষ যদি প্রকৃতই অকপট ও স্থির সঙ্কল্প হয়, আল্লাহর সাহায্যে কৃতকার্যতা আসিতে বাধ্য। প্রকৃতপক্ষে, কৃতকার্যতার জামিন আল্লাহ্ স্বয়ং দিতেছেন।

(২৪:৫৫) আল্লাহ্ প্রতিশ্রুতি দিয়াছেন, তোমাদের মধ্যে যাহারা বিশ্বাসী ও সৎকার্যকারী, তিনি তাহাদিগকে পৃথিবীতে কৃতকার্য করিবেন, যেরূপ তিনি করিয়াছিলেন তোমাদের পুরোগামীদের। এবং নিশ্চয়ই তিনি তাহাদের জন্য তাহাদের ‘দ্বীন’ কে প্রতিষ্ঠিত করিবেন, যাহা তিনি তাহাদের জন্য অনুমোদিত করিয়াছেন, এবং যে ভীতিজনক অবস্থার মধ্যে তাহারা ছিল তিনি তাহা পরিবর্তন করিয়া নিরাপদ ও শান্তিময় করিবেন।

(১০:৯) যাহারা বিশ্বাসী এবং সৎকার্য করে, “তাহাদের প্রতিপালক তাহাদের পথ-প্রদর্শন করিবেন” [...]

(৯:১১১) নিশ্চয় আল্লাহ্ বিশ্বাসীদের নিকট হইতে বেহেশতের বিনিময়ে তাহাদের জীবন ও তাহাদের ধন-সম্পদ কিনিয়া লইয়াছেন [...]

কিন্তু সতর্কবাণীও আছে:

(৪৭:৩৮) [...] আর তোমরা যদি বিপথগামী হও, তাহা হইলে আল্লাহ্ তোমাদের পরিবর্তে অন্য কোন জাতিকে লইয়া আসিবেন, যাহারা তোমাদের মত হইবে না।

(১০:১৩) তোমাদের পূর্ববর্তী বহু বংশপর্যায় যাহারা অন্যায় করিয়াছিল, আমরা তাহাদের ধ্বংস করিয়াছি; এবং (আল্লাহর তরফ হইতে) তাহাদের নিকট তাহাদের নবীরা আসিয়াছিলেন (আল্লাহর সর্বময় কর্তৃত্তের) সুস্পষ্ট প্রমাণাদিসহ, কিন্তু তাহারা বিশ্বাস করে নাই। এইরূপে আল্লাহ্ দোষী ব্যক্তিদের পুরষ্কার দেন।

১৬.১ গঠন-তন্ত্রের কাঠামো

প্রত্যেক রাষ্ট্রকে সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য একটি সংবিধানের প্রয়োজন হয়। ইহা ঐ রাষ্ট্রের কাঠামো ও ক্ষমতা এবং উহার নাগরিকদের অধিকার ও কর্তব্যের সংজ্ঞা নির্দেশ করে। ঐ সংবিধান লিখিত দলিল রূপে অথবা প্রচলিত রীতি ও ঐতিহ্যের উপর ভিত্তি করিয়া হইতে পারে এবং সেই অনুযায়ী দেশের সরকার সংগঠিত হইতে পারে। যাহা হউক, সমাজের অগ্রগতির বিবেচনায় সংবিধান উপযোজ্য হইতে হইবে।

ইসলামী রাষ্ট্রের সংবিধান অবশ্যই কোরানের নীতিসমূহ ও নির্দেশের উপর ভিত্তি করিয়া গঠিত হইতে হইবে, এবং সংবিধানের কোন অংশই কোরানের মূল নীতিসমূহের বিরোধী হইবেনা।

সমাজকে আলোচনার মাধ্যমে সংবিধান ঠিক করিতে হইবে, এবং এই আলোচনা কি প্রকারে সম্পাদিত হইবে তাহাও সমাজকেই ঠিক করিতে হইবে। ব্যক্তিগত বা সামাজিক জীবনে কোন ক্ষেত্রে সংবিধান অমান্য করা হইলে, প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূত বিচারবিভাগ তাহার বিধান দিবেন।

একটি ইসলামী রাষ্ট্রের সংবিধান যে ভিত্তির উপর নির্ভর করিবে তাহার প্রধান বিবেচ্য বিষয়গুলি নিম্নে উল্লেখ করা হইল:

