১৮. ইহুদি ধর্মগ্রন্থ ও বাইবেল



১৮.১ ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থ (হিবরীয়াক বাইবেল)

ওল্ড টেষ্টামেন্ট বা হিব্রু বাইবেল নয়শত বৎসরেরও অধিক সময় লইয়া লিখিত ভিন্ন ভিন্ন দৈর্ঘের রচনাসমূহের একটি সমষ্টি। এগুলি অনেকগুলি ভাষায় লিখিত হইয়াছিল, এবং হাদিস গ্রন্থের ন্যায়, এগুলির ভিত্তি ছিল মৌখিকভাবে সংগৃহীত তথ্যসমূহ। হিব্রু বাইবেলের বিষয়বস্তু প্রটেস্টান্ট ধর্মবিশ্বাসীদিগের ওল্ড টেষ্টামেন্টের মতনই তবে ভিন্ন বিন্যাসে লিখিত। ক্যাথলিকদিগের ওল্ড টেষ্টামেন্টে কিছু অধিকতর পুস্তক আছে যাহা প্রটেস্টান্ট ওল্ড টেষ্টামেন্টে নাই। নিম্নের পুস্তকগুলি প্রটেস্টান্ট ওল্ড টেষ্টামেন্টে আছে। হিব্রু ভাষায় তোরাহ্ এবং ইংরেজিতে পেন্টাটিউক বলিয়া পরিচিত প্রথম পাঁচটি গ্রন্থ হইল: জেনেসিস, এক্সোডাস, লেভিটিকাস, নাম্বারস এবং ডয়টেরোনোমি। এই গ্রন্থসমূহ ঐতিহ্য অনুযায়ী মূসার সহিত সংশ্লিষ্ট, এবং এগুলি বিশ্বের আদি হইতে মূসার মৃত্যু পর্য্যন্ত সময়ের ঘটনাবলির সহিত জড়িত। এইগুলি উনচল্লিশ খণ্ড সংকলনের প্রাথমিক পাঁচটি উপাদান, যাহাকে সমষ্টিগত ভাবে ওল্ড টেষ্টামেন্ট বলা হয় ইহার পর আছে বারটি ঐতিহাসিক গ্রন্থ (যোশুয়া, জাজেস, রুথ, ১স্যামুয়েল, ২স্যামুয়েল, ১কিংস, ২কিংস, ১ক্রনিকলস্, ২ক্রনিকলস্, এজরা, নেহেমিয়া, এসথার) এবং পাঁচটি কবিতা গ্রন্থ (জব, সামস্, প্রোভার্বস্, একলেসিয়াস্টিকস্ এবং সলোমানের গীতিসমূহ)। এইগুলির পরে আসে পাঁচজন প্রধান নবী (ইসাইয়াহ, জেরেমিয়া, ল্যামেন্টেশনস, এজেকিয়েল এবং ড্যানিয়েল) এবং বারজন অপ্রধান নবীগণের (হোসিয়া, জোয়েল, আমোস, ওবাদিয়া, জোনাহ, মিকাহ, নাহুম, হাবাক্কুক, যেফানিয়া, হাগ্গাই, জাকারিয়া এবং মালাচি) লিপিবদ্ধ বিবরণী।

ক্যাথলিকদিগের ওল্ড টেষ্টামেন্টে সংযুক্ত ইহাদের অতিরিক্ত পুস্তক: টোবিট্, যুডিথ্, ইশার, সলোমনের বিজ্ঞতা, সিরাখ অথবা একলেসিয়াস্টিকস, বারূখ, সুজানা এবং আজারিয়ার প্রার্থনা।

তোরাহর পাঁচটি গ্রস্থ বাইবেলে বর্ণিত সামারিটানদের ন্যায় ইসরাইলি সম্প্রদায়ের আদি একেশ্বরবাদের নিদর্শ। ইহুদিবাদ, যাহা আদি ইসরাইলি একেশ্বরবাদ হইতে উদ্ভূত, শুধুমাত্র যে উনচল্লিশটি গ্রন্থের সবকটিই গ্রহণ করে তাহা নহে, বরং খৃষ্টিয় যুগের প্রথম কয় শতাব্দীতে রচিত ইহুদি ঐতিহ্যের অন্যান্য শিক্ষাগত বিষয়সমূহ ও, মান্য করে। শেষোক্ত বিষয়গুলি একত্রে ‘তালমুদ’ নামে পরিচিত। ইহুদিরা নিজেদের পরবর্তী অন্য কোন প্রত্যাদেশে বিশ্বাস করে না। সেইজন্য ইহারা বাইবেলের নিউ টেষ্টামেন্ট বলিয়া খ্যাত অংশ এবং কোরান মান্য করেনা।

১৮.২ বাইবেল

প্রটেস্টন্ট বাইবেল: ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থের উনচল্লিশটি গ্রন্থকে ‘ওল্ড টেষ্টামেন্ট’ বলিয়া স্বীকার করে। নিউ টেষ্টামেন্ট, যাহাতে সাতাশটি গ্রন্থ আছে, ওল্ড টেষ্টামেন্টের সহিত একত্রিত করিয়া খৃষ্টীয় বাইবেল গঠিত হইয়াছে। সাতাশটি গ্রন্থের মধ্যে ‘গসপেল’ (ম্যাথউ, মার্ক, লিউক ও জন) নামে অভিহিত চারটি গ্রন্থ ঈসার জীবন-বৃত্তান্ত, এবং একটি তাঁহার প্রথম দিকের অনুসারীদের কর্মকাণ্ড ও প্রচারকার্যের বিবরণী। শেষোক্তটিকে বলা হয় এপসলদের (Apostles) এ্যাক্টস্ (সাধারণতঃ শুধুমাত্র এ্যাক্টস)। তারপর আছে একুশটি এ্যপিসলস্ (Epistles) (ধর্মীয় নির্দেশাবলী সংক্রান্ত বিভিন্ন এপিসলদের পত্রালাপ)। এগুলির তেরটি আরোপিত হয় পলের প্রতি, যিনি সাধারণতঃ খৃষ্টীয়বাদের প্রতিষ্ঠাতা রূপে বিবেচিত। পরিশেষে, আসে রেভেলেশন নামে ভবিষ্যদ্বাণীর গ্রন্থ। খৃষ্টীয়বাদ ঈসার পরবর্তী কোন প্রত্যাদেশ মান্য করেনা। সেইহেতু, ইহা কোরান বিশ্বাস করে না।

১৮.৩ মূল গ্রন্থ সমূহের ইতিহাস

ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থ সম্বন্ধে বলা যায় যে খৃষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকের দিকে অন্ততঃ তিন প্রকারের হিব্রু মূল গ্রন্থ ছিল। সেগুলি ছিল ম্যাসোটেরিক মূল গ্রন্থাংশ, গ্রীক ভাষায় অনুবাদের জন্য আংশিক ব্যবহৃত মূল গ্রন্থ, এবং সামারিটান পেন্টাটিউক। যদি এই তিন প্রকারের মূল গ্রন্থই বর্তমানে পাওয়া যাইত তবে একটি তূলনা করা সম্ভব হইত এবং মূল গ্রন্থ কিরূপ ছিল সে বিষয়ে একটি সমাধানে আসিতে পারা যাইত। দুর্ভাগ্যবশতঃ যাহা পাওয়া যায় তাহা হইতেছে ‘ডেড সী স্ক্রল’ সমূহ (কেভ অফ কামরান)। ইহা ঈসার আবির্ভাবের খুব বেশী আগে নহে। আর পাওয়া যায় খৃষ্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীর দশটি অনুশাসনের (Ten Commandments) প্যাপিরাস, যাহা এমনকি বাইবেলের সর্বাপেক্ষা প্রাচীন খৃষ্টীয় নবম শতাব্দীর (সি.ই.) হিব্রু ভাষার মূল্য গ্রন্থের সহিতও সম্পূর্ণ মিলে না। প্রথম গ্রীক ভাষায় অনুবাদের সময়কাল তৃতীয় শতাব্দ (সি.ই.) এবং চতুর্থ শতাব্দীর (সি.ই.) ল্যাটিন ভাষার সংস্করণ, আরাম-দেশীয় ভাষায় এবং প্রাচীন সিরিয়া-দেশীয় ভাষায় অনুবাদের ও উল্লেখ করা যায়। শেষোক্ত দুইটি অসম্পূর্ণ। আমরা বর্তমানে যে সকল গ্রন্থ পাই তাহা বিশেষজ্ঞগণ এই সকল অনুবাদ ব্যবহার করিয়া একত্রিত করিয়াছেন

