১. ভূমিকা



‘কোরান’ শব্দের অর্থ হইতেছে “পাঠ”, এবং এই গ্রন্থ সমগ্র মানবজাতির জন্য সঠিক পথ-প্রদর্শনের একটি বিশ্ব-গ্রন্থ বলিয়া দাবি রাখে। কোরানে আছে ১১৪টি অধ্যায় (সূরা)। প্রত্যেক অধ্যায় কতকগুলি শ্লোকে (আয়াত) বিভক্ত। প্রথম সূরায় আছে সাতটি আয়াত এবং এই সূরা কোরানের চাবি-কাঠি স্বরূপ। দ্বিতীয় সূরাই দীর্ঘতম। ইহাতে আছে ২৮৬ টি আয়াত, এবং ইহাকে কোরানের সার-মর্ম বলা যাইতে পারে। ‘ধর্ম’ শব্দের প্রচলিত অর্থে কোরান কোন ধর্ম পুস্তক নয়। ইহা মনুষ্যকুলকে নির্দেশ দানকারী একটি “প্রকৃতির” গ্রন্থ, যাহাতে কেবল অন্যান্য মনুষ্যগণই নয়, সমগ্র প্রাকৃতিক জগতের সহিত সমতা ও ঐক্য সহকারে সর্বাপেক্ষা স্বল্প সংঘাতের মাধ্যমে আমরা এই পৃথিবীতে বসবাস করিতে পারি।

কোরান আল্লাহর প্রত্যাদেশ রূপে ফিরিশতা জিবরাইল ক১ এর মাধ্যমে নবী মোহাম্মদ (আঃ) এর নিকট অবতীর্ণ হইয়াছিল। ইহা রাসূলের নির্দেশে তাঁহার জীবিতকালে, কোনরূপ পরিবর্তন ব্যতিরেকে গ্রন্থকারে লিপিবদ্ধ ও সংকলিত হইয়াছিল, এবং এই গ্রন্থ (আল-কিতাব) কালের বিধান এড়াইয়া সেইরূপ অবিকৃত রহিয়াছে। পৃথিবীতে আর কোন গ্রন্থ নাই যাহা এই দাবী করিতে পারে। তদব্যতীত রাসূলের জীবন কালের মধ্যেই কোরান বহু ব্যক্তির দ্বারা কণ্ঠস্থও হইয়াছিল এবং তাহা কোরানের পক্ষে একটি অতিরিক্ত রক্ষাকবচ হিসাবে কাজ করিয়াছে।

