১৭. ইসলামে মানুষের অধিকার



১৭.১ ভূমিকা

১৯৪৮ সালের ১০ই ডিসেম্বরে জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদ কর্তৃক মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণা (Universal Declaration of Human Rights) গৃহীত ও প্রচারিত হয়। এই ঘোষণায় ত্রিশটি অনুচ্ছেদ আছে, যাহা প্রশিক্ষণ ও শিক্ষার মাধ্যমে, সকল মানুষ ও সকল জাতির অধিকার ও স্বাধীনতার একটি সার্বিক আদর্শ স্থাপনের উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত হইয়াছিল।

মানবাধিকারের এই সার্বজনীন ঘোষণার পিছনে “আইন” এর জোর নাই। নিঃসন্দেহে মানবাধিকার অর্জন বাধ্যতামূলক ভাবে কেবলমাত্র প্রত্যেক রাষ্ট্রের পক্ষে উপযুক্ত আইন প্রণয়ন এবং স্বাধীন বিচার বিভাগের মাধ্যমে যথাযথ ভাবে প্রয়োগ দ্বারাই সম্ভব

ইহা যেমন প্রয়োজন যে আমাদের প্রচেষ্টা হইবে কার্যনির্বাহী, প্রশাসনিক, আইন প্রণয়ন ও বিচারগত প্রক্রিয়াসমূহের মাধ্যমে মানবাধিকার অর্জন করা, তদ্রুপ আমাদের অবশ্যই ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগতভাবে একটানা চেষ্টা করিতে হইবে, পরস্পরের প্রতি আমাদের সকল নৈতিক ও আধ্যাত্মিক কর্তব্যের দায়ীত্ব পূরণ করিতে

মুসলিমদের জন্য এবং যথার্থরূপে সমগ্র মানবজাতির জন্য ইসলাম একটি সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা করে যেখানে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জীবনের সকল ক্ষেত্রে সাম্য পালিত এবং অসাম্য পরিত্যক্ত হইবে।

ইসলাম ও মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণা সম্পর্কে মোহাম্মদ জাফরুল্লাহ খান, যিনি জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের সপ্তদশ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন এবং ‘হেগ’-এ অবস্থিত আন্তর্জাতিক বিচারালয়ের একজন বিচারক ও ভাইস-প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তাহার রচিত “Islam and Human Rights” গ্রন্থ হইতে কতিপয় অনুচ্ছেদ উদ্ধৃত হইল। ইসলাম ও বিশ্বসংস্থা ঘোষিত মানবাধিকার সম্পর্কে তাঁহার পুস্তকে একটি তুলনামূলক আলোচনা (study) করা হইয়াছে। নিম্নে তাঁহার ১৯৬৭ সালের প্রকাশিত পুস্তকটির সপ্তম পরিচ্ছদের ১৪০-১৪৩ পৃষ্ঠা হইতে কিয়দংশ উদ্ধৃত হইল।

১৭.২ “ইসলাম ও সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার ভবিষ্যত সম্পর্ক

“এই ঘোষণা মানবজীবনের এবং মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কের কেবলমাত্র কতকগুলি বিষয় সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট, এবং ইহার আদর্শসমূহ সাধন করিতে প্রয়োজনবশতঃই আইনগত, প্রশাসনিক ও বিচার-বিভাগীয় নিরাপত্তা ও কর্মপন্থা গ্রহণ করিতে হইবে। ইহা ব্যক্তিগত ও জনগোষ্ঠির জীবনে একটি অধিকতর ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী আমূল পরিবর্ত্তন আনিতে যে সকল পন্থা ও প্রক্রিয়া অবলম্বন করা প্রয়োজন তাহা করিতে পারে না। জীবনের শুধুমাত্র নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দিকসমূহের মধ্যে যতটুকু মানুষের সর্বপ্রকার আচরণের সঙ্গে অবশ্যম্ভাবীরূপে জড়িত তাহা ব্যতীত আর সবই ইহার উদ্দেশ্যের বাহিরে। অধিকন্ত পরকালের সহিতও ইহার কোন সংস্রব নাই বা থাকিতেও পারে না। এই সকল সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এতদকালের মধ্যে অর্জিত সম্ভাব্য সর্বাধিক মতৈক্যের ভিত্তিতে মানুষের অধিকারসকল সূত্রবদ্ধ করার ব্যাপারে ইহা একটি যুগান্তকারী সাফল্য।