১. ইসলামি রাষ্ট্রে সার্বভৌম ক্ষমতা কেবলমাত্র আল্লাহর। অতএব কেবলমাত্র আল্লাহর প্রতি নতি স্বীকার করিতে হইবে।

(৫১:৫৬) আমি (আল্লাহ্) জ্বিন ও মানুষ সৃষ্টি করিয়াছি কেবলমাত্র আমাকেই মান্য করার জন্য।

(১৬:৫১) আল্লাহ্ বলিয়াছেন, “আনুগত্যের জন্য দুইটি প্রভু গ্রহণ করিও না, কারণ আল্লাহ্ এক”।

(৩:৭৯) যাহাকে আল্লাহ্ তাহার গ্রন্থ, জ্ঞান ও বাণী প্রদান করিয়াছেন এমন কোন মানুষের পক্ষে পরে মানবসমাজকে বলা (সম্ভব) নহে, “আল্লাহর পরিবর্তে আমার অধীনতা স্বীকার কর”।

২. কার্য্যত: সর্বময় কর্তৃত্ব হইবে কোরানের, ইহার অর্থ এই যে সরকার কোরানের মূল নীতিসমূহের উপর ভিত্তিশীল আইনসকল মানিয়া চলিবেন।

(৬:১১৫) আপনার প্রতিপালকের কথা সত্য ও ন্যায়ের নিখুঁত। আল্লাহর কথা পরিবর্তন করিতে পারে এমন কিছুই নাই।

(৫:৪৪) [...] যাহারা আল্লাহর প্রদত্ত বিধান অনুযায়ী বিচার করে না তাহারা অবিশ্বাসী।

(৫:৪৭) [...] যাহারা আল্লাহর প্রদত্ত বিধান অনুযায়ী বিচার করে না তাহারা অন্যায়কারী।

(৬:১১৪) আমি কি আল্লাহ্ ব্যতীত আর কাহাকেও বিচারক মানিতে পারি, যখন তিনিই তোমাদিগকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা সহ (এই) গ্রন্থ প্রেরণ করিয়াছেন [...]

(৬:১১৬) যদি তোমরা পৃথিবীবাসীর অধিকাংশকে অনুসরণ কর তাহারা তোমাদিগকে আল্লাহর পথ হইতে বহুদূর ভ্রষ্ট করিবে। তাহারা অনুমান ও মত ব্যতীত অন্য কিছু অনুসরণ করে না।

(৪৫:১৮) এবং আমরা আপনাকে (হে মোহাম্মাদ) অনুশাসনের (commandment) একটি সুস্পষ্ট পথে চালিত করিয়াছি; সুতরাং ইহা অনুসরণ করুন, এবং যাহারা জানেনা তাহাদের খেয়ালিপনা অনুসরণ করিবেন না।

৩. ইসলামী রাষ্ট্রে কোন সাম্প্রদায়িক বিভেদের স্থান নাই। তাই একটি সত্যকার ইসলামী রাষ্ট্রের ঘোষণা অনুসারে যদি কেহ নিজেকে মুসলিম বলিয়া দাবি করে এবং সেই সাথে নিজেকে ‘সুন্নি’ অথবা ‘শিয়া’ অথবা অন্য কোন গোত্রের বলিয়াও দাবি রাখে তাহা হইলে রাষ্ট্রের মতে সে অবিশ্বাসী বলিয়া বিবেচিত হইবে। ইহাতে এইরূপ বুঝায় না যে সেই ব্যক্তি শাস্তি পাইবে, কারণ কাহাকেও জোর করিয়া বিশ্বাস করান যায় না।

(২:২৫৬) ইসলাম ধর্মে কোন বাধ্যবাধকতা নাই [...]

(৬:১৫৯) যাহারা নিজেদেরকে গোত্রসমূহে (মাযহাবে) বিভক্ত করিবে, তাহাদের সাথে আপনার (হে রাসূল) কোন সম্পর্ক নাই। তাহাদের বিষয় আল্লাহর কাছে যাইবে, যিনি তখন তাহাদের বলিবেন তাহারা কি করিত।

(৩০:৩১, ৩২) তোমরা একমাত্র তাঁহার (আল্লাহর) নিকট আত্মসমর্পণ কর এবং তাঁহার প্রতি তোমাদের কর্তব্য সম্বন্ধে সাবধান হও। নিয়মিত ‘সালাত’ (নামাজ) প্রতিষ্ঠিত কর এবং যাহারা তাঁহার অংশীদার সৃষ্টি করে ও নিজেদের দ্বীনকে বিভিন্ন মাযহাবে বিভক্ত করে। প্রত্যেক মাযহাবই নিজেদের কীর্তি লইয়া আনন্দিত থাকে; তাহাদের সঙ্গে এক হইও না।

(৩:১০৩) এবং তোমরা একত্রে আল্লাহর রজ্জু দৃঢ়রূপে ধরিয়া থাক এবং বিছিন্ন হইও না [...]