খৃষ্টান ধর্মের আদিতে মৌখিক মতবাদ এবং যীশুর শিষ্যদের (আপসল) শিক্ষাদানই ছিল প্রধান কর্তৃত্ব ও প্রভাব। পলের চিঠি দ্বারা প্রথম লিখিত প্রচলন শুরু হয়। প্রকৃত পক্ষে খৃষ্টীয় ১৪০ বর্ষ পূর্বের লিখিত গসপেল সম্বন্ধে মানুষের কোন ধারণা ছিল না। ৪০ অথবা ৫০ বৎসর পর্যন্ত গসপেল সম্পূর্ণ মৌখিক ভাবে প্রচারিত ছিল। যীশুর বাণী প্রচারকগণের প্রত্যেকে মৌখিক ভাবে পূর্ব প্রচারিত বাণী সংগ্রহ করিয়া স্বীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে সেইগুলি লিপিবদ্ধ করিয়াছেন। বাইবেলের বর্তমান কালের পণ্ডিত সমূহের মতে ম্যাথ্‌উ, মার্ক, লিউক ও জন, চার গসপেলের গ্রন্থকার নন, বরং অন্যের দ্বারা সংগৃহিত নানাবিধ বিষয় বস্তুর সংকলক। খৃষ্টীয় ১৭০ বর্ষ যাবত চার গসপেল প্রামাণিক পুস্তক হিসাবে গৃহিত হয় নাই।

নিউ টেষ্টামেন্ট সম্পর্কে বলা যায় যে, খৃষ্টীয়বাদের প্রাথমিক যুগে ঈসার উপর অনেক কিছু লিখিত হইয়াছিল (লিউক ১.১ দ্রষ্টব্য) যাহা নিউ টেষ্টামেন্ট বাদ দিয়াছে। নাজারেনদের গসপেল (উপদেশাবলী), হিব্রুদের গসপেল, মিশরীয়দের গসপেল, টমাসের গসপেল এবং বার্ণাবাসের গসপেল সমূহের উল্লেখ করা যায়। প্রচলিত অনেকগুলির মধ্যে এগুলি কয়েকটি। কিন্তু পরবর্তীতে চার্চ এগুলিকে লুকাইয়া ফেলিবার নির্দেশ দেয়, এবং সেইজন্য এগুলির নাম হয় ‘এ্যাপোক্রিফা’ (সন্দেহজনক)। ৩৬৭ খৃষ্টাব্দে আলেকজান্দ্রিয়ার বিশপ এ্যাথেনেসিয়াস যে রচনা সমূহের তালিকা প্রস্তুত করিয়াছিলেন, ৩৯৩ খৃষ্টাব্দে হিপোর চার্চ কাউন্সিল এবং চারি বৎসর পরে আবার কার্থেজের কাউন্সিল তাহা অনুমোদন করে। প্রচলিত অনেকগুলি গসপেল হইতে অধুনা ব্যবহৃত চারিটি গসপেল বাছাই করিতে কী প্রকার যথেচ্ছ প্রক্রিয়া প্রয়োগ করা হইয়াছিল, সে বিষয়ে সহজেই প্রশ্ন উঠিতে পারে, বিশেষ করিয়া যখন কতকগুলি বাতিলকৃত গ্রন্থ ঐতিহাসিক বিশুদ্ধতার যথাযথ পূর্ণ দাবি রাখিতে পারে। তাছাড়া, নিউ টেষ্টামেন্টের উপর কঠোর শোধন, সম্পাদনা ও অনুমোদন প্রক্রিয়া প্রয়োগ করা হইয়াছে এবং এখনও হইতেছে। উদাহরণ স্বরূপ উল্লেখ করা যায় যে, রোমান ক্যাথলিক অনুবাদের সাতটি অতিরিক্ত গ্রন্থ, যেগুলিকেও ‘এ্যাপোক্রিফা’ বলা হয়, ইহা হইতে বাদ দেওয়া হইয়াছে।

এইরূপে দেখা যায় যে ওল্ড ও নিউ টেষ্টামেন্টে মানুষের ব্যাপক হস্থক্ষেপ হইয়াছে। একই বিষয়ে ভিন্নতর বিবৃতি ছাড়াও পরস্পর-বিরোধী বর্ণনা, ঐতিহাসিক ভুল-ত্রুটি এবং দৃঢ় ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক তথ্যসমূহের সহিত অসঙ্গতি ওল্ড ও নিউ টেষ্টামেন্টে দেখিতে পাওয়া যায়।

১৮.৪ ইহুদি ও খৃষ্টিয় ধর্ম গ্রন্থসমূহের যথার্থতা

পশ্চিমা দেশসমূহে ধর্মগ্রন্থসমূহের সমালোচনা মুলক গবেষণা নিতান্তই সাম্প্রতিক ব্যাপার। এমনকি এখনও অধিকাংশ লোক সন্তুষ্ট চিত্তে বাইবেল — ওল্ড ও নিউ টেষ্টামেন্টের যথাযর্থতা বিষয়ে কোন প্রশ্ন না করিয়া, যেরূপ আছে সেইরূপেই গ্রহণ করে। ইহার কারণ, যাজকগণের বাইবেল সম্বন্ধে ব্যাপক জ্ঞান থাকিলেও অধিকাংশ জনসাধারণ ধর্মোপদেশের (সারমন) অংশ হিসাবে কেবল নির্বাচিত অংশসমূহই শুনিয়া থাকে। বাইবেল গ্রন্থসমূহে যে সকল অসম্ভাব্য ও পরস্পর-বিরোধী বর্ণনা আছে তাহা জানিতে হইলে বিশেষজ্ঞদের গবেষণালব্ধ তথ্যের শুধুমাত্র কিছু কিছু পাঠ করিলেই হইবে। পাঠকের অতিরিক্ত জ্ঞান লাভের সাহায্যের উদ্দেশ্যে এই অধ্যায়ের শেষে কতকগুলির নজির দেওয়া হইয়াছে। যাহা হউক, বাইবেল গ্রন্থসমূহে পরস্পর-বিরোধী বর্ণনা ছাড়াও অন্যান্য গুরুত্বর বিষয় আছে যাহা অবহেলা করা যায় না। এইগুলি বিশেষ করিয়া নবীদের চরিত্র, সামাজিক ও যুদ্ধঘটিত আইন-কানুন, নিকট-সম্পর্কীয় স্ত্রী-পুরুষের অবৈধ সঙ্গম এবং অন্যান্য বিষয়সমূহ, যাহা আমাদের নৈতিকতা ও মানবিক আদর্শবোধের সহিত সংঘাত সৃষ্টি করে। এই অধ্যায়ে এইগুলি সম্বন্ধে কিছু কিছু আলোচনা করা হইয়াছে, এবং সেইসঙ্গে কিছু জাজ্বল্যমান অসঙ্গতিও নির্দেশ করা হইয়াছে। উপরন্তু, সমপর্যায়ের বিষয় হইলে, সে সম্পর্কে কোরানের মতও বর্ণনা করা হইয়াছে। বিশেষ করিয়া ইব্রাহীমের কথা অধিকতর বিশদভাবে আলোচনা করা হইয়াছে, কারণ বাইবেলে গড (God) বলেন যে, তিনি (গড) তাহাকে ‘বহু জাতির জনক’ করিয়াছেন, এবং কোরানেও আল্লাহ্ বলেন যে ইব্রাহীমকে ‘সমগ্র মানব জাতির নেতা’ আখ্যা দেওয়া হইয়াছে।