“ধর্ম (দ্বীন) অবশ্যই উপায় এবং উদ্দেশ্য উভয় বিষয়েই এই ঘোষণা হইতে সুদূরপ্রসারী হইবে। ধর্ম ইহকাল ও পরকালের সামগ্রিক জীবন বিষয়ে সংশ্লিষ্ট। এই ঘোষণা অবশ্যই, ইসলামের মত, দাবী করে সার্বজনীনতা এবং ইহাতে ব্যাখ্যাকৃত ও নির্দেশিত সকল অধিকার, স্বাধীনতা ও কর্তব্য যাহাতে সর্বত্র সকলের জন্য স্বীকৃত ও কার্য্যকরী হয় সে বিষয় সন্ধানকামী। সেইজন্য প্রকৃত অর্থে এই ঘোষণা আপন সীমার মধ্যে ইসলামের সহিত একই দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। কিছু কিছু নির্দিষ্ট বিষয় এই ঘোষণা খুবই সাদাসিধাভাবে বর্ণনা করিয়াছে, যদিও ইসলাম এইসব ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় রক্ষাকবচের উল্লেখ করিয়াছে। মাঝে মাঝে অপরিহার্য ভাবে এই দুইয়ের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গীর পার্থক্য দেখা যায়। ইসলাম ও এই ঘোষণা উভয়েই মানবজাতির কল্যাণ, সমৃদ্ধি ও সুখের সহিত সংশ্লিষ্ট, কিন্তু ঘোষণাটি যেখানে এই সমস্ত বিষয় বাস্তবস্তরে ভৌতপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে কেবলমাত্র পার্থিব জীবনে লব্ধ করিতে প্রয়াসী সেখানে ইসলাম একটি ধর্ম হিসাবে সেগুলি সর্বস্তরে এবং সর্বউপায়ে ইহকালে ও পরকালে প্রাপ্তির উপায় সম্বন্ধে সচেতন। ইসলাম সকলপ্রকার মূল্যবোধের পরস্পরের উপর ক্রিয়া, প্রতিক্রিয়া ও মিথষ্ক্রিয়াকে স্বীকার করে, কোন কিছুই অবহেলা করে না পরন্তু এগুলির মধ্যে সমন্বয়ের উপর যথাযথ গুরুত্ব দেয়, ফলে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক আদর্শের উপর বিশেষ প্রাধান্য দিবার ও মানিয়া চলিবার প্রয়োজন হয়। এগুলি অবশ্য আলোচ্য ঘোষণার মূখ্য উদ্দেশ্য নয়। দৃষ্টিভঙ্গীর এই পার্থক্যের জন্য বিশেষ বিশেষ বিষয়ের নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে সংঘাতের সম্ভাবনা থাকিতে পারে। যদি তাহা হয় এবং দ্বন্দ মীমাংসাযোগ্য না হয় তাহালে ইসলামী সমাজের ব্যাপারে ইসলামী রীতি অবশ্যই অগ্রাধিকার পাইবে।

“এই সুদূর অনিশ্চিত সম্ভাবনা মানিয়া লইলে, সত্যকার ইসলামী মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ ও দৃঢ়করণ আলোচ্য ঘোষণার উদ্দেশ্য সমূহ লব্ধ করিতে সাহায্যই করিবে।

“পূর্বেই ইঙ্গিত করা হইয়াছে যে, মুসলিম চিন্তাধারা, সর্বতোভাবে, প্রায় এক শতাব্দি ব্যাপী একটি সুস্থ পুনর্জাগরণের অভিজ্ঞতা আনুভব করিতেছে। এই পুনর্জাগরণের সর্বাপেক্ষা অধিক আশাপ্রদ বিষয় হইতেছে যে, মানুষ তাহার বর্তমান জীবনের অবস্থা ও মূল্যবোধের দ্রুতপ্রসারী জটিলতার সম্মুখীন হইয়া আলোক ও পথ প্রদর্শনের জন্য কোরানের প্রতি অধিকতর মনোযোগ দিতেছে এবং এই প্রচেষ্টা বহুল পরিমানে, উত্তমরূপে, মাত্রাতিরিক্তভাবে ফলপ্রসূ হইতেছে। এই বিষয়টি বাস্তবিকই কোরানের আশ্বাস বাণীর সহিত মিলিয়া যায়, যে বাণী অনুসারে ইহার জ্ঞানালোক ও পথনিদের্শনার সম্পদ অফুরন্ত

“বল: আমার প্রভুর (প্রতিপালকের) বাণী বর্ণনার জন্য যদি সাগর কালি হইত তবে প্রভুর বাণী নিঃষেশ হওয়ার পূর্বে নিশ্চয়ই সাগর শুকাইয়া যাইত (১৮:১০৯)

“এবং এমন কি আরও পরিষ্কার রূপে:

“যদি পৃথিবীর যাবৎ বৃক্ষ কলম হইত, এবং সমুদ্র কালি হইত এবং সপ্তসমুদ্র তদুপরি তাহা উদ্বেলিত করিত, তথাপি আল্লাহর বাণী বর্ণনা করিয়া শেষ করা যাইত না। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ শক্তিশালী, পরম বিজ্ঞ (৩১:২৭)

“মানবজাতির ভবিষ্যত বংশধরদের জন্য এই রত্নরাজি নিরাপদে সংরক্ষিত হইবে।

“নিশ্চয়ই আমরাই স্বয়ং এই উপদেশাবলী পাঠাইয়াছি, এবং অতি নিশ্চয়ই আমরাই ইহার তত্ত্বাবধায়ক (১৫:৯)

এইরূপে তন্মধ্যে (কোরানে) বর্ণিত পথ-নির্দেশনা সকল যুগেই প্রাপ্তিসাধ্য থাকিবে”।

দ্রষ্টব্য ৬.২: কোরানের যে সকল আয়াতে মানুষের অধিকার ও কর্তব্যের নির্দেশ আছে তাহা এই বিভাগে পাওয়া যাইবে।

References: (প্রসঙ্গ সূত্র)

১. Islam and Human Rights, by Muhammad Zafrulla Khan.
Published by The London Mosque, 63 Melrose Road, London
SW18. p. 140-143.





Home Next >>