রাসূল এবং চারি খলিফার সময়ে একটি সত্যকার ইসলামী রাষ্ট্র অবশ্যই গঠিত হইয়াছিল, এবং ইহা প্রায় ত্রিশ বৎসর স্থায়ী হইয়াছিল। পরবর্তী খলিফারা ইহা রাজতন্ত্রে পরিবর্তিত করে যাহা কার্যতঃ ইহার অবলুপ্তির বহু কারণের মধ্যে অন্যতম।

এইরূপ রাষ্ট্রে বিশ্বাসীগণ কেবলমাত্র যে ভাল কাজ করেন তাহা নহে, বরং একে অপরকে সত্য ও কর্তব্যের প্রতি উৎসাহিত করেন।

(১০৩:৩) যাহারা বিশ্বাসী এবং সৎকর্ম করে এবং যাহারা পরস্পরকে সত্য ও ধৈর্যের ব্যাপারে উৎসাহিত করে তাহারা ব্যতীত [....]।

(৫:২) [...] কিন্তু তোমরা একে অপরকে ন্যায় ও ধর্মীয় কর্তব্যে সাহায্য করিও [...]

(৩:১০৪) এবং তোমাদের মধ্য হইতে একটি জাতি উত্থিত হইতে পারে যাহারা ভাল কাজে আমন্ত্রণ জানায় এবং সঠিক আচরণ আরোপ করে ও অশ্লীলতা নিবারণ করে। এইরূপ লোকেরাই সফলকাম হয়।

৪. ইসলামী রাষ্ট্র হইবে “আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে গণতন্ত্র”

-প্রগতি ও প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা দ্বারা উন্মুক্ত রাখিয়া। বস্তুতঃ ইলাহি নির্দেশ দ্বারা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করার বিরূদ্ধে কোরান সতর্ক করিতেছে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ, সরকার কিরূপ হইবে সে বিষয়ে ইহা নির্দেশ দেয় না। আইন প্রণয়ন ও প্রস্তুতির জন্য যথেষ্ট অবকাশ রহিয়াছে, যে পর্যন্ত না মূল নীতি সমূহ লঙ্ঘিত হয়।

(৫:১০১) হে বিশ্বাসীগণ! এমন বস্তুসমূহ সম্বন্ধে জানিতে চাহিও না, যাহা, যদি তোমাদের জানান হয় তাহা তোমাদের কষ্টের কারণ হইবে; কিন্তু যদি তোমরা সেগুলি সম্বন্ধে কোরানের আলোকে জানিতে চাও, উহা তোমাদের নিকট প্রত্যক্ষ হইয়া পড়িবে। আল্লাহ্ সেগুলি বাদ দিয়াছেন, কারণ তিনি ক্ষমাশীল, করুণাময়।

(৪২:৩৮) [...] যাহারা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের বিষয় সমূহ পরিচালনা করে।

(৩:১৫৯) [...] এবং কার্যাদি পরিচালনা বিষয়ে তাহাদের সহিত পরামর্শ করিও। এবং যখন তুমি স্থির সিদ্ধান্ত হও, তখন তোমরা বিশ্বাস আল্লাহর উপর ন্যস্ত কর। দেখ! যাহারা তাঁহার (আল্লাহর) উপর তাহাদের বিশ্বাস রাখে, আল্লাহ্ তাহাদের ভালবাসেন।

কোরানকে ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তি করিলে মতপার্থক্যের সমাধান হইতে পারে।