১৮.৫ কয়েকজন প্রধান প্রদান নবীদের বাইবেলে বর্ণিত চরিত্র

১৮.৫১ ইব্রাহীম: ইব্রাহীম তাঁহার ভগ্নী সারাহকে বিবাহ করেন। সারাহ্ তাঁহার পিতার কন্যা, কিন্তু তাহাদের মাতা ভিন্ন। ইহা ছিল ভাই ও বৈমাত্রেয় ভগ্নীর নিকট-সম্পর্কীয় বিবাহ। সারাহ্ অত্যন্ত সুন্দরী ছিলেন। যখন তাঁহাদের দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, ইব্রাহীম তাঁহার স্ত্রীসহ মিশরে যাওয়া মনস্থ করিলেন। কিন্তু সারাহর সৌন্দর্যের জন্য তাহার ভয় ছিল যে, মিশরবাদীরা যদি জানিতে পারে সারাহ্ তাহার স্ত্রী, তাহারা তাহাকে মারিয়া ফেলিবে। সেইজন্য তিনি তাঁহার স্ত্রীকে ভগ্নী বলিয়া পরিচয় দিতে বলিলেন। যখন ফেরাউন সারাহর সৌন্দর্যের কথা শুনিল, সে সারাহকে নিজ অন্তঃপুরে লইয়া গেল। অনুগ্রহ হিসাবে সে ইব্রাহীমকে পুরুষ ও স্ত্রীভৃত্যাদিসহ অনেক গবাদি পশু দান করিল। কিন্তু সারাহকে তাহার অন্তঃপুরে লইয়া যাওয়ার জন্য সে গডের অসন্তোষ ভাজন হইল, এবং গড তাহার পরিবারে প্লেগরোগ দিলেন। যখন ফেরাউন জানিতে পারিল যে তাহাকে প্রবঞ্চনা করিবার জন্য ইব্রাহীম নিজের স্ত্রীকে ভগ্নী বলিয়াছে সে ইব্রাহীমকে ভৎর্সনা করিল। সে তারপর তাঁহাদের উভয়কে চলিয়া যাইতে বলিল; কিন্তু সারাহর কারণে যে সমস্ত ধন-দৌলত ইব্রাহীমকে দিয়াছিল দয়াপরবশ হইয়া তাহা ফিরাইয়া লই নাই। (জেনেসিস ১২:১০-২০)

এই একইরূপ গল্প ইব্রাহীম গেরারের রাজা আবিম’ইলেককে বলিয়াছিলেন, যিনি সারাহকে ইব্রাহীমের ভগ্নী মনে করিয়া তাঁহার অন্তঃপুরে লইয়া গেলেন। কিন্তু ঐ রাজা সারাহকে স্পর্শ করিবার পূর্বে গড তাঁহাকে স্বপ্নে সতর্ক করিয়া দিলেন যে অপর একজনের স্ত্রীকে তাহার অন্তঃপুরে রাখার জন্য সে মৃত্যুবরণ করিবে। ফলে আবিম’ইলেক সারাহকে মুক্তি দিলেন এবং ইবরাহীমকে ভেড়া, গবাদিপশু এবং পুরুষ ও স্ত্রী ক্রীতদাসাদি উপহার দিলেন (জেনেসিস ২০:১-১৬)

অতঃপর ফেরাউন ও রাজা আবিম’ইলেকের উপকার সমূহের দৌলতে ইব্রাহীম একজন ধনবান ব্যক্তি হইয়া পড়িলেন। সারাহ্ বন্ধ্যা ছিলেন তাই তিনি ইব্রাহীমকে মিশরীয় ক্রীতদাসী হ্যাগার (হাজেরা) কে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করিতে বলিলেন। ইব্রাহিম হাজেরাকে গ্রহণ করিলেন এবং সে গর্ভবতী হইল (জেনেসিস ১৬:১-৪)। ইব্রাহীম তাঁহার পুত্রের নাম দিলেন ইশমাইল। ইব্রাহীমের বয়স যখন নিরানব্বই বৎসর, গড তাঁহার সহিত একটি চুক্তি করিলেন, যাহার শর্ত ছিল তিনি এবং তাহার পরিবারস্থ সকলকে খাতনা (লিঙ্গের ত্বক ছেদন) করিতে হইবে। ইব্রাহীম অনতিবিলম্বে তাহা করিলেন। ইহা ব্যতীত গড তাঁহাকে বহু জাতির জনক করিলেন। সে সময় ইশমাইলের বয়স তের বৎসর। গড ইব্রাহীমকে কথা দিলেন যে, তিনি বসন্ত ঋতুতে ফিরিয়া আসিবেন এবং সারাহর একটি পুত্র সন্তান হইবে। (জেনেসিস অধ্যায় ১৭ ও ১৮)

“প্রভু তাহার কথামত সারাহকে দর্শন দিলেন, এবং প্রভু সারাহর প্রতি যাহা অঙ্গীকার করিয়াছিলেন তাহাই করিলেন। সারাহ্ গর্ভবতী হইলেন, এবং ইব্রাহীমকে একটি পুত্রসন্তান দিলেন [...]”। (জেনেসিস ২১:১,২)

ইব্রাহীম তাহার নাম রাখিলেন ইসহাক। ইসহাক মাতৃস্তন ছাড়িলে সারাহ্ ইব্রাহীমকে বলিলেন: “এই ক্রীতদাসীকে তাহার পুত্র সমেত তাড়াইয়া দাও; কারণ এই ক্রীতদাসীর পুত্র আমার পুত্র ইসহাকের সহিত উত্তরাধিকারীত্ব পাইবে না।“ (জেনেসিস ২১:১০)

প্রভু ইব্রাহীমকে সারাহ্ যেরূপ বলিয়াছিলেন তাহাই করিতে উপদেশ দিলেন, কারণ তাঁহার বংশধরেরা ইসহাকের মাধ্যমেই আখ্যায়িত হইবে। গড আরও জানাইলেন যে, তিনি ঐ ক্রীতাদাসীর পুত্রের মাধ্যমেও একটি জাতির উদ্ভব ঘটাইবেন। ইব্রাহীম প্রত্যুষে উঠিয়া হাজেরাকে রুটি ও পানির মশক দিলেন এবং তাঁহাকে ইশমাইলের সহিত পাঠাইয়া দিলেন। তিনি চলিয়া গেলেন এবং বিয়ার-শিবার বিরল প্রান্তরে ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিলেন। মশকের পানি ফুরাইয়া গেলে, হাজেরা তাহার পুত্র সন্তানকে একটি ঝোপের নীচে রাখিয়া দিলেন। গড বালকটির কণ্ঠস্বর শুনিতে পাইলেন। প্রভুর একটি দূত আসিয়া হাজেরাকে বালকটিকে উঠাইতে বলিলেন। গড তখন হাজেরার চক্ষ খুলিয়া দিলেন। তিনি একটি পানির কূপ দেখিতে পাইলেন এবং সেখানে গিয়া পানির মশক পূর্ণ করিলেন ও ছেলেটিকে পানি খাইতে দিলেন। তাঁহারা পারানের বিরল প্রান্তরে বাস করিতে লাগিলেন, এবং তাঁহার মাতা মিশর হইতে তাঁহার জন্য একটি স্ত্রী গ্রহণ করিলেন (জেনেসিস ২১:১২-২১)

ইহার পর গড ইব্রাহীমকে পরীক্ষা করিতে চাহিলেন। তিনি বলিলেন:

“তোমার একমাত্র পুত্র সন্তান ইসহাক, যাহাকে তুমি স্নেহ কর, তাহাকে লইয়া মোরিয়া ভূমিতে যাও। সেখানে আমার নির্দেশমত একটি পাহাড়ের উপর তাহাকে ‘হোমে’ (বলির পর জ্বালাইয়া) উৎসর্গ কর।“ (জেনেসিস ২২:২)

