পরিশিষ্ঠ



পরিশিষ্ট ১ (ক)

জিবরাইল (Gabriel) “ইহা হিব্রু শব্দ। কোরানে এই শব্দ তিনবার ব্যবহৃত হইয়াছে–(২:৯৭,৯৮) এবং (৬৬:৮)। যে স্বর্গীয় শক্তি নবী মোহাম্মাদের এর নিকট পবিত্র কোরান লইয়া আসিয়াছিল (২:৯৭) ইহা তাহা নির্দেশ করে। ইহাকে ‘পবিত্র আত্মা’ (রূহুল কুদ্দুস) (১৬:১০২) এবং ‘সত্য আত্মা’ (রূহুল আমিন) (২৬:১৯৩) ও বলা হয়। নবীরা ব্যতীত আমরা এই স্বর্গীয় শক্তি সম্বন্ধে কিছুই হৃদয়ঙ্গম বা কল্পনা করিতে পারি না। এই শক্তিই নির্দেশ অনুযায়ী, কোন সংযোগ, সংমিশ্রণ বা পরিবর্তন ব্যতীতই, প্রত্যাদেশসমূহ বহন করিয়া আনিত”।

পরিশিষ্ট ২ (ক২)

মালাইকা (Angel): কোরান (২২:৭৫) আয়াতে, সংবাদবাহক অর্থে মালাইকা শব্দও ব্যবহার করিয়াছে। ইহা অবশ্য ইহার করণীয় ও কর্তব্যের একটি দিক। ইহা ব্যতীত ইহারা নির্দেশ অনুসারে বিষয়াদি পরিচালনা করি (৭৫:৫), ঘটনাসমূহ নিয়ন্ত্রণ করে এবং আদেশ অনুসারে বিভিন্নভাবে বিস্তৃত হয় (৫১:৪)। এই শক্তিসমূহকে কোন নিজস্ব ইচ্ছা, স্বাধীন শক্তি বা ইচ্ছা অনুযায়ী কোন কিছু করিবার ক্ষমতা বা বিবেচনা শক্তি দেওয়া হয় নাই। তাহারা আল্লাহর নির্দেশমত প্রদত্ত কাজ/দায়িত্ব পালন করে”।

পরিশিষ্ট ৩ (ক২)

ইবলিস অথবা শয়তান (Devil) : “কোরান ‘ইবলিস’ অথবা ‘শয়তান’কে একই মুদ্রার দুই পিঠ রূপে আখ্যায়িত করে। আদমের কাহিনী বর্ণনা কালে, নত হইতে অস্বীকৃতি, তারপর বিদ্রোহ, অবাধ্যতা এবং পরিশেষে মানবজাতিকে বিপথগামী করিবার আহবান, এ সমস্তই আরোপিত হয় ‘ইবলিসের’ উপর, আর যখন আদমের পতনের কাহিনী বর্ণীত হয়, তখন ইহা ‘শয়তানের’ উপর আরোপিত হয় (২:৩৬:, ৭:১১-২০), ২০:১১৬-১২০)। ইহা হইতে বুঝিতে পারা যায় যে ‘ইবলিস’ শব্দ একটি বিশেষ ব্যক্তিত্ব-লক্ষণ বুঝাইতে ব্যবহৃত হয়, এবং এই লক্ষণ যেরূপে ক্রিয়া করে তাহাকে বলা হয় ‘শয়তান’। ইবলিস এবং শয়তান অথবা নৈরাশ্য এবং বিদ্রোহ প্রকৃতপক্ষে বিভিন্ন ধরণের প্রতিবন্ধক, যাহা মানুষের নিজ সত্ত্বার (নাফস) উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করে”।

পরিশিষ্ট ৪ (ক৪)

রাকাত: রাকাত দেহের কতকগুলি নির্দ্ধারিত অবস্থান, যেমন দাড়ান হইতে নত (রুকু), এবং নত (রুকু) হইতে প্রণিপাথ (সেজদা)। প্রার্থনা (নামাজ) ৪ রাকাত হইলে, দুই রাকাতের পরে বসিতে হইবে। ইহার পর আবার দাড়াইতে হইবে এবং আরও দুই রাকাত সম্পূর্ণ করিয়া বসিতে হইবে।