কোরান সুস্পষ্টরূপে দাবী করে যে ইহা আল্লাহর বাণী, রাসূলের নহে। কোরানের পরিপ্রেক্ষিতে রাসূলের অবস্থান হইতেছে যে, প্রত্যাদেশ দ্বারা অনুপ্রাণিত হইয়াই রাসূল কর্তৃক আল্লাহর বাণী উচ্চারিত হইয়াছিল। সূতরাং, কার্যতঃ কোরান রাসূলের কণ্ঠ-নিঃসৃত বিবৃতি বলিতে পারা যায়। অতএব কেবলমাত্র এইক্ষেত্রেই আল্লাহর বাণী ও রাসূলের মুখ-নিঃসৃত বিবৃতি এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য করিতে পারা যায় না, এই দুইই এক ও অভিন্ন। সেইজন্য আল্লাহতায়ালা কোরানে বলিতেছেন, কোরান অনুসরণ করিতে ও কোরানের শিক্ষা অভ্যাস করিতে, “রাসূলকে অনুসরণ কর”। কিন্তু, কোরান সতর্ক করিয়া দিতেছে যে, রাসূল যদি নিজ বক্তব্য হিসাবে নিজ হইতে কিছু বলিতেন এবং তাহা কোরানে অন্তর্ভূক্ত করিতেন, তাহা হইলে তাঁহাকে কঠোর শাস্তি প্রদান করা হইত এবং কেহই তাহাকে রক্ষা করিতে পারিত না। সুতরাং আমাদের পরিষ্কার রূপে বুঝিতে হইবে, রাসূলকে অনুসরণ করার যে নির্দেশ কোরানে দেওয়া হইয়াছে ইহার অর্থ হইতেছে তাঁহাকে অনুপ্রাণিত অবস্থায় যে প্রত্যাদেশ দেওয়া হইয়াছিল তাহাই অনুসরণ করা। ইহার অর্থ এই নহে যে, প্রধানতঃ লোক পরম্পরায় মৌখিকভাবে সংগৃহীত এবং প্রায় ২৫০ বৎসর পরে রাসূলের কথা ও কাজ হিসাবে যাহা লিখিত হইয়াছিল, তাহা অনুসরণ করা। এই সাহিত্য, যাহা হাদিস রূপে পরিচিত, কোরানের বক্তব্যের সহিত অসংগতিতে পূর্ণ আর ইহাই যথেষ্ট প্রমান যে এইগুলির সহিত রাসুলের কোন সর্ম্পক নাই। এই বক্তব্য প্রমাণ করিতে কোরানের সহিত হাদিসের কয়েকটি প্রধান অসংগতির উদাহরণ এই পুস্তকের একটি পৃথক অধ্যায়ে বর্ণনা করা হইয়াছে। উপরন্তু, যদি রাসূল তাঁহার নিজ বক্তব্যের বিষয়ে এতই উদগ্রীব হইতেন তাহা হইলে তিনি তাঁহার জীবিতাবস্থায় ইহা লিপিবদ্ধ করাইতেন, অথবা তাঁহার সাহাবিগণ ইহা করিতেন, কারণ তাঁহারা রাসূলের অভিপ্রায় সম্বন্ধে নিশ্চয় সচেতন ছিলেন।

কোরানের ঘোষণা অনুযায়ী, যাহারা কোরানে প্রদত্ত নির্দেশাবলী অনুসরণ ও কার্যকর করে তাহাদিগকে বলা হইবে “মুসলিম”, ইহার অর্থ হইল কোরানে প্রদত্ত আল্লাহর ইচ্ছার প্রতি যাহারা আত্মসমর্পণ করে। তাহাদের জীবন-ধারাকে বলা হয় “ইসলাম” অথবা শান্তি’, অর্থাৎ পৃথিবীর মানুষ ও পরিবেশের সহিত সম্পূর্ণ সমতা রক্ষা করিয়া চলা। অতএব “ইসলাম” ও “মুসলিম” শব্দ সমূহের কোন সাম্প্রদায়িক অন্তর্নিহিত অর্থ নাই এবং ইহাদের ভাবার্থ সকল সময়ই বিশ্বজনীন। কোরান সুষ্পষ্টরূপে বর্ণনা করে যে ইসলাম ও মুসলিম নামসমূহের উৎপত্তি হযরত ইবরাহীম (আ:) এর সময় হইতে, যাঁহাকে “মানবসমাজের নেতা” আখ্যা দেওয়া হইয়াছে। কোরানে আরও অনেক নবীদের নাম উল্লিখিত হইয়াছে, মূসা (আ:) ও ঈসা (আ:) সহ, যাঁহারা ইবরাহীম (আ:) এর পরে আসিয়াছিলেন, এবং শেষ নবীর নাম বলা হইয়াছে মোহাম্মদ (আ:)। যেহেতু মোহাম্মদ (আ:) এর পরে আর কোন নবীর আবির্ভাব হইবে না, তাঁহাকে “নবীদের সীলমোহর” ও বলা হয়।