সেজন্য ইব্রাহীম প্রত্যুষে উঠিয়া তাঁহার গর্দভটিকে জিন পরাইলেন, এবং তাহার দুইজন যুবক ভৃত্য ও পুত্র ইসহাককে লইয়া গডের নির্দেশমত স্থানে গেলেন। সেখানে তিনি একটি বেদী তৈয়ার করিয়া তাহার উপর কাঠ সাজাইলেন এবং তাঁহার পুত্র ইসহাককে বাধিয়া ঐ বেদীর কাঠের উপর রাখিলেন। ইহার পর ইব্রাহীম ছুরি লইয়া পুত্রকে বধ করিতে উদ্যত হইলেন। কিন্তু স্বর্গ হইতে প্রভুর দূত তাহাকে ডাকিয়া বলিলেন:

“ঐ ছেলেটির ক্ষতি করিও না, কারণ তোমার পুত্রকে, তোমার একমাত্র পুত্রকে আমাকে দিতে অস্বীকার কর নাই, ইহা দেখিয়া এখন জানিলাম তুমি গডকে ভয় কর।“ (জেনেসিস ২২:১২)

ইব্রাহীম তাঁহার চক্ষু তুলিয়া চাহিয়া দেখিলেন তাহার পিছনে একটি মেষ একটি ঝোপের সঙ্গে শিঙ্গে আটকাইয়া আছে। ইব্রাহীম পুত্রের বদলে মেষটিকে উৎসর্গ (হোম) করিলেন। স্বর্গীয় দূত দ্বিতীয় বার বলিলেন যে, প্রভুর আদেশের প্রতি আনুগত্যের জন্য তিনি অঙ্গীকার করিয়াছেন আকাশের নক্ষত্ররাজি ও সমুদ্র সৈকতের বালুকণার ন্যায় তাহার (ইব্রাহীমের) বংশধরদিগের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হইবে। এবং তাহার বংশধরগণের মাধ্যমে বিশ্বের সকল জাতিই নিজেদেরকে আশীর্বাদ-পুষ্ট করিবে। ইব্রাহীম তখন ফিরিয়া আসিয়া বিয়ার-শেবায় বসবাস করিতে লাগিলেন। (জেনেসিস ২২:১৩-১৯)

টিকা: ইব্রাহীমের বিষয় কোরানে কি বলিয়াছে তাহার জন্য ৭.৫ অনুচ্ছেদ দ্রষ্টব্য।

কোরানের বর্ণনা অনুযায়ী ইশমাইল এবং ইসহাক উভয়েই ইব্রাহীমের পুত্র এবং তাহারা উভয়েই স্বকীয়ভাবে নবী হইয়াছিলেন। আল্লাহ্ ইব্রাহীমকে পরীক্ষা করিয়াছিলেন, এবং তিনি সকল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়াছিলেন বলিয়া তাঁহাকে ‘মানবকুলের নেতায়” উন্নীত করা হইয়াছিল। অতিরিক্ত পরীক্ষা হিসাবে তাহাকে ইশমাইলকে (ইসহাককে নহে) কোরবানী করিতে বলা হইয়াছিল। কোরবানী করিবার সম্মুখীন হইলে আল্লাহ্ তাহাকে একটি ‘অতীব গুরুত্বপূর্ণ উৎসর্গের’ বিনিময়ে দায়মুক্ত করিয়াছিলেন। ঐ উৎসর্গ মেষ ছিলনা (এবং কোরানে ইহা বলাও হয় নাই), ইহা ছিল আল্লাহ্ ও তাঁহার (ইব্রাহীমের) মধ্যে একটি চুক্তি। এই চুক্তি ছিল ‘কাবা’ গৃহ (আল্লাহর ঘর) নির্মাণ করা, ধর্মীয় অনুষ্ঠানের জন্য যাহারা আসিবে তাহাদের জন্য এই গৃহ (কাবা) পবিত্র রাখা এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যে কাজ করিয়া যাওয়া। তাঁহার পরবর্তী অন্যান্য নবীদের ন্যায় তাঁহাকেও একই পথনিদের্শক গ্রন্থ দেওয়া হইয়াছিল; এবং কোরানের বর্ণনা অনুযায়ী ‘তিনি ইহুদিও ছিলেননা খৃষ্টানও ছিলেননা তিনি ছিলেন সত্যকার মুসলিম’। অন্যান্য নবীদের মত তাঁহার মাধ্যমে মানবজাতির জন্য যে জীবনধারা নির্দেশিত হইয়াছিল তাহা ইসলাম, এবং এই পথের সকল অনুগামীদের মুসলিম বলা হইবে। ইব্রাহীমের চরিত্র ছিল নিষ্কলুষ। ওল্ড টেষ্টামেন্টে বর্ণিত তাঁহার প্রতারণার গল্পসমূহ একজন মহান নবী হিসাবে তাঁহার চরিত্রের সহিত অসঙ্গতিপূর্ণ। অধিকন্ত আল্লাহ কিরূপে বলিতে পারেন ‘ইব্রাহীমের একমাত্র পুত্র ইসহাক’, এবং একই রূপে ইব্রাহীমকে হাজেরার গর্ভে সন্তান লাভে বাধ্য হওয়ার পূর্বে, আল্লাহ্ কেন সারাহকে একটি সন্তান দেন নাই? কোরানে এরূপ কোন অসঙ্গতি নাই, এবং আল্লাহর দূত হিসাবে সকল নবীদেরকেই উত্তম নৈতিক আচারণকারী হিসাবে দেখান হইয়াছে।

১৮.৫২ বাইবেলে বর্ণিত অন্যান্য নবী ও রাজাদের নৈতিক কলুষতার দৃষ্টান্ত সমূহ

নূহ: “এবং তিনি (নূহ) মদ্যপান করিয়া মাতাল হইলেন, এবং তাঁবুর মধ্যে উলঙ্গ হইয়া শুইয়া থাকিলেন”। (জেনেসিস ৯:২১)

সল: “এবং তিনি (সল) তাঁহার পোষাক পরিত্যাগ করিলেন ও স্যামুয়েলের সম্মুখে একইরূপে ভবিষ্যদ্বাণী করিতে লাগিলেন, এবং সারাদিন ও সারা রাত্রি উলঙ্গ অবস্থায় শুইয়া থাকিলেন যে কারণে লোকে বলে সলও কি নবীদের একজন”। (১স্যামুয়েল ১৯:২৪)

দায়ূদ: “আজ ইসরাইলদের রাজা (দায়ূদ) কেমন গৌরবময় ছিলেন, যিনি নিজেকে তাহার ভৃত্যদের দাসীদের চক্ষে উলঙ্গ করিলেন, একজন দাম্ভিক লোক যেমন নির্লজ্জভাবে নিজেকে উলঙ্গ করে!” (২স্যামুয়েল ৬:২০)

“এবং দায়ূদ তাহার (বাথ-শেবা) নিকট দূত পাঠাইলেন, সে আসিল, এবং তিনি তাহার সহিত সহবাস করিলেন [...] (২স্যামুয়েল ১১:৪)

“দায়ূদ শয়তানি করিয়া বাথ-শেবার স্বামী ইউরিয়ার মৃত্যু ঘটাইলেন”। (২স্যামুয়েল ১১:৬-২৫)

সোলায়মান: সোলায়মানের ৭০০ স্ত্রী এবং ৩০০ উপ-পত্নি ছিল (১কিংসে ১১:৩). তিনি তাহার নিজ বৈমাত্রেয় ভাই এ্যাদোনিজাহকে তাঁহার সমস্ত অনুগামীদের সহিত হত্যা করেন, কারণ তিনি (এ্যাদোনিজাহ্) সোলায়মানের বহু স্ত্রীলোকদের একজনকে বিবাহ করিতে চাহিয়াছিলেন। (১কিংস ২:১৩-২৫)

ইসাইয়াহ্: “এবং প্রভু বলিলেন, আমার ভৃত্য ইসাইয়াহ্ যেমন উলঙ্গ হইয়া এবং খালি পায়ে তিন বৎসর হাঁটিয়াছে [...]”। “[...] তেমনি তরুণ ও বৃদ্ধকে, উলঙ্গ ও খালি পায়ে, এমন কি তাহাদের পশ্চাদ্দেশ উলঙ্গ অবস্থায় লইয়া যাইবে, যাহাতে মিশরবাসী লজ্জাহত হয়।” (ইসাইয়াহ্ ২০:৩-৪)