পরিশিষ্ট ৫ (ক৫)

‘রহমান’ ও ‘রহীম’ শব্দদ্বয়ের উৎপত্তি একই মূল শব্দ (রা-হা-মীম) হইতে। ‘রহমাত’ শব্দর উৎপত্তিও ঐ একই মূল হইতে এবং ইহার অর্থ ব্যক্তি বা বস্তুর প্রয়োজন অনুসারে পুষ্টি (ব্যক্ত বা গুপ্তভাবে), যোগান। উদাহরণ স্বরূপ, ‘রেহাম’ শব্দ, যাহার মুল একই, ও অর্থ মায়ের জরায়ু এবং যেখানে গর্ভস্থ সন্তান কোন পরিশ্রম না করিয়া তাহার পুষ্টি পায়। কোরান আরও বলে যে আমাদের উন্নয়ন আমাদের কর্মের উপর নির্ভর করে এবং সফলতার জন্য যথার্থ চেষ্টার দ্বারা তাহা সাধন করিতে হইবে, শুধু আল্লাহর অনুগ্রহের উপর নির্ভর করিলে চলিবে না। ‘রহমান’ ও ‘রহীম’ শব্দদ্বয়ের শব্দমূলের, এই ভূমিকার পরে, এই দুই শব্দের প্রকৃত অর্থ বুঝিবার জন্য যে সমস্ত আয়াতে আল্লাহর এই দুই অতি গুরুত্বপূর্ণ গুণ ব্যবহৃত হইয়াছে, আমরা তাহা পর্যবেক্ষণ করিতে পারি।

আল্লাহর গুণ অর্থে এবং ইহার সহিত অন্য কোন গুণের সংযোগ না করিয়াই ‘রহমান’ শব্দ কোরানে ৫৫ বার ব্যবহৃত হইয়াছে। কিন্তু ‘রহীম’ শব্দের ব্যবহার ১২০ বার পাওয়া যায়, এবং প্রধানতঃ তাহা ‘গফুর’ (ক্ষমাশীল) এবং কিছু ক্ষেত্রে ‘তাওয়াবুর’ (দয়ার্দ্র) এই দুই গুণের সংযোগে। ‘রহমান’ ও ‘রহীম’ একত্রে ছয় বার পাওয়া যায়, যাহাতে সূরা ‘ফাতিহা’ ব্যতীত অন্যান্য সূরার প্রারম্ভের ‘রহমান’ ও ‘রহীম’ ধরা হয় নাই।

‘রহীম’ শব্দের সহিত ‘গফুরের’ (ক্ষমাশীল) অথবা ‘তাওয়াবুরের’ (দয়ালু) সংযোগ হইতে ইহার উপলব্ধি হয় যে এইরূপ অনুকম্পা পাওয়ার যোগ্যতা আমাদের কর্মের উপর নির্ভর করে। অর্থাৎ যদিও আল্লাহ্ আমাদের কর্মের মধ্যে ভুলের জন্য ক্ষমা করিতে প্রস্তুত, তবুও আমাদের উন্নয়ন আমাদের কর্মের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয়। ফলে মঙ্গলজনক কর্ম র্বতীত কেবলমাত্র আল্লাহর করুণা প্রার্থনার মাধ্যমে প্রকৃত কোন ফললাভ হইতে পারে না।

অপরপক্ষে ‘রহমান’ শব্দ সর্বক্ষেত্রেই অন্য কোন গুণের সংযুক্ত না হইয়াই উল্লিখিত। ফলে এই গুণ স্পষ্টতঃ পুষ্টি অথবা জীবন রক্ষার অর্থের সহিত জড়িত। অর্থাৎ আমরা ভাল কাজ করি অথবা না করি, আল্লাহ্ আমাদের সকলকেই এই সকল উপকার দান করেন, যাহার ফলে আমাদের জীবন ধারণ সম্ভব। উদাহরণ স্বরূপ: তিনি আমাদের পানি, বাতাস, সূর্যের আলো ও উত্তাপ অবাধে দিয়াছেন, যাহা ব্যতীত জীবন ধারণ অসম্ভব।