(২:২১৩) মানব-গোষ্টি একটিই জাতি ছিল, এবং আল্লাহ্ সুসংবাদ ও সতর্কবাণী সমেত নবীদিগকে পাঠাইয়াছিলেন এবং তিনি তাঁহাদের সহিত সত্যপূর্ণ গ্রন্থ (কেতাব) দিয়াছিলেন যাহাতে ইহা, যে সব বিষয়ে মানুষের মধ্যে মতভেদ আছে, তাহার মীমাংসা করিতে পারে; কিন্তু গ্রন্থ-প্রাপ্ত সম্প্রদায় সুস্পষ্ট নিদর্শন পাওয়ার পর পরস্পর বিদ্বেষের মাধ্যম ব্যতিরেকে মত-বিরোধী হয় নাই। বিশ্বাসীরা যে বিষয়ে মতভেদী হইয়াছিল, আল্লাহ্ তাঁহার করুণাবশতঃ তাহাদিগকে সত্যের পথে চালিত করিয়াছিলেন। আল্লাহ্ যাহাকে ইচ্ছা সত্য পথে চালিত করেন।

(৪২:১০) এবং যাহা কিছুতেই তোমাদের মতভেদ হয়, তাহার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আল্লাহর। আমার প্রতিপালক এইরূপই, যাঁহার উপর আমি আস্থাবান, এবং যিনি আমার নির্ভর।
ইসলামী রাষ্ট্রে কিরূপ সরকার হইবে, সে বিষয়ে কোরান কোন নির্দেশ দেয় না। প্রাথমিক অবস্থায় ইহার ভিত্তি হইবে যাহা কিছু জনগণের জন্য সর্বোত্তম এবং হিতকর। চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হইতেছে জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রের সকল বাধাবিপত্তি দূরীভূত করা, যাহাতে ব্যক্তিবিশেষের চলাফেরার স্বাধীনতা ব্যহত না হয়, ও ইহার ফলে মানবগোষ্ঠির একতা সাধিত হয়।

পশ্চিমা দেশসমূহে বিদ্যমান ধারণা যে গণতন্ত্র একটি বহু-দলীয় ব্যবস্থাপনায় অপেক্ষাকৃত ভাল ফল দেয়। বাস্তবে ইহা একটি কল্পকথা মাত্র, কারণ, বহু অঙ্গীকারের উপর ভিত্তি পূর্বক, যে রাজনীতির আশ্রয় গ্রহণ করিয়া ক্ষমতায় আসিতে হয়, বাস্তবে, ক্ষমতায় আসার পর সে সকল অঙ্গীকার পূরণ করা হয় না। বর্তমান রাজনীতিতে নৈতিকতার কোন স্থান নাই। বিচার ব্যবস্থা কেবল ধনী এবং শক্তিশালীদিগকেই পক্ষপাতিত্ব করে। কিন্তু একটি সত্যকার ইসলামী রাষ্ট্রে নীতি বিগর্হিত অথবা দুর্নতিপরায়ণ ব্যক্তিকে দলের মধ্যে তাহার প্রতিপত্তি নির্বিশেষে উৎখাত করা হইবে।

৫. ইসলামী রাষ্ট্রের নীতি-নির্দ্ধারক ও প্রশাসকদের উচ্চপর্যায়ের আচার-আচরণ ও চরিত্রের অধিকারী হইতে হইবে। মুসলিম সম্প্রদায়ের ব্যক্তিদের কিছু কিছু সদগুণাবলী কোরানে উল্লিখিত হইয়াছে, যথা ‘মুমেনীন’, ‘সালেহীন’, ‘মুত্তাকীন’, ইত্যাদি।

(৪৯:১৫) বিশ্বাসীগণ (মুমেনীন) কেবলমাত্র তাহারাই যাহারা আল্লাহ্ ও তাহার নবীদিগের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করিয়াছেন, এবং পরবর্তীতে দ্বিধা বা সন্দেহ পোষণ করেন নাই, এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যে স্বীয় জীবন ও সম্পদের বিনিময়ে কঠোর প্রচেষ্টা করিয়াছেন। ইহারাই নিষ্ঠাবান।

(২৯:৯) এবং যাহারা বিশ্বাস স্থাপন করিয়াছেন এবং সৎকার্য করে, নিশ্চয় আমরা তাহাদিগকে ন্যায়পরায়ণদের (সালেহীন) মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করিব।

(২:১৭৭) তুমি তোমার মুখ পূর্বে না পশ্চিমে ঘুরাও তাহাতে ধর্মপরায়ণতা নাই, কিন্তু ধর্মপরায়ণ সেই ব্যক্তিই যে আল্লাহ্, বিচার-দিবস, ফেরেস্তা, ধর্মগ্রন্থ ও নবীগণের প্রতি বিশ্বাস রাখে এবং তাঁহারই প্রেমে আত্মীয়, এতিম, অভাব-গ্রস্থ, মুসাফির এবং প্রার্থনাকারীদের নিজ সম্পদ হইতে দান করে; এবং ক্রীতদাসদের মুক্তি দেয় ও ‘সালাত’ প্রতিষ্ঠিত করে ও ‘যাকাত’ প্রদান করে। এবং যাহারা সন্ধি করিলে তাহা পূর্ণ করে এবং দুরবস্থা, বিপর্যয় ও সংকটে ধৈর্য ধারণ করে। তাহারাই সত্যপরায়ণ এবং তাহারাই আল্লাহ্-ভীরু (মুত্তাকীন)