১৮:৫৩ মূসার আইনের দৃষ্টান্ত সমূহ

নিম্নে প্রদত্ত মূসার আইনসমূহের কতকগুলি তাঁহাকে খারাপভাবে চিত্রিত করে, যদি, প্রচলিত বিশ্বাস মতে মূসা ইহুদিদের প্রথম পাঁচটি গ্রন্থের রচয়িতা হয়।
“যুদ্ধ ফিরত শত ও সহস্র সেনাধ্যক্ষ সমেত সেনাবাহিনীর সমস্ত কর্মকর্তাগণের উপর মূসা ক্রদ্ধ হইলেন। তিনি বলিলেন, “তোমরা কি সমস্ত স্ত্রীলোকদেরই নিষ্কৃতি দিয়াছ? দেখ, বালামের পরামর্শে ইহারাই ইসরালীদের, প্রভুর বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকের কাজ করাইয়াছিল। অতএব এক্ষণে প্রত্যেক পুরুষ শিশুকে, এবং যে সমস্ত স্ত্রীলোক পুরুষদের সহিত শয়ন করিয়া তাহাদের পরিচিতি লাভ করিয়াছে তাহাদের প্রত্যেককে হত্যা কর। কিন্তু যে সকল তরুণী পুরুষদের সহিত শয়ন করিয়া তাহাদের পরিচয় লাভ করে নাই, তোমাদের নিজেদের জন্য তাহাদিগকে জীবিত রাখ”।
(নাম্বারস্ ৩১:১৪-১৮)

“যখন তোমরা যুদ্ধ উপলক্ষে কোন নগরীর নিকটবর্তী হও, তখন সেই নগরীকে শান্তি-চুক্তির প্রস্তাব দাও। যদি শান্তির পক্ষে জবাব পাও এবং নগরীর দ্বার তোমাদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়, তবে সেখানে যত ব্যক্তিকে পাইবে তাহাদিগকে তোমাদের জন্য বাধ্যতামূলক শ্রমে নিয়োজিত করিবে। কিন্তু শান্তি চুক্তি না করিয়া তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিলে নগরী অবরোধ করিবে, এবং যখন তোমাদের প্রভু তোমাদের হস্থে উহা অর্পণ করিবেন তোমরা উহার সকল পুরুষ অধিবাসীদের তরাবারী দ্বারা হত্যা করিবে, কিন্তু স্ত্রীলোকদের, শিশুদের, গবাদিপশু এবং নগীর অন্যান্য সব কিছু তোমরা নিজেদের জন্য লুণ্ঠন করিবে। এবং তোমাদের প্রভুর দেওয়া শত্রুদের লুণ্ঠিত দ্রব্যাদি তোমরা উপভোগ করিবে। তোমাদের হইতে বহু দূরবর্তী যে সমস্থ নগর, যেগুলি এখানকার জাতি সমূহের নহে, সেই সমস্থ নগরের তোমরা এইরূপ করিবে। কিন্তু এইসব লোকদের (টিকা) নগরসমূহ যাহা তোমাদের প্রভু উত্তরাধিকারের জন্য তোমাদের প্রদান করেন, তোমরা সেখানে কোন কিছুই জীবিত রাখিবেনা” (ডেওটেরোনমি ২১: ১০-১৬)।

টিকা: হিত্তি ইত্যাদি জাতি সমূহের।

“যদি কোন ব্যক্তির একগুঁয়ে ও বিদ্রোহভাবাপন্ন পুত্র থাকে, যে পিতা মাতার কথা মান্য করেনা, এবং শাসন সত্ত্বেও সে তাহাদের গ্রাহ্য করে না, [...] তখন সেই নগরীর সকল পুরুষ মিলিয়া তাহাকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করিবে; [...]” (ডেওটেরোনমি ২১: ১৮, ২১)

“যদি কোন ব্যক্তি বিবাহের পর স্ত্রীর নিকট যায়, এবং ঘৃণাভরে তাহাকে প্রত্যাখ্যান করে, এবং সেই তরুণী স্ত্রীলোকের মধ্যে যদি সত্যই কুমারীত্বের নিদর্শন না পাওয়া গিয়া থাকে, তবে তাহারা ঐ তরুণীকে তাহার পিতৃগৃহের দ্বারে লইয়া যাইবে, এবং নগরীর পুরুষেরা প্রস্তরাঘাতে তাহাকে হত্যা করিবে, [...]”। (ডেওটেরোনমি ২২: ১৩,১০,২১)

“যদি কোন ব্যক্তিকে অপর কাহারও স্ত্রীর সহিত শুইয়া থাকিতে দেখা যায়, তাহাদের উভয়কেই হত্যা করা হইবে, [...]”। (ডেওটেরোনমি ২২:২২)

“যদি কোন ব্যক্তির, কোন বাগদত্তা কুমারীর সহিত নগরীতে সাক্ষাৎ হয় এবং সে তাহার সহিত সহবাস করে, তবে তোমরা তাহাদের উভয়কেই ঐ নগরীর দেউড়িতে লইয়া যাইবে এবং প্রস্তরাঘাতে তাহাদের হত্যা করিবে। ঐ তরুণীকে হত্যা করিবে, কারণ সে নগরীতে থাকিয়াও সাহায্যের জন্য চীৎকার করে নাই, এবং ঐ ব্যক্তিকে হত্যা করিবে কারণ সে তাহার প্রতিবেশীর স্ত্রীর সহিত অসঙ্গত ভাবে লিপ্ত হইয়াছিল [...]”। (ডেওটেরোনমি ২২:২৩)

“কিন্ত যদি কোন ব্যক্তির সহিত, বাগদত্তা নয় এমন কোন কুমারীর সাক্ষাৎ হয়, এবং সে তাহার সহিত বলপূর্বক সহবাস করে, এবং তাহারা সেই অবস্থায় সনাক্ত হয়, তবে সহবাসকারী ব্যক্তি ঐ তরুণীর পিতাকে পঞ্চাশ শেকেল রৌপ্য প্রদান করিবে, এবং ঐ রমণী তাহার স্ত্রী হইবে, কারণ সে ঐ রমণীকে ধর্ষণ করিয়াছিল, [...]”। (ডেওটেরোনমি ২২:২৮)

“যাহার অণ্ডকোষ পিষ্ট হইয়াছে কিংবা পুরুষাঙ্গ কাটিয়া ফেলা হইয়াছে, সে প্রভুর সমাবেশে আসিবে না। কোন জারজ ব্যক্তি প্রভুর সমাবেশে আসিবে না, এমন কি তাহার দশম বংশধর পর্যন্ত কেহই প্রভুর সমাবেশে আসিবে না”। (ডেওটেরোনমি ২৩:১’২)

১৮.৫৪ নিকট সম্পর্কীয় স্ত্রী-পুরুষের অবৈধ সঙ্গম

সমগ্র ওল্ড টেষ্টামেন্টে নিকট সম্পর্কীয় স্ত্রী-পুরুষের অবৈধ সঙ্গম সম্পর্কে উল্লেখ খুবই ব্যাপক এবং প্রায়শঃই ইহা নবীদের ও তাহাদের পরিবার বর্গের চরিত্রের সহিত জড়িত। নিম্নের উদাহরণগুলি নজির হিসাবে উল্লেখ্য:

পিতা ও তাহার কন্যাদের মধ্যে: (জেনেসিস ৩৫: ৩৩-৩৫)
মাতা ও পুত্রের মধ্যে : (জেনেসিস ৩৫:২২)
শ্বশুর ও পুত্র-বধুর মধ্যে: (জেনেসিস ৩৮:১৫-১৮)
ভ্রাতা ও ভগ্নির মধ্যে অবৈধ সঙ্গম ও ধর্ষণ : (২ স্যামুয়েল ১৩:১৪)

পুত্র ও তাহার মাতাদের মধ্যে অবৈধ সঙ্গম ও ধর্ষণ: (২ স্যামুয়েল ১৬: ২২)

অন্যান্য প্রকারের নিকট আত্মীয়ের মধ্যে অবৈধ সঙ্গম: (লেভেটিকাস ১৮: ৮-১৮, ২০: ১১-১৪ এবং ১৭-২১)