যে সমস্ত আয়াতে এই দুই শব্দ পাওয়া যায় তাহার নির্দেশ নিম্নে দেওয়া হইল।

রহমান (উপকারী): (২:১৬৩:, (১৩:৩০), (১৭:১১০), (১৯:১৮:, ২৬, ৪৪, ৪৫, ৫৮, ৬১, ৬৯, ৭৫, ৭৮, ৮৫, ৮৮, ৯১, ৯২, ৯৩, ৯৬), (২০:৫, ৯০, ১০৮, ১০৯), (২১:২৬, ৩৬, ৪২, ১১২), (২৫:২৬, ৫৯,৬০,৬৩), (২৬:৫), (২৭:৩০), (৩৬:১১, ১৫, ২৩, ৫২), (৪১:২), (৪৩:১৭,১৯, ২০, ৩৩, ৩৬, ৪৫, ৮১), (৫০:৩৩), (৫৫:১), (৫৯:২২), (৬৭:৩,১৯,২০,২৯), (৭৮:৩৭,৩৮).

রহীম (করুণাময়) : (২:৩৭, ৫৪, ১২৮, ১৪৩, ১৬০, ১৬৩, ১৭৩, ১৮২, ১৯২, ১৯৯, ২১৮, ২২৬), (৩:৩১, ৮৯, ১২৯), (৪:১৬, ২৩, ২৫, ২৯, ৬৪, ৯৬, ১০০, ১০৬, ১১০, ১২৯, ১৫২), (৫:৩, ৩৪, ৩৯, ৭৪), (৫:৯৮), (৬:৫৪, ১৪৫, ১৬৫), (৭:১৫১, ১৫৩, ১৬৭), (৮:৬৯), ৭০), (৯:৫, ২৭, ৯১, ৯৯, ১০২, ১০৪, ১১৭, ১১৮, ১২৮), (১০:১০৭), (১১:৪১, ৯০), (১২:৫৩, ৬৪, ৯২, ৯৮), (১৪:৩৬), (১৫:৪৯), (১৬:৭, ১৮, ৪৭, ১১০, ১১৫, ১১৯), (১৭:৬৬), (২১:৮৩), (২২:৬৫), (২৪:৫, ২০, ২২, ৩৩, ৬২), (২৫:৬, ৭০), (২৬:৯, ৬৮, ১০৪, ১২২, ১৪০, ১৫৯, ১৭৫, ১৯১, ২১৭), (২৭:১১, ৩০), (২৮:১৬), (৩০:৫), (৩২:৬), (৩৩:৫, ২৪, ৪৩, ৫০, ৫৯, ৭৩), (৩৪:২), (৩৬:৫, ৫৮), (৩৯:৫৩), (৪১:২, ৩২), (৪২:৫), (৪৪:৪২), (৪৬:৮), (৪৮:১৪), (৪৯:৫, ১২, ১৪), (৫২:২৮), (৫৭:৯,২৮), (৫৮:২, ১২), (৫৯:১০, ২২), (৬০:৭, ১২), (৬৪:১৪), (৬৬:১), (৭৩:২০).
রহমান ও রহীম: (১:১), (১:৩), (২:১৬৩), (২৭:৩০), (৪১:২), (৫৯:২২)

পরিশিষ্ট ৬ (ক৬)

কোরান অনুসারে আরবী শব্দদ্বয় ‘উম্মি’ ও ‘উম্মিয়ুন’ এর ভাবার্থ।

নিম্নে পরিচ্ছেদ ডাঃ আলাউদ্দিন শাহবাজের “Truth or Consequences” এর ৩য় অধ্যায়ের উপর ভিত্তি করিয়া লিখিত হইয়াছে। বহু মুসলিম এবং পশ্চিম বাসিদের বিশ্বাস যে নবী নিরক্ষর ছিলেন এবং ইহার সমর্থনে ৭:১৫৭ আয়াত প্রায়ই উল্লেখ করা হয়।

(৭:১৫৭) যাহারা বার্তাবাহককে অনুসরণ করে, যে নবী লিখিতে ও পড়িতে পারে না (উম্মি) [...]