(৪৯:১৩) [...] আল্লাহর নিকট সেই ব্যক্তিই সর্বাপেক্ষা সম্মানিত যে ব্যক্তি তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা ন্যায়পরায়ণ।

ইসলামের প্রতি তাহাদের দায়িত্ববদ্ধতার ব্যাপারে মুসলিমদের ব্যক্তিগত গুণাবলীর পার্থক্যকে কোরান স্বীকার করে। কিন্তু ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব কাহাকেও দিবার পূর্বশর্ত হইল মূল সদগুণাবলীর অস্তিত্ব। ইহা অবশ্যই কাহারও সাম্যের অধিকার সম্পর্কে কোনরূপ পার্থক্য সৃষ্টি করে না। সাম্যের অর্থ হইতেছে ধন-সম্পদ, জন্মসূহ, শ্রেণী, বর্ণ অথবা গোত্রের বিশেষ অধিকার দুরীকরণ এবং আইনের দৃষ্টিতে, আকার ও ইঙ্গিতে, কোনও প্রকার প্রভেদ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করণ। অনুরূপভাবে অমুসলিমদের সরকারী অথবা বেসরকারী চাকুরিতে নিয়োগের ব্যাপারে কোনরূপ বাধা থাকিবেনা। যোগ্যতার ভিত্তিতেই কর্মনিয়োগ হইবে।

৬. বিচার ব্যবস্থা: ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনায় ন্যায়-বিচার চাবি-কাঠি স্বরূপ। সাম্য, বিচার পরিচালনা, বিচারকদের স্বাধীনতা ও ন্যায়নিষ্ঠতা এবং সাক্ষীদের নিজ দায়িত্বে কোনরূপ অনুগ্রহ অথবা পক্ষপাতিত্ব ব্যতিরেকে সত্য সাক্ষ্য প্রদানের ব্যাপারে কোরানে কঠোর মানদণ্ড এবং আদর্শের ভিত্তি আছে।
নিচের আয়াতটি ন্যায় বিচারের মান সম্পর্কে সর্বতোভাবে ধারণা দেয়।

(৪:১৩৫) হে বিশ্বাসীগণ! ন্যায় বিচারে অবিচলিত থাকিও, তোমরা আল্লাহর সাক্ষী, এমনকি যদি ইহা তোমাদের, অথবা তোমাদের পিতা-মাতার অথবা আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধেও যায়, বিচার ধনীর হউক বা নির্ধনের, কারণ আল্লাহ্ তোমাদের অপেক্ষা উভয়েরই অধিকতর নিকটে আছেন। অতএব আবেগের বশবর্তী হইও না, পাছে তোমরা সত্যভ্রষ্ট হও এবং যদি তোমরা সত্যভ্রষ্ট হও অথবা বিনষ্ট হও, তবে জানিও! তোমরা যাহা কর সে বিষয়ে আল্লাহ্ সর্বদাই অবিহিত আছেন।

বিচার-প্রার্থীর সামাজিক অবস্থান যাহাই হউক রাষ্ট্র কর্তৃক বিনা ব্যায়ে বিচারের ব্যবস্থা করিতে হইবে, এবং আইন মুসলিম ও অমুসলিমদের মধ্যে কোন পার্থক্য করিবে না। বাস্তবিকই, ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিমরা কোরানে বর্ণিত মানুষের সকল মৌলিক অধিকারই উপভোগ করিবে, এবং তাহাদের জীবন, ধন-সম্পদ, সম্মান ও ধর্মীয়স্থান প্রতিরক্ষিত হইবে।

References: (প্রসঙ্গ সূত্র)
১. Islamic State –First Principles: Notes from Lecture and an unpublished article, by Syed Mustafa Ali.
২. Quranocrcy, by Dr S.A. Wadud.
Khalid Publishers P.O. Box 4109, Lahore-54600, Pakistan.
summarised from p. 42-68.





Home Next >>