১৮.৫৫ ঈসা

ম্যাথ্উর মতে ঈসা কেবল ইহুদিদের জন্য প্রেরিত হইয়াছিলেন:

“এবং ঈসা সেন্থান হইতে টায়ার ও সিডন জিলায় প্রস্থান করিলেন। সেখানে এক ক্যানান জাতীয় স্ত্রীলোক আসিয়া কাঁদিয়া বলিল, ‘হে প্রভু দাউদের পুত্র, আমার উপর করুণা করুন। আমার কন্যা অপদেবতা দ্বারা কঠিনভাবে ভূতাবিষ্ট হইয়াছে’। কিন্তু তিনি তাহার একটি কথারও জবাব দিলেন না। এবং তাঁহার শিষ্যরা আসিয়া তাঁহাকে অনুনয় করিয়া বলিল, ঐ রমণীকে বিতাড়িত করুন, সে আমাদের পিছনে চীৎকার করিতেছে। তিনি উত্তরে বলিলেন, ‘আমাকে পাঠান হইয়াছে কেবলমাত্র পথভ্রান্ত ইসরাইলের সংশোধনের জন্য’। কিন্তু ঐ স্ত্রীলোকটি তাঁহার সামনে নতজানু হইয়া বলিল, ‘প্রভু, আমাকে সাহায্য করুন’। তিনি উত্তর দিলেন, ‘শিশুদের খাদ্য কুকুরকে দেওয়া অন্যায়’। স্ত্রীলোকটি বলিল, ‘হাঁ প্রভু, তবুও মনিবের টেবিল হইতে পড়িয়া যাওয়া খাবারের গুড়া কুকুরও ভক্ষণ করে’। তখন ঈসা বলিলেন, ‘হে রমণী, তোমার বিশ্বাস অতি দৃঢ়! তুমি যাহা চাহ তাহাই হউক’। এবং তাহার কন্যা তৎক্ষণাৎ আরোগ্য লাভ করিল। (ম্যাথ্উ ১৫: ২১-২৮)

“এই বারজন (শিষ্য) কে ঈসা এই বলিয়া পাঠাইয়া দিলেন, জেনটাইল (ইহুদি ভিন্ন অন্য জাতীয় লোক) দের মধ্যে কোথাও যাইও না এবং সামারিটানদের কোন শহরে প্রবেশ করিও না; বরং পথভ্রান্ত ইসরাইলের নিকট যাও। এবং যাইতে যাইতে প্রচার কর ‘স্বর্গরাজ্য আসিয়া গিয়াছে’। এবং পীড়িতদের সুস্থ কর, মৃতদের জাগ্রত কর, কুষ্ঠরোগীদের রোগমুক্ত কর ও অপদেবতা দূর কর। (ম্যাথ্‌উ ১০: ৫-৬)

কোরানের (৩:৪৯) আয়াতের আক্ষরিক অনুবাদ করিলে ঈসাকে যে অলৌকিক ঘটনা সম্পন্ন করিবার ক্ষমতা দেওয়া হইয়াছিল সে বিষয়ে বাইবেলের সঙ্গে সঙ্গতি পাওয়া যায় বলিয়া মনে হয়, যেমন অন্ধ ও কুষ্ঠরুগীদের সুস্থ করা, এবং বিশেষ করিয়া মৃতকে পুনর্জীবিত করা। এই আক্ষরিক অনুবাদ নিম্নের আয়াতসমূহের বৈপরীত্য করে, যেখানে বলা হইয়াছে কেবলমাত্র আল্লাহই কর্তৃত্বের অধিকারী।

(১৮:২৬) [...] আল্লাহ্ ব্যতীত তাহাদের কোন রক্ষাকারী সুহৃদ নাই, এবং তিনি কাহাকেও তাঁহার কর্তৃত্বের অংশীদার করেন না।

(৪০:১২) [...] কিন্তু কর্তৃত্বের অধিকার কেবলমাত্র আল্লাহর যিনি মহান, মহিমান্বিত, উচ্চ মর্যাদাশীল।

তাহা ব্যতীত এপর্য্যন্ত কোন বাস্তব প্রমাণ নাই যে মানুষ মৃতকে পুনর্জীবিত করিতে পারে। সে যাহা হউক কোরানের মতে ঈসা একজন ছিলেন, আল্লাহর পুত্র নয়। অতএব (৩:৪৯) আয়াত রূপক বলিয়া মনে হয়; সেক্ষেত্রে ঈসা কর্তৃক ‘মৃতকে জীবিত করিবার সর্বপরি সম্ভাব্য অর্থ হইতে পারে আধ্যাত্মিক ভাবে মৃত (ইহুদিদের), আধ্যাত্ম জীবনের পুনর্জাগরণের রূপকাশ্রিত বর্ণনা। ‘অন্ধ ও কুষ্ঠরোগীদের আরোগ্য করিবার তাৎপর্যও অনুরূপ, যেমন সত্যের প্রতি অন্ধ ও আধ্যাত্মিক ভাবে রোগ-গ্রস্থ ব্যক্তিদের আভ্যন্তরীন পুনরুজ্জীবন।

বাইবেল অবশ্য দাবী করে যে তিনি ঐ সকল অলৌকিক কাজ করিয়াছিলেন। কিন্তু তিনি যাহা কিছুই করিয়া থাকুন তাহা গডের অনুমতি-সাপেক্ষে ছিল তাঁহার নিজস্ব ইচ্ছায় হয় নাই। নিম্নের উদ্ধৃতিসমূহ ইহা নিশ্চিত করে:

“আমি নিজ কর্তৃত্বে কিছুই করিতে পারি না, যেমন আমি শ্রবণ করি, বিচার করি, এবং আমার বিচার সঠিক হয়, কারণ আমাকে যিনি পাঠাইয়াছেন আমি তাঁহার ইচ্ছা অনুসরণ করি, আমার নিজের ইচ্ছা নয়। (জন ৫:৩০)

“কিন্তু যদি এমন হয় যে, গডের অঙ্গুলি হেলনে আমি অপদেবতা দূরীভূত করি, তাহা হইলে গডের রাজ্য তোমাদের নিকট আসিয়াছে। (লিউক ১১:২০)

“পিতা, আমি আপনাকে ধন্যবাদ দিই যে আপনি আমার কথা শুনিয়াছেন। আমি জানি আপনি আমার কথা সব সময়ই শুনেন; কিন্তু আমার পার্শ্বে দণ্ডায়মান ব্যক্তিরা যাহাতে বিশ্বাস করে আপনিই আমকে প্রেরণ করিয়াছেন সেইজন্যই আমি ইহা বলিয়াছি”। এই কথা শেষ করিয়া তিনি উচ্চকণ্ঠে বলিলেন, “লাজারাস, বাহির হও”। হস্ত পদ ব্যাণ্ডেজ জড়িত এবং মুখমণ্ডল একখণ্ড কাপড় দ্বারা আবৃত অবস্থায় মৃত ব্যক্তি বাহিরে আসিল। ঈসা তাহাদের বলিলেন, “তাহার বাঁধন মুক্ত করিয়া তাহাকে যাইতে দাও”। (জন ১১: ৪১-৪৪)

ইহা লক্ষ্য করা আকর্ষণীয় যে বাইবেলের এ্যাক্টস্ বর্ণিত অধ্যায়ে ঈসার নামের ভিত্তিতে অনেক অলৌকিক ঘটনার উদাহরণ পাওয়া যায, যাহা কেবলমাত্র ধর্মপ্রচারকদের দ্বারাই নহে, তাহার শিষ্যদের দ্বারাও সাধিত হইয়াছিল। ঈসা তবুও বলিয়াছেন তাঁহার ক্ষমতা তাঁহার নিজস্ব নহে। সুতরাং, কার্যতঃ ইহার অর্থ এই দাঁড়ায় যে, যে কেহই ঈসার শিষ্য হইত, সেই ব্যক্তিই স্বাভাবিক ভাবে গডের নিকট হইতে ঈসার ন্যায় ক্ষমতা পাইত।