অথচ অন্যান্য প্রাসঙ্গিক আয়াত আলোচনা করিলে দেখা যায় যে কোরান এই শব্দ (উম্মি) ভিন্ন অর্থে ব্যবহার করিয়াছে, কাজেই এই সমস্ত আয়াতের আলোচনা না করিয়া উম্মি শব্দের অনুবাদে বুঝায় এমন এক ব্যক্তি, যিনি লিখিতে ও পড়িতে পারেন না, এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা অনুচিত।

(৬২:২) তিনি তাহাদের অন্তর্গত নিরক্ষণগণের (উম্মিয়ুন) মধ্য হইতে এক বার্তাবাহক পাঠাইয়াছেন, যিনি তাহাদের নিকট তাহার নিদর্শনাবলী পাঠ করিবেন, যাহাতে তাহারা উন্নত হয়, এবং তাহাদিগকে ধর্মগ্রন্থ ও জ্ঞানে শিক্ষা দিবেন, যেহেতু ইহার পূর্বে তাহারা বিপদগামী ছিল।

এই আয়াত হইতে দেখা যায় যে নিরক্ষরগণের (উম্মিয়ুন) মধ্য হইতে নবীকে প্রেরণ করা হইয়াছিল [...]। উম্মিয়ুন শব্দ ঐ সময়ে মক্কায় সকল অধিবাসীকে ইঙ্গিত করে। অতএব আক্ষরিক অনুবাদ করিলে সমস্ত আরব বাসীকেই নিরক্ষর বলিতে হয়। অথচ উম্মি শব্দের অর্থ ‘নিরক্ষর’ মানিয়া লইলেও, আমরা সুনিশ্চিত ভাবে বলিতে পারি না যে সমস্ত আরববাসী নিরক্ষর ছিল কারণ আমরা নিশ্চিতভাবে জ্ঞাত যে কোরান লিপিকারের উল্লেখ করিয়াছে যাহারা লিখিতে ও পড়িতে পারিত। কিন্তু লোকেরা বিপথগামী ছিল যেহেতু তাহারা তখনও প্রত্যাদেশ প্রাপ্ত হয় নাই যাহা তাহাদের জীবন ধারণের পথে আল্লাহর নিদর্শন। আর ব্যাখ্যার জন্য ৩:২০ আয়াত দ্রষ্টব্য।

(৩:২০) এবং যদি তাহারা তোমার সহিত বির্তক করে তবে তুমি বল — আমি আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করিয়াছি এবং আমার অনুসারীগণও সেইরূপ করিয়াছে। এবং যাহাদিগকে গ্রন্থ প্রদান করা হইয়াছে (অর্থাৎ ইহুদী ও খৃষ্টানগণ) এবং যাহারা নিরক্ষর (অর্থাৎ আরবগণ) তাহাদিগকে বল—তোমরাও কি আত্মসমর্পণ করিয়াছে? যদি তাহারা আত্মসমর্পণ করে, তবে নিশ্চয় সুপথ পাইবে: এবং যদি তাহারা প্রত্যাখ্যান করে, তবে তোমরা কর্তব্য কেবলমাত্র প্রত্যাদেশ প্রচার করা; এবং আল্লাহ্ তাঁহার বান্দাদের (অন্তরের) প্রতি দৃষ্টিবান।