আল্লাহ যে বিশ্বজনীন বার্তা প্রদান করিয়াছেন তাহা হইতেছে কোরান, এবং বিশ্বাসীদের উচিত এই বার্তা, অর্থাৎ কোরান, অন্যদেরকে অবহিত করা (৩:১৮৭)। কোরান অবশ্য বলে যে কোরানের নির্দেশ কার্যকরী করায় কোন বাধ্যবাধকতা নাই, এবং কোরানের বার্তা গ্রহন করা বা বর্জন করা অবশ্যই স্বাধীন ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। তাই কোরান মানুষকে দুইটি শ্রেণীতে বিভব্ত করিয়াছে : (ক) “বিশ্বাসী” (মুমিন) যাহারা কোরানের নির্দেশাবলী অনুসরণ করে এবং (খ) “অবিশ্বাসী” (কাফির)। শেষোক্ত শ্রেণী কোরান আল্লাহর বাণী বলিয়া বিশ্বাস করে না এবং সেইহেতু তাহারা ইহার নির্দেশসমূহ অনুসরণ করে না। তথাপি ইহার অর্থ এই নহে যে শেষোক্ত শ্রেণীকে বাতিল করা হইয়াছে, কারণ বিশ্বাসী হইবার দরজা সর্বদাই উন্মুক্ত রাখা হইয়াছে। সেইজন্য ‘কাফির’ একটি অবমাননা জনক শব্দ নহে।

কোরান সুদৃঢ়রূপে আরও দাবী করে যে নবী মোহাম্মদ (আঃ) কে যে প্রত্যাদেশ দেওয়া হইয়াছিল তাহা নতুন কিছুই নহে, কারণ সেই একই গ্রন্থ (আল-কিতাব) সকল নবীদেরকেই দেওয়া হইয়াছিল। কিন্তু মানুষের হস্তক্ষেপের ফলে বিদ্যমান অন্য সকল গ্রন্থে আল্লাহর বাণী নবীদের ও অন্যান্যদের বক্তব্যের সহিত মিশ্রিত হইয়া গিয়াছে। এইজন্য কোরান শেষ প্রত্যাদেশ রূপে আসিয়াছে, এবং ইহাতে কেবলমাত্র আল্লাহর বাণীই অক্ষত অবস্থায় আছে। পূর্ববর্তী নবীদের কাছে প্রদত্ত প্রধান শিক্ষনীয় বিষয়সমূহ পূর্ণরূপে কোরানে রক্ষিত আছে, কারণ কোরান দাবী করে যে একই বিশ্বজনীন বার্তাসমূহ সকল নবীদের দেওয়া হইয়াছিল। এই পুস্তকে ‘ইহুদিদিগের ধর্মগ্রন্থ ও বাইবেল’ শিরোনামে একটি অধ্যায় সংযুক্ত করা হইল, কোরানের পরিপ্রেক্ষিতে ইহাদের গুরুত্ব ব্যাখ্যার উদ্দেশ্যে। অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহও এইরূপভাবে বিন্যস্ত করা হইয়াছে যাহাতে কোরানের একটি সর্বাঙ্গীন চিত্র উপস্থাপিত হয়। ইহার ফলে, যদি কেহ উৎসাহী হন, তিনি আরো অধ্যয়নের মাধ্যমে অগ্রসর হইয়া পরিশেষে কোরান অনুশীলনে ব্রতী হইতে পারেন। একটি বিষয় স্পষ্টরূপে জানা দরকার যে, কোরানের অনুবাদ হইতে যদি কোন মতভেদ বা বিভ্রান্তির উদ্ভব হয় তাহা হইলে মূল আরবী শব্দসমূহের ভিত্তিতে অনুবাদের যথার্থতা যাচাই করা যাইতে পারে, ইহাতেই কোরানের সৌন্দর্য (এবং ইহার সঠিকতা) নিহিত আছে। ইহা অন্য কোন “ধর্মগ্রন্থের” ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নহে, কারণ সেগুলির ‘মূল’ এর অস্তিত্বই নাই।