বিচিত্র নহে যে ম্যাথ্উয়ের মতে ঈসা কেবলমাত্র পথভ্রান্ত ইসরাইলের জন্য প্রেরিত হইয়াছিল। বস্তুতঃ খৃষ্টীয়বাদের প্রথম দিকে দুইটি দলের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল। একটিকে বলা যায় পলীয় খৃষ্টীয়বাদ (পল প্রচারিত খৃষ্টীয়বাদ), এবং অপরটি ইহুদীয় খৃষ্টীয়বাদ। প্রথমটি কৌশলে ধীরে ধীরে দ্বিতীয়টিকে অপসারিত করিল এবং পলীয় খৃষ্টীয়বাদ ইহুদীয় খৃষ্টীয়বাদের উপর বিজয়ী হইল।

“পলের দৃষ্টিতে লিঙ্গাগ্রের ত্বক ছেদন, বিশ্রাম দিবস (Sabbath) এবং ধর্মগৃহে প্রার্থনার চলিত রূপ এখন হইতে ইহুদিদের জন্যও পুরাতন-পন্থী হইয়া গেল। খৃষ্টীয়বাদকে ইহুদিবাদের সহিত ধর্ম তথা রাষ্ট্রীয় সান্নিধ্য হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া অ-ইহুদি জাতিগোষ্ঠীর (Gentiles) জন্য উন্মুক্ত করার প্রয়োজন হইয়াছিল”।

যাহা হউক ম্যাথ্উ মনে হয় নিজের বিরোধীতা করিতেছেন যখন তিনি বলেন: ঈসা আসিয়া তাঁহাদিগকে বলিলেন:

“স্বর্গ ও পৃথিবীতে সকল কর্তৃত্ব আমাকে দেওয়া হইয়াছে। অতএব সমস্থ জাতির মধ্য হইতে শিষ্য গ্রহণ কর (এস্থলে ম্যাথউ তাঁহার পূর্বের, ‘ঈসাকে কেবলমাত্র ভ্রষ্ট ইসরাইলের জন্য প্রেরণ করা হইয়াছিল’, এই উক্তির স্ববিরোধীতা করিয়াছেন)। স্বর্গীয় পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মার নামে তাহাদের খৃষ্টধর্মে দীক্ষিত করিয়া আমি তোমাদিগকে যে সব নির্দেশ দিয়াছি, তাহাদেরকে তাহা পালন করিতে সব শিক্ষা দাও। এবং মনে রাখিও, আমার সময় শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি সর্বদাই তোমাদের সঙ্গে আছি”। (ম্যাথউ ২৮: ১৮-২০)

খেয়াল রাখিতে হইবে যে, ঈসার আদি উপদেশাবলী বিদ্যমান নাই, এবং বর্তমানে প্রচলিত বাইবেল মৌখিক ঐতিহ্যের ভিত্তিতে রচিত।

কোরানের বর্ণনা অনুযায়ী ঈসাকে বার্তাবাহক হিসাবে ইসরাইলের বংশধরদের জন্য প্রেরণ করা হইয়াছিল। তিনি যে গ্রন্থ আল্লাহর নিকট হইতে পাইয়াছিলেন তাহা ইনজীল (গসপেল)। তিনি ‘তোরাহ’ (আইন) কে স্বীকৃতি দিয়াছিলেন এবং তাঁহার পরে আহমদ নামে (মোহাম্মাদ এর অপর নাম) একজন বার্তাবাহক আসিবেন এই সুখবর আনিয়াছিলেন। একই গ্রন্থ সকল নবীকে দেওয়া হইয়াছিল, কোরানের এই বক্তব্য ইহাই বুঝায় যে, সকল নবীকে যে গ্রন্থ দেওয়া হইয়াছিল তাহাতে একই বিধান ছিল। অতএব ‘তোরাহ’ এবং ‘ইনজীলে’এ (গসপেল), আদিরূপে প্রকাশিত বিধানসমূহ, কোরানে সংরক্ষিত আছে, মানুষের অনধিকার হস্থক্ষেপ বর্জিত আল্লাহর বাণী হিসাবে। কোরান দৃঢ় ভাবে অস্বীকার করে যে, ঈসা আল্লাহর পুত্র।

নিম্নের উদ্ধৃতিসমূহ দুই প্রকারের গসপেল নির্দেশ করে: “বর্ণনামূলক” এবং “বাণীমূলক”। বর্ণনামূলক গসপেলের একটি প্রধান অসঙ্গতি এই যে, চারিটি গসপেলের মধ্যে কেবলমাত্র ম্যাথউ ও লিউকের গসপেলে ঈসার বক্তব্য ও শিক্ষনীয় বিষয়সমূহর কিছুটা আভাস পাওয়া যায়। ইহার এই বক্তব্য ও শিক্ষনীয় বিষয়সমূহই “বাণীমূলক গসপেল” হিসাবে উল্লখ করা হয়, যাহা বার্টন এল, ম্যাকের মতে “নিরুদ্দিষ্ট গসপেল”, প্রাথমিক পর্যায়ের খৃষ্টানগণ যাহা চর্চা করিতেন। পরে ইহার স্থান বর্ণনামূলক গসপেল অধিকার করিয়াছে।

“আধুনিক খৃষ্টানগণের মধ্যে যে পুরাণ কথা সর্বাধিক প্রচলিত তাহার বিকাশ হয় উত্তর সিরিয়ায় ও এশিয়া মাইনরে সংগঠিত বিভিন্ন দলের মধ্যে। সেখানে ঈসার মৃত্যু প্রথমে শহীদী মৃত্যু হিসাবে বর্ণিত হইয়াছিল, এবং পরে ক্রুশ-বিদ্ধ হওয়া ও পুনরুত্থানের অলৌকিক ঘটনা রূপে ভূষিত হয়। এই পুরাণ-কথা গ্রীক পৌরাণিক উপাখ্যানে বর্ণিত একটি স্বর্গীয় সত্তা (বা গড এর পুত্রে)র পরিণাম ব্যক্তকারী ঘটনা আশ্রয় করিয়া উদ্ভূত। এইরূপে এই ধরণের সমাবেশগুলি সকল সত্বরই ঈসার পুনরোত্থান বা রূপান্তরের ধর্মাচরণে পরিণত হয়, এবং এখন হইতে খৃষ্ট অথবা প্রভু ও গড এর পুত্র বলিয়াও ঈসাকে উল্লেখ করিতে লাগিল। পলের ৫০ অব্দের পত্র সমূহে অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে লিপিবদ্ধ খৃষ্টীয় ধর্মসামবেশগুলি, ঈসার শিক্ষাসমূহ হইতে লক্ষণীয়ভাবে দিক পরিবর্তন করিয়া মৃত ও পুনরুত্থিত খৃষ্টের আদর্শের দিকে আকৃষ্ট হইল। এই পুরাণকথাই বর্ণনামূলক গসপেলকে সম্ভাব্য করিয়াছিল”