এই আয়াতে কোরান ‘উম্মি’ ও ‘উম্মিয়ুন’ শব্রেদ ব্যবহারিক নির্দেশ প্রকাশ করিতেছে। এখনে কোরান ইহুদী ও খৃষ্টান, যাহারা পূর্বে প্রত্যাদেশ প্রাপ্ত হইয়াছে, এবং আরবদের, যাহাদের উম্মিয়ুন বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে, এই দুই অধিবাসীদের মধ্যে পার্থক্য করিতেছে। এখানে নবী, যিনি ইতিমধ্যে প্রত্যাদেশ প্রাপ্ত হইয়াছেন, ইহুদী ও খৃষ্টান সহ সকলকে আল্লাহর নির্দেশ অনুসরণ করিতে বলিতেছেন। তাঁহার কাজ প্রচার করা, মানুষ আল্লাহর নির্দেশ গ্রহণ করিল কি না করিল তাহার জন্য আল্লাহ্ তাহার বান্দাদের প্রতি দৃষ্টিবান।

এইবার ২:৭৮, ৭৯ পরীক্ষা করা যাউক।

(২;৭৮,৭৯) এবং তাহাদের মধ্যে অনেক নিরক্ষর (উম্মি) লোক আছে, যাহাদের ধর্মীয় গ্রন্থের কোন জ্ঞান নাই এবং কেবল অমূলক ধারণা-বিশ্বাস দ্বারা তাহারা পরিচালিত হয়। সুতরাং দুর্ভোগ তাহাদের জন্য যাহারা স্বহস্তে পুস্তক রচনা করে, এবং বলে যে, ইহা আল্লাহর নিকট হইতে আসিয়াছে। ইহা দ্বারা তাহারা সামান্য লাভ করিতেছে। বস্তুতঃ তাহাদের হাতের এই রচনা তাহাদের দুর্ভোগের কারণ এবং ইহার সাহায্যে তাহারা যাহা কিছু উপার্জন করে তাহা তাহাদের দুর্ভোগ আনিবে।

উপরোক্ত আয়াতদুইটিতে আমরা দেখি যে মুসার সময় কতক ইহুদীদিগকেও উম্মিয়ুন বলা হইত কারণ তাহাদের ধর্মীয় গ্রন্থের কোন জ্ঞান ছিল না। যদিও এই আয়াতগুলিতে ইহুদীদিগের সরাসরী উল্লেখ নাই, তথাপি ইহা যে তাহাদের সম্পর্কে ইঙ্গিত দেয় তাহা ইহার পূর্বের কিছু আয়াত দেখিলেই উপলব্ধি হইবে। উপরন্তু, এই সকল ব্যক্তিরাই তাহাদের জ্ঞানের ছল করিত এবং আল্লাহ্ তাহাদের নিজ হাতে ধর্মীয় গ্রন্থ রচনায় অভিযুক্ত করেন। সুতরাং গতানুতিক অর্থে তাহাদের কোনক্রমেই নিরক্ষর বা অশিক্ষিত বলা যায় না, তবে ধর্মীয় অর্থে তাহারা নিরক্ষর, কারণ তাহাদের ধর্মীয় জ্ঞান ছিল না এবং সেইহেতু আল্লাহর নির্দেশ বিষয়ে তাহারা ছিল অজ্ঞ। সুতরাং ‘উম্মি’ এবং ‘উম্মিয়ুন’ এর প্রকৃত অর্থ এই দুই আয়াত নিশ্চিত করিয়াছে, অর্থাৎ ‘উম্মি’ হইতেছে যাহারা ‘ধর্মীয় জ্ঞানে অজ্ঞ’ এবং ‘উম্মিয়ুন’ হইতেছে যে সব অধিবাসীদের ধর্মীয় জ্ঞান নাই।

নিম্নের দুইটি আয়াতে বলা হইতেছে যে প্রত্যাদেশ পাইবার পূর্বে নবীর কোন ধর্মীয় জ্ঞান ছিল না (অতএব উম্মি), এবং আল্লাহ্ তাঁহাকে এই জ্ঞানে সুনিশ্চিত করিবেন।

(২৯:৪৮) এবং ইহার পূর্বে (ও মোহাম্মাদ) তুমিতো কোন ধর্মীয় গ্রন্থ পাঠ কর নাই এবং তোমার স্বহস্তে কোন ধর্মীয় গ্রন্থ লিপিবদ্ধ কর নাই যে মিথ্যাভাষীরা সন্দেহ পোষণ করিবে।