দুঃখের বিষয, কোরানের আয়াতসমূহের বহু ভূল অনুবাদ হইয়াছে। এই বিষয় নির্দেশ করিয়া এই পুস্তকে একটি অধ্যায় সংযোজন করা হইয়াছে (অষ্টম অধ্যায়)। যাহাতে বিষয়বস্তুর সহিত মিল রাখিয়া আরবী শব্দসমূহের সূত্র দেওয়া হইয়াছে। সর্বশেষে বহু আয়াতে আল্লাহ্ নিজেই বলিতেছেন যে সর্বোৎকৃষ্ট ব্যাখ্যাদাতা তিনিই (দ্রষ্টব্য: ৬:৬৫; ১৭:৪১, ৮৯; ১৮:৫৪; ৩০:৫৮; ৩৯:২৭; ৪১:৩; ৭৫:১৯, ইত্যাদি, যে আয়াতসমূহ এই পুস্তকে চতুর্থ অধ্যায়ে সংশ্লিষ্ঠ করা হইয়াছে।এই অধ্যয়ন পর্যায়ক্রমে সন্নিবেশিত হইয়াছে। কিন্তু বিভিন্ন বিভাগগুলি স্বতন্ত্রভাবে পাঠযোগ্য। আমি ঐকান্তিকভাবে আশা করি ইহা মুক্তমন ও পক্ষপাতিত্বহীন ভাবে পঠিত হইবে, এবং ইহা আল্লাহর সর্বশেষ প্রত্যাদেশ, মানবজাতির পর্থনির্দেশক কোরান অধ্যয়নে প্ররোচিত করিবে।

দ্রষ্টব্য নং ১ : কিছু কিছু সূরায়, আয়াতগুলির যুক্ত বা বিভক্তকরণের জন্য উল্লিখিত আয়াত সংখ্যার ১ বা ২ এর ব্যতিক্রম হইতে পারে। পাঠকবৃন্দকে এই বিষয়ে স্মরণ রাখার জন্য অনুরোধ করা হইতেছে, বিশেষ করিয়া ইউসূফ আলী ও জি, এ, পারভেজের অনুবাদ অনুসরণ করিবার সময়।

দ্রষ্টব্য নং ২ : কোন নবী বা রাসূলের নাম উচ্চারণের পর প্রথানুযায়ী মুসলিমরা “আলাই-হিস-সালাম” (তাঁহার উপর শান্তি বর্ষিত হউক) উল্লেখ করেন। আমি আশা করি এই গ্রন্থে কোন নবীর নাম পাঠের পর মুসলিমগণ এই রীতি অনুসরণ করিবেন।

দ্রষ্টব্য নং ৩ : বিশ্বের প্রতিপালক হিসাবে কোন বাংলা শব্দের পরিবর্তে আমি আরবী শব্দ ‘আল্লাহ্’ ব্যবহার করিয়াছি কারণ আল্লাহ্ শব্দ কোরানে বিশেষ ভাবে নিরূপিত হইয়াছে এবং অন্য কোন অংশীদারকে তাঁহার সহিত বিজড়িত করা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। তিনি এক ও অদ্বিতীয়, এবং তিনি বহু গুণাবলীর অধিকারী, যথা সর্বব্যাপী, সর্বজ্ঞ, মঙ্গলময়, করুণাময়, ইত্যাদি।

দ্রষ্টব্য নং ৪ : কোরানের অনেক আয়াতে, অতএব ইহার অনুবাদেও ‘আল্লাহ্’র স্থলে ‘আমি’, ‘আমরা’, ‘আমাদের’, ইত্যাদি ব্যবহৃত হয়। ইহা অসঙ্গত নহে কারণ রাজকীয় অর্থে ‘আমরা’, ‘আমাদের’ ইত্যাদি একবচন হিসাবে ব্যবহৃত হয়। অধিকন্তু, কোরানে কোন কোন আয়াতে, ‘আমি’, ‘আমরা’, ‘আমাদের’, ইত্যাদি একই বাক্যে ব্যবহৃত হইয়াছে। ইহা সুপরিকল্পিত, এবং ইহা দ্বারা বুঝান হইতেছে যে আল্লাহ্ আমাদের ধারণামত একজন ব্যক্তি নহে।





Home Next >>