“ঈসার প্রথম পর্যায়ের অনুসারীগণের ধারণায় আসে নাই, বা প্রয়োজন হয় নাই, যে তাঁহার শিক্ষা অনুযায়ী জীবন ধারণের প্রচেষ্টায় তাহাদিগকে এইরূপ পুরাণ-কথার আশ্রয় লইতে হইবে। বাণীমূলক গসপেল ঈসার অনুসারীগণের জন্য যথেষ্টই ছিল কারণ তাহারা ইহা বুঝিতে সক্ষম ছিল। বর্ণনামূলক গসপেল প্রবল হইয়া উঠার পরেও বাণীমূলক গসপেল সম্পূর্ণভাবে বিদ্যমান ছিল। তখনও ইহার অনুলিপি হইত এবং ক্রমবর্দ্ধমান ব্যক্তিগোষ্ঠী আগ্রহ সহকারে ইহা পাঠ করিত। পরিণামে বর্ণনামূলক গসপেলই খৃষ্টানদের কাঙ্খিত প্রতিকৃতি বর্ণনায় বিজয়ী হইল এবং বাণীমূলক গসপেল শেষপর্যন্ত খৃষ্টীয় চার্চের ঐতিহাসিক স্মৃতি হইতে বিলুপ্ত হইল। বর্ণনামূলক গসপেলের লেখকদ্বয় যদি বাণীমূলক গসপেলের বৃহৎ অংশ তাহাদের লিখিত ঈসার জীবন বৃত্তান্তে সন্নিবেশিত না করিতেন তাহা হইলে ঈসার প্রথম অনুসারীদের বাণীমূলক গসপেল বিভিন্ন পরিবর্তনের মধ্যে নিশ্চিহ্নভাবে হারাইয়া যাইত। খৃষ্টীয় চার্চের পূর্বে যে ঈসা ঘটিত আলোড়নের বিস্তার ঘটিয়াছিল তাহা আমরা জানিতেই পারিতাম না। কিন্তু ম্যাথউ এবং লিউক উভেয়েরই বাণীমূলক গসপেলের একটি অনুলিপি ছিল এবং তাঁহারা যে সমস্ত বিষয় ইহা হইতে নকল করিয়াছিলেন তাহা বহুলাংশেই একে অন্যকে আবৃত করিয়াছিল। এই দৈবক্রমিক যুগপৎ সঙ্ঘটনই বর্তমান কালে এই গ্রন্থের পুনরুদ্ধার সম্ভব করিয়াছে, যদিও বাণীগুলি এখন ঈসার শিক্ষামূলক নির্দেশের পরিবর্তে “গড’ এর পুত্রের ঘোষণার সামিল মনে হয়”।

ইহা ব্যতীত ১৯৪৬ সালে মিশরের উচ্চ এলাকার নাগ হামাদি অঞ্চলের নিকট গুপ্তভাবে রক্ষিত বারোটি হস্তলিপির কপটিক পুঁথি ও অংশাবশেষের আবিষ্কার হইতে বক্তব্যমূলক গসপেলের আরও প্রমাণ পাওয়া যায়। খৃষ্টীয় প্রায় ৪০০ অব্দের সংরক্ষিত এ সংকলনের মধ্যে প্রায় পঞ্চাশটি অংশ আছে। এই সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সংকলনের মধ্যে টমাসের লিখিত গসপেল আছে। ঈসার ঐতিহাসিক বিষয় সম্বন্ধে এই চমকপ্রদ গ্রন্থ হয়ত আমাদিগকে অনেক কিছু বলিতে পারে। ইহার আরম্ভেই এই শিরোনাম আছে “এইগুলি জীবিত ঈসার বাণী”। অতএব টমাসের গসপেল একটি বাণীমূলক গ্রন্থ অর্থাৎ ঈসার বাণীযুক্ত গসপেল, কোন বিশেষ বর্ণনামূলক প্রসঙ্গ ব্যতিরেকেই । বস্তুতঃ ইহাতে ক্রুশ সম্বন্ধে একটিই উক্তি আছে এবং তাহা একটি প্রবাদ বাক্যের ভিত্তিতে, “তোমাকে ক্রুশ বহন করিতে হইবে”, অর্থাৎ তোমাকে তোমার ভার বহন করিতে হইবে। অধিকন্তু এই গ্রন্থে কোনও রূপ পুনরুত্থানের উল্লেখও নাই। এই পাণ্ডলিপি গুলি রক্ষণশীল খৃষ্টীয়বাদের বিরুদ্ধে একটি দ্বন্দমূলক প্রতিঘাত, এবং মিশরের কপটিক যাদুঘরে তালাবদ্ধ অবস্থায় সংরক্ষিত আছে। “ঈসার জীবন” সংক্রান্ত একটি সাম্প্রতিক টেলিভিশন প্রচারে মার্ক টুলি এই সংগুপ্ত গসপেলের তাৎপর্য সম্বন্ধে এই বিষয়ের কিছু কিছু বিশেষজ্ঞের সঙ্গে আলোচনা করিয়াছেন। টমাস লিখিত গসপেল ঈসার উক্তি হিসাবে গণ্য ১১৪টি বাণীর একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকলন।

ঈসার নীতিবচন সমূহে বর্ণিত তাঁহার মূল শিক্ষা হইতে খৃষ্টীয়বাদকে বিকৃত করার জন্য পলই সম্পূর্ণরূপে দায়ী। ইসলাম সম্বন্ধেও অনুরূপ তুলনা করা যায়। বুখারী ও মুসলিমের লিখন সমূহের ভিত্তিতেই, বর্তমানে প্রচলিত ইসলামের বহু বিধান পরিচালিত হয়, যাহা কোরানের প্রকৃত শিক্ষাকে বিকৃত করে। একমাত্র পার্থক্য এই যে, কোরান আদিরূপে অবিকৃত ভাবেই বর্তমান, কিন্তু বাইবেলের ভিত্তি ঠিক বুখারী, মুসলিম ও অন্যান্য অনেকের লিখিত বস্তুর ন্যায় মৌখিক ঐতিহ্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। মানবসমাজ যে আজ এত ধারায় বিভক্ত তাহার প্রধান কারণ হইতেছে পল, বুখারী, মুসলিম প্রভৃতির লিখনসমূহ; ইহারা নবীগণ প্রচারিত মূল জীবন-আদর্শসমূহ অগ্রাহ্য করিয়াছেন। পরিবর্তে ইঁহারা তাহাদের লিখিত বস্তু দীর্ঘকালের ব্যবধানে সংগ্রীহিত মৌখিক ঐতিহ্যের ভিত্তিতে রচনা করিয়াছেন।

পরিশেষে ইহা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, বর্তমানে বিদ্যমান ওল্ড ও নিউ টেষ্টামেন্ট আদি প্রত্যাদেশ-লব্ধ গ্রন্থ সমূহ নহে। কোরানের বহু আয়াতের এই উক্তির সত্যতা প্রতিপন্ন করিবার উদ্দেশ্যে ওল্ড ও নিউ টেষ্টামেন্ট বর্ণিত বহু অসঙ্গতির মধ্যে কতকগুলি এই পরিচ্ছেদে উদাহরণ স্বরূপ দেওয়া হইয়াছে।

মানুষের হস্তক্ষেপ বর্জিত আল্লাহর বাণী বলিয়া কোরান এই সকল অসঙ্গতি হইতে মুক্ত এবং ইহাতে যে বাণী আছে তাহা পূর্ববর্তী সকল নবীদেরকেই দেওয়া হইয়াছিল। মোহাম্মাদকে স্মরণ করাইয়া কোরান স্পষ্টরূপে ব্যক্ত করে যে, তাঁহাকে এমন কিছুই দেওয়া হয় নাই যাহা পূর্বে দেওয়া হয় নাই (৪১:৪৩)। পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহ আদিরূপে বর্তমান না থাকাই কোরান অবতীর্ণ হওয়ার মূল কারণ। বহু ঘটনার বর্ণনায় কোরান এবং বাইবেলের বিভিন্ন অংশের অফুরন্ত তুলনা করা যায়; আপাত দৃষ্টিতে তাহাদের মধ্যে সাদৃশ্য থাকিলেও পার্থক্য বিরাট, তাহার একমাত্র কারণ বাইবেল গ্রন্থে মানুষের হস্তক্ষেপের প্রভাব।

References: (প্রসঙ্গ সূত্র)
১. Making the Christian Bible by John Barton. Published by
Darton, Longman and Todd, Ltd. Spencer Court,
140-142 Wandsworth High Street, London SW18 4JJ
২. All Biblical quotations are from “The Holy Bible”: Revised
Standard Version. 1952.
৩.The Bible The Our’ an and Science, by Dr. Maurice Bucaille.
Publisher Seghers, 6 Place Saint-Sulpice 75006 Paris, p. 67, 68.
৪.The Lost Gospel (The Book of Q and Christian Origins), by
Burton L. Mack. Published in Great Britain by Elements Book
Ltd. Longmead, Shaftesbury, Dorset. p. 2.
৫. Ibid,. p. 3.
৬.The Lives of Jesus, A BBC television series presented in
December 1996 by Mark Tully. This paragraph is a selection
from the last programme of that series.





Home Next >>