কোরানের এই আয়াত সুস্পষ্ট ভাবে ব্যক্ত করে যে নবী প্রত্যাদেশ পাইবার পূর্বে কোন ধর্মগ্রন্থ পাঠ করেন নাই অথবা সে বিষয়ে কিছু লিখেন নাই, অতএব তিনি ধর্মীয় বিষয়ে উম্মি (অজ্ঞ) ছিলেন, গতানুগতিক অর্থে উম্মি শব্দ দ্বারা যাহা বুঝায় তাহা নহে।

(৮৭:৬) নিশ্চয় আমি তোমাকে পাঠ করাইব, ফলে তুমি বিস্মৃত হইবেনা।

এই আয়াত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যেহেতু আল্লাহ্ নবীকে প্রত্যাদেশ দ্বারা ধর্মীয় জ্ঞান দিবার ভার নিজের উপর লইয়াছেন। এখানে গতানুগতিক ভাবে ‘পাঠ’ বুঝায় না। নবী প্রত্যাদেশ পাইয়া তাহা সাধারণের নিকট প্রচার করিবেন। এবং সেইহেতু আল্লাহ্ বলিতেছেন যে নবী এই প্রত্যাদেশ ভুলিয়া যাইবেন না।

সুতরাং কোরানে যথেষ্ট প্রমাণ আছে যে ‘উম্মি’ শব্দের অর্থ ‘ধর্মীয় বিষয়ে জ্ঞানে অভাব’। নবীকে কোরানে ‘উম্মি’ বলা হইয়াছে কারণ প্রত্যাদেশ পাইবার পূর্বে ধর্মীয় বিষয়ে তিনি কোন শিক্ষা পান নাই। অনরূপ ভাবে আরবদের ‘উম্মিয়ুন’ বলা হইয়াছে কারণ কোরানের পূর্বে কোন প্রত্যাদেশ আরবরা প্রাপ্ত হয় নাই, এবং ফলে আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী জীবন যাপন করিতে তাহারা অজ্ঞ ছিল। অর্থাৎ নবী ও আরবরা ধর্মীয় জ্ঞানে অজ্ঞ ছিল, কিন্তু সাধারণ অর্থে অশিক্ষিত বা নিরক্ষর ছিলেন না।

নবীদের আমাদের মধ্যে এখন আর বর্তমান নাই, কিন্তু আল্লাহর প্রত্যাদেশ হিসাবে কোরান বর্তমান ও সমুজ্জ্বল। কিন্তু আমরা যদি কোরানের নির্দেশ পালন করিবার জন্য কোরান পাঠে নিজেদের উৎসর্গ না করি তাহা হইলে কোরানের নির্দেশের অজ্ঞতার জন্য আমাদেরকেও ‘উম্মি’ বলা যাইবে। কোরানের নির্দেশ না বুঝিয়া কেবল মাত্র কোরান আবৃত্তি করিলে আল্লাহর নির্দেশ সম্বন্ধে আমরাও অজ্ঞ থাকিব এবং সেই অনুসারে জীবন যাপন করিতে পারিব না।

সুতরাং ‘উম্মি’ শব্দ ‘ধর্মীয় জ্ঞানের অভাব’ ইঙ্গিত করে, এই সিদ্ধান্তে আসিতে হয়। সাধারণ অর্থে ‘নিরক্ষর’ বা ‘অশিক্ষিত’ বলিতে যাহা বুঝায়, কোরান সে বিষয়ে উদ্বিগ্ন নহে।

References: (প্রসঙ্গ সূত্র)

Exposition of the Qur’an, by Gulam Ahmed Parwez
Tolu-E-Islam Trust (Regd) 25B Gulberg, Lahore-11, Pakistan.
p. 11.

Truth or consequences, by Dr. Alauddin Shabaz.
Chapter 3, pages 31-34. Publisher: New Mind Productions, Inc.
P.O. Box 5185, Jersey City, NJ 07305.





Home